Jump to ratings and reviews
Rate this book

শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ

Rate this book
১৮৯১ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ অঞ্চলে কাটিয়েছেন। সেই বিশেষ পর্বের রবীন্দ্র-ব্যাক্তি-জীবন ও রবীন্দ্রসৃষ্টি কথা আলোচনা করেছেন এই গ্রন্থে তার ছাত্র প্রমথনাথ। সমগ্র রবীন্দ্রসাহিত্য সৃষ্টি কালে, প্রাচুর্য্য বৈচিত্র ও স্থায়িত্বের দাবিতে এই দশক সব দিক দিয়ে সফলতর ও শ্রেষ্ঠ এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
এই দশকে রবীন্দ্র সৃষ্টি ক্ষেত্রে যে সোনার ফসল ফলেছিল তার তুলনা হয় না। সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, কণিকা, ক্ষণিকা, কল্পনা, কথা, নৈবদ্য, চিত্রাঙ্গদা, মালিনী, গান্ধারীর আবেদন, বিদায় অভিশাপ, নরকবাস, সতী, এছাড়া বহু ছোটগল্প।
'পদ্মা' বজরায় বসবাসের সম্ময় কবির একদিকে জমিদারি অন্যদিকে সাহিত্য সৃষ্টি চলছে সমানে। কবিতে মানুষে জমিদারে মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে ব্যক্তিত্ব, তাকে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক তার শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে।

88 pages, Hardcover

Published September 1, 2014

Loading...
Loading...

About the author

Pramathanath Bishi

29 books12 followers
Pramathanath Bishi (1901-1985), a writer and educationist, was born on 11 June 1901 at Joari in Rajshahi, the son of Nalininath Bishi and Sarojbasini Devi. He studied for seventeen years at Brahma Vidyalaya in santiniketan, where he became closely acquainted with rabindranath tagore. He passed the Matriculation (1919) from Santiniketan and took a break of several years before going on to complete the IA (1927) and BA with Honours in Englsih from rajshahi college (1929). He then took an MA in Bangla (1932) from Calcutta University, standing first class first. He carried on research on a ramtanu lahiri Research Fellowship (l933-36). He joined Ripon College (1936-46) and then Calcutta University (1950) as professor of Bangla. He was Rabindra Professor and Head of the Department of Bangla, Calcutta University (1963-66). He also worked as editor of the Santiniketan (1931) and assistant editor of the Anandabazar (1946-49). He retired in 1971. He was also a member of West Bengal Bidhan Sabha (1962).

Bishi was a prolific writer in several genres: poetry, satire, short story, novel, drama, essay and criticism He wrote under various pseudonyms, such as Pranabi, Kamalakanta, Haturi, Bishnu Sharma, Amit Ray, Madhabya, Scot Thomson. Among his published novels are Desher Shatru (1924), Padma (1935), Jodadighir Chaudhuri Paribar (1938), Keshabati (1941), Nilmanir Svarga (1954), Sindhudesher Prahari (1955), Carey Saheber Munsi (1958), Lal Kella (1963), Ashvatther Abhishap, Chalan Beel, etc. His books of short stories include Shrikanter Pancham Parba (1944), Galper Mato Galpa (1945), Gali O Galpa (1945), Dakini (1945), Brahmar Hasi (1948), Nilbarna Shrgal (1956), Alaukik (1957), Bichitra Sanglap (1955), Svanirbachita Galpa (1960), etc. His books of poems are Dewali (1923), Basanta Sena O Anyanya Kavita (1927), Bidyasundar (1935), Juktabeni (1948), Shakuntala O Anyanya Kavita (1946), Hangha Mithun (1950), Uttar Megh (1953), Kingshuk Bahni (1959), Shrestha Kavita (1961), etc. His dramas are Rnang Krtta (1935), Ghrtang Pibet (1941), Mauchake Dhil (1945), Government Inspector (1944), Permit (1956), etc. His essays are included in Banglar Lekhak (1950), Jawharlal Nehru- Byakti O Byaktitva (1951), Bangla Sahityer Nara Nari (1953), Kamala Kanter Asar (1955), Nana Rakam (1958), Rabindra Kavya Prabaha, Rabindra Kavya Nirjhar, Rabindranath O Santiniketan, Rabindra Natya Prabaha, Rabindra Bichitra, Rabindra Sarani, etc. He also edited Bhudev Rachana Sambhar, Vidyasagar Rachana Sambhar, etc.

Bishi was awarded the Rabindra Puraskar (1960), Vidyasagar Smrti Puraskar (1882), Jagattarini Puraskar (1983). He died in Calcutta on 10 May 1985.

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
1 (10%)
4 stars
5 (50%)
3 stars
1 (10%)
2 stars
3 (30%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 3 of 3 reviews
Profile Image for Arupratan.
247 reviews417 followers
May 8, 2022
কখনও বা কবির পাল্কি থামিয়ে একজন মুসলমান প্রজা কবিকে দুটো টাকা নজর দিলেন। কবি নিতে আপত্তি করলে তিনি বললেন, আমরা না দিলে তোরা খাবি কি করে?

একদম সত্যি কথা! রবীন্দ্রনাথ আশি বছর বেঁচেছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনের চতুর্থ দশকটি সৃষ্টির প্রাচুর্যে, বৈচিত্র্যে এবং স্থায়িত্বের দাবীতে বিশেষভাবে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এই দশকে তিনি লিখেছিলেন সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালির মতো কবিতার বই, বিদায় অভিশাপ ও কর্ণ-কুন্তী-সংবাদের মতো কাহিনিকাব্য, অসংখ্য ছোটগল্প, এবং সর্বোপরি— ছিন্নপত্রাবলী! এক হিসেবে দেখতে গেলে, জীবনের চতুর্থ দশক থেকেই রবীন্দ্রপ্রতিভার প্রকৃত স্ফূরণ শুরু হয়েছিল। এবং তাঁর এই বিস্ময়কর আত্মবিকাশের প্রেক্ষাপটরূপে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছে পূর্ববঙ্গের পল্লীঅঞ্চল। নদ-নদী-খালবিল। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত। মাঠ-প্রান্তর-রাস্তা-কৃষিক্ষেত্র। শুধু পেটের খাদ্য নয়, রবীন্দ্রনাথকে মনের খাদ্য জুগিয়েছিল এই অঞ্চলের প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষ। রবীন্দ্রজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল হিসেবে প্রমথনাথ বিশী এই শিলাইদহ-পর্বটিকেই চিহ্নিত করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলতেন, তাঁর পেশা জমিদারি আর নেশা আশমানদারি। কলকাতার ঘিঞ্জি নাগরিক পরিবেশ থেকে যে তিনি এই আশমানদারি করার প্ররোচনা পাননি, এইকথা তো বলাই বাহুল্য। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রমথনাথ বিশী শুধু বিষয়টিকে বিশ্লেষণই করেননি, আমাদের জানিয়েছেন অনেক জানা-অজানা-অর্ধজানা তথ্য। যেমন, "শিলাইদহ" নামটির উৎস হচ্ছে সেই অঞ্চলের জনৈক নীলকর সাহেব, যার নামের পদবি ছিলো "শেলী"। শেলী থেকে শিলাই। আমি জানতে পেরে আশ্চর্য হয়েছি, স্বাধীনতার আগে শিলাইদহ গ্রামটি ছিল নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত। আমার বাড়ি এই নদীয়া জেলাতেই, যদিও শিলাইদহ আজ চলে গেছে কাঁটাতারের ওপারে। বন্ধু জগদীশচন্দ্র বসুকে নিজের লেখা ছোটগল্প শোনাবার লোভ দেখিয়ে শিলাইদহ আসার আমন্ত্রণ জানাতেন রবীন্দ্রনাথ। কুষ্টিয়ার মানুষরা জেনে খুশি হবেন, কুষ্টিয়াতে প্রথম আলুচাষের প্রবর্তন করেন কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। তার আগে ওই অঞ্চলের মানুষ আলু খেতে জানতেন না। আমি নিজেও জেনে খুশি হয়েছি যে, রবীন্দ্রনাথ এবং আমি, আমরা দুজনেই মীনরাশির জাতক। হাহা!

রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য রচনায় প্রবিষ্ট হয়ে আছে পূর্ববাংলার চিহ্ন। সমাপ্তি গল্পের মৃন্ময়ী, ছুটি গল্পের ফটিক, অতিথি গল্পের তারাপদ, পুরাতন ভৃত্য ও দুই বিঘা জমি কবিতার কেষ্টা ও উপেন, কিংবা ময়নাপাড়ার মাঠের কালো-হরিণ চোখের সেই বিখ্যাত মেয়েটি, এরা কেউই পুরোপুরি কাল্পনিক নয়। ঠিক যেমন কাল্পনিক নয় "তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা" গানটির বিষাদবিলীন কথা ও সুর। কাল্পনিক নয় আরো অনেক কিছু। চলনবিলে সূর্যাস্তের সময় ঝপাঝপ দাঁড় ফেলতে ফেলতে দাঁড়ের তালে তালে ছোকরা মাঝিদের গেয়ে ওঠা গান—
যোবতী ক্যান্‌ বা করো মন ভারি?
পাবনা থাক্যে আন্যে দেব ট্যাকা দামের মোটরি...

পূর্ববাংলার পল্লীপ্রকৃতি শুধু তাঁর সৃষ্টিসম্ভারকেই পুষ্ট করেনি, তাঁকে এক দিগন্তপ্রসারী উদার শান্তির স্পর্শ দিয়েছিল। যা তিনি জীবনে আগেও কোথাও পাননি, পরেও না। সুদূরলব্ধ সেই শান্তির সুখস্পর্শকে সারাজীবন নিজের চেতনার মধ্যে লালন করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ। পূর্ববাংলার ঐশ্বর্য্যময় স্মৃতি তাঁর বুকের ভেতর বাস করেছে আমৃত্যু। (একটা কথা এখানে আলাদা করে জানিয়ে রাখা উচিত। এই বইটির অলংকরণ করেছেন নন্দলাল বসু। তাঁর নিরাভরণ কিন্তু অসামান্য স্কেচগুলো বইটির মূল্য বৃদ্ধি করেছে।)

পাবনা শহর, রাজশাহী শহর, পতিসর গ্রাম, পদ্মা নদী, পদ্মা-গোড়াইয়ের সঙ্গমস্থল, যমুনা নদী, ইছামতি নদী, আত্রাই নদী, চলনবিল, সাজাদপুর কাছারিবাড়ি, শিলাইদহ কাছারিবাড়ি... কবে যে দেখতে যাবো এইসব জায়গা! যে জায়গাগুলোতে কোনোদিন পা না-রেখেই মনে হয় তারা যেন ইশারার মতো অমোঘ, স্মৃতির মতো সুপরিচিত। বেদনার মতো অমলিন।
হাল ছেড়ে আজ বসে আছি আমি,
ছুটি নে কাহারো পিছুতে,
মন নাহি মোর কিছুতেই, নাই কিছুতে।
নির্ভয়ে ধাই সুযোগ-কুযোগ বিছুরি,
খেয়াল খবর রাখি নে তো কোনো-কিছুরই।
উপরে চড়িতে যদি নাই পাই সুবিধা
সুখে পড়ি থাকি নিচুতেই, থাকি নিচুতে...

(শিলাইদহ, ১০ বৈশাখ, ১৩০৭)
Profile Image for Sohan.
274 reviews75 followers
November 20, 2022
আমার শহরে বর্ষাকাল এলেই দেখি লোকে দলবল নিয়ে জল দেখতে বেরোয়। খুব সকালবেলা যখন নাক ডেকে ঘুমুচ্ছি তখন হয়তো দেখা যাবে ছেলেবেলার এক বন্ধু দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। কি রে ঘুমুচ্ছিস? ওঠ, অনেকদিন পর পাবনায় এলুম চল্‌ একটু ঘাট থেকে ঘুরে আসি। খুব জল এসেছে এবার না?
কিংবা কোন এক বিকেলে, উহু, মন খারাপ করা বিকেলে, যখন বর্ষার আকাশ মেঘমেঘ গুড়গুড় করছে তখন পাঠচক্রের কোন পাঠিকা কিংবা আড্ডাচক্রের কোন আড্ডাবাজ চট করে বলে ওঠে—চল সবাই মিলে ঘাট থেকে ঘুরে আসি। নৌকায় করে বেড়াবো।
এ শহরে ঘাট বলতে এখন টিকে আছে ঐ এক পদ্মাঘাট যাকে আমারা বলি শিলাইদা। এখনও খেয়া পারাপার হয়। লোকে কুষ্টিয়া যায় এই পথে। প্রশাসনিক খাতাপত্রে অবশ্যি শিলাইদা পুরোপুরি কুষ্টিয়ার মধ্যে পরে।

এ শহরে যে সব কিশোর কিশোরীর সদ্য প্রেম হয়েছে কিংবা যাদের ও বালাই কেটেছে বহু আগে এখন শুধু দিন গুনতি, ঘর সংসার আর গোলামি থেকে হপ্তায় একদিন রেহাই পান যারা তাদের কাছে মনোরম বিকেলে একটু ফুরফুরে হাওয়া খাওয়ার এই এক জায়গা। এছাড়া এ শহরে নতুন কেও এলেও তাকে ধরে ঘাটে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা আমাদের মধ্যে আছে।
আমরা যারা কুষ্টিয়ার বাসিন্দা নই অর্থাৎ যারা পদ্মার উত্তরপারের মানুষ আমরা শিলাইদহ বলতে ঠিক ‘কুঠিবাড়ি’ বুঝি না। আমরা বুঝি শুধু পদ্মা। আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের প্রাগৈতিহাসিক পূর্বপুরুষ ‘আধা মৎস্য আধা মানুষ’ পদ্মার জল থেকেই উঠে এসেছিলেন। তা হোক আর না হোক পদ্মার সর্বনাশীনি রুপের মতোই দুঃখবিনাশিনী রূপ অনেকের কাছে ধরা দেয়। যেমনটা ধরা দিয়েছিলো রবীন্দ্রনাথের কাছে। কবি তাঁর মেয়ে বেলাকে একটা চিঠিতে লিখেছিলেন—

শিলাইদা, নদীয়া
[চৈত্র ১৩১৮]

বেল, শরীরটা অত্যন্ত খারাপ হয়ে পরেছিল। মনে হচ্ছিল সেই সেবারে বিলেত যাবার আগে একদিন হঠাৎ যেমন একেবারে ভেঙ্গে পরেছিলুম আবার তেমনিতর হবে। তাই কাজকর্ম তাড়াতাড়ি গোছান গাছানো ফেলে এক দৌড়ে পদ্মার কোলে এসে আশ্রয় নিয়েছি। যেমনি এসেছি অমনি আমার সেই ভয়ঙ্কর ক্লান্তি কোথায় দূর হয়ে গেছে। পদ্মা আমাকে যেমন করে শুশ্রূষা করতে পারে এমন আর কেও না। এতদিন চারিদিকে নানা জায়গায় ঘোরাঘুরি না করে যদি এখানে স্থির হয়ে পদ্মার কলধ্বনিতে কান পেতে চুপচাপ পড়ে থাকতে পারতুম তাহলে ভারি উপকার পেতুম। এবারে এখানে এসে সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছি…

আমাদের কবির মতো হয়তো ‘পদ্মাবোট’ নেই। সংসার বাঁধতে পারিনা নদীর পারে। তবুও মাঝে মাঝে নিজেদেরকে হিলিং করতে পদ্মার কাছে যাই। এই তো সেদিন। ভরা বর্ষা। একটু মেঘ মেঘ করছে। কয়েকজন পাঠকবন্ধু মিলে ঘাটে গেলাম। একটা আস্ত নৌকা ভাড়া করলাম। মাঝি চাচাকে বললাম—চলো চাচা যেদিকে দুচোখ যায়। চাচা এক গাল পান মুখে নিয়ে চিবুতে চিবুতে বৈঠা মারা শুরু করলেন। শুরু হল নিরুদ্দেশ যাত্রা—
আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে
হে সুন্দরী?
বলো কোন্‌ পার ভিড়িবে তোমার
সোনার তরী।
যখনি শুধাই, ওগো বিদেশিনী,
তুমি হাস শুধু, মধুরহা��িনী—
বুঝিতে না পারি, কী জানি কী আছে
তোমার মনে।


সুন্দরীর মনে যাই থাক আমার মনে আছে জলের আতংক। ছাউনির মধ্যে থেকে আমি জল আকাশ মেঘ দেখি। মেঘ দেখে ভয় করে। আমাদের নৌকার দিকে বিষণ্ণ মুখে কেমন চেয়ে আছে। বিষণ্ণতা একটু বাদে দেখি কান্নায় পরিণত হয়—প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হয়। নদীর স্রোতের জল নৌকায় ধাক্কা দেয়। জল ঢুঁকে আসে ছাউনির ফাঁক দিয়ে। ভেতরে আমরা ক’জন গুটিসুটি মেরে বসে থাকি। প্রচণ্ড বৃষ্টির চোটে কেমন শীত শীত করে। আমার এক বন্ধু হঠাৎ বেরিয়ে পড়ে ছাউনির বাইরে। বেরিয়ে আমায় ইশারায় বলে—উঠে আয়! দেখে যা!
আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও বেরিয়ে পড়ি। বেরিয়ে দেখি এক অকল্পনীয় দৃশ্য। মাঝ দরিয়ায় নৌকা ভাসছে ভারি বর্ষণে কূল কিনারা কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। চারিদিকে অথৈ জল। অথৈ জলে ভাসছে আমাদের নাও। আমাকে খোঁচা দিয়ে বন্ধু বলে—কি রে কি ভাবছিস?
আমার হাড়ে শীত ঢুঁকে গেছে। হাতে হাত ঘসে বলি—জানিস, এই সময়টা না বড্ড কবিগুরুর কথা মনে হচ্ছে। বেচারা কবি এপথে শিলাইদা শাহজাদপুর যেতেন আসতেন। সংসার পেতেছিলেন পদ্মার ধারে। এমন দৃশ্য হয়তো তিনি দেখতেন তাঁর কুঠিবাড়ির জানালা দিয়ে। এমনি এক বর্ষায় লিখেছিলেন—
গগন ঢাকা ঘন মেঘে,
পবন বহে খর বেগে।
অশনি ঝনঝন
ধ্বনিছে ঘনঘন
নদীতে ঢেউ উঠে জেগে,
পবন বহে ধর বেগে!


প্রমথনাথ বিশি লিখেছেন—
“রবীন্দ্রনাথের মতো মহাকবির দৃষ্টিতে পদ্মাকে কেও দেখেনি। বছরের পর বছর, ঋতুর পর ঋতু পদ্মাকে নিরীক্ষণ করে তিনি তাঁর বিশ্বরূপ দর্শন করতে সমর্থ হয়েছেন। চর্মচক্ষের দৃষ্টির সাথে যুক্ত হয়েছে কল্পনার দৃষ্টি ও দিব্য দৃষ্টি। এই তিন দৃষ্টির সম্মুখে পদ্মা উদ্ঘাটিত করে দিয়েছে তার অপার রহস্য, কিছুই গোপন রাখেনি। কেনই বা রাখবে? সে তো অনাদিকাল থেকেই অপেক্ষা করে ছিল এমন এক মহাকবির জন্যে। কবির চোখে, ভাবুকের চোখে, প্রেমিকের চোখে, যে তাকে দেখতে চাইবে। তার আশা এতদিনে সফল হয়েছে।”

শুধু বর্ষা নয় শরতের জ্যোৎস্না রাতে পদ্মার শুনশান পারে কাশবনের ধারে পা ঝুলিয়ে আমরা জ্যোৎস্না দেখি। চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করা বিশাল পদ্মার বুকে যখন টুপ করে একটি শুশুক মাথা তুলে স্বাগত বার্তা জানিয়ে যায় তখন মনটা কেমন হারিয়ে যায় মহাকালের সাথে। পদ্মার তীরে শুয়ে নক্ষত্ররাজি দেখতে দেখতে নতুন বিশ্ববিক্ষা নির্মাণ করি। গুনগুন করে পুরনো সিনেমার গান গাই। হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেদ করে ঝপাশ করে জলে একটা শব্দ শুনে চমকে উঠি! রাতের বেলা জেলেরা চুপি চুপি মাছ ধরে। সিঁধেল চোর যেন সিঁধ কাটছে জলে। রাত গভীর হয়। বাড়ির পথে হাঁটা দিই আর পদ্মাকে দিয়ে যাই যত রাজ্যের দুঃখ কষ্ট। পদ্মা গোগ্রাসে গিলে খায়। যেন সে আজীবন অপেক্ষা করে আছে আমার অপেক্ষায়।

ছিন্নপত্রাবলীতে একটি চিঠিতে কবি লিখেছেন—

শিলাইদহ
[১৮৮৮]

শিলাইদহের অপর পারে একটা চরের সামনে আমাদের বোট লাগানো আছে। প্রকাণ্ড চর— ধু ধূ করছে— কোথাও শেষ দেখা যায় না— কেবল মাঝে মাঝে এক-এক জায়গায় নদীর রেখা দেখা যায়-— আবার অনেক সময়ে বালিকে নদী বলে ভ্রম হয়। গ্রাম নেই, লোক নেই, তরু নেই, তৃণ নেই— বৈচিত্র্যের মধ্যে জায়গায় জায়গায় ফাটল-ধরা ভিজে কালো মাটি, জায়গায় জায়গায় শুকনো সাদা বালি। পূর্বদিকে মুখ ফিরিয়ে চেয়ে দেখলে দেখা যায় উপরে অনন্ত নীলিমা আর নীচে অনন্ত পাণ্ডুরতা। আকাশ শূন্ত এবং ধরণীও শূন্ত, নীচে দরিদ্র শুষ্ক কঠিন শূন্যতা আর উপরে অশরীর উদার শূন্যতা। এমনতরো desolation কোথাও দেখা যায় না। হঠাৎ পশ্চিমে মুখ ফেরাবামাত্র দেখা যায় স্রোতোহীন ছোটো নদীর কোল, ও পারে উচু পাড়, গাছপালা, কুটার, সন্ধ্যাসূর্যালোকে আশ্চর্য স্বপ্নের মতো। ঠিক যেন এক পারে স্থষ্টি এবং আর-এক পারে প্রলয়। সন্ধ্যাসূর্যালোক বলবার তাৎপর্য এই— সন্ধ্যার সময়ই আমরা বেড়াতে বেরই এবং সেই ছবিটাই মনে অঙ্কিত হয়ে আছে। পৃথিবী যে বাস্তবিক কী আশ্চর্য সুন্দরী তা কলকাতায় থাকলে ভুলে যেতে হয়। এই-যে ছোটাে নদীর ধারে শান্তিময় গাছপালার মধ্যে সূর্য প্রতিদিন অস্ত যাচ্ছে এবং এই অনন্ত ধূসর নির্জন নিঃশব্দ চরের উপরে প্রতি রাত্রে শতসহস্ৰ নক্ষত্রের নিঃশব্দ অভু্যদয় হচ্ছে, জগৎসংসারে এ যে কী একটা আশ্চর্য মহৎ ঘটনা তা এখানে থাকলে তবে বোঝা যায়।


আমি খুব আশ্চর্য হই এইসব ছিন্নপত্রাবলি পড়ে! আমি যেভাবে ছেলেবেলা থেকে পদ্মার চরের দৃশ্যপট এঁকে চলেছি কবি সেই কবেএএএএএ এঁকে রেখেছেন! ইন্দিরা দেবীকে চিঠি লিখে কি সুন্দর করে বর্ণনা করেছেন। আর চিঠি নয় প্রমথনাথ বিশি বলেন ছিন্নপত্রাবলি হল গিয়ে কাব্য। ও জিনিস নাকি গদ্য হতে গিয়ে পদ্য হয়ে গেছে!

এবার ভূগোলটা বলি শুনুন। একপারে কুষ্টিয়া আরেক পারে পাবনা। মাঝখানে পদ্মা। এদিকে গোরাই নামের ছোট একটা নদী এসে মিলিত হয়েছে পদ্মার সাথে। সেই মিলনের স্থল হল—শিলাইদহ। ঠাকুরদের এ জমি কিনে নেবার আগে এখানে একটা নীল কুঠি ছিল। সেই কুঠিতে নাকি শেলি নামের এক ইংরেজ নীলকর সাহেব ছিল। পদ্মা ও গোরাইয়ের সঙ্গমস্থলে যে দহের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই দহের সাথে শেলি সাহেবের নাম জুড়ে দিয়ে হল—শেলির দহ বা শিলাইদহ।
এখন আমরা শিলাইদহে যে কুঠিবাড়ি দেখি তা আসলে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পরে নির্মান করেছিলেন। পদ্মার ভাঙনের কারনে সাহেবদের সেই নীলকুঠিটি পরিত্যক্ত করা হয়।
সেই ১৮০৭ সালে এ অঞ্চলের জমিদারি পান প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে জমিদার হয়ে আসেন ১৮৮৯ সালে। তিনি জমিদারি পরিচালনা করেন ১৯০১ সাল পর্যন্ত। এই কুঠিবাড়ি থেকেই তিনি পতিসর ও শাহজাদপুরের জমিদারি দেখাশুনা করতেন। পতিসর এখন নওগাঁ জেলার আর শাহজাদপুর এখন সিরাজগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত।

আমার শহরে একটা মৃত নদী আছে। নাম ইছামতী। এক কালের দুর্দান্ত প্রতাপশালী নদী। এখন মৃত। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ থেকে নৌপথে ইছামতী হয়ে শাহজাদপুরে যাত্রা করতেন। তাঁর কুঠিবাড়ির সাপেক্ষে আমাদের অঞ্চলটা ছিল ‘পরপার’। তাঁর কবিতায় বারবার পরপার বা ওপার বলে সম্বোধন করতেন আমাদের দিকটাকে। কোন এক ফাগুনের প্রভাতে তিনি তাঁর পদ্মাবোটে বসে জীবনের শ্রেষ্ঠতম একটি কবিতা লিখে ফেলেছিলেন। সোনার তরী। সেই কবিতার একটা অংশে লেখেন—
একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা—
এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।


শিলাইদহবাসের অন্যতম ফসল হল এই সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ। বিশি মহাশয় বলেন— এ চালানে আরও দুটো ফসল হল চিত্রা আর চৈতালি। তিনখানি কাব্যগ্রন্থেরই প্রধান motif নদী। নৌকা। মাঝি। সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের মুকাদ্দিমায় স্বয়ং কবি একটা চমৎকার কথা লিখেছেন—

“মানসীর অধিকাংশ কবিতা লিখেছিলুম পশ্চিমের এক শহরের বাংলা-ঘরে। নতুনের স্পর্শ আমার মনের মধ্যে জাগিয়েছিল নতুন স্বাদের উত্তেজনা…
…কিন্তু সোনার তরীর লেখা আর-এক পরিপ্রেক্ষিতে। বাংলাদেশের নদীতে নদীতে গ্রামে গ্রামে তখন ঘুরে বেড়াচ্ছি, এর নূতনত্ব চলন্ত বৈচিত্রের নূতনত্ব। শুধু তাই নয়, পরিচয়ে অপরিচয়ে মেলামেশা করেছিল মনের মধ্যে। বাংলাদেশকে তো বলতে পারি নে বেগানা দেশ; তার ভাষা চিনি, তার সুর চিনি। ক্ষণে ক্ষণে যতটুকু গোচরে এসেছিল তার চেয়ে অনেকখানি প্রবেশ করেছিল মনের অন্দরমহলে আপন বিচিত্র রূপ নিয়ে। সেই নিরন্তর জানাশোনার অভ্যর্থনা পাচ্ছিলুম অন্তঃকরণে, যে উদ্‌বোধন এনেছিল তা স্পষ্ট বোঝা যাবে ছোটো গল্পের নিরন্তর ধারায়। সে ধারা আজও থামত না যদি সেই উৎসের তীরে থেকে যেতুম। যদি না টেনে আনত বীরভূমের শুষ্ক প্রান্তরের কৃচ্ছ্���সাধনের ক্ষেত্রে।”


শুধু কাব্য নয় শিলাইদহ বাসের ফলে আরও বড় যে চালান এসেছিল বাংলা সাহিত্যের দরবারে তা হল রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প। দুটো গল্প, ঘাটের কথা আর রাজপথের কথা লিখে বছর সাতেক তিনি ছোট গল্প লেখেন নি। পরবর্তীতে তাঁর হাত দিয়ে যে সব ছোটগল্প বেড়িয়েছে তা আজও বাংলা সাহিত্যে অভিজিৎ নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে। সে গল্পগুলোর অধিকাংশের প্রেক্ষাপট নদীকেন্দ্রিক অর্থাৎ পদ্মাকেন্দ্রিক। বিশি মহাশয় বলেন—পদ্মানদী বিশেষভাবে রবীন্দ্রপ্রতিভার বাহন—গঙ্গানদী যেমন বাহন বঙ্কিমের।

কবি তাঁর সোনার তরীর মুকাদ্দিমায় আরও লিখেছেন—

“আমি শীত গ্রীষ্ম বর্ষা মানি নি, কতবার সমস্ত বৎসর ধরে পদ্মার আতিথ্য নিয়েছি, বৈশাখের খররৌদ্রতাপে, শ্রাবণের মুষলধারাবর্ষণে। পরপারে ছিল ছায়াঘন পল্লীর শ্যামশ্রী, এ পারে ছিল বালুচরের পাণ্ডুবর্ণ জনহীনতা, মাঝখানে পদ্মার চলমান স্রোতের পটে বুলিয়ে চলেছে দ্যুলোকের শিল্পী প্রহরে প্রহরে নানাবর্ণের আলোছায়ার তুলি। এইখানে নির্জন-সজনের নিত্যসংগম চলেছিল আমার জীবনে। অহরহ সুখদুঃখের বাণী নিয়ে মানুষের জীবনধারার বিচিত্র কলবর এসে পৌঁচচ্ছিল আমার হৃদয়ে। মানুষের পরিচয় খুব কাছে এসে আমার মনকে জাগিয়ে রেখেছিল। তাদের জন্য চিন্তা করেছি, কাজ করেছি, কর্তব্যের নানা সংকল্প বেঁধে তুলেছি, সেই সংকল্পের সূত্র আজও বিচ্ছিন্ন হয় নি আমার চিন্তায়। সেই মানুষের সংস্পর্শেই সাহিত্যের পথ এবং কর্মের পথ পাশাপাশি প্রসারিত হতে আরম্ভ হল আমার জীবনে। আমার বুদ্ধি এবং কল্পনা এবং ইচ্ছাকে উন্মুখ করে তুলেছিল এই সময়কার প্রবর্তনা— বিশ্বপ্রকৃতি এবং মানবলোকের মধ্যে নিত্যসচল অভিজ্ঞতার প্রবর্তনা। এই সময়কার প্রথম কাব্যের ফসল ভরা হয়েছিল সোনার তরীতে। তখনই সংশয় প্রকাশ করেছি, এ তরী নিঃশেষে আমার ফসল তুলে নেবে কিন্তু আমাকে নেবে কি।”


সোনার তরী গ্রন্থে শৈশবসন্ধ্যা কবিতাটি পড়ে কেমন কান্না কান্না পায়। আমি নিজেকে খুঁজে পাই এই কবিতার মাঝে। আমি ভুলে যাই সময়ের কথা। ভুলে যাই এ কবিতা লিখা হয়েছে আজ হতে শতবর্ষ আগে।
এই কবিতা পাঠ করবার উপযুক্ত প্রেক্ষাপট বোধহয় পদ্মাপারের সন্ধ্যাকাল।

ধীরে ধীরে বিস্তারিছে ঘেরি চারিধার
শ্রান্তি আর শান্তি আর সন্ধ্যা-অন্ধকার,
মায়ের অঞ্চলসম। দাঁড়ায়ে একাকী
মেলিয়া পশ্চিমপানে অনিমেষ আঁখি
স্তব্ধ চেয়ে আছি। আপনারে মগ্ন করি
অতলের তলে, ধীরে লইতেছি ভরি
জীবনের মাঝে– আজিকার এই ছবি,
জনশূন্য নদীতীর, অস্তমান রবি,
ম্লান মূর্ছাতুর আলো– রোদন-অরুণ,
ক্লান্ত নয়নের যেন দৃষ্টি সকরুণ
স্থির বাক্যহীন– এই গভীর বিষাদ,
জলে স্থলে চরাচরে শ্রান্তি অবসাদ।


সহসা উঠিল গাহি কোন্‌খান হতে
বন-অন্ধকারঘন কোন্‌ গ্রামপথে
যেতে যেতে গৃহমুখে বালক-পথিক।
উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর নিশ্চিন্ত নির্ভীক
কাঁপিছে সপ্তম সুরে, তীব্র উচ্চতান
সন্ধ্যারে কাটিয়া যেন করিবে দুখান।
দেখিতে না পাই তারে।...


ঐ আম সুপুরির বনে সহসা চেঁচিয়ে গান গেয়ে ওঠা বালকটি যেন আমি। আমার জাতিস্মর।
আমি আজও সেই আম সুপুরির বনে ঘুরে বেরাই।
ঘুরে বেরাই আজও শিলাইদহের কুঠিবাড়ির আনাচে কানাচে।
তিলের খাজা কুলফি মালাই খেতে খেতে শুধাই—
ও কুলফিওয়ালা, তোমার কাছে কবি মশাই নিশ্চয়ই কুলফি খেত?
কুলফিওয়ালা গাল ফুলিয়ে হাসে। বলে—
'আমাত্তিন না খালিও আমার ঠাকুর্দার তিন তো খাতি!'

ঘাটে সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ নিয়ে বসলে আমি টের পাই-
কবিতাগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। ইশারায় আঙ্গুল দিয়ে দেখায়-
ঐ দেখো ঘাটে সত্যি সত্যি একটা সোনার তরী এসে ভিরছে।
আমি দেখি তরীর উপর বসে আছে বছর চল্লিশের এক সুদর্শন পুরুষ।
কাত হয়ে শুয়ে আছে। বুকের উপর আধখোলা বই।
মুখটা বাকিয়ে এপারে তাকাতেই আমি চমকে উঠি-
কবি!
Profile Image for Nasrin Shila.
275 reviews91 followers
April 14, 2018
আশানুরূপ ভাল লাগেনি। যেমন বিশ্লেষণ আশা করেছিলাম তা ছিল না। সেসময় উনার জীবনে কি ঘটেছে এসব কিছুও ছিল না। অনেক কিছু বলার ছিল, বলেনি। যা বলেছে তাও কেমন যেন খাপছাড়া লেগেছে।
Displaying 1 - 3 of 3 reviews