হায়দারাবাদ হারিয়ে যাওয়া কোন অতীত নয়, মুছে ফেলা কোন দেয়ালের লিখন নয়, ফেলে দেয়া কোন পুরানো ক্যালেন্ডারের পাতা নয়। হায়দারাবাদ আমাদের জন্য জীবন্ত ইস্তেহার, ভবিষ্যতের দিক-নির্দেশনা, পথচলার অৰ্দ্ধশতাব্দী পরে হায়দারাবাদের ইতিহাস আমাদের সামনে ফিরে ফিরে আসছে। কবি রবীন্দ্রনাথ এই উপমহাদেশের শক হন, পাঠান, মোগলকে এক দেহে লীন করতে চেয়েছিলেন। পণ্ডিত নেহেরু স্বপ্ন দেখতেন প্রশান্ত মহাসাগর থেকে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত সমস্ত এলাকা একদিন ভারতের একচ্ছত্র দখলে চলে আসবে। তখন স্বাধীন রাষ্ট্র সত্তা নিয়ে কোন সংখ্যালঘু জাতি টিকে থাকবে না। গান্ধী ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতিকে অভিন্ন বলে চালাতে চেয়েছিলেন। রবার্ট বায়রণ তার ‘দি ষ্ট্রেটসম্যান অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে লিখেছেন, “বাল গঙ্গাধর তিলক বলেছেন, এই উপমহাদেশের মুসলমান অধিবাসীরা হল বিদেশী দখলদার, কাজেই তাদের শারীরিকভাবেই নির্মুল করতে হবে” । কংগ্রেস সভাপতি আচাৰ্য্য কৃপালনী বলেছিলেন-“কংগ্রেস অথবা সমগ্র ভারতীয় জাতি কখনই অখন্ড ভারতের দাবী পরিত্যাগ করবে না।”
প্রথমেই বইটিতে যেটা সবচেয়ে বেশি বাজে লেগেছে সেটা হলো হায়দারাবাদের ইতিহাস টানতে গিয়ে লেখক পাকিস্তানকে একদম দুধে ধোয়া তুলসি পাতা বানিয়ে দিয়েছেন অন্যদিকে ভারতকে বানিয়েছেন পুরোদস্তুর ভিলেন। যদিও হায়দারাবাদের ইতিহাসে টানলে ভারতের সমালোচনা অনেক বিশেষজ্ঞই করবে, কিন্তু কেনো জানি মনে হলো লেখক সম্পূর্ণভাবে একপক্ষ সমর্থন করেছেন। দেশ বিভাগের পরবর্তী সময়ে হায়দারাবাদ স্বাধীন একটি রাজ্য ছিলো, বর্তমান সময়ের মতো তারা ভারতের অংশ ছিলোনা। কিন্তু ভারত প্রোপাগান্ডা এবং সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে হায়দারাবাদ কিভাবে দখলে নিলো সেটারই বর্ণনা বইটিতে পাওয়া যাবে। হায়দারাবাদ আক্রমণের সময় তাদের দেখানো কারন ছিলো সেখানের হিন্দুরা মুসলিম নিজামের হাতে অত্যাচারিত হচ্ছে। লেখক ভারতের আগ্রাসী মনোভাব বইটিতে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন, এবং পাকিস্তান বিভক্তিকরণে ভারতের ভূমিকা কতোটা ছিলো সেটাও টেনে এনেছেন। বইটিকে হয়তো ভালো বই বলতে পারতাম, তবে লেখকের অতিরিক্ত ভারত বিদ্বেষ এবং পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন বইটিকে নিরপেক্ষ রাখতে পারেনি। বইটিতে পাকিস্তানের শাসকদের যে সকল দোষ ছিলো দেশভাগের পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমান এবং হিন্দুদের উপরে অত্যাচার এবং শোষণ, সেটা উপেক্ষা করে তিনি পুরোটাকে ভারতের চাল বলে চালিয়ে দিয়েছেন। এই জিনিসটা খুব বাজে লেগেছে। কিন্তু বইটিতে কিছু কথা রয়েছে যেগুলো বিচক্ষণ ব্যক্তি মাত্রে অনুধাবন করতে পারবেন, একই সাথে আমার মতে সেগুলো নিয়ে বড় পরিসরে লেখালেখি প্রয়োজন।
বইটির প্রথম প্রকাশ ২০০১ সালে, অথচ বিষয়বস্তু এখনো প্রচন্ড প্রাসঙ্গিক। ইতিহাস জানতে আগ্রহী পাঠক খোঁজ পাবে হারানো সেই স্বাধীন সার্বভৌম হায়দারাবাদের—যার ছিল নিজস্ব মুদ্রাব্যবস্থা, ভাষা, বিচার ব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, সেনাবাহিনী, হাইকোর্ট, পতাকা, জাতীয় সংগীত। একসময় আয়তনে স্বাধীন হায়দারাবাদ ছিল ফ্রান্সের সমান। সেই বিশাল হায়দারাবাদ আজ অন্ধ প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু প্রভৃতি রাজ্যের মধ্যে টুকরো টুকরো হয়ে আছে।
একটি স্বাধীন মুসলিম ভূখন্ডকে জোরজবরদস্তিমূলক দখল করে, সেই ভূমির মূল মালিক মুসলমানদেরকেই 'বহিরাগত' ট্যাগ লাগিয়ে 'সৌদি আরব চলে যা' আচরণ করেই ক্ষান্ত হয় নি, ভয়াল আগ্রাসী ভারত যাকে গিলে নিয়েছে ভয়ংকরতম তান্ডবলীলা, গনহত্যা, মুসলিম নিধন, মুসলিম নারীদের ইজ্জত-সম্ভ্রম লুট আর তার কুকৌশলী হিংস্র থাবায়।
ষাট পৃষ্ঠার ছোট এই অবশ্যপাঠ্য বইটি যেনো ২৩ বছর পরেও তুলে ধরছে কোনো সমসাময়িক বিষয়ই, দিচ্ছে কোনো অপ্রত্যাশিত ইঙ্গিত, শিক্ষা নিতে উদ্বুদ্ধ করছে একসময়ের স্বাধীন হায়দারাবাদের পরাধীনতার পরিনতির ইতিহাস থেকে যাকে দখল করা হয়েছিল দুই দিক থেকে সেনা অভিজান চালিয়ে।
এখন পর্যন্ত পড়া এবছরের সেরা আবর্জনা। হায়দারাবাদের পতনের ইতিহাস পড়বো এই আশায় হাতে তুলে নিয়েছিলাম। লেখক ইনিয়ে বিনিয়ে পাকিস্তান কত ভালো ছিল, বাংলাদেশ কত খারাপ, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়াটা ব্রাহ্মণবাদী ভারতের একটি চাল, এসব ঢুকিয়ে দিয়েছেন লাইনে লাইনে সচেতন ভাবেই। স্বাধীন বাংলাদেশে এরকম বই প্রকাশ করাটা রীতিমত দেশদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়া উচিৎ। অথচ এই বই রকমারিতে বিক্রি হয়!