সন্তোষ রানা (১৯৪২– ২৯ জুন ২০১৯) ছিলেন একজন ভারতীয় মার্কসবাদী-লেনিনবাদী রাজনীতিবিদ। ১৯৬০-এর দশকে তিনি ছিলেন চারু মজুমদারের নেতৃত্বে নকশাল আন্দোলনের নেতা ও সশস্ত্র সংগ্রামের অগ্নি যোদ্ধা। সন্তোষ রানা ২০১৮ সালে তার রাজনৈতিক জীবনে উপর লেখা বইয়ের রাজনীতির এক জীবন-এর জন্য আনন্দ পুরস্কার পেয়েছিলেন।
সন্তোষ রানার জন্ম বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুরের গোপীবল্লভপুর অঞ্চলে। ছয়ের দশকে তিনি পড়তে আসেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। পদার্থবিদ্যায় এমএসসি-তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। গবেষণা করতে করতেই সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন নকশাল আন্দোলনে। নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলনের পরে যে সব ছাত্রযুবক ‘গ্রামে চলো’র ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে সন্তোষ রানা ছিলেন অন্যতম।
সন্তোষ রানার প্রথম স্ত্রীর নাম ছিলো জয়শ্রী রানা। উনার সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদের কারণে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপরে বিয়ে করেন দেবী চট্টোপাধ্যায়কে, যিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যাপনা করতেন। তিনি দীর্ঘ দিন জেলে ছিলেন। ১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জেলে বসেই লড়েছিলেন। তিনি গোপীবল্লভপুর আসনে জিতেছিলেন।
রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করে গিয়েছেন আজীবন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘রাজনীতির এক জীবন’-এর জন্য সন্তোষ রানা আনন্দ পুরস্কার পান ২০১৮ সালে।
১৯৬০-এর দশকে সন্তোষ রানা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজের গবেষক ছিলেন। সেই সময় তিনি পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। রাজনৈতিকভাবে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) এর সমর্থক ছিলেন।প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পরে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯ সালে সিপিআই (এমএল) একটি নতুন বিপ্লবী দল হিসাবে সূচিত হয়েছিল। সেই সময় বিপ্লবের ডাক সন্তোষ রানাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি তার পিএইচডি গবেষণা অসম্পূর্ণ রেখে গোপীবল্লভপুরে তার নিজের গ্রামে ফিরে যান এবং কৃষি বিপ্লবে যোগ দেন।
তার নেতৃত্বে ছিলো মেদিনীপুর জেলা ও ডেবরা, গোপীবল্লভপুর, নয়াগ্রাম ও লোধাশুলি ব্লক এবং বিহার (বর্তমানে ঝাড়খণ্ড) ও উড়িষ্যার আশেপাশের অঞ্চলগুলি।
সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে সিপিআই (এমএল)-এর মধ্যে ভাঙন শুরু হয় এবং ১৯৭১-১৯৭২ সালের মধ্যে বিভক্তি দেখা যায়। সন্তোষ রানা ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চারু মজুমদারের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং পরে সত্যনারায়ণ সিংহের নেতৃত্বাধীন দলে যোগ দেন, তিনি একজন বিশিষ্ট নেতা,যিনি ১৯৭১ সালে চারু মজুমদারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন এবং সিপিআই (এমএল) -এর বিভাজনের দিকে পরিচালিত করেছিলেন। এপ্রিল ১৯৭৪ সালে সত্যনারায়ণ সিংহের দল পুনর্গঠিত করেছিলেন। সত্যনারায়ণ সিংয়ের অনুগত গ্রুপ থেকে পিসিসি, সিপিআই (এমএল) বিবর্তিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে সন্তোষ রানা এই দলের সাধারণ সম্পাদক হন। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে এই দলটি নকশালদের মধ্যে ছিল।
সন্তোষ রানা স্বতন্ত্র হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, ১৯৭৭ সালে গোপীবল্লভপুর আসনটিতে তিনি জিতেছিলেন, তবে ১৯৮২ সালে তিনি হেরেছিল।
সন্তোষ রানা জঙ্গলমহলের মাওবাদীদের পদক্ষেপের সাথে একমত ছিলেন না। তিনি বলেছিলেন, "মূল সিপিআই (এমএল) এবং আজকের সিপিআই (মাওবাদী) এর মধ্যে পার্থক্য অনেক বেশি। চারু মজুমদারের পার্টি লাইন নিতে আমাদের সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও, আমি অবশ্যই এটি বলব যে তিনি কখনই মাওবাদীদের নির্বিচারে হত্যার জন্য বলেননি। ১৯৬৯-৭১ সালে, আমি ডেবরা-গোপীবল্লভপুর অঞ্চলে সক্রিয় ছিলাম, লালগড়ের কাছে এখন যেটা মাওবাদীদের একটি বড় ঘাঁটি। আমরা মেরেছিলাম ১২০ ব্যক্তিকে, তাদের অনেকেই জমিদাররা বা তাদের পোষা গুন্ডার … আজ, আমি মনে করি এই হত্যার বেশিরভাগ অপ্রয়োজনীয় ছিল। তবে সিপিআই (মাওবাদী), সত্তরের দশকে দেবরা-গোপীবল্লভপুরের একটিও আদিবাসী ও দলিত ও দরিদ্র মানুষ কে হত্যা করে নি।"
২৯ জুন ২০১৯ শনিবার সকাল ৬ টায় দেশপ্রিয় পার্কের এক নার্সিংহোমে তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘ দিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে তার দেহ দান করা হয়েছে।
নকশাল ঘরানার এই আত্মজীবনী আসলে একটা দীর্ঘ, গোঁজামিলভরা আত্মপক্ষ সমর্থনের দলিল। সন্তোষ রানার কলমে যে বিপ্লবের ছবি আঁকা হয়েছে, তা এমন এক আন্দোলনের মহিমা গায়, যেটা বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনকে নরকে পরিণত করেছিল। অস্ত্র হাতে শিক্ষকদের মেরে ফেলা, ‘শত্রু শ্রেণি’ বলে দাগিয়ে দিয়ে, খতম লাইন অনুসরণ করে কৃষকদের শিরচ্ছেদ করা — এই বই সেই বর্বরতাকে ইতিহাসের নামে "আদর্শ" বলে চালিয়ে দেওয়ার এক জঘন্য প্রয়াস।
রানা সাহেব নিজের ভুল স্বীকার করেন ঠিকই, কিন্তু সে এক ধরনের আত্ম-গরিমায় মোড়া ‘ভুল’—যেন বলছেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, একটু মেরেছি, একটু পুড়িয়েছি, কিন্তু উদ্দেশ্য তো সৎ ছিল!” এর নাম কি আত্মসমালোচনা নাকি বিপ্লবী রূপকথার কস্টিউম ট্রায়াল?
ভাষা সহজ, কিন্তু সেটাই সমস্যা। এত সরল করে বলা হয়েছে যেন বাচ্চাদের নকশালবাদ শেখানোর পাঠ্যবই! আর বইটা পড়তে পড়তে মনে হয়, উনি আদর্শবাদী কম, এবং ঘটনাচক্রে ‘ইতিহাসের বিপরীতে অবস্থান করা' মানুষ বেশি।
“বন্দুক দিয়ে শুধু ক্ষমতা দখল করা যায় না —মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়”—এই উক্তি যেন এই বইয়ের কফিনে শেষ পেরেক। বিশ্বাস অর্জন করতে গিয়ে যারা ধানখেতে মরেছিল, যারা গলিঘুঁজিতে মরেছিল, একদল উজ্জ্বল তোরণ শেষহ হয়ে গিয়েছিল, তাদের উত্তরপুরুষ আজও ওই বিশ্বাসের খেসারত দিয়ে চলেছে।
এটা আত্মজীবনী নয়, বরং অতীত ভুলগুলোকে রঙিন ফিল্টারে ঢেকে দেওয়া এক রাজনৈতিক মেকআপ টিউটোরিয়াল। ইতিহাস পড়তে চাইলে অন্য কিছু পড়ুন। এটা পড়ে মনে শুধু একটাই কথা আসে: "নকশালবাদ? না ভাই, থ্যাঙ্কস—আই পাস."
এ গ্রন্থ শুরু হয়েছে এই বাংলার পল্লিচিত্র দিয়ে। যে পল্লির বুকের ভিতর নানা সম্প্রদায়ের, নানা মতের, নানা আর্থিক বৈষম্যের মানুষজন পাশাপাশি বসবাস করেন। এক সঙ্গে গ্রাম গড়েন, যুগের পর যুগ ধরে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ শোষিত হন, আবার যুগের পর যুগ তাঁদেরই মধ্যে কেউ কেউ শোষকের ভূমিকা পালন করে যান। এই সবিস্তার বর্ণনার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে প্রাথমিক ভাবে মনে হতে পারে, সন্তোষ রাণার মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কর্মকাণ্ড ও যাত্রাপথের আখ্যানে এই বর্ণনা কতটা প্রাসঙ্গিক? কিন্তু কিছু পরেই মনে হয়, ভাগ্যিস বাংলার পল্লিসমাজের ছবিটা লেখক এত নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন! তা না হলে ষাটের দশকের শেষে কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটটি বোঝাই যেত না! দক্ষিণবঙ্গের গোপীবল্লভপুরের সমাজজীবন ও জাতি বৈষম্যের এই বিশ্লেষণ না থাকলে সুদূর উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ি ব্লকে ১৯৬৭-র ২৫ মে যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটও এ ভাবে বিশ্লেষণ করা যেত না। প্রবীণ এই নকশালপন্থী নেতা লিখছেন, ‘‘আসলে, ভারতের বাস্তব অবস্থা বিচার না করে কেউ যদি যান্ত্রিকভাবে মার্কসবাদী তত্ত্বকে প্রয়োগ করতে চায়, তা হলে সে ভুল সিদ্ধান্তেই পৌঁছবে। ভারতীয় সমাজ এমন সমাজ নয় যা বুর্জোয়া ও প্রোলেতারিয়েত এই দুই বৃহৎ শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে গেছে। বরং এখানে রয়েছে সামাজিক অবস্থানের নানাবিধ ধাপ। সামাজিক উৎপাদনে কোন ব্যক্তি কী ভাবে অংশগ্রহণ করবে এবং ফলত সামাজিক উৎপন্নের কতখানি অংশ সে ভোগ করবে তা অনেকটা নির্ভর করে সে কোন ধাপে জন্মেছে তার উপর। ১৯৬৭ সালে এই সব প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজিনি, যদিও কাজ করতে গিয়ে অনেক বিষয়েই খটকা লেগেছিল।’’ নানা রাজনৈতিক গ্রন্থ আমরা অনেক সময়েই পড়ি। বহু গ্রন্থেই সংশ্লিষ্ট গ্রন্থকার তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস ও মতের কথা জোর গলায় বলেন। সেখানে অন্য মতের কথা বললেও সেই বিকল্প মত নিয়ে ভাবনাচিন্তা তৈরির পরিসর বড় একটা দেন না। কিন্তু সন্তোষ রাণার এ গ্রন্থের বিশেষত্ব হল, সিপিআই (এমএল) বা অন্য নকশালপন্থী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক লাইনের গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে এটি প্রকৃত রাজনৈতিক ভাবনার ভিত্তি নির্মাণে সাহায্য করেছে। কূপমণ্ডূকতায় আবদ্ধ থাকেনি। এখানেই ‘দেশবাসী’-কে উৎসর্গ করা গ্রন্থ রাজনীতির এক জীবন-এর সার্থকতা।
বইটির লেখক সন্তোষ রাণা, প্রেসিডেন্সী কলেজের কৃতী প্রাক্তণী যিনি কলেজ পরবর্তী জীবনে জড়িয়ে পড়েছিলেন নকশালপন্থী আন্দোলনে। এই বই অনেকটা আত্মবিশ্লেষণ মূলক জীবনী। বইয়ের শুরুতে তিনি স্মৃতি রোমন্থন করেছেন নিজের ছেলেবেলা, পরিবার, প্রতিবেশী, তার নিজের গ্রাম ও আশেপাশের গ্রামগুলোর। সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের পূর্বে আশেপাশের প্রান্তিক মানুষদের জীবনযাত্রা ও তাদের প্রতি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের যে পরিচয় তিনি পেয়েছিলেন সেটাই সম্ভবত তাকে অনুপ্রাণিত করেছিলো তার রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বাচনের ক্ষেত্রে। নিজের ছেলেবেলা, কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ ও তারপর রাজনৈতিক কার্যকলাপের সবিস্তার বর্ণনা দিয়েছেন এই বইতে। রাজনৈতিক জীবনের কার্যকলাপ, জেলবন্দী অবস্থায় জীবন, সেই সময়ের আর্থিক সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন ঘটনা ও রাজনীতি সম্পর্কে নিজের সুস্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করেছেন এই বইতে।