কোথায় যেন পড়েছিলাম, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো ‘ভালো বই কাকে বলে?’ আর তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘যে বই পাঠককে ভাবায়, সেটাই ভালো বই’। রাজীব হাসান লিখতেন ফেসবুকে, ভাবাতেন আমার মতো পাঠকদের। না, তাই বলে আমি ফেসবুককে ভালো বই বলবো না! সাংবাদিকতার বাইরে রাজীব হাসানের হৃদয়ছোঁয়া লেখাগুলো পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ফেসবুক কর্তৃপক্ষ অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারে।
‘আমাদের শহরে বাঘ এসেছিলো’ নামটা প্রথম শুনে আমার ভাবনায় এসেছিলো হয়তো কিশোর উপন্যাস এটি। এ প্রসঙ্গে আলোচনায় একজন বলেছিলো এ বইয়ের নামটা যেমন চটকদার, বিজ্ঞাপনও তেমন চটকদার মনে হয়েছে, দেখবেন পড়ার পর আশাভঙ্গ হবে! আশা পূর্ণ বা ভঙ্গ হয়েছে কিনা পরে বলছি তবে পাঠানুভূতিটা জানাই প্রথমে।
আমি কখনো রংপুর যাইনি। বইটি পড়তে শুরু করার পর কল্পনা করে নিচ্ছিলাম রংপুর শহরটা। গল্পের ওঠার সাথে সাথে আমার কল্পিত রংপুরের সীমা-পরিসীমাও বাড়তে থাকে। রেলওয়ে স্টেশন, পুলিশ স্টেশন আর ফিরে যাচ্ছিলাম নব্বইয়ের দশকে। শাওন, রনিদের মতো আমারও শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো মিলাচ্ছিলাম বারবার, যেন হারিয়ে যাওয়া সময় চোখের সামনে ভাসছে! যেন টেলিভিশনে কোন প্রোগ্রাম দেখার জন্য এ-ঘরের ছেলে ও-ঘরের জানালায় উঁকি মারছে, আর উথলে পড়ছে জমানো হিংসে-অহংকারের জোয়ার! গল্পের সাথে সাথে পাঠককে কল্পনার সাগরে ভাসাতে পারার মুন্সিয়ানাটা লেখক দারুণভাবে দেখিয়েছেন।
পাঠক হিসেবে এ উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক মনে হয়েছে চরিত্রগুলোর গঠন আর বর্ণনা। উপন্যাসের সাথে সাথে একে একে চরিত্রগুলোর সাথে পাঠকের পরিচয় হয়, কিন্তু অপ্রাসঙ্গিকভাবে কাউকে আগে বা পরে টেনে আনা হয়েছে বলে মনে হয়নি। একে একে শাওন-রনি আর তাদের পরিবার, বৃদ্ধা বু, চিত্রা, রাশেদুল, ফুলবানু, শের খান, আজিজ স্যার, হায়দার কিংবা পুলিশ অফিসাররা, সবাই ধীরে ধীরে গল্পের সাথে এসেছে এবং লেখক চমৎকারভাবে ছোট্ট কোন প্রাসঙ্গিক গল্প জুড়ে দিয়ে অল্পতেই বর্ণনা করেছেন চরিত্রের সম্পর্কে।
কাহিনী বর্ণনায় চমকপ্রদ লেগেছে বাঘের উপস্থিতি। পাঠকের কাছে কোন লুকোচুরি না করেই বাঘের বর্ণনা দিয়েছে, কিন্তু কোথায় যেন একটা রহস্য তৈরী হচ্ছিলো, যা শেষ পর্যায়ে গিয়ে উন্মোচিত হয়। আমি বলবো লেখক হিসেবে রাজীব হাসান সবচেয়ে বড় মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন গল্পের ধারা বর্ণনায় আর তার পাশাপাশি চরিত্রগুলোর আন্তর্জাল তৈরী করায়। কোন চরিত্র হুট করে এসে অমিমাংসিতভাবে গল্প থেকে হারিয়ে যায়নি। লেখক সম্ভবত বেশ সময় নিয়ে দক্ষতার সাথে চরিত্রগুলো নিয়ে ভেবে লিখেছেন, যা মুগ্ধ করেছে আমাকে।
ইদানিংকার অনেক লেখকের বই পড়তে গেলে তিনটি ব্যাপার চোখে পড়ে। প্রথমত, লেখা দ্রুত শেষ করার প্রবণতা থাকে। তাই কাহিনী কাঁট-ছাঁট করে দ্রুত উপন্যাস শেষ করে দেয়। দ্বিতীয়ত, হুটহাট ইংরেজী শব্দের ব্যবহার। আর তৃতীয়ত, সচেতন কিংবা অসচেতনভাবেই হুমায়ূন আহমেদের ভঙ্গিমায় গল্প বলা। এটি দোষের কিছু না তবে প্রসঙ্গক্রমেই বলছি, আমাদের বেশিরভাগেরই গল্প-উপন্যাস ভাল লাগার শুরু হুমায়ূন আহমেদের লেখা দিয়ে। তাই, বেশিরভাগ তরুণ লেখকের লেখায় হুমায়ূন আহমেদের ছায়া থেকে যায়। এ উপন্যাসে এগুলোর কোনটাই চোখে পড়েনি। দ্রুত কাহিনী শেষ করে দেয়া বা দ্রুততার সাথে বর্ণনা শেষ করার লেশমাত্র ছিলো না। আর, ইংরেজী শব্দ ঢুকিয়ে দেয়ার কোন প্রবণতা ছিলো না। 'ঝরঝরে বাংলাতে' লেখা যাকে বলে, তা পেয়েছি এখানে। আরেকটি লক্ষ্যণীয় দিক ছিলো আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার। গল্পের প্রয়োজন উপেক্ষা করে প্রমিত বাংলা না লিখে চরিত্রগুলোকে দিয়ে তাদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলানোয় লেখককে ফার্স্ট ক্লাস মার্ক দিতেই হবে।
উপন্যাসের কোথাও কৃত্রিমতার ছিটেফোঁটাও ছিলো বলে মনে হয়নি। গল্প আর চরিত্রগুলো সব যেন আমাদের আশেপাশেই থাকা বিভিন্ন মানুষেরই সম্মিলন। যে বাঘ নিয়ে এ উপন্যাস, সে বাঘও দৃশ্যমান পুরো উপন্যাসজুড়ে। তবু কিভাবে গল্পটা পাঠকদের শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে? পড়তে শুরু করলে যে কেউই বুঝতে পারবেন। গল্পের মতো বাস্তবেও গুজবের আড়ালে সত্যিকারের বাঘ এসে ঘুরে যায়, আমরা অনেকেই টের পাই না, লেখক ব্যাপারটা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে।
এ উপন্যাসটি নির্দিষ্ট কোন নায়ক-নায়িকা ঘিরে ডালাপালা নিয়ে বেড়ে উঠেনি। পুরো উপন্যাস পড়েও নির্দিষ্ট কাউকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে মনে হয়নি। পুরোটা জুড়ে ছিলো কখনো মায়া , কখনো কষ্ট, কখনো আবার হিংস্রতাও। বু নামে বৃদ্ধার প্রতি ভালবাসা জন্মেছে, শাওন-রনিকে নিজের হারানো কৈশোরের কেউ মনে হয়েছে, ফুলবানু-রাশেদুলকে আশপাশে থাকা কেউ মনে হয়েছে। উপন্যাসে সংসারের টানাপোড়েন যেমন এসেছে, বিত্তশালীর ক্ষমতা-অনৈতিকতাও এসেছে। অপরাধ যেমন এসেছে, নিরপরাধের ভোগান্তিও এসেছে।
এক কথায় বলতে বললে আমি বলবো ‘আমাদের শহরে বাঘ এসেছিলো’ একটি ‘কমপ্লিট নভেল’।
সবচেয়ে বড় কথা উপন্যাসে কোন কিছু্ই আরোপিত মনে হয়নি। লেখার পরিপক্কতার ছাপ পুরো উপন্যাসজুড়েই ছিলো। হয়তো আবেগাক্রান্ত কথা মনে হবে, তবে আমার কেন যেন মনে হচ্ছে ঠিক এমন একটা উপন্যাস লেখার জন্যই একজন লেখক সারাজীবন অপেক্ষা করে।
প্রথমেই উল্লেখ করেছিলাম আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কথাটি, ‘যে বই পাঠককে ভাবায়, সেটাই ভালো বই।’ রাজীব হাসানের উপন্যাসটি শুধু ভাবায়নি, স্মৃতির সাগরে-ও ডুবিয়ে দিয়েছে। ফিরিয়ে নিয়ে গেছে নব্বইয়ের দশকে। মোটকথা, অনেকদিন পর এমন একটা নতুন উপন্যাস পড়লাম যা পাঠক হিসেবে আমার আশা পূর্ণ করে আরো বেশি তৃপ্তি দিয়েছে। এখন পর্যন্ত আমার পড়া এ বছরের সেরা বই ‘আমাদের শহরে বাঘ এসেছিলো’।
বনের পশু যতটা না হিংস্র তার চেয়ে বহুগুণ হিংস্র মানুষরূপী পশু। সমাজের পরতে পরতে থাকা বাঘের মুখোশ উন্মোচন করেছেন লেখক। কেউ ক্ষমতালোভী বাঘ, কেউ টাকালোভী, কেউবা নারীমাংসলোভী, কেউ আবার দারিদ্র নামের বাঘের কামড়ে পর্যুদস্ত। এ সবই লেখক আস্তে আস্তে সুতো ছেঁড়ে আবার গুটিয়ে এনেছেন। শেষমেশ আমরা সবাই যে 'সিস্টেম' এ বাঁধা, সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন।
আমার কাছে বইয়ের সবচেয়ে ভালো দিক ছিল, লেখক বাস্তবতার আলোকেই ইতি টেনেছেন। সমাজের এ চিত্রগুলো আসলে ছুঁ মন্তর ছুঁ করে গায়েব করে দেয়া যেত না। আর, খারাপ লেখেছে, বসু বাবুর ঘটনা টা। একটা মানুষ দিনের পর দিন গায়েব অথচ তার পরিবারের কেউ একটু থানায় গেল না, খবর নিল না কারো কাছে শুধু অপেক্ষাই করে যাচ্ছে- এটা ঠিক যুতসই মনে হয়নি। রংপুর শহরের এমন চিত্র দেখানো হল যেখানে সবাই সবাইকে চেনে সেখানে একজন গায়েব হয়ে গেল কেউ একবার একটু চিন্তাও করল না, এ মানুষটা কই?-এরকমটা বেখাপ্পা মনে হয়েছে।
ভালো লেগেছে বইটি। লেখনী সুন্দর কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় একটু ছাড়া ছাড়া ভাব ছিল । রংপুর শহরের সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। কখনো রংপুর যাই নি তবুও মনে হচ্ছিল খুবই চেনা পরিচিত একটা শহর। বেশিরভাগ চরিত্রই সুন্দর করে সাজিয়েছেন লেখক। চরিত্রগুলিকেও খুব চেনা মনে হবে , মনে হবে আমাদের চারপাশেই তো এমন মানুষ আছে। বাঘের কথা উপন্যাসের নামেই আছে। গল্পে সেই বাঘের ও দেখা মিলবে। বইটি পড়লে বোঝা যায় যে বাস্তবেও কিন্তু আমাদের চোখ আড়াল করে বাঘ এসে ঘুরে যায়। বইটি আপনার আবেগে নাড়া দিতে সক্ষম হবে। কখনো কারো পরিণতিতে আপনার কষ্ট লাগবে , কখনো মায়া লাগবে বা কখনো আনন্দ অনুভব করবেন। পড়ার পর বইটি বেশ আন্দাররেটেড মনে হলো।
নব্বই দশকের প্রেক্ষাপটে রংপুর শহরকে ঘিরে গড়ে উঠা একটা সাধারণ গল্প।তবে গল্পটা সাধারণ হলেও এই গল্পের অসাধারণ বিষয় হলো গল্পটা পড়ার সময় আপনি একটা অদ্ভুত মায়ায় পড়ে যাবেন।রংপুর শহরের মায়ায় পড়বেন,রনি,শাওন,বু,ফুলবানুর মায়ায় পড়বেন।রংপুর শহরটাকে আপনার নিজের শহর বলে মনে হবে।গল্পটা পড়ার সময় বারবারই আমার এই শহরটাকে নিজের শহর বলে মনে হয়েছে।মনেহয়েছে,এই শহরের পথঘাট,বাড়ি,মানুষগুলো আমার চেনা।
"আমাদের শহরে বাঘ এসেছিলো" আমাদের সমাজে বাস করা কিছু মুখোশধারী বাঘকে চিনতে শেখায়।
এই গল্পের অদ্ভুত মায়ায় মিশে যাওয়ার জন্য হলেও বইটা সবার পড়া উচিৎ বলে মনে করি।
প্রথমে মনে হয়েছিল এটা বোধহয় ক্রিকেট খেলা নিয়ে কোনো উপন্যাস। ফ্ল্যাপের কিছু অংশ পড়ে ভৌতিক গল্পের একটা আমেজ পাচ্ছিলাম। কিন্তু আদতে এটি একটি সামাজিক উপন্যাস। সমাজে বিদ্যমান কিছু সমস্যা আর সেগুলোর সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বাঘের সাথে রূপায়ণের মাধ্যমে একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন লেখক।
“এই গল্প হরর হতে পারত। পিশাচকাহিনী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল। রহস্য উপন্যাসের দিকেও মোড় নিতে পারত। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে পাঠক আবিষ্কার করবেন, এই গল্প পড়ে তাঁর ভয় জাগছে না; জাগছে মায়া!”