আমাদের ছোটোবেলায় উপহার হিসেবে বই দেওয়ার একটা সলিড রেওয়াজ ছিল। শুরুতে থাকা ‘উপহার’ পৃষ্ঠা (আহা, তাতে নারায়ণ দেবনাথ থেকে শুরু করে কত না শিল্পীর অতুলনীয় অলঙ্করণ পেয়েছি আমরা!)-তে আশীর্বাদক মানুষটির বাঁকানো হাতে লেখা কথাগুলোর দিকে এক ঝলক তাকিয়েই আমরা অবশ্য গল্প বা উপন্যাসটিতে ডুব দিতাম। উপহার হিসেবে, আমার অন্তত, সবচেয়ে পছন্দের জিনিস ছিল সত্যজিৎ রায়-এর ‘ডজন’ বা ‘বারো’ নামধারী সঙ্কলনগুলো। কিন্তু ছোটোবেলায় যে কথাটা কখনও ভাবিনি, সেটাই বড়ো হয়ে মহাজনপন্থা অনুযায়ী ভাবা প্র্যাকটিস করার পর, মাথায় এল। সত্যজিৎ রায়-এর ফেলুদা ও শঙ্কু বাদে অন্য কাহিনিগুলোও আমার এত ভালো লাগত কেন? হ্যাঁ, গল্পগুলো স্মার্ট। তাতে হাবিজাবি জিনিসের বদলে প্লট, সংলাপ, আর আদি-মধ্য-অন্ত কাঠামো মেনে গড়া ন্যারেটিভ পেশ হত একদম ঝরঝরে ভাষায়। কিন্তু আসল ব্যাপার, অন্তত আমার মতে, ছিল এটাই যে ওই সংকলনগুলোতে নব না হলেও বেশ কিছু রসের সংমিশ্রণে একটা মন-ভরানো অনুভূতি হত। যাদের মধ্যে এক-আধটা সঙ্গে থেকে যেত আরো অনেকদিন ধরে। ‘বর্ণদূত’ প্রকাশনা সংস্থার পথচলা শুরু হল যে বইটি দিয়ে, সেটি অবিকল সত্যজিৎ মডেল অনুসরণ করেছে। এতেও এক ঝাঁক নানা রসের স্মার্ট গল্প স্থান পেয়েছে। এবং, সুমিত রায়-এর ঝকঝকে প্রচ্ছদে, ভালো পাতায়, ভালো ফন্টে, খুব কম বানানো ভুল নিয়ে ছাপা হওয়া বইটার একদম শুরুতেই আছে ‘উপহার’ লেখা একটা পাতা! কিন্তু একটা বই পাঠকমহলে সমাদৃত বা সমালোচিত হয় মূলত তার কন্টেন্টের ভিত্তিতে। সেই দিক দিয়ে দেখলে, বইটা কেমন হয়েছে?
লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক জয়দীপ চক্রবর্তী-র ‘ভূমিকা’ না পড়লে লোকসান, তাই ওটা দিয়ে পাঠ শুরু করা বাধ্যতামূলক। তারপর একে-একে এসেছে বিভিন্ন পত্রিকা ও ওয়েবজিনে প্রকাশিত, এবং পাঠকমহলে প্রশংসিত একঝাঁক গল্প, যারা হল: ১. গাড়িবারান্দা ২. ঘাটশিলার ঘটনা ৩. সাহেবি স্কুলের ভূত ৪. কাঁকরডাঙার নীলকুঠি ৫. সময়ের চোখ ৬. প্রতাপগড়ের রোশনিবাঈ (হ্যাঁ, এই বানান-ই লেখা হয়েছে) ৭. গুল্টেদার বাঘ শিকার ৮. নিউমেরোলজি ৯. তুফানি রাতের ভূত ১০. গয়নার গণ্ডগোল (উপন্যাস)
সহজ ভাষায়, টানটান ভঙ্গিতে লেখা এই গল্পগুলো পড়তে একটুও কষ্ট হয় না। আমার মতো হাড় পেকে যাওয়া পাঠক প্রতিটি গল্পেই ‘এরপর কী হবে’ তা অনুমান করতে পেরেও গল্পগুলো পড়ে শেষ করতে বাধ্য হয় স্রেফ লেখকের ছিমছাম, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিতকথনের টানে। কিন্তু… কিন্তু লেখক হিসেবে বাবিন-কে এখনও অনেক পথ হাঁটতে হবে, যদি তিনি নিজেকে সত্যজিৎ ঘরানার একজন গল্পবলিয়ে-র চেয়ে বেশি কিছু করে তুলতে চান। কেন? কারণ, ১) একমাত্র ‘নিউমেরোলজি’ ছাড়া প্রতিটি গল্পের প্লটে রয়েছে সত্যজিৎ রায়-এর লেখার অত্যধিক প্রভাব। এমনকি ‘নিউমেরোলজি’-তেও পাঠক অনুমান করতে পারেন, কী হতে চলেছে। সবচেয়ে মারাত্মক ভাবে এই প্রভাবের ব্যাপারটা ধরা পড়েছে ‘গুল্টেদার বাঘ শিকার’ গল্পে, যাতে চরিত্রচিত্রণ থেকে শুরু করে প্লট, সবই তারিণীখুড়োর অ্যাডভেঞ্চার ‘ডুমনিগড়ের মানুষখেকো’-র অনুসারী। এই জিনিস পাঠকের মনে লেখকের কব্জির জোর সম্বন্ধে আশঙ্কার পাশাপাশি বিরূপ প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করে, যা অভিপ্রেত নয়। ২) ‘গয়নার গণ্ডগোল’ গল্পটি পড়তে মন্দ লাগে না। কিন্তু আজকের ছোটোদের কাছে গল্পটা নেহাত হাস্যকর ঠেকবে তাতে ঘটা অজস্র বে-আইনি জিনিসের জন্য, যাদের মধ্যে আছে ক্রাইম সিনে নাবালকদের উপস্থিতি, পুলিশ মজুত থাকা সত্বেও লাইসেন্স-বর্জিত এক সিভিলিয়ানের দ্বারা সন্দেহভাজনকে ক্রাইম সিনেই জেরা করানো, ইত্যাদি অজস্র জিনিস। এই মুহূর্তে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর কনসেপ্টটাই যখন রদ্দি হয়ে গেছে, তখন পাণ্ডব গোয়েন্দা ধাঁচের এমন বালখিল্য কাহিনিনির্মাণ অন্তত বাবিন-এর কাছ থেকে প্রত্যাশিত ছিল না। তাহলে বইটা কি পড়ার মতো? আজ্ঞে হ্যাঁ, উপরোক্ত সমালোচনা সত্বেও আমি পাঠককে বইটি হস্তগত করে রসাস্বাদন করার পরামর্শই দেব, কারণ: ১] লেখকের মধ্যে গতিময় গদ্যে, সহজ ভাষায়, আকর্ষণীয় গল্প বলার একটা সৎ প্রয়াস আছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ২] এই বইটির মতো ভালো প্রোডাকশন ভ্যালু আমি কোনো নবাগত প্রকাশকের কাছ থেকে আশা করিনি। প্রকাশকের এই সযত্ন গ্রন্থনির্মাণ, এবং বই উপহার দেওয়ার রীতিটিকে উৎসাহ দেওয়ার সচেতন প্রয়াস, এই দুই-ই আমার কাছ থেকে অকুন্ঠ তারিফ কুড়িয়েছে। তাই, আমি আশা রাখি যে অন্য পাঠকেরাও তাঁদের স্নেহাশীর্বাদ বর্ষণ করবেন বইটির ওপর, যাতে এই প্রকাশনা, এবং লেখক, আরো বই প্রকাশ করতে সাহসী হন। পাঠ শুভ হোক।