বিভূতিভূষণ এর স্ত্রী রমা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন বেশ অসুস্থ তখন মৌসুমী পালিত বিভূতিস্মৃতিকথা লিখতে শুরু করেন। রমা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কথা বার্তা তখন প্রায় বন্ধ তাই তার কাছ থেকে তেমন কোন স্মৃতিচারন শোনার সৌভাগ্য লেখিকার হয় নি। তবে বিভূতিপুত্র সাহিত্যিক তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও পুত্রবধু মিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় এর সহায়তা তিনি পেয়েছেন বিস্তর। এছাড়াও বিভিন্ন জনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, পুরোনো ডায়েরী, চিঠিপত্র ঘেটে তিনি বিভূতিভূষণ কে নিয়ে এই বই লিখেছেন। এই বই প্রকাশ হবার পূর্বেই রমা বন্দ্যোপাধ্যায় মারা যান। বিভূতিভূষণ কে নিয়ে স্মৃতিচারন মূলক গ্রন্থের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। তবে তার বেশিরভাগই সহজপ্রাপ্য নয়। বিভূতিভূষণ কে জানার তাকে বোঝার একটা সহজ মাধ্যম হতে পারে এই বই।
আমার প্রিয় লেখক কে এই প্রশ্নের উত্তর জীবনে হয়তো বহুবার বদলেছে, কিন্তু একটা সময়ে এসে তা আর বদলায় নি, তিনি বিভূতিভূষণ। এখনও বিভূতিভূষণ এর অনেক লেখা অামার পড়ার বাকী, কিছু লেখা পুনঃপাঠের জন্য ঠিক করেও রেখেছি, তবে যতটুকু তার লেখা ও তার সম্পর্কে পড়েছি তাতেই গভীর শ্রদ্ধাবোধ আর আত্মীয়তা অনুভব করেছি।বইয়ের কাভারে যদিও রমা বন্দ্যোপাধ্যায় (কল্যাণী দেবী- বিভূতিভূষণ এর স্ত্রী) এর নাম আছে তবুও এই পুরো বইয়ে তার মুখ থেকে শোনা কোন কথা লেখিকা মৌসুমী পালিত এর পক্ষে লেখা সম্ভব হয় নি। এই লেখার জন্য তথ্য সংগ্রহের জন্য যখন লেখিকা বিভূতিভূষণ এর স্ত্রী- পুত্রের কাছে যান তখন কল্যাণী দেবী অ্যালঝাইমার রোগে আক্রান্ত, সব পুরোনো স্মৃতি তখন মুছে গেছে। তবু তার সযত্নে সংগ্রীহিত চিঠি, ডায়েরী, খসড়ার পাতা থেকে উদ্ধার করা ঘটনাগুলোই আমাদের শুনিয়েছেন লেখিকা। বিভূতিপুত্র সুসাহিত্যিক তারাদাস (বাবলু) ও পুত্রবধু মিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যান্য চেনাজানা লোক, আত্মীয়রাও সহায়তা করেছিলেন বিভিন্ন তথ্য দিয়ে। বিভূতিভূষণের প্রকাশিত গল্প উপন্যাস, দিনলিপি থেকেও কিছু তথ্য নিয়েছেন লেখিকা। কিশলয় ঠাকুরের পথের কবি পড়ার সুবাদে বিভূতি জীবনী মোটামোটি জানা ছিলো, তাছাড়া দিনলিপিগুলোও পড়েছি। তবু এবার নতুন অনেক তথ্য পেলাম। ছোট ভাই নুটুবিহারীর সাথে বিভূতিভূষণ এর বয়সের পার্থক্য ছিলো বিস্তর। ভাই-বোনদের মধ্যে একমাত্র জীবিত এই নুটুর প্রতি বিভূতিভূষণ এর ছিলো আপত্য স্নেহ। যেখানেই যেতেন দীর্ঘ চিঠি পাঠাতেন ভাইয়ের কাছে। এই বইয়ের একটি মূল আকর্ষন সেই সব চিঠি গুলো।কল্যাণী দেবীকে পাঠানো চিঠিও আছে অনেকগুলো। অাছে অন্যান্য অনেককে পাঠানো চিঠি, এছাড়াও আছে বিভূতভূষণকে লেখা বিভিন্ন খ্যাত অখ্যাত মানুষ আর সভা সমিতি বা পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশকদের চিঠি। একটা কথা বলতেই হবে সন তারিখের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় নি কোথাও, আগেরটা পরে, পরেরটা আগে এমন বারবারই হয়েছে। এই একটি দূর্বলতা এই বইয়ে আছে। এছাড়াও আছে লেখার খসড়া, ডাযেরীর পাতায় লেখা নানা লেখা। মূলত কল্যাণী দেবীর সাথে বিয়ের পরের ঘটনার উল্লেখই বেশী, আগের কিছু কথার উল্লেখও আছে নানা স্মৃতিচারন থেকে।শৈশব, তারুণ্যের দিনগুলো, মা -বাবা, বোন বা প্রথম স্ত্রী গৌরী দেবীর কথা খুব বেশি আসে নি। তবে এসেছে বিভূতিভূষণ এর ভ্রমণের দীর্ঘ বর্ণনা। আমার ধারণা ছিলো বিভূতিভূষণ হিমালয় ভ্রমণ করেন নি, কেননা তার দিনলিপিগুলোতে সেসবের উল্লেখ পাইনি। এখন জানলাম বিভূতিভূষণ স্বস্ত্রীক গিয়েছিলেন দার্জিলিং এ, গিয়েছেন ঋষিকেষ, হরিদ্বার, দেরাদুন, মুসৌরী। হিমালয় ভ্রমণের সুযোগটা ঘটেছিলো মিত্র এন্ড ঘোষের বন্ধুদ্বয় গজেন্দ্র মিত্র ও সুমথনাথ ঘোষ (দুজনেই লেখক ও প্রকাশক) এর ব্যয়ে এবং ফিরে এসে এই ভ্রমণের উপর একটি বই লিখে দেয়ার কড়ারে। দুঃখের বিষয় সেই বই কখনো লেখা হয় নি, যেমন লিখে যেতে পারেন নি কাজল। যাকেই চিঠি লিখেছেন নিতান্ত ব্যবহারিক চিঠির মধ্যেও প্রকৃতির বর্ণনা চলে এসেছে বারবার, প্রকাশিত হয়েছে তার শিশুশুলভ নানা চিন্তা ভাবনাও। কত অদ্ভুত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়ে ওঠে নি তার জীবনে। জীবনের শেষ পর্যায়ে বুঝতে পেরেছিলেন চলে যাচ্ছেন। ছাপ্পান্ন বছর আয়ু হয়তো সে সময়ের জন্য কম নয়। কিন্তু ২৭ বছরের তরুণী স্ত্রী, সাড়ে তিন বছরের বাবলুকে রেখে গেলেন বড় অসময়ে। একটা পরিবারের সুখের সংসার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো। শোক সামলাতে না পেরে আত্মহত্যা (?) করলেন ছোটভাই নুটুবিহারী। আধ্যাত্মিকতায়, অলৌককত্বে বিশ্বাস করতেন তিনি। শেষ জীবনে মৃত্যু আসন্ন এই বিশ্বাস কি তার মনে নেগেটিভ অটোসাজেশন এর জন্ম দিয়েছিলো? কে জানে সত্যিটা কি তা জানার উপায় নেই। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের পাঠানো চিঠিটাও এক অমূল্য সংযোজন। এক সন্দেহবাদী ব্যক্তির অলৌকিক ঘটনার ব্যাখ্যা জানার আগ্রহ ফুঠে উঠেছে সেই চিঠিতে। লিখেছেন তাকে (বিভূতিভূষণ), কারণ তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এ ঘটনা হেসে উড়িয়ে দেবেন না, বরং তার নিজের বিশ্বাস ও দৃষ্টিকোণ থেকে সেই ঘটনার একটা ব্যখ্যা দেবেন। জানিনা বিভূতিভূষণ কি উত্তর দিয়েছিলেন বা আদৌ দিয়েছিলেন কিনা। বড় কষ্ট লাগে শেষ দিকের ঘটনাগুলো। বাবলু, কল্যাণী, মৃত্যুপথযাত্রী বিভূতিভূষণ এর কথা পড়ে চোখে জল চলে অাসে। জানিনা বিভূতিভূষণ এর বিশ্বাস সত্যি কিনা, জানিনা মৃত্যুর পর কিছু আছে কি না, পরম ব্রহ্ম, জীবাত্মা, পরমাত্মা সত্যি কি না, তবু সত্যিই যদি কিছু থেকে থাকে, বিভূতিভূষণ এখনও হয়তো আছেন ইছামতীর তীরে, তেলাকুচার বনের ধারে, হয়তো বা ঘেঁটু বনে ঘেঁটু ফুলের ঘ্রাণ নিচ্ছেন অথবা সারেন্ডা ফরেষ্টের গভীর নির্জনতা উপভোগ করছেন। হয়তো জ্যোৎস্না রাতে এখনও তিনি তাজমহল এর রূপ দেখেন কিংবা ঘাটশিলার নির্জন পথে সন্ধ্যাবেলায় হেটে বেড়ান। কে জানে হয়তো তিনি এই পৃথিবীতে নেই আছেন অনন্ত নক্ষত্রলোকের অন্য কোন লোকে। তবু ভাবতে ভালো লাগে তিনি ছিলেন, আছেন , থাকবেন। যেমন থাকবে তার লেখাগুলো।