এত বড়বড় বিজ্ঞানীদের মাঝে তার মত একজন নগণ্য বাঁশিওয়ালা কেন? সে কি দুনিয়ার সেরা বংশীবাদক? যদি হয়ও তবু তার কাজ কী এই অভিযানে? প্রবাল জানে তাকে নিয়ে এমন প্রশ্ন সহযাত্রীদের অনেকের মনেই আনাগোনা করে, তাদের বাঁকা দৃষ্টি দেখলেই সে তা বুঝতে পারে।
গণিতবিদ টয়লার ঠোঁট বাঁকিয়ে মুচকি হেসে বলেন, "ক্যাপ্টেন, আপনার হিসাবে কিছুটা গরমিল আছে, শেষ জাম্পে আমরা ঠিক তিন ঘণ্টা দশমিক শূন্য এক পাঁচ সেকেন্ড থাকব।" ক্যাপ্টেন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে হঠাৎ প্রবাল বলে, “ক্যাপ্টেন, আমার একটা প্রশ্ন ছিল।”
প্রবালের দিকে প্রশ্রয়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে মৃদু মাথা নাড়েন ক্যাপ্টেন। “আমি আসলে জানতে চাচ্ছিলাম যে পৃথিবীতে থাকতেই আমরা কেন ব্ল্যাংক-জাম্প দেইনি? কেন শুধু শুধু গত একমাসে বিপুল বেগে ধেয়ে সৌরজগতের বাইরে আসলাম? আর প্রাইমারি ও আল্টিমেট জাম্পের কী প্রয়োজন? প্রথমেই কেন আল্টিমেট জাম্পে যাচ্ছি না?”
পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে আসে ঘরে, সবার মুখ কেমন যেন থমথমে হয়ে যায়; গণিতবিদ টয়লারের মুখ একবারে পাংশু বর্ণ ধারণ করে মুহূর্তেই, পদার্থবিজ্ঞানী ভ্লাদিমিরের চোয়াল ঝুলে পড়ে; গুমোট এই নীরবতার মধ্যে হঠাৎ “ওহ, ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন, নিশ্চয় উনি সবার সহায়!” বলে চেঁচিয়ে বুকে ক্রুশ এঁকে বাইবেলটা একবার কপালে ছুঁয়ে বুকের ওপর দু হাতে চেপে ধরেন ফাদার ৷
মোহাম্মদ সাইফূল ইসলাম এর জন্ম ১৯৮১ সালে নরসিংদী জেলায়। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দেশে-বিদেশে। একজন সফল উদ্যোক্তা ও স্বপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানির সিইও হিসেবে বর্তমানে প্রবাসজীবন যাপন করছেন লিবিয়াতে। শিক্ষাজীবনে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে ২০০৩ সালে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্নাতক। লিখছেন দীর্ঘদিন থেকে। 'শান্তির দেবদূত' ছদ্মনামে সামহোয়ারইনব্লগে সায়েন্স ফিকশন লিখে যথেষ্ট জনপ্রিয়। অনলাইন জগতে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় দুই ডজন বিপুল পঠিত ও আলোচিত সায়েন্স ফিকশন গল্প-উপন্যাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার। লেখকের প্রথম সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল যথেষ্ঠ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। ‘ও-টু’ লেখকের দ্বিতীয় সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস। বিজ্ঞান, মানবতা, প্রেম আর প্রখর রসবোধের মিশেলে অনবদ্য লেখনিবৈশিষ্ট্য লেখককে বিশিষ্টতা দিয়েছে। তার লেখাগুলো সুখপাঠ্য ও চুম্বকধর্মী। লেখকের সায়েন্স ফিকশনগুলো বিজ্ঞানের নীরস কচকচানি নয়, বরং জীবনের প্রেম-কাম ও হাসি-কান্নার রসে সিক্ত। -- By Tasruzaman Babu
"সবচেয়ে মৌলিক ও আদি বাদ্যযন্ত্র হচ্ছে আমাদের কণ্ঠ। তারপরেই আবির্ভাব হয়েছে বাঁশির। সুরের প্রতি মানুষের সেই যে টান লক্ষ বছরের বংশপরম্পরায় এখনো তা বিদ্যমান, এখনও সুরের টানে ঘর ছাড়ে মানুষ। মানুষ কাঁদে, মূর্ছা যায় এই সুরের কুহকে।"
- কথাগুলো ক্লাসিকাল বংশীবাদক প্রবালের। ভাবছেন, সায়েন্স ফিকশনে সঙ্গীত আর মানবিক বোধের কথা এলো কোত্থেকে? আশা করি, আলোচনা শেষে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বিজ্ঞানী-গণিতবিদ-প্রকৌশলীদের নিয়ে মহাকাশে ছুটে চলেছে অত্যাধুনিক মহাকাশযান সক্রেটিস-১। গণিতবিদ টয়লার, পদার্থবিদ ভ্লাদিমির, ক্যাপ্টেন চমনোস্কির মতো কীংবদন্তিখ্যাত অভিযাত্রীদের মাঝে বাংলাদেশের এক সাদাসিধে বংশীবাদকের উপস্থিতি বড় বেমানান। প্রবাল নিজেও জানে না, তার কাজটা কী। এখানে তাকে আনাই বা হলো কেন? এতবড় কোন মিশনে নিশ্চয়ই খেয়ালের বশে কাউকে নিয়োগ দেয়া হয় না! তবে কী সেই মহান উদ্দেশ্য?
আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থার এক অভিনব প্রজেক্ট : "প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল"। মহাশূন্যের সীমারেখার ওপারে কী আছে, তা জানতে সময়ের বলয়কে ভেদ করে মহাবিশ্বের বাইরে চলে যাওয়াই এ প্রজেক্টের উদ্দেশ্য। গন্তব্য অসীম, পরিণতি অজ্ঞাত; তবুও সাফল্যের আশায় বুক বেঁধে অত্যাধুনিক মহাকাশযানে পাড়ি জমালো তারা।
পৃথিবীর ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, বিজ্ঞানের শুরু থেকেই ধর্মীয় দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। সৃষ্টির রহস্য নিয়ে গবেষণাকে সীমা লঙ্ঘনের অপচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যুগে যুগে। ঠিক একইভাবে, 'প্রজেক্ট প্রজেক্টাইলে' অভিযানের মাধ্যমে যখন ঈশ্বরের বেঁধে দেয়া সীমারেখা ডিঙিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সঙ্গত কারণেই বাধ সাঁধে এক ধর্মীয় জঙ্গীগোষ্ঠী 'চার্চ অভ রিজারেক্টেড আর্মি' এর একটাই উদ্দেশ্য, যে করেই হোক এই প্রজেক্টকে বানচাল করে দিতে হবে। আর তাই, ষড়যন্ত্র করে ছদ্মবেশে সক্রেটিস-১ স্পেসশিপে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাদের এক প্রতিনিধিকে। শেষমুহূর্তে হয় সে অভিযাত্রীদেরকে যাত্রার দিক পরিবর্তনে বাধ্য করবে, নতুবা ধ্বংস করে দেবে সবকিছু!
সমান্তরালভাবেই এগিয়েছে বন্দনা নামের একটি মেয়ের জীবনকাহিনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত একজন পদার্থবিজ্ঞানী প্রফেসরের মেয়ে বন্দনা কবির। নিজের জন্মপরিচয় নিয়ে অজানা এক রহস্যের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সে অসহায় বোধ করে। আরেকদিকে প্রবালের বাঁশির সুরে ব্যকুল হয়ে ওঠে তার হৃদয়। অজান্তেই কখন যেন বাঁশির শিক্ষককে ভালোবেসে ফেলে মেয়েটা। আবেগের বশবর্তী হয়ে প্রবালকে সে কথা জানানোর পর, নিছক ছেলেমানুষি ভেবে প্রবাল বারবার পাশ কাটিয়ে যায়। তবু পৃথিবী থেকে অনেক অনেক দূরে এসে, প্রবালের স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে বন্দনার কথা।
বাধাবিপত্তি কাটিয়ে অনেকটা পথ পাড়ি দেয় মহাকাশযান। কিন্তু অযুত-নিযুত আলোকবর্ষ দূরে, লক্ষ্যের কাছাকাছি এসে ঘটতে শুরু করে একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। একদিকে নভোচারীদের সিদ্ধান্থীনতা, আরেকদিকে মৃত্যু তাড়া করে ফিরছে প্রতিপদে। এ অবস্থায় কি আদৌ মহাবিশ্বের সীমারেখা ভেদ করা সম্ভব? ঈশ্বর কি সত্যিই সীমারেখা টেনে রেখেছেন? সেই সীমালঙ্ঘনের ফলেই কি ঘনিয়ে আসছে চরম বিপর্যয়? কীই বা আছে সীমানার ওপারে?
জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্মম এক ধাঁধার সমাধান খুঁজে বের করতে প্রবালকে। বাঁশি বাজিয়ে সেই গহীন দুর্যোগ মোকাবেলা করতে সে কতোটা প্রস্তুত? মৃত্যুর অপেক্ষায় ক্লান্ত কেন্দ্রীয় মহাকাশ সংস্থার প্রাক্তন পরিচালক ক্যাসিও আন্তের। মৃত্যুর আগে কোন রহস্যের পর্দা উন্মোচন করতে মরীয়া হয়ে উঠেছেন বৃদ্ধ? বইয়ের পাতায় মিলবে সে উত্তর।
বিজ্ঞানের যুক্তিকে দমিয়ে রাখতে যুগে যুগে উত্থান ঘটেছে ধর্মীয় গুপ্তসংঘের। আগ্রাসী হস্তক্ষেপে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে যুক্তিবাদীদের। ধর্মীয় ধারণাকে অবজ্ঞা করে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ ধ্রুব সত্যটি বলার কারণে বিজ্ঞানী ব্রুনোকে জীবন দিতে হয়েছে। গ্যালিলিও ধর্ম যাজকদের ভয়ে নিরুপায় হয়ে পৃথিবী যে সূর্যকে বেষ্টন করে ঘূরে, সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে ভীত ছিলেন । নিজের মতামত প্রচার থেকে বিরত ছিলেন একই কারণে। বাধা এসেছে, অস্ত্রের জোরে সত্যকে দমিয়ে রাখা হয়েছে বহুবার। তবে তাতে কিন্তু বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। জ্ঞানপিপাসু মানুষ খনি হাতড়ে বের করে এনেছে সত্যের রত্নভাণ্ডার।
চিরাচরিত সেই দ্বন্দ্বকে কল্পকাহিনির পাতায় ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। আকাশ বিজয়ের ইতিহাস বহু পুরনো, মানুষের জ্ঞান তাকে আরো দূরের পথ পাড়ি দিতে উদ্বুদ্ধ করে। ডানাবিহীন মানুষ যখন বিজ্ঞানের কল্যাণে আকাশে উড়তে শিখেছে, তবে সেই বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তথাকথির সীমারেখাকেও সে ভেঙে ফেলতে চায়। ঈশ্বরকণার গতি-প্রকৃতি, বিগ ব্যাং থিওরি, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, আপেক্ষিকতার তত্ত্ব- বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞানীরা যুগান্তকারী আবিষ্কার করেই চলেছেন। কল্পবিজ্ঞানের ছলে হলেও 'প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল' তাই যথেষ্ট বাস্তবসম্মত হয়ে ধরা দেয় আমাদের চোখের সামনে।
সায়েন্স ফিকশনের নামে হাস্যকর, আজগুবি তথ্য সম্বলিত জবজড়ং উপন্যাস পড়ার দুর্ভাগ্য হয়েছে এর আগে। দুর্বোধ্য বিষয়ের উপস্থিতি টেনে ভজঘট পাকাতেও দেখেছি অনেককে। প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল সেদিক থেকে সফল। জার্গনের ব্যবহারজনিত জটিলতা থাকলেও শেষাংশে নির্ঘণ্ট জুড়ে দেয়ায় তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। প্রতিষ্ঠিত থিওরির সহজ স্বাভাবিক ব্যাখ্যা, তার সাথে কল্পনার মিশ্রণ- ভালো না লেগে উপায় নেই।
বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী সাহিত্যেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘরানা। তাই লেখার গুণগত মান অবশ্যই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। মোহাম্মদ সাইফূল ইসলাম সেক্ষেত্রে তেমন অভিযোগের সুযোগ রাখেননি। তার বর্ণণাভঙ্গি সুন্দর, স্বাচ্ছন্দ্যে এগোনো যায়। ছোট্ট কলেবরের বইটিতে প্রয়োজন অনুযায়ী অনেকগুলো চরিত্রের উপস্থিতি ঘটেছে। প্রতিক্ষেত্রেই দাঁড় করানো হয়েছে শক্তিশালী ব্যাকগ্রাউন্ড। প্রবালের বাঁশির সুর যেন কাগজের জড়জগত থেকে বেরিয়ে এসে আঘাত করে কানের পর্দায়। বন্দনার জমে থাকা অভিমান, অতীতের অনুসন্ধানে উৎকণ্ঠিত হৃদয় আমাদের বিষণ্ণ করে তোলে। গণিতবিদ টয়লার এবং পদার্থবিদ ভ্লাদিমিরের খুনসুটি আমাদেরকে পক্ষপাতিত্বের দিকে ঠেলে দেয়। হাস্যমুখী ডাক্তার মিলিতাকে মনে হয় বহুদিনের পরিচিত। আলাদা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয়। তবে সামগ্রিক বিবেচনায়, চরিত্রগুলো মূলত একা। মহাকাশের রহস্যময় জগতে সেই নি:সঙ্গতার অনুভূতি আমাদের মনে দাগ কেটে যায়। লেখকের কৃতিত্ব এখানেই- পাঠক খুব সহজেই চরিত্রগুলোকে আপন করে নিতে পারবেন; তাদের একাকীত্বে ভারী হয়ে উঠবে আপনার মন, সুখ-দু:খের অনুভূতিতে আলোড়িত হবেন আপনি নিজেও।
নিছক সায়েন্স ফিকশন নয় প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল। এই ব্যাপারটা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অজানাকে অনুসন্ধানের গল্প প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল। চাক্ষুষ সীমানাকে ছাড়িয়ে ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়ানোর গল্পও এটা। তবে ঠিক একইভাবে মানব-মানবীর অকৃত্রিম প্রেম এ গল্পে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। রোমাঞ্চকর থ্রিলারধর্মী আবহের সাথে চমৎকারভাবে সমন্বয় ঘটেছে মানবিক আবেগের। প্রয়োজনীয় মুহূর্তে নিজেদের অহং বিসর্জন দিয়ে ভ্লাদিমির আর টয়লারের এক হয়ে যাওয়া, বৃহত্তর স্বার্থের দিকে তাকিয়ে নিজের অস্তিত্বকে তুচ্ছজ্ঞান- মানভসভ্যতা টিকেই আছে এই পরিচিত আবেগের বহি:প্রকাশকে ভিত্তি করে! অতৃপ্ত প্রেমের গল্পের উপসংহারে মনের ভেতর বেজে ওঠে অজান্তেই, "কে জানে কীসের লাগি প্রাণ করে হায় হায়!"
#ভালো না লাগা বিষয়গুলো:
১) 'আগে দর্শনদারী, তারপর গুণবিচারী।' হ্যাঁ, বইয়ের প্রচ্ছদটি মূল গল্পের সাথে অতি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবুও বলতে হয়, তা অনেকাংশেই শিশুতোষ। কালার কম্বিনেশনের দিক থেকে আকর্ষণীয় হলেও প্লট অনুযায়ী আরো মানসম্পন্ন প্রচ্ছদ অন্তত আমার কাছে কাম্য ছিল।
২) লেখার ভঙ্গি স্বতন্ত্র এবং সুখপাঠ্য। তবে বর্ণণার ক্ষেত্রে কিছু অংশে ধারাবাহিকতা রক্ষায় অসামঞ্জস্য লেগেছে। একই সাথে ফ্ল্যাশব্ল্যাক এবং প্যারালাল স্টোরিটেলিং এ আরো যত্নশীল হওয়ার সুযোগ ছিল।
৩) আগেও বলেছি, এই গল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর আড়ালে মিশে থাকা মানবিক অনুভূতি। তবে শেষপর্যায়ে এসে, এই আবেগের অতিবহি:প্রকাশই আবার ভ্রূকুটি করতে বাধ্য করেছে। ভালোবাসায় বারবার একই ধরণের বাধা, একই দুর্ভাগ্য...না থাক, এই ব্যাপারে বলতে গেলে স্পয়লার হয়ে যায়।
আলোচনা, সমালোচনা সব মিলিয়ে বলতে গেলে প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল একটি উপভোগ্য সায়েন্স ফিকশন। এমন সব স্বতন্ত্র গল্পের ডানায় ভর করে আমাদের সাহিত্য এগিয়ে যাক আলোকবর্ষ দূরে।
লেখকের লোলার জগৎ পড়বার পর তার লেখনশৈলীর ভীষণ রকম ভক্ত বনে গেছিলাম। এবার প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল সেটাকে আরও পাকাপোক্ত করেছে। ছোট্ট কলেবরের বইটা চাইলে আরেকটু বিস্তৃত আকারে উপস্থাপন করা যেত। তবে তাতে পাঠক মনের তৃষ্ণা মিটলেও লেখকের ইচ্ছা হয়তো পরিপূর্ণতা পেতো না। নিজস্ব কিছু ফিকশনাল টেকনোলজি ও দর্শনতত্ত্ব ধরে রেখেছেন। যারা লোলার জগৎ পড়েছেন তারা ভালো ভাবে অনুধাবন করতে পারবেন এই কথার মর্ম। মাত্র ১১১ পৃষ্ঠার মাঝেই কল্পবিজ্ঞান ও মানবমনের চিত্র নিপুণ হাতেই এঁকেছেন লেখক। সে জন্য আলাদা ভাবে বাহবা তার প্রাপ্য। দেশের অনেক লেখকই চার-পাঁচশো পৃষ্ঠা লিখেও মনোযোগ কাড়তে পারেন না, সেখানে তিনি ছোট মরিচেই ঢেলেছেন সুতীব্র ঝাল। প্রচ্ছদটা একদমই সুবিচার করতে পারেনি চমৎকার নভেলাটিকে। ভবিষ্যতে নতুন মুদ্রণ এলে ভিন্ন কিছু চাই তার কাছ থেকে। মোহাম্মদ সাইফূল ইসলামের অন্য দুটো উপন্যাস 'ওটু' এবং 'ঈশ্বরের গণিত' পড়বো শীঘ্রই। শুভকামনা ও সুস্থতা কামনা রইল লেখকের জন্য।
বইয়ের নামঃ প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল লেখকঃ মোহাম্মদ সাইফূল ইসলাম বইয়ের ধরণঃ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী প্রচ্ছদঃ আসিফ সিদ্দিকী প্রকাশনাঃ উপন্যাস প্রকাশন প্রথম প্রকাশঃ মে, ২০১৮ পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১১২ মুদ্রিত মূল্যঃ ২৩০ টাকা . ধর্ম ও বিজ্ঞান-- এ দুয়ের দ্বন্দ্বের ইতিহাস বহু পুরনো। ঠিক কবে থেকে এ দুইয়ের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল, সে ব্যাপারে বিস্তারিত কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র আজও পাওয়া যায়নি। যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞান ও বিশ্বাসনির্ভর ধর্মের মাঝে চলমান দ্বন্দ্বে জড়িয়ে কতজন যে হতাহত হয়েছে, সে ব্যাপারেও কোনো পরিসংখ্যানিক উপাত্ত পাওয়া যায়না। ধর্মীয় অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো ধর্মে বিশ্বাস করতে বলা হলেও আধুনিক বিজ্ঞানের কোনো তত্ত্ব দিয়ে সরাসরি তাকে প্রমাণ করা যায়না। এ নিয়েই ধর্মবাদী ও বস্তুবাদীদের যত দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে। . এমনই এক দ্বন্দ্বের গল্প নিয়ে পাঠক সমাজে হাজির হয়েছেন তরুণ লেখক মোহাম্মদ সাইফূল ইসলাম। ১৯৮১ সালে জন্ম নেওয়া এ লেখকের বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব কাটে দেশে-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায়। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়(কুয়েট) থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি(সিএসই) বিষয়ে স্নাতক(সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে উদ্যোক্তা হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সে প্রতিষ্ঠানের সুবাদে বর্তমানে লিবিয়ায় প্রবাস জীবন যাপন করছেন তরুণ এ লেখক। তো, যা বলছিলাম তখন! ধর্ম ও বিজ্ঞানের এ বিরোধের গল্পের আশ্রয়ে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী তুলে ধরেছেন এ লেখক। মহাবিশ্বের জন্ম ও গঠন নিয়ে মানুষের জল্পনা-কল্পনার কোনো শেষ নেই। বারবার মানুষ চেষ্টা করেছে মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটন করতে। বার বার মানুষ মহাকাশে ছুটে গিয়েছে এ রহস্যের টানে। বার বার ব্যর্থ হলেও মানুষের এ উৎসাহে কোথাও যেন কোনো ভাটা পড়েনি কখনোই। বরং একেক বার ব্যর্থ হবার পর পরের বার দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে ছুটে গিয়েছে মহাবিশ্বের পানে। মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটন করতে আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থার এক প্রজেক্টের গল্প নিয়ে রচিত বইয়ের নাম "প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল"। পাশাপাশি মানুষের মানবিকতার নানা দিক সংক্রান্ত আলোচনা এ বইটিতে সমানভাবে স্থান পেয়েছে। একদিকে বিজ্ঞান, অন্যদিকে মানবিকতা--- এ দুইয়ের অসম লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কোন শক্তির জয় হয়? বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত দানবীয় শক্তির জয় হয়, নাকি "সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই"---- চণ্ডীদাসের এ জনপ্রিয় উক্তির সত্যতা আরেকবার প্রমাণিত হয়? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে উল্লেখিত বইয়ের পাতায়। . আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পক্ষ থেকে মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনে এক প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়। প্রজেক্টের নাম "প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল"। টাইম ও স্পেসের মাত্রা শূন্য হলে সেখানে কী ঘটতে পারে, তা খুঁজে বের করাই এ প্রজেক্টের উদ্দেশ্য। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মহাকাশে স্পেসশিপ পাঠানো হয়। মহাকাশচারী হিসেবে এ অভিযানে অংশ নেন পৃথিবীর সকল বাঘা বাঘা পদার্থবিদ, গণিতবিদ ও বিজ্ঞানীরা। এদের সাথে এ অভিযানে যাবার সুযোগ পান বাংলাদেশের এক অখ্যাত যুবক। তার নাম প্রবাল। পেশায় বংশীবাদক প্রবাল কী করে এ অভিযানের সওয়ারী হলেন, তা নিয়েই এ বইয়ের গল্প। শুনতে বেশ অবাক লাগলেও এ বংশীবাদক অন্যান্যদের সাথে মহাকাশে পাড়ি জমান। পরবর্তীতে ঘটনাচক্রে যখন তাদের ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা নেমে আসে, তখন এ অখ্যাত বংশীবাদকের প্রচেষ্টায় তারা সকলে বিপদ থেকে মুক্ত হন। কিন্তু একজন সামান্য বংশীবাদক কী করে রক্ষা করতে পারে এ মহাকাশযানকে। প্রিয় পাঠক! সে প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে চোখ রাখতে হবে উপন্যাসের পাতায়। এ তো উপন্যাসের একদিকের গল্প। এর পাশাপাশি দুই নরনারীর অতৃপ্ত প্রেমের গল্প-ও সমানভাবে ফুটে উঠেছে এ উপন্যাসটিতে। প্রেম এ উপন্যাসের মুখ্য কাহিনী না হলেও তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নির্ভর এ উপন্যাসটাতে। . উক্ত উপন্যাসের আলোচ্য বিষয়বস্তু নিয়ে কথা তো কম হলো না। এবার আসি চরিত্রগত বিশ্লেষণের অংশে। আমার মতে, এটাকে ঠিক বিশ্লেষণ না বলে ব্যবচ্ছেদ বলাই বোধ হয় অধিকতর শ্রেয় হবে। কেননা, রিভিউয়ের এ অংশে লেখকের সৃষ্টিকর্মকে ইচ্ছেমত টেনে-হিঁচড়ে, কেটে কুটিকুটি করা হয়। যা হোক, মূল আলোচনায় ফিরে আসা যাক আবার। উপন্যাসের মুখ্য চরিত্রে রাখা হয়েছে প্রবাল নামক এক বংশীবাদককে। মহাবিশ্বের রহস্য সংক্রান্ত জটিল বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে পূর্বদেশীয় একজন সামান্য বংশীবাদকের ভূমিকা কী হতে পারে, সেটাও এক অপার বিস্ময়। তার চাইতে বড় বিস্ময় হচ্ছে, এ নগণ্য ব্যক্তির ভূমিকাতেই আসন্ন বিপদের হাত থেকে রক্ষা পায় প্রথিতযশা বিজ্ঞানীর দল। কিন্তু এটাও কি কখনো সম্ভবপর হতে পারে? হ্যাঁ, পাঠক! এটাও সম্ভবপর হয়ে উঠতে পারে, যার সত্যতা পাওয়া যাবে উক্ত বইয়ে। এর পাশাপাশি তার জীবনের এক অতৃপ্ত দিক বেশ সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলবার কাজটি সুনিপুণ হাতে করেছেন এ ঔপন্যাসিক। বিজ্ঞানের ডাকে সাড়া দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে অনেক কিছুই হারাতে হয় তাকে। যাকে নিজের নিত্যসঙ্গিনী করার কথা ভেবেছিল, সে তার জীবনে বাস্তব হয়ে ধরা দেয় না আর। অধরাই রয়ে যায় তার বহুদিনের লালিত সে স্বপ্ন। সবকিছু হারিয়েও সে যেন আজ জয়ী। এভাবেই এগিয়ে যায় উপন্যাসের কাহিনী। . উপরোল্লিখিত চরিত্রের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রয়েছে। সে চরিত্রের নাম বন্দনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক দিলীপ চৌধুরীর একমাত্র সন্তান বন্দনা চৌধুরী। মা-মরা মেয়ে বন্দনার সময় একান্ত নিরবে-নিভৃতে। বাবা তার চাকরি ও কর্মব্যস্ততার কারণে মেয়েকে সময় দিতে পারেন না। এ নিঃসঙ্গতা কাটাতে বন্দনা একসময় শিল্পকলা একাডেমিতে ভর্তি হয়। এ ভর্তির সুবাদে প্রবালের সাথে তার পরিচয় হয়। প্রবালের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে তাকে ঘিরে বিনা সুতোয় আগামী দিনের স্বপ্নজাল বুনতে শুরু করে দেয় বন্দনা। এক পর্যায়ে নিজের ভাবাবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে নিজের মনের কথা বলে দেয় প্রবালকে। কিন্তু প্রবাল এটাকে নিতান্ত ছেলেমানুষি জ্ঞান করে অবজ্ঞা করতে শুরু করলে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। প্রবালকে নিজের করে পাবার তীব্র বাসনা তার এ স্বপ্ন পূরণের সহায়ক না হয়ে বরং কাল হয়ে দাঁড়ায়। সুদীর্ঘকাল অপেক্ষার পরেও নিজের প্রিয় মানুষ তার আপনজন হয়ে ওঠে না আর! বিজ্ঞান তাকে বেগ দিলেও কেড়ে নেয় আবেগ। এগিয়ে চলে উপন্যাসের গল্প। . উপরোক্ত দুইটি মুখ্য চরিত্র ছাড়াও উপন্যাসে আরো কিছু গৌণ চরিত্রের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু চরিত্র হচ্ছে, ক্যাসিও আন্তের, দিলীপ চৌধুরী, স্বর্ণা, মিলিতা, বিশিষ্ট গণিতবিদ টয়লার, জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিদ ভ্লাদিমির, ক্যাপ্টেন চমনোস্কি, ফাদার প্রমুখ। এসবের চরিত্রের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন চরিত্র লাইকাকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যায় এ গল্পে। প্রত্যেকে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী/অধিকারিণী হবার ফলে এ উপন্যাসে এক আলাদা মাত্রা যুক্ত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, টয়লার ও ভ্লাদিমিরের নিত্যকার ঝগড়া উপন্যাসের গল্পে আলাদা এক ব্যঞ্জনা দান করেছে। তেমনি, পেশাগত জীবনে চিকিৎসক মিলিতার হাসি-খুশি ও মিশুক স্বভাব তাকে অন্যান্য চরিত্র থেকে সহজেই আলাদা করে তুলেছে পাঠকের চোখে। এসব গৌণ চরিত্রের আলাদা আলাদা ভূমিকা গল্পের প্রয়োজনেই যুক্ত করা হয়েছে। উপন্যাসের পুরো কাহিনী একটা বৈজ্ঞানিক প্রজেক্টকে ঘিরে এগিয়েছে বিধায় উক্ত প্রজেক্টের নামে নামকরণ করা হয়েছে উপন্যাসের। তবে সবকিছু ছাপিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে প্রবাল ও বন্দনার গল্প। . এবার আসি উক্ত বইটির ভাষার গল্পে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী হলেও ভাষার ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা চোখে পড়েনি আমার। বেশ সহজ ভাষায় ঔপন্যাসিক এ উপন্যাসের গল্প লিখে গিয়েছেন। গল্পের স্বার্থে কোথাও কোথাও বৈজ্ঞানিক টার্ম ব্যবহৃত হবার ফলে শুরুতে কিছুটা জটিল লাগছিল এগুলো। তবে আশার কথা হলো--- উপন্যাসের শেষে প্রয়োজনীয় টিকা সংযুক্ত থাকার ফলে এগুলো বুঝতে তেমন কষ্ট হয়নি আমার কোনো। এছাড়া বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর পাশাপাশি নরনারীর চিরকালীন প্রেমের দিকটি আলাদা মাত্রা যুক্ত করেছে এ বইটিতে। এ দিকটি যুক্ত হবার ফলে এটি অন্যান্য আর দশটি সাধারণ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর তুলনায় ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ও অতৃপ্ত প্রেমের গল্প--- এ দুইয়ের মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় সাধিত হবার ফলে বইটি আলাদা এক আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। . সর্বোপরি, এক কথায় বলতে গেলে, উপন্যাসের গল্প, দ্বৈত বিষয়বস্তুর সমন্বয় ও ভাষাশৈলী--- এসব কিছুর বিচারে বইটি দারুণ সুখপাঠ্য এ উপন্যাস বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। যারা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী পড়তে ভালোবাসেন, তাদের মনে এ উপন্যাস একটু হলেও আলাদা জায়গা করে নিতে সক্ষম হবে, এটাই আমার বিশ্বাস। আশা করি, কোনো পাঠক বইটি পড়ে আশাহত হবেন না। . উক্ত বই সম্পর্কিত আরো কিছু ব্যাপারে না বললেই নয়। প্রথমত উল্লেখ্য যে, এ বইটি যে প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে, সে প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত প্রথম বই এটি। প্রথম বই হিসেবে কাগজের কোয়ালিটি, বাইন্ডিং থেকে শুরু করে লেখার মান----কোথাও কোনো ব্যাপারে কিছুর কমতি দেখিনি এ বইতে। বিশেষত কোথাও কোনো ভুল-ত্রুটি দেখলে তা তাদের অফিশিয়াল মেইলে জানানোর আহ্বান ও বড় ধরনের কোনো সমস্যা থাকলে রিফান্ডিংয়ের বিষয়টা সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে আমার কাছে। উপরন্তু, একটা সুদৃশ্য বুকমার্ক বইয়ের সাথে দেওয়া হয়েছে উপহারস্বরূপ, যা একজন পাঠকের আনন্দ বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে যথেষ্ট। প্রসঙ্গত আরো উল্লেখ্য যে, ইদানীং সময়ে আমাদের দেশের প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানগুলো নবীন লেখকদের লেখা প্রকাশের সুযোগ খুব কম দেয়। সে তুলনায় এ প্রকাশনীর এমন উদ্যোগ এ দেশীয় সাহিত্য অঙ্গনের জন্যে সত্যিকার অর্থেই আশাজাগানিয়া। এমন মহৎ উদ্যোগ আরো অব্যাহত থাকুক। তাদের সরব পদচারণায় মুখরিত হোক বাংলা সাহিত্যের সকল অঙ্গন। . আসুন, সকলে সুস্থধারার বই পড়ি। আর সম্ভব হলে, বই কিনে পড়ি। নিতান্তই সত্যিকারের দরকার না হলে ফ্রি পিডিএফকে না বলি!♥ . পাঠ অনুভূতি সুখের হোক! ♥
বই: প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল (বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী) লেখকঃ মোহাম্মদ সাইফূল ইসলাম প্রচ্ছদঃ আসিফ সিদ্দিকী উপন্যাস প্রকাশন - Uponnash Prokashon প্রথম প্রকাশঃ মে, ২০১৮ পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১১২ মুদ্রিত মূল্য : ২৩০ টাকা রেটিং:৪.২/৫.০
__________________________
ধর্মের পাশাপাশি সংগীত হলো সাধনার বিষয়।প্রাচীনকালে বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মের পাশাপাশি হতো শাস্ত্রীয় সংগীতের উপাসনা। শুনতে অবাক লাগলেও আদিমযুগ থেকে সংগীতের মূর্ছনায় আর টানে লক্ষ বছরের পরম্পরায় এখনো রয়ে গেছে। আচ্ছা, সবচেয়ে প্রাচীন ও মৌলিক বাদ্যযন্ত্রের নাম কি? বিগব্যাং থিওরি তো নিশ্চয় পড়েছেন স্কুল এ? কিসের মধ্যে এই বিগব্যাংটা সংঘটিত হয় বলতে পারবেন?
না, না। আমি সাধারণ জ্ঞানের ক্লাস নিতে এখানে আসি নি।ভয়ের কিছু নেই। অনেকেই হয়তো ইতিমধ্যে বেশ কিছু রিভিউ পরে আঁচ করে ফেলেছেন 'প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল' -- সায়েন্স ফিকশনের কাহিনী সংক্ষেপ।অল্প করে তবুও বলছি। তারপর চলে যাবো আলোচনা, পর্যালোচনা আর সমালোচনার দিকে।
#কাহিনী_সংক্ষেপ:
কেন্দ্রীয় মহাকাশ সংস্থা এক গোপন প্রজেক্ট হাতে নিতে চলেছে, যার কার্যপদ্ধতি টপ সিক্রেট, টপ প্রায়োরিটি। এই অভিযানে রয়েছে তিনবার ওয়ার্ল্ড প্রেসিডেন্সি প্রাপ্ত পদার্থ বিজ্ঞানী ভ্লাদিমির, গণিতের প্রফেসর টয়লার, আছেন প্রৌকশলীবৃন্দদের একটি টিম, আছে ফাদার আর্চার, সুন্দরী তরুণী ডাক্তার মিলিতা; যে এই পুরো অভিযানের প্রাণ জাগানিয়া।আর আছেন ক্যাপ্টেন চমনস্কি।এই প্রজেক্ট প্রজেক্টাইলের মূল উদ্দেশ্য ঈশ্বরের বেঁধে দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম করে ঐশরিক ক্ষমতা লাভ করা, যেখান থেকে এই মহাবিশ্বকে একেবারে নিজের মতো করে চালনা করা যাবে।এ যেন ঈশ্বরকে এক হাত দেখানো, ঈশ্বরের সাথেই যুদ্ধে নামার নামান্তর। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও দুঃসাহসিক এই অভিযানে প্রবালের মতো এক নহঁয় বংশীবাদকের এখানে কি কাজ থাকতে পারে প্রবাল তা নিজেও জানে না। তাকে কি মেরে ফেলা হবে? যদি তা নাও হয়, তবে কিসের এক্সপেরিমেন্ট করতে চায় মহাকাশ সংস্থা? প্রবালের মনে নানান প্রশ্ন উঁকি দেয়।তাকে নিয়ে প্রশ্ন আছে অভিযানের সদস্যদের মনেও। এদিকে বন্দনা খুঁজে চলেছে নিজের অতীত। যেখানে বিজ্ঞানী বাবার সাথে তার মায়ের রয়েছে এক তিক্ত অতীত।বাবার সাথে মেয়ের এক গভীর বোঝাপড়া।বন্দনার বাবার ভেতরে কিসের ভয়? কতটুকু জানে বন্দনা? একই সর্বনাশ করে গেলো স্বর্ণা? কিন্তু বন্দনাও কি কোনোভাবে এই প্রজেক্ট এর সাথে জড়িত? তবে মহাকাশ সংস্থার সাথে তার কিসের গোপন ইমেইল আদান-প্রদান চলছে? প্রবালের সাথে সম্পর্কটার শুরু না হয়েও কেমন গোলমেলে। মহামান্য ক্যাসিও আন্তের কি কোন যোগসূত্র স্থাপন করতে পারবেন?
আরেকদিকে ধর্মীয় উগ্রপন্থী জঙ্গিগোষ্���ী ''চার্চ অফ রেজারেক্টেড আর্মি'' চাইছে গোপনে এই প্রজেক্ট এর সব পরিকল্পনা, প্রোগ্রাম নস্যাৎ করে দিতে।ধর্ম নাকি বিজ্ঞান ? কে হবে বিজয়ী এই চিরন্তন লড়াইয়ে?
এ অভিযান যদি সফল হয় তাহলে কি মানুষ হয়ে উঠবে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী? সীমাবদ্ধতাকে করতে পারবে জয়? কিসের আশায় প্রবালও মনে মনে চায় সফল হতে?
ভাবতে থাকুন। আর ফিকশন পড়ে অনেক মিলিয়ে নিন।
#পাঠ_পর্যালোচনা:
#ভালো_দিক:
১) প্রচ্ছদের ম্যান যথেষ্ট ভালো লেগেছে, কালার কম্বিনেশন ভালো ছিল। ভালো কথা হলো হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করার সময় প্রবল বংশীবাদকের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে।তবে প্রচ্ছদের বিষয়বস্তু আরেকটু ম্যাচিউরড হলে মন্দ হতো না। তবে বিজ্ঞানমনস্ক কিশোর পাঠকদের আলাদা আকর্ষণের সুযোগ আছে এতে।আর XF-G-5-9 আর রোবটের কপালে ক্রস চিহ্ন আকার চিন্তাটা প্রশংসনীয়।
২) ধর্ম আর বিজ্ঞানের সংঘাত নিয়ে এর হিসেবে মিলানোর একটা জায়গা তৈরী হয়েছে, সেদিক থেকে পাঠকের হৃদস্পন্দন বাড়াতে লেখক সার্থক।
৩) বাঁশির ব্যাপারে যে কতকিছু জানার আছে, সত্যিই এভাবে ভাবিনি কখনো। নতুন কিছু জানার আগ্রহ বেড়ে গেলো।
৪) প্রবালের সাথে তার বাঁশির কালেকশন দিয়ে দেওয়ার কথা মাথায় রেখে মহাকাশ সংস্থার দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়াটা অভিনব ছিল।
৫) মানুষের সাথে যন্ত্রের পার্থক্য যে রসিকতার মাধ্যমে করা হয়েছে তা বেশ ইন্টারেষ্টিং ছিল।
৬) কনফিউজড প্রবালের নানা প্রশ্নমুখর পরিবেশ আবার পাঠককে দ্বিতীয়বার ভাবতে হলেও বসিয়ে রাখবে, শেষটা জানার কৌতূহলে।
৭) ৩৮ পেজ থেকে একদম শেষটা দুরুদুরু করে চিন্তাভাবনা খেলে গেছে একটার পর একটা মাথার মধ্যে।পাঠকের অন্তত এখন থেকেই মনে হবে, যেও স্পেসশীপের একজন সদস্য।
৮) মহাকাশের ৫ মাস, আর পৃথিবীর ১৫ বছরের যে ইকুয়েশন তা যেন তব্দা খেয়ে যাওয়ার মতন ব্যাপারটা। ফ্যাবিউলাস!
৯) থিওলজিক্যাল ফিজিক্স এন্ড কসমোলজি আর ইউনিফাইড থিওরি অফ এভরিথিং -- এই দুইয়ের সমন্বয় খুব ভালোভাবে মিশে গেছে।এই ব্লেন্ডিংটাই আলাদা টেস্ট।
১০) মানুষের জ্ঞানের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতার সাথে আমিও একমত।আর এইটা সবচেয়ে বেশি অনুধাবন করতে পারবে বইপোকারা।আর এই সত্যি জানতে চোখ রাখুন ৫৪ পৃষ্ঠাতে।
১১) সীমারেখার বাইরের নীল এল যেন আমার চোখেও সেই মুহূর্তে ধরা দিল।এইটা জাস্ট আপনার কনসেপ্ট পাওয়ার এর উপর নির্ভরশীল হলেও এটা একটা দারুন অনুভূতি।মাত্রাহীন, সময়হীন পরম শূন্যতা যেন আমাকেও সেই মুহূর্তে পেয়ে বসেছিল।ওহ! কি শ্বাসরুদ্ধকর।
১২) দ্যা গ্রেট ক্রাউলির 'অরিজিন এন্ড ডেসটিনি অফ ইউনিভার্স'- এর জায়গায় এসে এর সংযোজন মাথা হ্যাং করার মতোই দারুন টুইস্ট।
১৩) চিঠিগুলোর ফন্ট স্টাইল আলাদা, এই কন্সেপ্টটাই পাফেক্ট।
১৪) বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার বুদ্ধিমত্তা বেশ প্রশংসনীয়।
১৫) হঠাৎ করেই ফ্ল্যাশব্যাক আবার হঠাৎ করেই বর্তমান, এইখানে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও পাঠক যদি খুব মনোযোগ দিয়ে প্রথম থেকেই সাজিয়ে নিতে পারেন, তাহলে এইটাই আসল মজা সাইন্স ফিকশনের।
#মন্দ_দিক:
সবকিছুরই কয়েনের মতো দুটি দিক রয়েছে।ভালোর বিপরীতেই মন্দ।দুটিই যেন পিঠাপিঠি ভাই।তাই ভুলত্রুটিও আছে ব্যাপক।আমার চোখে যেগুলো পড়েছে সেগুলোই পয়েন্ট করে দিচ্ছি।
১) টোটাল কন্সেপ্টটাই হাই রাইজিং।তবে 'ঈশ্বরের রাজ্য ধ্বংসের খেলা' - ব্যাপারটা আসলেই সিরিয়াস। হঠাৎ করে ধর্মীয় মনোভাবে বেশ কঠিনভাবেই আঘাত হানার মতোই ব্যাপার।
এই বইটার রিভিউ লেখার পেছনে দু’টো কারণ আছে। প্রথম কারণ হলো, অনলাইনে কি পরিমাণ মেধাবী লেখক আছে সেটা দেশের অনেক পাঠকই জানে না। অনলাইনে প্রকাশিত যে ক’টা উপন্যাস আমি পড়েছি, এটা তাদের মধ্যে অন্যতম, সম্ভবত সেরা। দ্বিতীয় কারণ হলো, এদেশে যে সব লেখক সাইফাই লেখেন, তাদের অনেকেই বিজ্ঞান ভালো জানেন না, কিন্তু কল্পনাশক্তি অনেক প্রখর হওয়াতে তাদের গল্প অনেক ভালো লাগে পড়তে। তবে সেখানে বিজ্ঞানের প্রয়োগ থাকে অল্প। আবার অনেক লেখক আছেন, যারা অনেক ভালো বিজ্ঞান জানেন বটে, কিন্তু সেভাবে কল্পনাশক্তি না থাকায় ভালো প্লট তৈরি করতে পারেন না। তাই তাদের গল্প হয়ে যায় কিছুটা প্রবন্ধ ধাঁচের। কিছু লেখকের ভালো কল্পনাশক্তি, ভালো বিজ্ঞানের জ্ঞান এবং ভালো লেখার হাত রয়েছে। শান্তির দেবদূত তাদের একজন। আমার প্রিয় কল্পগল্প লেখকদের মধ্যে অন্যতম তিনি।
প্রজেক্ট প্রজেক্টাইলের গল্প একদল মহাকাশযাত্রীদের নিয়ে। যারা আমাদের মহাকাশের বাইরে কি আছে, সেটা জেনে একটা ইউনিফাইড থিওরি তৈরি করতে চায়, যে থিওরিতে পৃথিবীর সকল জ্ঞান থাকবে (যেমনটা বর্তমানে স্টিফেন হকিং করতে চাইছেন The Theory of Everything আবিষ্কারের মাধ্যমে)। সেই অভিযাত্রীরা মহাকাশে ছোট ছোট ওয়ার্মহোল তৈরি করে কম সময়ে অসীম দূরত্ব পার হয়ে ইউনিভার্সের বাইরে যেতে চায়। তাদের ধারণা এই যাত্রা সফল হলে তারা পেয়ে যাবে সৃষ্টির সকল প্রশ্নের উত্তর, সকল জ্ঞান, সকল তত্ত্ব। তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে কি না, সফল হলে কি পাওয়া যাবে সেটাই উপন্যাসের মুখ্য বিষয়।
এ ধরনের লেখায় যেটা দেখা যায়, লেখকরা ভালো প্লট তৈরি করতে পারেন না কিংবা পারেন না গ্রহণযোগ্য সমাপ্তি টানতে। কিন্তু এ বইটাতে আশ্চর্যজনক ভাবে ভালো প্লট, ভালো ফিনিশিং ছিল। ইউনিভার্সের বাইরে যাবার প্রযুক্তি কাল্পনিক হলেও বইয়ে সেটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেখে মনে হবে আসলেই এটা সম্ভব। ব্রেন স্টর্ম তোলার জন্য এরকম একটা বই যথেষ্ট। প্রথম ৩০-৩৫ পৃষ্ঠা একটু এলোমেলো লেগেছিল আমার, তারপর হুট করে কখন পরের ৭০-৮০ পৃষ্ঠা শেষ হয়ে গেল টেরও পাইনি। বইটাতে কিছু টাইপিং মিস্টেক এবং কিছু বানান ভুল আছে। যেহেতু লেখক নিজেই বইটার পিডিএফ বের করেছেন, প্রুফ রিডিং হয়নি, তাই এ বিষয়টা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাছাড়া কাহিনীর ভেতর ঢুকে পড়লে টেরও পাওয়া যায় না কোথায় কি ভুল আছে। লেখক শান্তির দেবদূত সামহোয়ারইন ব্লগে লিখছেন দীর্ঘদিন ধরে। ব্লগের বেশ সম্মানিত একজন সাইফাই লেখক তিনি। আমি খুব কম লেখককে শ্রদ্ধা করি, উনি তাদের একজন।