বাস্তু, যেখানে বসত করে দেহ, বসত করে মন। পূর্বপুরুষের স্মৃতি আর উত্তরপুরুষের স্বপ্ন। পাথুরে পাহাড়ের দুর্গম খাঁজে নির্জলা এক ভূখণ্ড, সেটাই ওদের বাস্তু। এক মুমূর্ষ জনপদ। তবু তারা স্বপ্ন বোনে থরে থরে। প্রকৃতির ঘনীভূত রূপ ধরে রাখে ছৌ-এর ছন্দে। ঝুমুরের তালে সুরে। তাদের পথ দেখায় ছৌ, পথ দেখায় ঝুমুর। আর ভিনদেশ থেকে পথ ভুলে এসে পড়া এক জাদুশিল্পী।জঙ্গলমহলের সব শিল্পসত্তা এক করে তারা নির্মাণ করে লড়াই-এর হাতিয়ার। কাস্তে-কুড়ুল, তির-ধনুক আর ছৌ-ঝুমুর সম্বল করে রুখে দাঁড়ায়। বনপার্টি এসে পাশে দাঁড়ায় রাতে-রাতে। দিনের আলোয় অন্য দল গুণ গায় সংসদীয় গণতন্ত্রের। মাঝে পড়ে বিভ্রান্ত ওরা। জঙ্গলমহলের আদিবাসী মানুষের আশ্চর্য জীবনালেখ্য ‘রুশিকা’।
বিমল লামার জন্ম ৪ জুলাই ১৯৬৮ দার্জিলিং পাহাড়ের সিংতাম চা বাগানে এক চা-শ্রমিক পরিবারে। বাবা পুলিশের চাকরি নিয়ে সপরিবারে চলে আসেন হুগলি জেলায়। পড়াশোনা চুঁচুড়ার স্কুলে-কলেজে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। আইনের কলেজছুট। বর্তমানে রাজ্য সরকারি কর্মচারী, পুরুলিয়ায় কর্মরত। স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ছোটগল্পই জীবনের প্রথম প্রকাশিত লেখা। ‘দেশ’ পত্রিকা আয়োজিত ছোটগল্প প্রতিযোগিতায় পরপর দু’বার পুরস্কৃত। প্রথম উপন্যাস ‘নুন চা’। ‘রুশিকা’ লেখকের দ্বিতীয় উপন্যাস। ২০১৩ সালে পেয়েছেন জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায় স্মারক সম্মান।
বই: রুশিকা লেখক: বিমল লামা প্রচ্ছদ: স্বর্ণাভ বেরা প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড প্রথম প্রকাশ: নভেম্বর ২০১৬ সংগ্রহ মূল্য: ৪০০/-
পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের দুর্গম খাঁজে জঙ্গলের গভীরতম নির্জনতায় ধুঁকতে থাকা এক মুমূর্ষু গ্রাম কুসুমডি। পূর্বপুরুষের স্মৃতি আর উত্তরপুরুষের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে তার বাসিন্দারা। প্রকৃতির ঘনীভূত রূপ তারা ধরে রাখে ছৌ-এর ছন্দে, ঝুমুরের তালে সুরে। সর্ব অর্থেই প্রান্তিক এই মানুষগুলোর মাঝে হঠাৎ একদিন হাজির হয় এক পথভোলা জাদুশিল্পী। রুশিকা।
বিমল লামার এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় আছে অরণ্যের অন্তর আবিষ্কারের খোঁজ। চিরবঞ্চিত এই জঙ্গলের ভূমিপুত্ররা পায় না পেটের ভাত, চাষের জমি, নদীর জল বা অরণ্যের অধিকার। খিদের তাড়নায় হারিয়ে যেতে বসে ছৌ-ঝুমুর-ধামসা-মাদলের প্রাচীন শিল্প। দিনের বেলায় ভোট সন্ধানী রাজনৈতিক দলের নেতারা এসে সংসদীয় গণতন্ত্রের গুণ গায়। আর রাতের অন্ধকারে ছায়ামূর্তির মত আসে বনপার্টির দল, তাদের মনে এঁকে দিতে চায় বঞ্চনার কঠিন ছবি। এই দুইয়ের মাঝে পড়ে বিভ্রান্ত হয় কুসুমডি গ্রামের প্রান্তজন।
ভোরের আবছা কুয়াশামাখা সুইসা স্টেশনে হলুদ রঙের বোর্ড যেখানে লেখা আছে হারিয়ে যাওয়ার ঠিকানা, স্বপ্নাদিষ্ট কানু সেখানেই পায় রুশিকা হয়ে ওঠার পথনির্দেশ। সে তাদের স্বপ্ন দেখতে শেখায়। কানু, যে কিনা মৃত্যুর অভিলাষে ঘর ছেড়েছিল, এই নিপীড়িত অসহায় মানুষগুলোকে সে জীবনের সন্ধান দেয়। বামনি নদীর পারের জমিতে কুসুমডির মেয়েরা ফলায় আশ্চর্য ধান, যে ধানে মিশে থাকে রুশিকার জীবনবোধ আর গোটা গ্রামের স্বেদ রক্ত ঘাম খিদের উপশম।
সেই ধান জমির অনধিকারের অভিযোগ নিয়ে যখন উপস্থিত হয় সরকারী প্রতিনিধি দল তখন মেয়েরা একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে স্লোগান দেওয়ার মতো করে – "হ হ, কাটি ফেইলব... কাটি ফেইলব...।" কাস্তে কুড়ুল তীর ধনুকের মত চাষের আদিম সরঞ্জামগুলো আবার মাটি ছেড়ে লাফিয়ে ওঠে আকাশের দিকে। তাদের তুলে ধরে রাখে সেইসব হাত, যারা ধান কাটার জন্য মরিয়া।
সরকারপক্ষ বিরোধীপক্ষর রাজনীতির খেলা আর মাওবাদী বনপার্টি, সবাই এদের ব্যবহার করতে চেয়েছে নিজেদের স্বার্থে। রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এরা ভোট সংখ্যা বাড়ানোর খেলনা ছাড়া কিছুই নয়। অপরদিকে মাওবাদী তথাকথিত 'বিপ্লবী'-দের কাছেও এরা বিপ্লব বিদ্রোহ প্রদর্শনের পুতুলমাত্র। এদের সারল্যকে শুধু ব্যবহার করেছে সবাই। রুশিকা এদের প্রকৃত বিপ্লব শিখিয়েছে যা এসেছে নিজের হাতে ফলানো ধানের গন্ধে, পাতামনির হাতে বোনা বাবুইঘাসের চাটাই বিক্রির মূল্যে, কুসুমডির প্রথম মাধ্যমিক পাস মনজুড়ার মার্কশীটের উজ্জ্বলতায়। আর এসেছে ধামসা মাদল ছৌ ঝুমুরের উদ্দামতায় শূন্যভূমি বিনির্মাণের প্রক্রিয়ায়।
বিনির্মাণের এই প্রক্রিয়ায় কানুর সাথ দিয়েছেন ছৌ-এর রাজা (এই চরিত্রটি জঙ্গলমহলের প্রবাদ প্রতিম ছৌ-শিল্পী পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়ার আদলে নির্মিত) আর এক আশ্চর্য নারী মিশিলা। মিশিলার পাখির নীড়ের মতো চোখে একদা মৃত্যু অভিলাষী কানু খুঁজে পেয়েছে জীবনের আশ্রয়। শুধুই কি কানু ? মিশিলার চোখে আশ্রয়ের আশ্বাস দেখেছে গোটা কুসুমডি।
“কয়েক পা এগিয়ে আসে ধব্রুর বউ। আলুথালু। অর্ধ উলঙ্গ। নিরবচ্ছিন্ন খইনি শেষ করে ফেলেছে তার দাঁত। পড়ে আছে শুধু কালো মাড়ির অবশেষ। তাই নিয়ে যেন সে হাসার মতো ভাব করে। হাত বাড়িয়ে ধরে মিশিলার হাত। মিশিলা অবাক হয়ে তাকায় তার দিয়ে। তার ছোঁয়ার মধ্যে কোথাও কোনও মলিনতা নেই। হাত দিয়ে নয়, যেন সে নিজের অন্তর দিয়ে ধরেছে তার হাত। তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, 'তু হামদের ভরসা বিটি। ওতনাটুকুই দে। আর কনো নাই খুঁজি।”
রুশিকা তাই শুধু কানু নয়। বিমল লামার এই উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্র নিজের মত করে এক এক জন রুশিকা। ছৌ-এর রাজা যখন নিজের বাড়ির আঙিনায় উদ্বেল হয়ে নাচেন আর গাঁথা হতে থাকে বেগুনবিড়ি কারখানার ভিত্তিপ্রস্তর, তিনিও হয়ে ওঠেন রুশিকা। মিশিলার কাস্তের মত চকচকে কালো বাঁকা কাঁধে কানু যখন খুঁজে বেড়ায় নিজেকে, তখন সেও হয়ে ওঠে এক রুশিকা। রুশিকাকে নির্মাণ ও তার আশ্রয় হয়ে যে ওঠে সে স্বয়ং রুশিকা আর কী ! মদ ও পুরুষের সোহাগের নেশার নিশির ডাক প্রাণপণে উপেক্ষা করে যে পাতামনি বাবুইঘাসের চাটাই বোনে আশ্চর্য কুশলতায়, রুশিকা তো সেও !
এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় জীবনের গল্প বলেছেন লেখক। সমস্ত প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে যে জীবন শুধু বেঁচে থাকার ও আরও ভালো ভাবে বেঁচে থাকার লড়াই ও আশ্বাস। কারণ “... মানুষ শুধু ভাত রুটিঞঁ নাই বাঁচে। কারণ, মানুষ শুধু মানুষ লয়, সে রুশিকাও বটে।”
“ইঞ দ রুশিকা।”
বিমল লামার লেখা এই উপন্যাস অরণ্যের আত্মাস্বরূপ। জঙ্গলবাসী মানুষের এক আশ্চর্য জীবনালেখ্য 'রুশিকা'।
দ্বৈত সত্তা ফুটিয়ে তুলে অসম্ভব সুন্দর প্রচ্ছদটি করেছেন শিল্পী স্বর্ণাভ বেরা। তাঁকে ধন্যবাদ। আর লেখক বিমল লামার প্রাজ্ঞ কলমের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলাম।