নজরুল নিজেকে একসময় বিদ্রোহী বলে ঘোষণা করেছিলেন। বিদ্রোহের প্রথম দুই-তিন বছর প্রকৃত বিদ্রোহীর মতোই আচরণ করছিলেন। তবে ১৯২৭ সালের শুরু থেকে তিনি পরাজিত হতে থাকলেন, পরাজিত হলেন দারিদ্র্যের কাছে। দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত হয়ে তিনি রণক্লান্ত হলেন, রণে ভঙ্গ দিলেন। যার জন্য ১৯২৭ সালের মে মাসে নওরোজ পত্রিকায় তিনি চাকরি নিলেন একটি শর্ত মেনে। শর্তটি হচ্ছে, তিনি যা কিছু লিখবেন তার সবই ওই পত্রিকায় প্রকাশিত হবে। কোনো স্বাধীনচেতা লেখক বা কবি এ রকম দাসত্ব-দশা মেনে নিয়ে চাকরি সাধারণত করবেন না। কিন্তু নজরুলের মতো বিদ্রোহীও সেই বশ্যতা স্বীকার করে নিলেন। ওই বছরেরই ডিসেম্বরে নওরোজ ছেড়ে যোগ দিলেন সওগাত-এ। এবারে বেতন বেড়ে হলো দেড় শ টাকা। আর বিনিময়ে সেই একই রকম শর্ত। এভাবেই নজরুলের পরাজয়ের শুরু। সেই পরাজয় আরও বিস্তৃত হলো যখন তিনি ১৯২৯-৩০ সালে গ্রামোফোন কোম্পানির জন্য গান লিখতে শুরু করলেন। তখন গান লিখতে গিয়ে তো নিজের মনের মধ্যে কী প্রেরণা আসছে, তা তিনি চিন্তা করছেন না। অন্তরের এই ভাব থেকে আমি এই গানটি লিখব—এমনটি কি আর ঘটছে? তখন তাঁর কাছে নিছক ফরমাশ দেওয়া হতো। কবি সে সময় লিখছেন অন্যের ফরমায়েশে—এর চেয়ে বড় পরাজয় আর কী হতে পারে? তবে তাঁর লেখা অধিকাংশ গানই যে রসোত্তীর্ণ ও চমৎকার হয়েছে, তাতে দ্বিমত নেই, থাকা সম্ভবও নয়। কিন্তু আত্মিক পরাজয় স্বীকার করেই তিনি এই ক্ষেত্রে এসেছিলেন। এ কারণেই বলেছি, তিনি বিদ্রোহী ঠিকই, কিন্তু রণক্লান্ত। পরাজিতও বটেন।
Ghulam Murshid (Bengali: গোলাম মুরশিদ) is a Bangladeshi author, scholar and journalist, based in London, England.
জন্ম ১৯৪০, বরিশালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম. এ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। পি এইচ ডি— ঐতিহাসিক ডেইভিড কফের তত্ত্বাবধানে। গবেষণার বিষয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু সমাজ সংস্কার আন্দোলন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দু দশক ধরে অধ্যাপনা । মাঝখানে দু বছর কেটেছে মেলবোর্নে, শিবনারায়ণ রায়ের তত্ত্বাবধানে, পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা কর্মে। ১৯৮৪ সাল থেকে লন্ডন-প্রবাসী। | বেতার-সাংবাদিকতা এবং শিক্ষকতার অবসরে প্রধানত আঠারো শতকের বাংলা গদ্য এবং মাইকেল-জীবন নিয়ে গবেষণা। প্রধান নেশা গবেষণার— অতীতকে আবিষ্কারের । বারোটি গ্রন্থ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত বিদ্যাসাগর বক্তৃতামালার ওপর ভিত্তি করে রচিত গ্রন্থ: রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা (১৯৮১)। পিএইচ ডি. অভিসন্দর্ভের ওপর ভিত্তি করে লেখা সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও বাংলা নাটক (১৯৮৫)। মহিলাদের নিয়ে লেখা Reluctant Debutante: Response of Bengali Women to Modernization (১৯৮৩) (বাংলা অনুবাদ: সংকোচের বিহ্বলতা [১৯৮৫]) এবং রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া : নারীপ্রগতির একশো বছর (১৯৯৩)। অন্য উল্লেখযোগ্য রচনা, কালান্তরে বাংলা গদ্য (১৯৯২), যখন পলাতক (১৯৯৩) এবং বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার আদি-পর্ব (১৯৮৬)। প্রবন্ধ সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮২)। আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বক্তৃতা দান (১৯৯১-৯২)। ছদ্মনাম হাসান মুরশিদ। এই নামে একটি উপন্যাসও লিখেছেন।
' বজ্র, বিদ্যুৎ আর ফুল, এই তিনে নজরুল' - প্রেমেন্দ্র মিত্র
কাজী নজরুল ইসলামের মতো বিচিত্র জীবন ও ট্র্যাজেডি সমকালীন আর কোনো লেখকের নেই। তাঁর জীবনের সাথে মধুকবির তুলনা চলতে পারে। বহুমাত্রিক নজরুলকে কত রঙে, ঢঙে দেখা যায়। তার লেখাজোখা নেই। নজরুলের জীবনী লেখার বড়ো একটি প্রতিবন্ধকতা হলো পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব ও তাঁকে ঘিরে নানান ধরনের গল্পের অবতারণা। যেমন: ১৯২০ সালের পর নজরুল কখনো তাঁর মায়ের সাথে দেখা করেননি। এমনকি মৃত্যুর পর দেখতেও যাননি৷ কেন তার মাতৃবিমুখতা তার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিসের সাথে আকদ হওয়ার পরেও কেন বিয়ে ভেঙে গেল তা নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। কিন্তু এই বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্যের ঘাটতিতে ঘটনাটি স্পষ্ট হয়নি। তাই পরে তা ডালপালা গজিয়েছে। ফজিলাতুন্নেছার সাথে কবির প্রণয় হয়েছিল না কি তা একপাক্ষিক ছিল তাও ভালোভাবে জানা যায় না। ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে বেশির ভাগ গবেষক একে একপাক্ষিক ভালোবাসা দাবি করেছেন। নজরুল সামান্য মুখ খুললেও আজীবন মৌনব্রত পালন করেছিলেন ফজিলাতুন্নেছা। রাণু সোম যিনি পরবর্তীতে প্রতিভা বসু নামে খ্যাত হয়, উমা মৈত্রদের সঙ্গে কবির কী সম্পর্ক ছিল তাও সঠিকভাবে জানার উপায় নেই।
১৯৪২ সালে দীর্ঘদিনের হতাশা, আর্থিক চাপ, সাংসারিক দুশ্চিন্তায় কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রমীলা দেবী আগেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিলেন। স্বামী-স্ত্রী দু'জনই অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় সংসারে তীব্র অর্থসংকট দেখা দেয়। টাকার অভাবে প্রাথমিকভাবে নজরুলকে ভালো ডাক্তারও দেখানো যায়নি। তখন নজরুলের কোনো মুসলমান বন্ধু-শুভানুধ্যায়ী এগিয়ে আসেনি। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নজরুলের সমালোচক সজনীকান্ত দাশের নেতৃত্বে প্রথম তাঁকে সাহায্য করার জন্য তহবিল গঠন করা হয়। কয়েকমাস টাকা দেওয়ার পর এই কমিটি আর অর্থ সাহায্য করেনি। নজরুলের সুহৃদ জুলফিকার হায়দার ও শাশুড়ি গিরিবালা দেবী খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, একজন বিখ্যাত মুসলমান লেখক সজনীকান্তদের কাছে বলেছেন ফাণ্ডের টাকায় নজরুলের বাড়িতে মণ্ডা-মিঠাই খাওয়া হয়। তখন রাগ করে সজনীকান্তরা এই ফাণ্ড বন্ধ করে দেন। উল্লেখ্য, নজরুল ফাণ্ড বন্ধ করতে কুৎসারটনাকারী হলেন কবি জসীম উদদীন, যাকে নজরুল ইসলাম অত্যাধিক পছন্দ করতেন।
গোলাম মুরশিদের বইটি বেশ খেটে লেখা। নজরুলকে নিয়ে তথ্যের ভাণ্ডার বলতে পারেন। তবু আমার ভালো লাগেনি। যে কোনো ঘটনাকে অনেকগুলো দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। কোনভাবে দেখবেন তা একান্তই ব্যক্তির ইচ্ছে। এখানেই গোলাম মুরশিদের ক্ষুদ্রতা ও একচোখামির বহিঃপ্রকাশ। উদাহরণ দিই - নজরুলের বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানা যায়, নজরুল স্কুল থেকেই ঘোরতর ইংরেজবিদ্বেষী ছিলেন। বাঙালি পল্টনে যোগ দেওয়ার অন্যতম একটি কারণ ছিল যুদ্ধ শিখে এসে ইংরেজ উৎখাত। বাস্তবতার নিরিখে নজরুলের এই আকাঙ্ক্ষা রোমান্টিসিজমের বেশি কিছু নয়। কিন্তু এমন ব্যক্তিকে যখন গোলাম মুরশিদ লেখেন নজরুল পল্টন থেকে ফিরে এসেও প্রথমদিকে রাজভক্ত ছিলেন তা অত্যন্ত হাস্যকর শোনায়। এই ধরনের দ্বান্দ্বিকতায় পূর্ণ ব্যাখা-বিশ্লেষণ গোলাম মুরশিদ আরও করেছেন। তাতেই মেজাজে চটে গেছে।
ভাবছিলাম ভদ্রলোকের লেখা, ভাষা হয়ত কঠিন হবে। তাই কেনার পর অনেকদিন ফেলে রাখছিলাম। কিন্তু পড়তে গিয়ে দেখলাম তথ্য থাকলেও 'তথ্যের কচকচানি' বিষয়টা নাই। পড়তে ভালোই লাগে। যুক্তির সাপেক্ষে নজরুলের বাস্তব রূপ দেখাতে চেয়েছেন লেখক। তবে বলা ভালো যারা নজরুলকে অনেক উচু আসলে বসিয়ে রেখেছেন তাদের ভালো নাও লাগতে পারে। গোলাম মুরশিদ কোথাও নজরুলকে খাটো করেননি কিন্তু নজরুলকে একজন প্রতিভাবান সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখিয়েছেন। কিন্তু একটা আশ্চর্য বিষয় লক্ষ্য করি। এতো ঘেঁটেঘুঁটেও নজরুলের জীবনের অনেক জায়গার কোন ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় না। মানুষটা আসলেই এতো বিচিত্র যে গোলাম মুরশিদও জায়গায় জায়গায় হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
দারুণ! জাতীয় কবি হওয়া স্বত্ত্বেও নজরুল সম্পর্কে আমার জ্ঞান যে পাঠ্যপুস্তকে পড়া কিছু গল্প-কবিতা-প্রবন্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো - এটা অস্বীকার করব না। এ বই সেই অতৃপ্তি অনেকটাই ঘোচালো। বইয়ের ভাষা বেশ প্রাঞ্জল। তবে নজরুলের জীবনের শেষ অংশ খুবই করুণ। পড়তে খারাপই লেগেছে।
অনেক দিনের তৃষ্ণা ছিল কবি নজরুলের জীবনী পড়ার। দারুনভাবে তৃষ্ণা মিটিলো এ বইটি পড়ে। লেখককে কৃতিত্ব দিতে হয় এই অসাধারন কর্মটির জন্য। বিশেষ করে কবির অসুস্থ-পরবর্তী সময়টা সম্বন্ধে জানার কৌতুহল ছিল প্রবল। বেশ মুগ্ধতা নিয়েই শেষ করেছি। কবির দুর্দশাগ্রস্ত অতিবাহিত জীবনের সময়টা যেন মনের পর্দায় ভেসে উঠছিলো আর একরাশ হতাশা জেগে উঠছিলো। পূর্ববর্তী জীবনীকারদের বইয়ের বিভিন্ন ভ্রান্তি ও রটনা লেখক তুলে ধরেছেন এবং বিশ্লেষণ করে যুক্তিখন্ডন করেছেন।
বাঙালি মাত্রই ছোটবেলা থেকেই কাজী নজরুল ইসলামের নাম শুনে বড় হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য নজরুলের জীবনের কিছুই জানা হয় নি। “বিদ্রোহী রণক্লান্ত : নজরুল-জীবনী” বইটা পড়ে মনে হল নজরুল সম্পর্কে যেন শূন্য থেকে জানলাম। গোলাম মুরশিদ লিখেছেন এই বই কিংবদন্তির নজরুলকে নিয়ে নয় এটা রক্ত মাংসের নজরুলকে নিয়ে। কিন্তু নজরুল নিজেই যখন সবার চেয়ে আলাদা, তখন তাঁর জীবনীও যে অসাধারন হবে এটাইতো স্বাভাবিক। এই বইয়ে নজরুলকে দেখা যায় সৈনিক, কবি, প্রেমিক, স্বাধীনচেতা, খাম-খেয়ালি, পুত্র হারা বাবা, স্ত্রী সুস্থতা কামনায় স্বামী কিংবা মানসিক শান্তির পিছনে ছোটা অসহায় একজন এবং সবশেষে অসুস্থ মানুষ হিসাবে। পাঁচ শতাধিক পৃষ্ঠার এই বইয়ের চারশ পৃষ্ঠা নজরুলের চল্লিশ বছর নিয়ে। পরের একশ পৃষ্ঠা তাঁর দীর্ঘ ৩০ বছরের অসুস্থ জীবন নিয়ে। নজরুল দীর্ঘ সময় অসুস্থ ছিলেন, এটা সবাই জানে। কিন্তু তাঁর অসুস্থতার সময়টা যে তাঁর নিজের এবং পরিবারের বাকি সদ্যসদের জন্য কতটা কষ্টের ছিল এই বই না পড়লে হয়তো কোনদিন জানা হতো না। মনের অজান্তেই তখন সেই দুরন্ত বিদ্রোহী কবির জন্য খারাপ লাগে।