সুপ্রিয় চৌধুরীর জন্ম উত্তর কলকাতার সাবেকি পাড়ায়। কৈশোরের অনেকটাই কেটেছে রেললাইন আর উদ্বাস্তু কলোনি ঘেঁষা শহরতলিতে। যৌবন, প্রৌঢ়ত্বের ঠিকানা মধ্য ও দক্ষিণ কলকাতার সীমান্তবর্তী সংখ্যালঘু মহল্লা। পুঁথিগত শিক্ষার গণ্ডি পেরোলেও নানাধরনের পাঠে প্রবল আগ্রহ। শখ: ফুটবল, ফিল্ম আর পশুপাখি পোষা।
সাহিত্যকে আমরা সমাজের দর্পণ বলি ঠিকই, কিন্তু মাঝেমাঝে আয়নায় নিজের বদলে হৃত্বিক রোশনকে দেখতে ইচ্ছে করে। ঠিক সেভাবেই সাহিত্যে এমন কিছু খুঁজে পেতে ইচ্ছে করে, যেখানে বাকি সব বাস্তবানুগ অন্ধকার হলেও শেষে আলো দেখা যায়। আলোচ্য বড়োগল্পটিও সেই ইচ্ছাপূরণ করার এক আয়ুধ। রোজ যেভাবে আমাদের ঘরের মেয়ে বা বোনেরা কিছু মানবরূপী দানবের খেলনা হয়ে ভেঙে যায়, তুবড়ে যায়, হারিয়ে যায়, ঠিক সেভাবেই হারিয়ে গেল স্কুলছাত্রী অন্বেষা। সৎ, শ্মশান হয়ে যাওয়া সংসার ভুলে ডিউটিতে বাঁচতে চাওয়া পুলিশ অফিসার রুদ্রনারায়ণ ব্যানার্জি ও তার টিম অন্বেষাকে পেল বটে, তবে মৃত অবস্থায়। তারপর কী হল? অন্বেষার মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তাদের কি কোনো শাস্তি হল? এই কলকাতায়, এই ভারতবর্ষে, হয়তো ওই অপরাধীদের কিচ্ছু হয় না, কিন্তু এই নভেল্লায় কিছু হয়েছে। এক্কেবারে মসালা মুভি স্টাইলেই হয়েছে! জানতে চান? পড়ে ফেলুন বৃশ্চিককাল। নাক-উঁচু সাহিত্যের আশা করলে ব্যর্থ হবেন। তবে ইচ্ছাপূরণের বিনোদন, বা স্বপ্নবিলাস চাইলে এটি আদর্শ। আমিও ঠিক সেই কারণেই বইটিতে মজলাম।
শেষ করলাম সাহিত্যিক সুপ্রিয় চৌধুরী রচিত ক্রাইম থ্রিলার বৃশ্চিককাল ।
সংক্ষেপ - স্কুলের পরে প্রাইভেট টিউশন পড়ে বাড়ি ফেরার জন্য বের হয় অন্বেষা । কিন্তু সে বাড়ি ফেরেনি । অনেক অপেক্ষার পর তার বাবা সুমিতবাবু পুলিশের কাছে যান । মিসিং কেস নিয়ে তদন্ত শুরু করে কলকাতা পুলিশ। মামলা গোয়েন্দা বিভাগে যায়। মামলার তদন্তের দায়িত্ব যায় অফিসার রুদ্র নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে।
কোনো ক্লু পাওয়া যায়না। মেয়েটি কোথায় যেতে পারে ? তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়না। এরপরে পুলিশ ব্যবহার করে কলকাতা শহর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন গোপন সূত্র তথা সোর্সদের, যারা নিজেরাও অন্ধকার দুনিয়ার সাথে কোনো না কোনো সময়ে যুক্ত ছিল। কিন্তু কোনো লাভ হয়না । ইতিমধ্যে রুদ্রের পারিবারিক জীবনে নেমে আসে শোকের অধ্যায়, তার স্ত্রী আই টি কর্মী তাকে ছেড়ে চলে অন্যত্র চলে যায় তাদের মৃত পুত্রের জন্মদিনের কয়েকদিন পরেই। এদিকে অন্বেষার কেস নিয়ে চিন্তিত রুদ্র স্ত্রী ছেড়ে চলে যাওয়ায় একা হয়ে পড়ে, এরপর অন্বেষার লাশ পাওয়া যায় বাইপাস থেকে বাসন্তী যাওয়ার হাই ওয়ের ধারে একটি বিশাল মাছের ভেড়িতে ৷
এই ঘটনার পর কলকাতার বেশ কিছু অঞ্চলে বিভিন্ন কলেজ ছাত্রের লাশ পাওয়া যেতে শুরু করলো কিছুদিন পর পর , যাদের অধিকাংশের পরিবার প্রবল যশস্বী ও রাজনৈতিক ভাবে প্রতিপত্তিশালী।
কে করছে খুন গুলো ? রুদ্র কি পারবে এই কেসগুলো সলভ করতে ? এদিকে কমিশনার রুদ্রকে সাত দিনের সময় দিয়ে দিয়েছেন কেস সলভ করার জন্য অন্যথা কেস চলে যাবে এমন এক অফিসারের হাতে যিনি ধূর্ত , অসৎ এবং ঘুষখোড় । যার মধ্যে বাস করে রুদ্রের প্রতি প্রবল প্রতিহিংসা ।
প্রতিক্রিয়া - এটি একটি pure ক্রাইম থ্রিলার। সাসপেন্স বেশি নেই। কিন্তু শহর কলকাতার অন্ধকার গলিতে লেখক আমাদের ঘোরাবেন, যেখানে থাকবে মধ্যরাতে পরিত্যক্ত রেল ইয়ার্ডে বসা গোল মিটিং , যেখানে থাকবে সস্তা ধাবার পিছনে শাটার বন্ধ ঝা চকচকে ড্রয়িং রুমে গোয়েন্দাদের সাথে ইনফরমারদের চুক্তি, কিংবা রাত্রি নিশীথে নাইট ক্লাব গুলির মধ্যে ডিজে পার্টিতে কামাতুর নারীর উদ্দাম নৃত্য, যাকে রোজ দেখে বড়লোক বাপের ড্রাগ নেওয়া ছেলে বোর হয়ে যায় আর নতুন ডিশের জন্য মন ব্যকুল হয়ে ওঠে, থাকবে বস্তি থেকে মাফিয়া হয়ে যাওয়া বেপরোয়া মানুষ। লেখক দেখিয়েছেন যদি বাবা মা উভয়ই সারাদিন ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং কোনোদিন সন্তানকে একটু সময়ও না দেন, তাহলে তাদের সন্তানের চিন্তা ধারা বোধ শক্তি কেমন হয় বড়ো হলে ?? লেখক প্রশ্ন করেন মেকি আধুনিকতার আড়ালে থাকা ক্লেদাক্ত শহুরে মনোভাবকে। লেখক দেখিয়েছেন, রাজনীতির মাথায় থাকা জননেতা কত ভয়ংকর হতে পারে যদি তাদের স্বার্থে ঘা লাগে , লেখক যেমন দেখিয়েছেন ঘুষ খেয়ে ক্রিমিনাল দের বাঁচিয়ে সোনার ডিম পাড়া হাঁস বানানো গোয়েন্দা কত নিচ হতে পারে আবার তেমনই দেখিয়েছেন রাজ্যের শাসক দলের মন্ত্রীর হুমকি শুনে একজন মেরুদন্ডযুক্ত গোয়েন্দা অফিসার কতটা দৃঢ়ভাবে মোক্ষম জবাব দিয়ে দেয়। লেখক তার গোয়েন্দা পুলিশ অফিসার রুদ্রের মুখ দিয়ে প্রশ্ন করায় - কেন মানুষ বিচারের আশায় পুলিশের উপর ভরসা করে না ? তারা কেন আইন হাতে তুলে নেয় ? যার কোনো উত্তর কমিশনার দিতে পারেন না।
বিশাল সাহিত্য, টুইস্ট বা সাসপেন্স এতে পাবেন না। । তবে থ্রিলার হিসেবে মজা পাবেন ।
সব মিলিয়ে বইটি শহরের আয়নায় নিজেদের দেখতে পাওয়ার মতো ক্রাইম থ্রিলার ।