প্রকৃতপক্ষে বিশাল এই ভারত উপ-মহাদেশ তিন ভাগ হয়েছিল ১৯৪৭ এর ১৭ই অগাস্টে যখন বড়লাট মাউন্টব্যাটেন জনৈক সিরিল র্যাভডক্লিফের প্রস্তাবিত রোয়েদাদ, অর্থাৎ এ দেশের ভাগ-বাটোয়ারা প্রকাশ করলেন। ষোলো পৃষ্ঠার সে দলিলে “বাংলার জন্য বরাদ্দ ৯ পাতা, পাঞ্জাবের জন্য বাকিটা।“
“র্যা ডক্লিফের তীক্ষ্ণ আঁচড়ে উত্তর-দক্ষিণে আদমুদ্রহিমাচল বিস্তীর্ণ ভারতবর্ষের তেমন কিছুই ক্ষতি হল না, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল পুবে-পশ্চিমে দুই ভূখণ্ড। বেবাক ভাগ হয়ে গেল বাংলা আর পাঞ্জাব। দুই জাতির মেরুদাঁড়াই গেল ভেঙে। পূর্ববাংলা এখন পাকিস্থানের অংশ। পূর্বপাকিস্থান।“
অবশ্য এই ভাগ-বাটোয়ারা হওয়ার আগে থেকেই সদ্য ভূমিষ্ঠ দুটি দেশের কিছু হিংসাকাতর মানুষ নবলব্ধ এই স্বাধীনতা উদযাপনের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছেন রক্তের উৎসব। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তখন চলছে হিন্দু-মুসলমানের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা। আসলে, এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য যত রক্তপাত হয়েছে, স্বাধীনতা পাওয়ার ‘আনন্দে' তার চাইতে বেশি বই কম রক্ত ঝরে নি!
কিন্তু, কেবল এই দুই প্রদেশের ভাগাভাগি আর তাৎক্ষনিক ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গাতেই উপমহাদেশের ইতিহাস স্তব্ধীভূত হল না। এর জের চলতে লাগল মাস পেরিয়ে বছর, বছর পেরিয়ে দশক দশক ধরে। স্বাধীনতা আসার মাত্র সাড়ে পাঁচ মাস পরেই ১৯৪৮ এর ৩০ শে জানুয়ারির এক ছায়াঘন বিকেলে মারা গেলেন মহাত্মা গান্ধী। জনৈক নাথুরামের তিনটে কার্তুজ লজ্জাহীন ভাবে ফুঁড়ে দিল আটাত্তর বছরের মানুষটির অশক্ত ঐ শরীরখানি। সত্যের প্রতি মানুষের নিষ্ঠা যেন নতুন করে টাল খেয়ে গেল।
স্বাধীনতা পরবর্তী এই ঘটনা গুলি থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল এই বিস্তৃত উপমহাদেশের দেহে যে দগদগে ঘা দেখা দিয়েছে তা সহজে সারবার নয়। সত্যিই সেই অস্থিরতা ক্রমে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ল সাধারণ মানুষের জীবনে। সেই ঘা, সেই রক্তপাতেরই এক খন্ডিত এবং মর্মান্তিক এক বিবরণ ধরা পড়েছে দেবতোষ দাশের এই ছোটো, অথচ নিটোল এই উপন্যাসখানি তে, যার নাম বিয়োগ পর্ব, লেখকের কৈফিয়তি অনুসারে যার কিছুটা লেখকের পূর্বপুরুষের ইতিহাস ও বটে!
এ উপন্যাস বিধৃত হয়েছে মুরলীধর দাসের কাহিনীকে অবলম্বন করে। নোয়াখালি সদরের পূবে, আরেক টাউন শহর ফেনী, তার মাইল খানেক দূরে মধুপুর গ্রাম। মুরলীধর থাকেন মধুপুরে, ফেনীতে তার মস্ত হার্ডওয়ারের দোকান। তাছাড়া, কলকাতার লাহা বাবুদের এস্টেটের অন্যতম বড় প্রজা মুরলীধর দাস। তার হাতে সাতটা তালুকের তালুকদারি। বন্ধু সুধীন্দ্র কর, ফেনীর ডাক্তারবাবু প্রায়শই মুরলীধরের দোকানে আসেন আড্ডা দিতে, নতুন শোনা খবর বিনিময় করতে; মুরিলীধরকে তিনি প্রায়শই সাবধান করেন, জমিদারি প্রথা খতম হওয়ার মুখে। জমির উপর নির্ভরতা তিনি কমাতে বলেন। বলেন বটে, তবে চতুর্দিকের এই অবিশ্বাসের বাতাবরণ এর মধ্যেও মুরলীধর, সুধীন্দ্র কর বা অশ্বিনী দত্তেরা আন্তরিক ভাবে আচ্ছন্ন থাকেন এক বিপরীত বিশ্বাসে। এদেশ যে তাদেরই দেশ, জন্মভূমি। আজ পূর্ব পাকিস্থানে হিন্দুরা মাইনরিটি হলেও তেদের বিশ্বাস তারা যেমন ছিলেন, তেমনি থাকবেন চিরকাল। কিন্তু, হায়! আদৌ কি তাই হয়?
কি হয়, তা কেই বা বলতে পারে? জীবনের ক্ষেত্রে নেহাত আগাম আন্দাজ চলে না, তাই চারদিকের এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও জীবন নিজের মত করে বইবার চেষ্টা করে। মুরলীর ইতিমধ্যে তিন পুত্র ও তিন কন্যা। এখানে ছেলে মেয়ে বড় হচ্ছে জীবনের নিজেস্ব ছন্দে, মধুপুরের যা কিছু আপন, সেই মাধুর্যের ছোয়ায়। তারা মাঘ মাসের হিম ভোরে পুনু কাকার সাথে খেজুরের রস খেতে যায়; মাঘের শীত তাড়াতে অমিয় আর বিভূতি দু ভাই পুনু কাকার সাথে মিলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ছড়া বলতে থাকে। মাঘের শীত আসলে যেন এক উৎসব। কিরণবালা রস জ্বাল দিয়ে রাব (খেজুর রসের গুড়) বানান, হরেক রকম পিঠে বানান। মুরলীর নির্দেশে গগন চাড়াল মাঘের শীতেও গা ডোবায় দিঘীতে, মাছ ধরতে। ফাল্গুনে দোল আসে, ছেলেরা খেজুর নারকেলের ডাল সুপারির খোল দিয়ে বিশাল করে বুড়ির ঘর বানায়, ন্যাড়াপোড়া করে। দোলে দূর্গামন্ডপে কীর্তনের আসর বসে, বাতাসা আর নারকেলের কুচি দেওয়া হয় হরির লুঠে। প্রতি বৃহস্পতিবার কিরণবালা লক্ষ্মীর পাঁচালী পড়েন, সত্যনারায়ণ এর সিন্নি দেন সকলকে। এমন করে বছর ফুরায়, চরক শেষ হলে বৈশাখ আসে। আম জাম কাঁঠালের ভারে নুয়ে পড়ে মুধুপুরের গাছ। নতুন বছরে প্রজারা খাজনা দেয়, সংসারে সমৃদ্ধি আসে। বৈশাখ ফুরালে আষাঢ় এর শেষে শুরু হয় পবিত্র রমজান মাস, সোনা মিঁয়া সবাই কে নেমন্তন্ন করে যায় তার বাড়ি। “নোয়াখালির বর্ষা দিকবিদিক-জ্ঞানশূন্য… খাল-বিলের দেশ যায় ভেসে। ছোটোমাছের দল পুকুর উপচে নালা বেয়ে অজানার উদ্দেশ্যে সাঁতরায়। কইমাছের ঝাঁক পুকুরের ঢাল বেয়ে কান ঘষে উঠতে শুরু করে।“ বিভূতি অমিয় বাশের শলাকা দিয়ে খাচা বানিয়ে পাতে নালার মুখে, সুনীতি কই মাছ ধরতে রক্তাক্ত করে ফেলে হাত। সুনীতি কে দেখে মুরলীর বন্ধুপুত্র সুহাস এসে দাঁড়ায় দাওয়ায়, সুনীতির সাথে তার বিয়ের কথা চলছে। সুহাস ও মাছ ধরতে এগোয়। হঠাত বজ্রপাত হলে সুহাস দৌড়ে ফেরে ঘরে, আছাড় খায় কাদায়। “কাদার মধ্যে শুয়ে ধুতিকে যথাযথ যায়গায় আনতে-আনতে সুহাসের চোখ যায় জানালায়। অনাবিল হাসিতে গড়িয়ে পড়ছে সুনীতি।“
আসলে আবহমানকাল ধরে মানুষ এমনিভাবেই তার জীবনকে তার নিজের মত করে চালনা করতে চেয়েছে, আর দেশের রাজনীতি সে জীবনের ছন্দে নতুন গিটকিরি আমদানি করে এসেছে। দুই সুর যে পরস্পর মেলে না, এ তো বলাই বাহুল্য। প্রতি সন্ধ্যেয় যে সুনীতি গাইতে বসে, “তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে, তব পুণ্যকিরণ দিয়ে যাক মোর মোহ কালিমা মুছায়ে… জীবনের মলিনতা মোছার বদলে আসলে তা গাঢ় হয়ে চেপে বসে মধুপুরের বুকে।
দিন কে দিন পূর্বপাকিস্থানের রাজনীতি আরও ঘোরাল হয়ে ওঠে। দেশের ভাষা উর্দু করার জন্য প্রথমে কায়দে আজম, পরে লিয়াকত আলি ফরমান জারি করেন। হক সাহেব প্রতিবাদ করেন। আওয়ামী লিগ গঠন হয়। পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্থানের মধ্যে যেমন রাজনৈতিক দ্বৈরথ তৈরি হয়, তেমনি, হিন্দু আর মুসলিম এর মধ্যেও বিভেদ বাড়তে থাকে অতি দ্রুত। লুটপাট দাঙ্গা ছড়াতে থাকে এধারে ওধারে, পরিচিত সম্পর্কগুলি অবিশ্বাসের আগুনে দগ্ধ হতে থাকে ক্রমাগত। সময়ের জটিল এক আবর্তে পাক খেতে থাকে উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রগুলি। কি হবে মুরলীর? সুধিনের? অশ্বিনীর? নিষিদ্ধ কম্যুনিস্ট দলের সদস্য হয়ে পুনু কি আর ফিরতে পারবে মধুপুরে? সুনীতি আর সুহাসের বিয়েটা কি হবে? অসংখ্য প্রশ্ন উত্তরহীন হয়ে পাক খেতে থাকে হাওয়ায়। প্রশ্ন জাগে জীবন কি একই রকম হবে আবার, নাকি এই ঘৃণার রাজনীতির গরল স্পর্শে জ্বলে পুড়ে খাঁক হয়ে যাবে সবাই? এসব উওরই লেখা আছে কেবল সময়ের গর্ভে।
দেবতোষ দাশের উপন্যাসটি কলেবরে ছোটো হলেও লেখার গুণে ও বিষয়ের গাম্ভীর্যে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের উপর উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন উপন্যাস থাকলেও, দেশভাগের অব্যবহিত পরের সময় নিয়ে উপন্যাস প্রায় নেইই। বিয়োগ পর্ব উপন্যাসটি একরকম বলা চলে যে সেই মধ্যবর্তী সময়ের এক ভরসাযোগ্য চিত্রায়ন। উপন্যাসটি প্রথমদিকে সামান্য মন্থর হলেও পরে দ্রুত ছন্দে এগিয়ে গিয়েছে, এবং পাঠকও অচিরেই সেই ছন্দে এগিয়ে চলেন। উপন্যাসের মধ্যে মধ্যেই রাজনীতির প্রসঙ্গগুলি লেখক যেভাবে তুলে ধরেন, তাতে আপাত ভাবে লেখকের নিরপেক্ষ ভাবে ইতিহাস কে দেখার যে মনোভব ফুটে ওঠে, তা পাঠককে স্বস্তি দেবে। শুধু মাত্র হিন্দু নয়, কেবল মাত্র মুসলিম নয়, আসলে মাইনরিটি আর মেজরিটির মধ্যে চিরকাল যে এই যুদ্ধ চলেছে, এই নিরপেক্ষতা পাঠকে সেটা মনে রাখতে সাহায্য করে।
এখানে বিশেষ করে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে মুরলীধর লেখকের পূর্বপুরুষ এর ছায়ায় রচিত হলেও, লেখক যে মুরলীর চরিত্রের দুর্বল দিকটিকেও তুলে ধরতে দ্বিধা করেননি। কায়স্থ মধ্যস্বত্বভোগী মুরলীধর এখানে উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের এক চমৎকার উদাহরণ হয়ে ওঠেন, যাদের ভাবনা-চিন্তা ও জীবনধারনের মধ্যে দিয়ে কেবল যে হিন্দু ও মুসলিম জাতির মধ্যেকার পরস্পরবিরোধ ও অপরের প্রতি তাচ্ছিল্য ভাবটি ধরা পড়ে, শুধু তাই নয়, এমনকি স্বজাতের মধ্যেও নমশূদ্র হিন্দুর প্রতিও উচ্চবর্ণের হিন্দুর যে হীন মনোভাব তাও প্রকাশ পেয়ে যায়। এটা অস্বীকারের জায়গা নেই যে মুসলিম ও শূদ্রদের প্রতি জমিদার বা বড়লোক হিন্দুদের এই দ্বিধাদীর্ণ মানসিকতাও অনেকাংশ দায়ী ছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রসারে ও দেশভাগের পেছনে।
এই উপন্যাসে লেখক পাঠকের স্বার্থেই বড় সামান্য নোয়াখালি ভাষা ব্যবহার করেছেন, এবং সে কথা তিনি ভূমিকায় বলেই রেখেছেন। আমার মতে, নোয়াখালি ভাষার আরও ব্যবহার হলে ভাল হত। তাছাড়া, চলতি ভাষার মধ্যেই অনেক জায়গায় ‘করে নি’, ‘যায় নি'র বদলে ‘করে নাই' বা ‘যায় নাই' ইত্যাদির ব্যবহার সামান্য চোখে লাগে। তবে, সব মিলিয়ে, এই কাহিনী স্বাধীনতা পরবর্তী পূর্ববাংলার, পূর্বপাকিস্থানের মানুষের; এ কাহিনী উপমহাদেশের জটিল ও কদর্য রাজনীতির। তা স্বত্বেও এই কাহিনী আসলে একান্তই আমাদের। আশা করি, দেশভাগ ও দেশত্যাগ নিয়ে উপন্যাসের ভিড়ে বিয়োগ পর্ব ও একটি স্বতন্ত্র জায়গা অধিকার করে নেবে।
দেশভাগ এবং এর পরবর্তী সময় নিয়ে এ পর্যন্ত খুব একটা উপন্যাস পড়া হয়নি আমার, তবে বিয়োগপর্ব বইটি পড়ে সেসময়কার ঘটনাগুলোর একটা ধারণা পেয়েছি। সত্যিই চমৎকার লিখেছেন লেখক দেবতোষ দাস। বিন্দুবিসর্গের পর আমার পড়া নির্দ্বিধায় একটি সেরা উপন্যাস যা যে কোন পাঠককে টানতে সক্ষম।