দুনিয়াবিমুখতার অর্থ হলো লোভ লালসা ও দৃশ্যমান বস্তুরাশির প্রেম থেকে চিত্তের পবিত্রতা৷ দুনিয়ার ধ্বংস অনিবার্য, পার্থিব যা কিছু রয়েছে তার কোনো কিছুরই স্থায়িত্ব নেই৷ তবে দুনিয়াবিমুখতার অর্থ এই নয় যে, দুনিয়াকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করতে হবে এবং সকল মানবীয় সম্পর্ক বর্জন করতে হবে।
দুনিয়াবিমুখতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিলেন আমাদের মহানবী স.। তাঁর পরে তাঁর সময়কার সাহাবাদের জীবনযাপন ছিলো দুনিয়া বিমুখতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাঁরা হচ্ছেন এই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ ও উত্তম ব্যক্তিবর্গ। দুনিয়া সম্পর্কে তাদের চিন্তা ধারা ছিলো ভিন্ন ভিন্ন। বেশ কয়েকজন প্রসিদ্ধ সাহাবিদের চোখে দুনিয়া কেমন ছিলো আজকে আমরা তা সম্পর্কে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।
আবু বকর সিদ্দিক রা. এর দুনিয়াবিমুখতা
মৃত্যুর পর আমরা কত সম্পদ রেখে যাই৷ অনেক সময় সম্পদের হিসেবও থাকে না অনেকের৷ অথচ রাসূল স. এর সবচেয়ে প্রিয় এই সাহাবি মৃত্যুর পর কিছুই রেখে যাননি। হাকাম বিন হাযন বলেন,
" আল্লাহর কসম! আবু বকর একটি দিনার বা একটি দিরহামও রেখে যাননি। তিনি তাঁর মুদ্রা তৈরির ছাঁচও আল্লাহর জন্য দান করেছিলেন।"
খিলাফতের দায়িত্ব নিয়ে তিনি ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছিলেন। মুসলিম উম্মাহর সেবায় নিজের জীবন নিয়োজিত করেছেন। সব সময় বেশি কথা পরিহার করতেন। আর বলতেন৷ জিহবা মানুষকে অনিষ্টের দিকে টেনে নিয়ে যায়। উনি যে জামা পরিধান করতেন তা দিয়েই দাফন করার জন্য বলে গিয়েছিলেন।
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর দুনিয়াবিমুখতা
বলা হয়ে থাকে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. অর্ধ দুনিয়া শাসন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর ক্ষমতাকালে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বিনয়ী ব্যক্তিদের একজন। আমরা সামান্য সম্পদের অহংকারে কত কিছুই না করি৷ অথচ তিনি নির্জন জায়গায় নিজেকে তিরস্কার করতেন। আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত,
আমি একবার উমর রা. এর সঙ্গে বের হলাম। তিনি একটি দেয়ালঘেরা স্থানে প্রবেশ করলেন। আমার ও তার মধ্যে একটি দেয়াল আড়াল হয়ে থাকলো। আমি শুনতে পেলাম, তিনি বলছেন, " বাহ্ উমর বাহ্! তুমি এখন আমিরুল মুমিনীন! হে খাত্তাবের বেটা, তুমি অবশ্যই আল্লাহকে ভয় করবে, অন্যথায় তোমাকে তার শাস্তি ভোগ করতে হবে।"
পৃথিবীতে নানার রকমের মানুষ আছে। আমরা একাকী থাকার চেয়ে খারাপ মানুষের সঙ্গ পছন্দ করে থাকি। উমর রা. খারাপ মানুষের চেয়ে একা থাকাকেই শ্রেয় বলেছেন। ইসমাঈল বিন উমাইয়া বলেন, উমর রা. বলেছেন,
"খারাপের সঙ্গে মেলামেশার চেয়ে নিঃসঙ্গতাতেই সুখ রয়েছে।"
উসমান ইবনে আফফান রা. এর দুনিয়াবিমুখতা
সামান্য সম্পদের রক্ষায় আমরা কত টাকা খরচ করি সিকিউরিটির জন্য৷ অথচ মুসলিম বিশ্বের খলিফা হয়েও তিনি বাসায় কোনো গার্ড রাখতেন না। জাফর বিন বুরকান হামদানি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
"আমি উসমান বিন আফফান রা. আনহু কে একটি কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলাম। তাঁর আশেপাশে কেউই ছিলো (কোনো পাহারাদার ছিলো না)। অথচ তখন তিনি আমিরুল মুমিনীন।"
আমরা কিছু সময় কোরআন পাঠ করলে ক্লান্ত হয়ে যাই। হাঁপিয়ে উঠি৷ নিয়মিত কুরআন তো আজকাল খুব কম মানুষই পাঠ করে৷ অথচ তিনি কখনো কুরআন পাঠে ক্লান্ত হতেন না। নামাজে কিংবা রাতে তিনি সম্পূর্ণ কুরআন পাঠ করতেন প্রায়ই। সুফিয়ান রা. বলেন, উসমান রা. বলেছেন,
"তোমার অন্তর যদি পবিত্র হয় তবে আল্লাহ তাআলার কালাম পাঠে তোমাদের কখনো পরিতৃপ্তি আসবে না।"
আলি বিন আবু তালিব রা. এর দুনিয়াবিমুখতা
আমাদের সাধারণ মানুষদের কাছেও কত কিছু থাকে। অথচ তিনি ছিলেন এক সময়কার খলিফা যার সামান্য জিনিস ক্রয় করার মত অর্থও ছিলো না৷ ইয়াযিদ বিন মিনযান রা. বলেন, আলি রা. একবার একটি তরবারি কোষমুক্ত করে বললেন,
" এই তরবারিটি কে ক্রয় করবে?? আল্লাহর কসম! যদি আমার কাছে একটি লুঙ্গি কেনার দাম থাকতো, তবে আমি তা বিক্রি করতাম না।"
আবুদ দারদা রা. এর দুনিয়াবিমুখতা
আমরা বিপদে পড়লে আল্লাহমুখি হই৷ বিপদ কেটে গেলে কিংবা সুখের দিনগুলোতে আমরা আল্লাহর কথা স্মরণ করতে চাই না৷ ইসলামে বিষয়টি কঠিন ভাবে নিষেধ করা হয়েছে৷ আবু কিলাবাতা রাহি. থেকে বর্ণিত, আবু দারদা রা. বলেছেন,
সময় শেষ হওয়ার আগেই সৎ কাজ করা উচিত৷ আমাদের অনেকেই শেষ বয়সের জন্য ইবাদত রেখে দেই। কিন্তু আমরা কেউই জানি না আমরা কখন,কোথায়, কীভাবে মারা যাবো। রাবীআ বিন যায়দ রা. থেকে বর্ণিত, আবুদ দারাদা রা. বলেন,
"যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তোমরা সৎ কাজ করে নাও। কারণ তোমরা তোমাদের আমল দ্বারাই লোকদের সাথে লড়াই করবে।" যুদ্ধে যাওয়া মানে শহীদ হওয়ার নিয়তেই যাওয়া। আর মৃত্যুর পর আমল ছাড়া কিছুই কাজে দিবে না। উনি এ বিষয়টিই বুঝিয়েছেন।
ইমরান বিন হুসাইন রা. এর দুনিয়াবিমুখতা
ইমরান রা. এর দুনিয়ার প্রতি আসক্তি এতই কম ছিলো যে উনি মানুষ হওয়ার চেয়ে ছাই হওয়া বেশি পছন্দ করতেন। কাতাদা রা. বলেন, ইমরান বিন হুসাইন রা. বলেছেন,
"হায়, আমি যদি ছাই হতাম, বাতাস আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতো।"
তালহা বিন উবায়দুল্লাহ রা. এর দুনিয়াবিমুখতা
সম্পদ পেলে আমরা খুশি হই। যত বৃদ্ধি পায় খুশিও হই তত বেশি৷ কিন্তু সাহাবিরা সম্পদের আশা করতেন না। তাঁরা কম উপার্জন করতেন। সম্পদ বৃদ্ধি পেলে দান করে দিতেন। কারণ তারা ভাবতেন সম্পদের বৃদ্ধি তাদেরকে আখেরাত সম্পর্কে ভুলিয়ে রাখতে পারে। হাসান বসরি রা. বলেন,
"তালহা বিন উবায়দুল্লাহ রা. সাত লাখ দিরহামে জমি বিক্রি করলেন। এই জমি তাঁর কাছে মাত্র একদিন থাকলো। কিন্তু তিনি এই সম্পদের ভয়ে ঘর্মাক্ত হয়ে রাত্রিযাপন করলেন। সকালে উঠে সেই সম্পদ লোকদের মাঝে বণ্টন করে দিলেন।"
সালমান ফারেসি রা. এর দুনিয়াবিমুখতা
বেতন বা ভাতা পাওয়ার পর আমরা তা দিয়ে কিছু কেনাকাটা করি। অনেক সময় অপচয় করি। অতিরিক্ত খরচ করে বেড়াই। কিন্তু সালমান ফারেসি ছিলেন ব্যতিক্রম ব্যক্তি। উনি তার ভাতা পাওয়া মাত্রই বিলিয়ে দিতেন। নিজের খরচ চালাতেন নিজ হাতে রোজগার করে। আমরা বাজারে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটাই। কিন্তু সালমান রা. বাজরে অপছন্দ করতেন। উনি বলেছেন,
" তুমি বাজারে প্রথম প্রবেশকারী এবং শেষ প্রস্থানকারী হোয়ো না৷ কেননা বাজারে শয়তানের অবতরণস্থল ও তার ঝান্ডার কেন্দ্র রয়েছে।"।
তাছাড়া তিনি রাস্তায় ময়লা ফেলে মানুষকে কষ্ট দিতেন না। তার বাসা থেকে কখনো পানিও রাস্তায় পড়তো না। তিনি বলতেন, যদি নামাজের জন্য বাইরে বের হতে না হতো তাহলে আমি কখনোই বাইরে বের হতাম না।
আয়েশা সিদ্দীকা রা. এর দুনিয়াবিমুখতা
আয়েশা সিদ্দীকা ছিলেন মহানবী স. এর স্ত্রী ও আবু বকর সিদ্দিক এর মেয়ে। তবুও তিনি সাধারণ জীবন যাপন করতেন। পরিতৃপ্তসহ খেতেন না৷ জামা কাপড় তালিয়ে দিয়ে পরিধান করতেন। উরওয়াহ ইবনুয যুবায়ের রা. বলেন,
"আয়েশা রা. ৭০ হাজার দিরহাম মানুষের মাঝে বণ্টন করলেও তিনি নিজে তাঁর ওড়নাতে তালি লাগিয়ে পরতেন।"
তিনি আল্লাহর ভয়ে প্রচুর কাঁদতেন। তিনি বিস্মৃতি হয়ে যাওয়ার আকাঙখা রাখতেন৷ তিনি বলতেন, যদি গাছ হয়ে জন্ম নিতাম তাহলে মানুষ কেটে নিয়ে যেত। এইসব কিছুই ছিলো দুনিয়ার প্রতি তার আবেগহীনতার প্রমাণ।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এর দুনিয়াবিমুখতা
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. সবসময় এতিমদের নিয়ে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতেন৷ দীর্ঘসময় পর্যন্ত তিনি তৃপ্তিসহ খাবার খাননি বলে জানা যায়৷ তখনকার সময়ে এমনকি আজো কালোদের আমরা তুচ্ছ করি। উনি সব সময় ওদের ভালো চোখে দেখতেন। ওদেরকে দান করতে বলতেন। সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখতেন না। সব সময় আখেরাত অর্জনের কাজ করতেন। তিনি বলতেন,
" যখন তুমি কোনো ব্যক্তিকে দেখবে দুনিয়া অর্জমের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করছে, তখন তুমি তার সাথে আখেরাত অর্জনের প্রতিযোগিতা করো"
ক্ষুদ্র এই দুনিয়ায় আমরা খুব অল্প সময় বসবাস করতে পারবো৷ এই চিরন্তন সত্য আমাদের সকলেরই জানা। তবুও আমরা এখান থেকে শিক্ষা নেই না। সম্পদের মোহ আমাদের দুনিয়ামুখি করে রেখেছে। কিন্তু দেখুন আখেরাতের সুখবর প্রাপ্ত, জান্নাতের গ্যারান্টি প্রাপ্ত মানুষগুলোও দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়নি। আমাদের উচিত এদের থেকে শিক্ষা নিয়ে অহংকার মুক্ত, হিংসা মুক্ত জীবন যাপন করা৷ সবকিছু একাই ভোগ না করে আশেপাশের সবাইকে নিয়ে চলার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক জ্ঞান দান করুক। আমিন।