বাংলা গান এবং সিনেমার জগতে অনন্য এক নাম অঞ্জন দত্ত। তাঁর জীবনের গল্প নিয়ে লেখা এই বই। লেখক অঞ্জন দত্তের সঙ্গে দেখা করেন কলকাতায়। এরপর একসাথে ভ্রমণ করেন দার্জিলিং। এই ভ্রমণের মাঝেই তাদের অনেক গল্প হয়। অঞ্জন দত্তের জীবনের গল্প।
অঞ্জন দত্তের শৈশব, বেড়ে ওঠা, পরিবার, জীবনযুদ্ধ এসবই রয়েছে এই জীবন-গল্পে।
কোথায় কীভাবে সেটা মনে না থাকলেও এই গান দিয়েই অঞ্জন দত্তকে চেনা হয় আমার সেটা বিলকুল মনে আছে।
সেই অঞ্জন দত্তকে নিয়ে এই বই। এটাকে ঠিক জীবনী বলা যায় না। সাজ্জাদ হুসাইনকে নিয়ে কয়েকদিন নানান জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন আর এই ফাকে কথা হয়েছে অঞ্জন দত্তর ছোটবেলা, তার পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, অভিনয়, গান, প্রেম, বিয়ে, অন্য সেলিব্রেটিদের নিয়েও।
এটাকে অনেকটা আলাপ-চারিতা বা সাক্ষাৎকার টাইপ বই বলা যায়। সাজ্জাদ হুসাইন প্রশ্ন করছেন অঞ্জন দত্ত উত্তর দিচ্ছেন সেই উত্তরের প্রেক্ষিতে তিনি অন্য আরেক প্রশ্ন করছেন। এভাবে বেরিয়ে আসছে অঞ্জনদত্তর জীবনের প্রতিচ্ছবি।
অনেক প্রশ্ন এমনও আছে অন্য কেউ হলে হয়তো এড়িয়ে যেতো কিন্তু তিনি সেইসবেরও উত্তর দিয়েছেন।
পড়তে ভালোই লাগলো। উনার গান নিয়ে আরেকটু কথাবার্তা থাকলে ভালো লাগতো। যা আছে তাতে মন ভরলো না।
অঞ্জন দত্ত যেভাবে যেটা বলেছেন সাজ্জাদ হুসাইন সেটাকে সেরম করে লিখতে গিয়ে টাকা-ফাকা, খাবি- দাবি, মদ-ফদ এইরকম শব্দও লিখেছেন প্রচুর। দত্ত সাহেবের কথার স্টাইলই হয়তো ওরম কিন্তু পড়ুয়া হিসেবে আমার কাছে কিছুটা ত্যক্ত লাগলো।
অঞ্জন দত্তের গান ছোটো থেকেই শুনছি আর এখনো শুনে যাচ্ছি সাথে দেখে যাচ্ছি সিনেমাও। গানগুলো সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছিলো বরাবরই, অবশেষে কিছুটা খোড়াক মিটেছে এই বইটা পড়ে। লেখক সাজ্জাদ হুসাইন তাঁর লেখা শিল্প দিয়ে বইটাকে করেছেন প্রাণবন্ত। তথাকথিত আত্মজীবনী এটা না, তবে যাঁরা অঞ্জন দত্তকে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এ যেনো এক treasure trove.
অঞ্জন দত্ত আমার খুবই পছন্দের একজন শিল্পী। আমার ভালো লাগা বা খারাপ লাগা, সবকিছুতে অঞ্জন দত্তের গান আমার আশ্রয়স্থল।
আমার মনে হতো যে অঞ্জন দত্ত খুব candid ধরণের একজন মানুষ, এই বইটা যেনো তাঁরই একটা প্রতিফলন। খুব বিস্মিত হয়েছি অঞ্জন আর ছন্দা দত্তের সম্পর্ক দেখে!! কতোটা ভালোবাসা, বিশ্বাস থাকলে এমনটা সম্ভব, সেটা সহজেই অনুমেয়। অভিনেতা হওয়ার আকুল বাসনা, সেখান থেকে কেমন করে গায়ক হয়ে যাওয়া, এ যেনো অঞ্জন দত্ত দেখেই সম্ভব হলো।
লেখক হয়তো আরো লিখতে পারতেন, তবে এটাও ঠিক যে বেশী লিখলে তাঁর ব্যক্তিগত জায়গাটা থাকতো না। ভালো লেগেছে কথ্য ও লেখ্য ভাষার মিশ্রণ দেখে, সেটা বেশ উপভোগ্য ছিলো। একটা মানুষ কতোটা নস্টালজিক হতে পারেন, এই বইটা পড়লে সেটা বোঝা যায়। দার্জিলিংয়ে ছোটোবেলার সব স্মৃতি, কিংবা বন্ধুত্ব বা প্রথম প্রেম– এসব কিছুই কেনো জানি একই সুতোয় গাঁথা হয়েছে। আর আমার মতো অঞ্জন ভক্ত যারা আছেন, তাঁরা এই বইটা পড়তে থাকলে কেনো জানি তাঁর সৃষ্ট গানগুলো জগতে অটোমেটিক্যালি হারিয়ে যাবেন। এক নিঃশ্বাসে প্রায় শেষ করেছি, কেননা আমার মনে হয়েছে যে এসব কিছু আমার চেনা-জানা।
লেখক সাজ্জাদ অঞ্জনকে যেভাবে জেরা করেছেন, সেটাও প্রশংসা যোগ্য। অঞ্জন দত্তের ছোটো থেকে বেড়ে ওঠা, অন্যভাবে বললে বলতে হয় যে তা ছোটো থেকে আজ অব্দি সেই দস্যিপণাটা বেশ দাপটের সাথেই করে চলেছেন। হু, এটাই অঞ্জন দত্ত। কে কি বললো, কিংবা কে কি ভাবলো---সেগুলো ভাবার সময় নাই।
মালা, বেলা বোস কিংবা রঞ্জনার পেছনের গল্প, কিংবা ‘দুষ্ট গানে’র ইতিকথা—সত্যিকার অর্থেই উপভোগ্য। আর বন্ধুত্ব জিনিসটা যে কি, সেটাও অনেকটা প্রকাশ পেয়েছে অঞ্জনের ভাষ্যে। মানুষের হাজারো সম্পর্ক, সাথে হাজারো নতুন রূপ—সেটা জানারও একটা সুযোগ হলো বইটা পড়ে।
ভালো একটা কিছু সৃষ্টি করার যে প্রবল আকুতি, সেটা এই বইটা না পড়লে জানা যেতো না। অঞ্জন দত্ত যে তথাকথিত কোনো শিল্পী নন, এ কথাই বারবার এসে যায়। আমার জীবনের খুব ভালো কিছু বইয়ের মধ্যে এটা একটি, হয়তো শিল্পী অঞ্জনকে অনেক ভালোবাসি দেখেই কথাটা বললাম।
অঞ্জন দত্তকে, তাঁর সৃষ্টিকে যারা ভালোবাসেন, বুঝতে চান, তাঁদের জন্য দরকারি একটা কাজ। লেখক যত্নের সাথে, অনেক পরিশ্রম করে, নাছোড়বান্দার মতো লেগে থেকে ডিটেইল একটা বই তৈরি করেছেন। অনেক জায়গাতেই যেখানে দত্ত সাহেব তাঁর কালো সানগ্লাস নামিয়ে রেখে তাঁর চোখে জীবনকে কিভাবে দেখেন তা বলেছেন। এরকম খামখেয়ালী, অনেকটা আত্মমগ্ন, কাজপাগল চরিত্রকে দুই মলাটের মাঝে কথায় কথায় ধরতে পারার চেষ্টা সফল - ভক্ত, লেখক, প্রশ্নকর্তা সব মিলেমিশে গেছে। গল্প শুনতে চাইলে, মানুষকে খুলতে হলে, জানতে হলে, যেই জায়গায় তারা বড় হয়েছেন, বেড়ে উঠেছেন, অঞ্জন হয়েছেন, সেখানে ফিরে যাওয়ার বিকল্প নাই আসলে। অঞ্জনদাকে জানতে হলে তাই তার সাথে দার্জিলিং - কলকাতা হাঁটতে হবে, বসতে হবে, তাঁর মানুষগুলোকে তাঁর সাথে থেকে চিনতে হবে। একজন মানুষ যিনি গানে এসেছেন কারণ অভিনয়ে তাঁকে কেউ ব্যবহার করতে পারছেন না, strong footing আসছে না আর্থিকভাবে, লোকটা মধ্যমেধার বাজারে হাঁসফাঁস করছেন, কাজ করে যাচ্ছেন, কখনও নিজেও সেই গড়পড়তা কাজই করছেন (যদিও মানবেন না), বারবার চেষ্টা করছেন। অভিমান, হতাশা, হচ্ছে তো হচ্ছে না, মঞ্চ, স্ক্রিন, সিনেমা, গান, গিটার, রুচি, ক্লাস, ভিন্ন ভিন্ন করে কিছু একটা ভালো কিছুর চেষ্টা, না পারা, কীছুটা বিশ্বাস - সবকিছু মিলে অঞ্জন। অঞ্জনযাত্রাতে তাইই উঠে এসেছে। বিশেষ করে, এমনকি যার প্রতিটা গানেও একটা গল্পের গন্ধ আছে, সেই গল্পকারের গল্প, সৃষ্টির পেছনের গল্প না জানলে শিল্পী অঞ্জন সর্ম্পকে আসলে ধারণা বিক্ষিপ্ত থেকে যায়।
লেখক অঞ্জনকে ধরতে গিয়ে তাঁর সাথে কথোপকথন যেভাবে হয়েছে, বইয়ে ঠিক সেই মেজাজেই রেখেছেন। পড়তে গিয়ে তাই অঞ্জনদা’র কণ্ঠ কানে বাজে। একটা অডিওবুক খুব দুর্দান্ত হবে। কিন্তু ‘র’ ভাবটা রাখতে গিয়ে ৩৩১ পাতার বই কখনো কখনো দীর্ঘ মনে হয়েছে, রিপিটেশন থেকেছে অনেকবার। যাত্রায়, গল্পে সেটা হবেই - পাঠকের সাথে সেখানে কীছুটা দূরত্ব তৈরি হয় এই জায়গা থেকে যে মনে হয় আরে এই প্রশ্ন এখানে কেন, এটা কেন বললেন না। একই কথা তো বলেছেন উনি, ধরতে পারছেন না কেন? ইন্টারেকশন, লেখা, আর ছাপা - এই তিন ধাপের রূপান্তরে তাই লেখক এখানে কিছুটা সাহস আর বাকিটা আলসেমি করেছেন বলেই আমার ধারণা। তবে অঞ্জনদাকে নিয়ে আগ্রহী এক পাঠকের কাছে লেখকের সাথে এইটুকু চিন্তার ব্যবধান তো এক্সপেক্টেড-ই!
শিল্পীকে শিল্পীর মতোই ছেড়ে দেওয়া উচিৎ। সে হোক মাইকেল জ্যাকসন, জিম মরিসন বা অঞ্জন - তাকে খুব বেশি ভেঙ্গেচুরে খুলেমেলে ধরার চেষ্টা করলে একটু গুবলেট পাকবেই। বইটা তেমন একটা গুবলেটের পরিশীলিত রূপ।
ছোটবেলা থেকে যার গান শুনে বড় হলাম,তার জীবনী পড়ে দারুন লাগলো।অনেক গানের ইতিহাসও জানা গেলো।খুবই রোমাঞ্চকর জীবন অঞ্জন দত্তের।অনেক ছবিও আছে অঞ্জন দত্ত,তার ফ্যামিলি এবং বন্ধুরের।
এই বইটা ঠিক একটা ট্র্যাডিশনাল আত্মজীবনী নয়। অর্থাৎ, অঞ্জন দত্তের নিজের লেখনী নয় প্রথমত- লিখেছেন সাজ্জাদ হুসাইন। দ্বিতীয়তঃ ক্রোনোলোজিকাল ভাবে অঞ্জন দত্তের জীবনের প্রতিটা ধাপ এখানে বর্ণনা নেই, যেমনঃ এইখানে জন্মেছেন, এই স্কুলে পড়েছেন, এরপর এইখানে পড়েছেন- ঠিক এমনটা না। তবে হ্যাঁ, এই প্রত্যেকটা ব্যাপারই বইটায় আছে; তবে কিভাবে?
এই বইয়ের সারাংশ কি? লেখক সাজ্জাদ হুসাইনের ভাষায়-"অঞ্জন কী হতে চেয়েছিলেন? কী হলেন? আপনারা তাঁকে কীসের মর্যাদা দিলেন? ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে কতটা চিনতে পারলো? অঞ্জন কী? অঞ্জন কেন? অঞ্জন কার? "
ঢাকার লেখককে নিয়ে অঞ্জন দত্ত কলকাতা থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন দার্জিলিং। শৈশবের শহর, প্রাণের শহরে বসে অঞ্জন দত্ত শোনালেন তার জীবনের বিভিন্ন মোড়ের গল্প, কাউকে না-বলা গল্প। নিয়ে গেলেন ছোট্টবেলার সেন্ট-পলস স্কুলে, ঘুরে বেড়ালেন দার্জিলিং এর রাস্তায় রাস্তায়। প্রথম প্রেম, প্রথম চুমু, প্রথম সিগারেট, প্রথম যৌন স্বপ্ন, প্রথম চুরি, প্রথম মারপিট, দাঁতের ফাঁকে প্রথম রক্তের স্বাদ, প্রথমবার মদ, প্রথম মিথ্যে বলা- এসবই চলে এসেছে গল্পে গল্পে।
পুরো বই জুড়ে অজস্র ছবি-রঙ্গিন ছবি; অজস্র গানের রেফারেন্স; চলচ্চিত্রের রেফারেন্স।
আর অঞ্জন দত্তের অদ্ভুত জীবনদর্শনে মোড়া বইটি একবার পড়লে, বারবার ভাবনায় ডুবে যেতে বাধ্য করবে পাঠকে; ঠিক যেমনটা করেছে আমাকে।