শ্রীরামকৃষ্ণের প্রধানতম শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ উনবিংশ শতকের উল্লেখযোগ্য বাঙালিদের মধ্যে অন্যতম। রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা বেদান্ত বাদ ও উপনিষদের চর্চার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মের কুসংস্কার দূর করা, দেশে ও দেশের বাইরে সনাতন ধর্মের প্রচারে তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক। শিকাগো তে আন্তঃ ধর্ম সম্মেলনে মনোমুগ্ধ করেছিলেন সেখানে উপস্থিত মানুষকে তার বাগ্মীতা ও জ্ঞান দিয়ে। হিন্দু ধর্মের প্রতি পাশ্চাত্যের দৃষ্টি আকর্ষন করতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি। ভারতীয় প্রাচীন দর্শন পুনরায় প্রচারের ভারটা নিয়েছিলেন এই মহতী ব্যক্তি। স্বল্পায়ু এই পুরুষ তার জীবন উৎসর্গ করে গেছেন ধর্ম চর্চায়, প্রচারে। তার সেই জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে এই বই লিখেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার বাংলা ১৩২৬ সালে। দীর্ঘদিন পর আনন্দ পাবলিশার্স সেই বইটি আবার পুনঃমুদ্রন করেছে।
বিবেকানন্দ চরিত বইটির রচনা ১৩২৬ বঙ্গাব্দ, স্বামী বিবেকানন্দের পরলোকগমনের বছর পনের পরে। লেখকের সাথে বিবেকানন্দের সরাসরি সম্ভবত দেখা হয় নি, বিবেকানন্দের মৃত্যুকালেও তিনি ছিলেন শিশু, বিভিন্ন মানুষের অভিজ্ঞতা, চিঠি, বইপত্র প্রভৃতি থেকে তিনি মানুষ বিবেকানন্দকে তুলে আনতে চেষ্টা করেছেন। এই বইয়ের ভূমিকা যিনি লিখেছিলেন তিনি বলেছেন সে সময়ই এই দেশে অনেক মানুষের জীবনী লেখা হয়ে গেছে তাতে সব কিছুই আছে কিন্তু জীবন নেই। বিবেকানন্দ সেই দূর্লভ বাঙালিদের একজন যার জীবন ছিলো, খুব বেশি মাত্রায়ই ছিলো। মাত্র আটত্রিশ বছরের জীবনটি দৈর্ঘ্য দিয়ে বিচার করলে তেমন বড় নয় তবে কর্ম দিয়ে বিচার করলে বিশাল। লেখক মোটামুটি ভাবে অলৌকিক ঘটনা পরিহার করেই এই জীবনী লিখেছেন, তবু কিছু খুচরো ঘটনা রয়েছে। বিবেকানন্দ নিজেও আমেরিকায় বক্তৃতাকালে বলেছিলেন তিনি হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী সমগ্র ভারত ভ্রমণ করেছেন, বহু সাধু সন্ন্যাসীদের সাথে মিশেছেন, কোন অলৌকিক ক্ষমতাধারী উড়ন্ত সাধু তার নজরে পড়ে নি। সেকালে পাশ্চাত্যে থিয়োসফিস্ট সোসাইটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলো, ভারতেও তার বহু অনুরাগী ছিলো। তারা ভারতবর্ষকে প্রচার করেছিলো যাদুবিদ্যা আর অলৌকিক সাধুদের দেশ হিসেবে। আবার উল্টোদিকে ক্রিশ্চান মিশনরারীরা ভারতীয়দের অসভ্য, বর্বর কালা আদমী হিসেবে বর্ণনা করে পশ্চিম থেকে মোটা অংকের চাঁদা আনতো তাদের সত্যের (?) পথে আনতে। আরও ছিলেন ব্রাহ্মরা যারা ভারতের বেদান্ত আর পাশ্চাত্যের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এই দুই মিলিয়ে এক মিশ্র ধর্মের সৃষ্টি করেছিলেন। সাথে কুসংস্কারাচ্ছন্ন, জাতপাতে বিভক্ত উগ্র হিন্দুর দল তো ছিলোই। বিবেকানন্দের লড়াই চলেছিলো এই চার শ্রেণীর মানুষের বিরুদ্ধে, দেশে ও দেশের বাইরে। তবে সেই যুদ্ধে এই যোদ্ধা সন্ন্যাসী বিজয়ী হয়েছিলেন বলেই মনে হয়। এবার পেছনে ফেরা যাক। লেখক শুরুতে ঊনবিংশ শতকের বাঙালি মনমানসে জাগরনের একটা বর্ণনা দিয়েছেন।বাঙালি হিন্দুর নবজাগরনের শতক নিঃসন্দেহে ঊনবিংশ শতক। বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী বাঙালি সমাজ ও ধর্ম সংস্কারক এই শতকেই জন্ম ও কর্ম করে গেছেন। রামমোহন রায় দিয়ে যার শুরু বিবেকানন্দ দিয়ে তার শেষ বলা চলে। রামমোহন ব্রাহ্ম ধর্মের ভিত্তি রচনা করে গেছেন, যদিও সরাসরি তিনি ধর্মটি প্রচার করে যান নি। সতীদাহ ও গঙ্গাসাগরে সন্তান নিক্ষেপ এর মতো বর্বর অমানুষিক প্রথা তার চেষ্টায় দূর করা সম্ভব হয়েছিলো। সংস্কার যুগের সেই শুরু। তারপর এলেন বিদ্যাসাগর, আরেক শক্তিশালী পুরুষ, চালু করলেন বিধবা বিবাহ। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ শুরু করলেন ব্রাহ্ম ধর্ম, তবে সে ধর্ম সময়ের সাথে সাথে হয়ে গেলো ত্রিধা-বিভক্ত। এমন সময় বাংলায় দেখা মিললো এক আধ্যাত্মিক পুরুষ, শ্রীরামকৃষ্ণের। তিনি হিমালয় বা কোন পাহাড়ে সাধনা করেন নি, তার সাধন ক্ষেত্র ছিলো দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ীতে। সেখানে রাণী রাসমনির প্রতিষ্ঠিত মন্দিরের পূজারী ছিলেন তিনি। সেকালের বৃটিশ ভারতের রাজধানী তথা সংস্কৃতি, শিক্ষার কেন্দ্র ছিলো কলকাতা। তাই হিমালয়বাসী প্রভাবশালী সন্ন্যাসী তখনও নিশ্চয়ই অনেকে ছিলেন তবু এই সাধারণ, দরিদ্র, অশিক্ষিত ব্রাহ্মণ পূজারী কলকাতার শিক্ষিত গোষ্ঠীর অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হলেন, তিনি তো থাকেন ঘরের কাছেই তাকে তো চাইলেই খুঁজে পাওয়া যায়। এমনকি ব্রাহ্ম ধর্মের একাংশের নেতা পৌত্তলিকতা বিরোধী কেশবচন্দ্র সেনও প্রায়ই আসতেন তার কাছে। নরেন্দ্রনাথ ( বিবেকান্দের পূর্বাশ্রমের নাম) তখন বয়সে তরুণ, মনে তার আধ্যাত্মিক সংকট, এর মধ্যে পড়ে ফেলেছেন পাশ্চাত্য দর্শনও, তাই পৌত্তলিক পরিবারে জন্ম ও পৌত্তলিক আবহে বড় হয়েও বিবেকানন্দ হয়ে ওঠেন সংশয়বাদী। ডিরোজিওর শিষ্য ইয়ং বেঙ্গলের সদস্যরা দীক্ষা নিয়েছিলেন নাস্তিকতা আর হিন্দু ধর্মের সকল কর্মকান্ডের বিরোধিতায়। এদের অনেকে খ্রিষ্টানও হয়েছিলেন। ব্রাহ্ম ধর্ম এসে শিক্ষিত বাঙালি হিন্দুদের সেই ধারায় লাগাম টেনে তাদের ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারী করে তুললো। বিবেকানন্দ সেই সময়ের লোক। কিন্তু ব্রাহ্ম ধর্মের তত্ত্বকথায় তার মন ভরলো না। তিনি চাইছিলেন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। কিন্তু মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, কেশব চন্দ্র এরা শুধু পুঁথিগত জ্ঞান দিতে পেরেছিলেন, অতীন্দ্রিয় কোন অনুভূতির পরিচয় তারা দিতে পারেননি, মোট কথা ব্রাহ্ম ধর্ম। তার মনে শান্তি এনে দিতে পারে নি। সেই সময় কোন এক আত্মীয়ের পরিচয়ের সুবাদে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে দেখা করেন। প্রশ্ন ছিলেন একটাই “মশাই, আপনি কি আমাকে ঈশ্বর দর্শন করাতে পারবেন?” শ্রীরামকৃ্ষ্ণ ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি সহাস্যে তার প্রশ্নের উত্তরে হ্যা বলেছিলেন। তারপর কি হয়েছিলো সেটা বিবেকানন্দ নিজে বুঝেছেন, তবে পুরোপুরি শ্রীরামকৃষ্ণকে গুরু রূপে মানতে তার প্রায় ছয় বছর লেগেছিলো। সন্দেহবাদী হিসেবে বারবার তিনি যাচাই করেছেন শ্রীরামকৃষ্ণকে, বিশ্বাস অবিশ্বাস কোনটাই পুরোপুরি না করলেও তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের ব্যক্তিত্বের আকর্ষনে বারবার তিনি ছুটে গেছেন দক্ষিণেশ্বরে। তবে তার মনের মধ্যে একটা বিরোধ তো ছিলোই। ব্যক্তিগতভাবে তিনি বেদান্তে বিশ্বাসী ছিলেন, নিরাকার পরম ব্রহ্মকে আরাধনা করতেন, পৌত্তলিক শ্রীরামকৃষ্ণের জগদম্বা পূজার পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না। পিতার মৃত্যুর পর সাংসারিক জীবনে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েন বিবেকানন্দ।তবে ততোদিনে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন সংসার ত্যাগের , ব্রহ্মচারীর জীবন যাপনের। শ্রীরামকৃষ্ণ বিবেকানন্দের মতো আরও বেশ কিছু তরুণ শিষ্য পেয়েছিলেন তবে তিনি বুঝেছিলেন তাদের মধ্যে নরেন বা বিবেকানন্দই সেরা।শ্রীরামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর বিবেকানন্দ প্রথমদিকে বেশ কিছুদিন পুরো ভারত ভ্রমণ করেছেন, বিভিন্ন পন্ডিত ব্যক্তিদের কাছে শ্রাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন, বিভিন্ন ধনী রাজপরিবারে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন।প্রথম দিকে বিবেকানন্দের ধারণা ছিলো পাশ্চাত্যভাবাপন্ন এমন ধনী রাজারা তার বেদান্ত প্রচারে সহায়ক হতে পারেন, এই ভুল তার পরে ভেঙ্গেছিলো। তার সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব ও পান্ডিত্যের আকর্ষিত হয়ে অনেক রাজা, দেওয়ান তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন, আকর্ষন করেছিলেন নানা স্থানের ছাত্র ও অধ্যাপক সমাজকেও। বিশেষত মাদ্রাজের মানুষজন তাকে আপন করে নিয়েছিলো। এর মধ্যে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের অন্য শিষ্য, তার গুরুভাইদের সংগঠিত করেছেন, তাদের আগলে রেখেছেন। পরবর্তীতে বিবেকানন্দের পাশ্চাত্যভূমিতে নিজের আদর্শ ছড়িয়ে দেয়ার সময় তার এই সময়ের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা অনেক কাজে লেগেছিলো। তার অসাধারণ পান্ডিত্য, বাগ্মীতা আমেরিকাবাসীর মন জয় করেছিলো। তারপরে ইংল্যান্ডেও তিনি উল্লেখযোগ্য আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। মূলত বিবেকানন্দই প্রথম ভারতীয় দর্শন ও ধর্মকে পাশ্চাত্যবাসীর কাছে সম্মানজনকভাবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিষ্য সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে ভারতে শিষ্যদের সংগঠিত করে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার কৃতিত্বও বিবেকানন্দেরই। একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে রামকৃষ্ণের নামে তিনি রামকৃষ্ণ মিশন তৈরীর উদ্যোগটা না নিলে বর্তমান সময়ে এসে রামকৃষ্ণ এমনভাবে মানুষের মনে বেঁচে থাকতেন বলে আমি অন্তত মনে করি না। অত্যাধিক শারীরিক পরিশ্রম তার জীবনকে দীর্ঘায়ু হতে দেয় নি। তবে তার সন্ন্যাসব্রত শুধু ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক উন্নতি বা মুক্তির উদ্দেশ্যে ছিলো না, স্বদেশপ্রেম ছিলো তার কর্মকান্ডের মূল প্রেরণা। পরবর্তীতে তার এই আদর্শ সম্ভবত স্বদেশী আন্দোলনকারীদের উদ্বুদ্ধ করেছিলো, তবে যে বিরাট আদর্শ নিয়ে তিনি রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা কতোটুকু সফল হয়েছে বলতে পারছি না, একথা অবশ্য সত্যি বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটির কার্যক্রমই সবচেয়ে বিস্তৃত এবং শুধু ধর্মীয় কর্মকান্ডে নয় শিক্ষা, সমাজসেবায়ও রামকৃষ্ণ মিশন একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান, তবু মনে হয়েছে বিবেকানন্দের উদ্দেশ্য ছিলো আরও বড় কিছু আরও বিরাট কিছু, তা হয় নি বলেই মনে হয় আমার। তাছাড়া পাশ্চাত্যে তিনি যে আলোড়ন সৃস্টি করেছিলেন তা শুধু ঢেউ সৃষ্টি করে মিলিয়ে গেছে কি না কে জানে। তবে ভগীনি নিবেদিতার মতো কিছু প্রকৃত শিষ্য তিনি সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন, নাড়া দিতে পেরেছিলেন বাঙালি মন মানসিকতায়ও।জীবনি গ্রন্থে বিভিন্ন ঘটনাপঞ্জীর প্রত্যেকটি তুলে ধরতে গিয়ে কিছুটা ধৈর্য্যচ্যুতির সৃষ্টি হয়েছে এবং বইকে কিছুটা পানসে করেছে, আরও সংক্ষেপে শুধু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বর্ননা দেয়া যেত, এজন্যই একতারা কম দিলাম। এই দিকটা বাদ দিলে লেখক যথেষ্ঠ নির্মোহভাবে বিবেকানন্দের চরিত্র বর্ণন করেছেন।