আলোকচিত্রের তখনো সূচনা ঘটেনি, কিন্তু ছিল হাতে আঁকা ছবি। ঔপনিবেশিক আমলের সেই চিত্রময় ঢাকা তার অনুপম চেহারায় আচ্ছন্ন করেছিল বহু শিল্পীর মন। রূপে-রঙে-শৈলীতে সেসব ছবি যেমন অনন্য, তেমনই তাতে ধরা পড়েছে ৪০০ বছরের পুরনো এই রাজধানী শহরের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিচিহ্ন। এসব ছবি একই সঙ্গে শিল্প, ইতিহাস ও একটি প্রাচীন জনপদের চাক্ষুস দলিল। এগুলো কখনো এঁকেছেন দক্ষ বা শৌখিন কোনো শিল্পী, কখনো এ শহরের রূপমুগ্ধ কোনো সরকারি কর্মকর্তা। নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ১০০ ছবির বিরল এই সম্ভার দীর্ঘ সময়ের অনুসন্ধান ও একাগ্র গবেষণায় জড়ো করেছেন শৌখিন গবেষক শামীম আমিনুর রহমান। সংগ্রহ করেছেন ছবিগুলোর অবস্থান, শিল্পীর নাম ও প্রেক্ষাপট।
শামীম আমিনুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন বরিশাল শহরে। ঢাকার আদমজি ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে স্নাতক (১৯৮৬) এবং নটরডেমের আইএইচএস থেকে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা (১৯৯৫)। পেশায় স্থপতি। বাংলাদেশ সরকারের স্থাপত্য অধিদপ্তরে উপপ্রধান স্থপতি হিসেবে কাজ করছেন। শিল্পকলা, ইতিহাস ও চলচ্চিত্র নির্মাণ বিষয়ে অপরিসীম কৌতুহলী। লেখালেখির বিষয় সামাজিক ইতিহাস। লিখেছেন পূর্ববঙ্গের প্রথম আকাশচারী, জলতলে নিমজ্জিত প্রত্নস্মারক, সিপাহি যুদ্ধের নারীযােদ্ধা ও ঢাকার বাইজি নিয়ে। তাঁর প্রথম বই ঢাকার প্রথম আকাশচারী ভন্তাসেল (২০০০)।
টানা কয়েকটা মুনতাসীর মামুন পড়ার পর অন্য লেখকে আসার সুবিধা হল, একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসটা বিচার করে দেখা যায়।
মুনতাসীর সাহেব তাঁর বইয়ে ডয়লির ছবি তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যবহার করেছিলেন। এবং পোড়োবাড়ি, ধসে যাওয়া ব্রিজ—এসব আঁকার দিকেই ডয়লির আগ্রহটা বেশি ছিল। সুতরাং কেবল ডয়লির স্কেচ দেখলে এ ধারণাটা হওয়া বিচিত্র না যে, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ঢাকা ছিল মোটামুটি পরিত্যক্ত একটা শহর।
কিন্তু সেটা তো পুরোপুরি সত্যি না! ঢাকার জৌলুস যে তখনও এক অর্থে ছিল—সেটা অন্যান্য ব্যক্তির ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায়। বুড়িগঙ্গা-তীরের অসাধারণ প্যানোরামার কথা নাহয় বাদই দিলাম, মোলসওয়ার্থের ছবিগুলোও ঢাকার অসামান্য সুন্দর একটা ইতিহাসের কথাই বলছে।
এ বইয়ের একটা ভালো ব্যাপার এই যে, ইউরোপীয় চিত্রশিল্পীদের পাশাপাশি বাঙালি (হয়তো অজ্ঞাতনামা) শিল্পীদের ছবিও এখানে যোগ করা হয়েছে। ঢাকাকে দেখার ক্ষেত্রে তাদের পার্থক্যটা খুবই স্পষ্ট, এবং ক্ষেত্রবিশেষে সম্পূরক। একদিকে উৎসব চলছে, আর পাশেই অর্ধনগ্ন ভিখিরী হাত পেতে আছে—এই দৃশ্য হয়তো ইউরোপীয় শিল্পীদের চোখে ধরা পড়েনি, কিংবা পড়লেও তারা একে আঁকার যোগ্য মনে করেননি।
দ্বিতীয়ত, ছবিগুলো পূর্ণতা পেয়েছে সিরাজ স্যারের লেখা ভূমিকা, এবং বইয়ের শুরুতে (এবং...প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে) দেয়া আঁকিয়েদের পরিচয় ও প্রেক্ষাপটের কারণে। কেবল ছবি দেখলে নিঃসন্দেহে অনেক কিছুই না-বোঝা থেকে যেতো।