পল্লীবাসী,স্বাভাবিক কারণে লোক-সংস্কৃতির প্রতি একটা অনুরাগ আবাল্যের, সময় সুযোগ পেলে নিজ গ্রামের আশেপাশে, ক্রমে জেলার সর্বত্র পল্লীতে পল্লীতে ঘুরে ঘুরে লোক-সংগীত শুনেছি লৌকিক দেবতার পূজা পার্বণ দেখেছি ; পরে অনুসন্ধানের কাজও করেছি ঐ বিষয়ে ......।
এই অসামান্য বইয়ের কি আদৌ কোনো রিভিউ প্রয়োজন? বাংলার লৌকিক দেবদেবীরা দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত হয়েছেন। অ্যাকাডেমিয়া তাঁদের মধ্যে নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ছাড়া কিছুই দেখেনি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলোর পোষা বুদ্ধিজীবীদের কাছে তাঁরা স্রেফ কুসংস্কার হিসেবেই বিবেচিত হয়েছেন। তারপর পরিবর্তন এসেছে। আর অতি সম্প্রতি এসেছে 'দেও'— তমোঘ্ন নস্করের লেখা তেইশটি অলৌকিক ও অতিলৌকিক কাহিনির সংকলন, যার অধিকাংশের কেন্দ্রে আছেন এই বিস্মৃতপ্রায় দেবদেবীরা। তাঁদের মাধ্যমে আজও টিকে থাকা পুরোনো প্রথা, সমাজের বাঁকবদল, আর বিশ্বাসের নানা রঙ ও রূপের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। ফলে নতুন করে জরুরি হয়ে উঠেছে এই বইটি পড়া। একটা সময় তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-এর লেখায় তারানাথ তান্ত্রিকের নানা কাহিনিতে ছাড়া বাংলার লৌকিক বিশ্বাস নিয়ে কেউ লিখতেন না। বিদেশের মাটিতে শিকড়সন্ধানী সেই যুগে আলোচ্য বইটি ছাড়া আর কোনো সূত্রও ছিল না যা থেকে এই বাংলার জলে, মাটিতে, সন্ধ্যাপ্রদীপড়ে আর বটের ছায়ায় বেঁচে থাকা দেবদেবীদের কথা জানা যায়। নতুন করে তাঁদের তথা প্রকৃতিমাতৃকাকে নিয়ে জানার উৎসাহ দেখা দিয়েছে এখন। তবু, সেই পাঠ শুরু করতে হলে এই বইটিই সহজপাঠ তথা কিশলয়। অবশ্যই পড়ুন!
আনন্দবাজারে প্রকাশিত বই সম্পর্কিত শংসাপত্রে লেখা আছে "এই কাজ যখন তিনি শুরু করেন, তখন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁকে বলেছিলেন যে, আর দেরি হলে এরকম অনেক মূর্তিই ধ্বংস হয়ে যেত।"
বইয়ের প্রথম প্রকাশ 1966, আমি যে সংস্করণ থেকে পড়লাম সেটার প্রকাশকাল 1978, এখন চলছে 2021।
বাংলার লৌকিক দেবতা নিয়ে সাম্প্রতিককালের গবেষকদের কাছেও এই বইটাই এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে শেষ উত্তর। আশুতোষ ভট্টাচার্যের প্রামাণ্য বিপুল গবেষণা এই বই প্রকাশের আগেকার। সুনীতি চাটুজ্যে, বিনয় ঘোষ প্রমুখ তাঁর সমসাময়িক।
যেখানে কিছু প্রথার প্রবর্তনকাল হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর সময়কার বলে চিহ্নিত করছেন লেখক, কিছু প্রথা গ্রন্থ প্রনয়ণকালেই 'ইতিমধ্যে প্রায় লুপ্ত' বলে উল্লিখিত হচ্ছে, সেখানে এখন আর সে ইতিহাসের কতটুকু ছিটেফোঁটা পড়ে আছে, ভেবে কষ্ট হচ্ছিল পড়তে পড়তে।
লেখক সমাজতাত্ত্বিকের দৃষ্টি দিয়ে বিচার করলেও সে সময়ে 'মিথ' নিয়ে গবেষণাও যেহেতু ছিল অপ্রতুল, তাই তত্ত্বের পরিভাষিক অভিনিবেশ ততটা সম্ভবপর হয়নি।
অসামান্য ঐতিহাসিক গুরুত্বের বই। এ বিষয়ের আরো কিছু পেলে ভবিষ্যতেও পড়বো।
বাংলার লৌকিক দেবতাদের নিয়ে এত তথ্যসমৃদ্ধ ও সুন্দরভাবে গোছানো বই আর দ্বিতীয়টি নেই। প্রাচীন বাংলার মানুষের জীবন, জীবিকা, ধর্মবিশ্বাস এবং তার সাথে জড়িয়ে থাকা লৌকিক দেবতাদের আখ্যানই এই বইয়ের বিষয়বস্তু। বইটি পড়লেই এর পেছনে লেখকের কঠোর ধৈর্য্য, গবেষণা ও পরিশ্রমের পরিচয় পাওয়া যায়।