এ বইটিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে তাঁর স্ত্রী সঙ্গীতশিল্পী নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দু'টি স্মৃতিচারণ, আর এখানে-ওখানে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা কয়েকটি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। দু'টি তারা রেখে দিলাম দুর্বল সম্পাদনার জন্যে।
কিন্তু যা আছে, তা কেবল ভানুর কৌতুকমুগ্ধ দর্শক/শ্রোতার কাছে শিল্পী ও মানুষ ভানুকে নতুন আলোয় চেনানোর জন্যে যথেষ্ট। ভানু কৈশোরে বিক্রমপুরের মৃতুঞ্জয়ী ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের অনুসারী ছিলেন, আমৃত্যু তাঁর মাঝে সে সংকল্প অটুট ছিলো। সিনেমায় ঠাঁই করে নিয়েছেন কষ্টেসৃষ্টে, কঠোর চর্চা দিয়ে নিজের স্থান করে নিয়েছেন সেখানে, তারপর কারিগরদের পক্ষ নিয়ে প্রযোজকদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে পাঁচ বছরের জন্যে কালোতালিকাভুক্ত হয়ে মঞ্চনাটক আর যাত্রাপালায় হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে জীবিকানির্বাহ ও অভিনয়চর্চা করেছেন, আপোসের কাছে একে একে সহযোদ্ধা-বন্ধুদের হারিয়েছেন, একবারও দমে যাননি, নিজের পথে অটল ছিলেন। ভানু কখনও নিজের পরিচয় আর ভিত্তিগুণ নিয়ে সংশয় বা হীনমন্যতায় ভোগেননি, বরং গর্বিত ও সোচ্চার ছিলেন। এমন মানুষকে পরাজিত করতে গোটা বিশ্বসংসার যেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ষড়যন্ত্র করতে আসে, তাই তাঁর স্ত্রীর বিষণ্ন স্মৃতিচারণে ঠকে যাওয়ার ছোটো-বড় গল্প পড়ে মনের মাঝে রাগ বাড়ে। প্রবলপক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার পরিণতি অপুরস্কৃত রয়ে যাওয়া, আর প্রবলপক্ষের বগলতলায় গিয়ে ঢোকা বন্ধু-সহকর্মীদের প্রতারণার চাপে কাহিল হওয়া, ভানু তাঁর সংগ্রামে অটল থেকে সে পরিণতি স্বাস্থ্য ও জীবনের বিনিময়ে কিনেছেন। এমন মানুষ দেখে দেখে বড় হয়েছি বলে বইটি পড়ে ভানুর জন্যে ভালোবাসা ত্রিগুণিত হলো শুধু।
খুব ছোটবেলায় 'মাসিমা, মালপোয়া খামু' এই ডায়ালগ দিয়ে চেনা এই অভিনেতার অভিনীত কতিপয় চলচ্চিত্র আমি দেখেছি। তন্মধ্যে, রুমা গুহঠাকুরতার সাথে 'আশিতে আসিও না' ছবির একটি গান এত মজার লেগেছিলো যে আমি এখনো প্রায়ই গানটি দেখি। এছাড়াও, ভ্রান্তিবিলাস ছবিতে চাকরের ভূমিকায় অভিনয় এখনো মনে আছে। বেশ কিছুদিন আগে তাঁর উপর লেখা একটি আর্টিকেল আনন্দবাজার পত্রিকাতে পড়েছিলাম। পড়ে মনে হয়েছিলো, পর্দায় ভীষণ হাসিখুশি হলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি বেশ গম্ভীর। তাঁর অভিনয় এবং ব্যক্তিজীবন দুটো নিয়েই আগ্রহ ছিলো। তাই তাঁর লেখা প্রবন্ধ সংকলনটির খোঁজ পাওয়া মাত্রই পড়ে ফেললাম। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯২০ সালে মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে। পড়াশোনা সেন্ট গ্রেগরি, জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছিলেন কবি জসীমউদ্দিন, কবি মোহিতলাল মজুমদার, প্রফেসর সত্যেন বোসের প্রিয় ছাত্র। পরে ওপার বাংলায় পাড়ি জমান। বিয়ের পরে দ্বিরাগমনে যেদিন শ্বশুরবাড়ি আসেন, সেদিনই প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয়। মূলত 'সাড়ে চুয়াত্তর' ছবির মাধ্যমে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পান। নিজেকে কমেডিয়ান হিসেবে পরিচিত করাতে না চাইলেও বাংলা সিনেমার দর্শক-পরিচালক সকলের কাছে তাঁর মূল আবেদন ছিলো কৌতুকাভিনেতা হিসেবেই। দেখতে চিমসে হলেও একটা প্রবল ব্যক্তিত্ব ছিলো, ছিলো কথায় কথায় বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা। বিনয়-বাদল-দীনেশ বিপ্লবীরা ছিলেন তাঁর আদর্শ। এই বইটিতে ছোট ছোট প্রবন্ধগুলোতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে ভাবনাগুলো বেশি ফুটে উঠেছে। তাঁর সমাজ এবং রাজনীতি নিয়ে ভাবনাগুলো আলোড়িত করেছে। চলচ্চিত্র সম্পর্কেও তাঁর ভাবনা, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা প্রাঞ্জল ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন। হলিউডের লরেল-হার্ডি জুটি সমতুল্য ভানু-জহর এর জহর রায় সম্পর্কে আন্তরিক একটি প্রবন্ধ আছে। উত্তম কুমার-ছবি বিশ্বাস প্রমুখের সাথে নানান অভিজ্ঞতাও আনন্দ দিয়েছে। বইটির ভূমিকা লিখেছেন স্বনামধন্য বর্ষীয়ান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আর ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এর স্ত্রী নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা শুরুর দুটি প্রবন্ধ ভানুকে পারিবারিকভাবে চিনতে খুব সাহায্য করেছে। সুপাঠ্য বইটি পড়ে এবং বাঙলা চলচ্চিত্রের মনেপ্রাণে বাঙাল এই দিকপাল অভিনেতা সম্পর্কে জানতে পেরে সময়টা সুন্দর কেটেছে।