আমলা আসলে কে বা কী? সে কি ঈশ্বরপ্রতিম, বা দেবদূত, প্রায় যেন বিধাতপুরুষ? নাকি সে নেপথ্যে মৃত সৈনিক, অসহায় দাস? পুংলিঙ্গ, না স্ত্রীলিঙ্গ, না ক্লীবলিঙ্গ? সে কি গৌরবে বাঁচে, না অগৌরবে মরে? তার স্বাধীনতার সীমানা কোথায়, অস্তিত্বের সীমাবদ্ধতা কী?
বাংলা ও ভারতবর্ষের কয়েক শত বৎসরের ইতিহাস ছেঁচে এই বইয়ে তুলে আনা হয়েছে প্রশাসনিক ক্ষমতার আশ্চর্য সব গাঢ়, নির্মোহ, কিন্তু অন্তরঙ্গ বিশ্লেষণ।
পশ্চিমবঙ্গের আলোচিত-সমালোচিত আইএএস আলাপন ব্যানার্জির বইটি বড়ো আশা নিয়ে ধরেছিলাম। কিন্তু নিরাশ হয়েছি। তিনি আমলাতন্ত্র এবং আমলাদের লেখা বই-পুস্তক ভালোভাবেই পড়েছেন। তবে, নিজের কর্মজীবন নিয়ে খোলাসা করে লেখেননি।
"উদ্বাস্তু আন্দোলন বামপন্থাকে শক্ত করে, অন্নহীনাকে অন্নপূর্ণা করে না।" (আজকের রাজকন্যা ও রাজকর্মীদের অগৌরবের মরণ, পৃ: ৯৫) "রাজদ্বারে তরুণ দত্তর দ্বিধাহীন স্পর্ধা ছিল, শ্মশানে তাঁকে করুণ দেখাল।" (প্রশাসকের মৃত্যু, পৃ: ৮৬)
এই বই পড়ে এইজন্য আশ্চর্য লাগে না, যে ভদ্রলোকের লেখার হাত এত ভালো (আই. এ. এস হিসেবে সেটাই হয়তো স্বাভাবিক), বরং আশ্চর্য লাগে এটা দেখে যে, ক্ষমতার অলিন্দে তাঁর আনাগোনা যতটা স্বচ্ছন্দ, ঠিক ততটাই তিনি অন্তরঙ্গ অনুভবের অলিন্দেও। তাই আকবর বাদশার সাথে হরিপদ কেরানী অবাধে যাতায়াত করেন তাঁর প্রবন্ধে।
নিন্দুকরা বলে থাকেন, ক্ষমতার মনন ও মননের ক্ষমতা নাকি বিপ্রতীপেই অবস্থানকারী। কিন্তু এই বইয়ে ফিলিপ মেসনের 'দি মেন হু রুলড ইন্ডিয়া', থেকে প্রাণকৃষ্ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেরানী-চরিত', ইন্দিরা চৌধুরীর 'দ্য ফ্রেইল হিরো অ্যান্ড ভিরাইল হিস্ট্রি' থেকে সতীনাথ ভাদুরীর 'ঢোঁড়াই চরিতমানস'- মেধাচারী লেখকের পাঠ্য তালিকা নিতান্ত কম দেখি না। এককথায়, ভাষার নির্মেদ ব্যবহারে, যুক্তির শানিত বিন্যাসে ও মননের সুচারু অভিঘাতে 'আমলার মন' সাম্প্রতিক কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ সংকলন হওয়ার দাবি রাখে।