অজন্তা এক বিস্ময়কর কীর্তি। শিল্পী, পুরাতত্ত্ববিদ, শিল্পের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিবর্গের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও কতকাল ধরে অজন্তা একইরকম আকর্ষণীয়। ভগিনী নিবেদিতা অজন্তা পরিদর্শন করেন ১৯০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। মুগ্ধ ও বিশ্লেষণী মন নিয়ে এরপর তিনি লেখেন The Ancient Abbey of Ajanta নামে একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ। ১৯১০ সালে দ্য মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে সেটি প্রকাশিত হয়। ভারতীয় ভাস্কর্যে গ্রিক, গান্ধার প্রভাব এবং অজন্তার চিত্র, স্থাপত্য ও শিল্পকীর্তি সম্পর্কে অপূর্ব আলোচনায় সমৃদ্ধ সেই রচনা। প্রবন্ধটি ১৯১৫ সালে প্রকাশিত ‘ফুটফলস্ অফ্ ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি’ গ্রন্থে সংকলিত হয় সচিত্ররূপে। অজন্তাচর্চার প্রারম্ভিক পাথেয় হিসেবে ভগিনী নিবেদিতার এই রচনা অতি মূল্যবান। আনন্দ থেকে প্রকাশিত ভগিনী নিবেদিতার ‘অজন্তা’ গ্রন্থে নিবেদিতার অজন্তা সম্পর্কিত অসামান্য লেখাগুলির সঙ্গে প্রসেনজিত্ দাশগুপ্ত এবং সৌম্যেন পাল সংযোজন করেছেন চিত্র, প্রাসঙ্গিক চিঠিপত্র, প্রয়োজনীয় টীকা। ভারতপ্রেমী নিবেদিতার ভারতীয় শিল্প সম্পর্কে গভীর শ্রদ্ধার নিদর্শন এই গ্রন্থটি অবশ্যই সংগ্রহযোগ্য।
নিবেদিতা লিখিত এই বইটি মূল ইংরেজি থেকে অনুদিত। ১৯০০ সালের প্রথম দশকে কিছু ইংরেজ শিল্পী ও দুইজন বাঙালি শিল্পীকে নিয়ে অজন্তা পরিদর্শন করেন নিবেদিতা। ফিরে এসে যে বইটি লিখলেন তাতে ভ্রমণকাহিনীর ছিঁটেফোঁটা নেই। আছে উপলব্ধি ও আর্টের তুলনামূলক আলোচনা। অজন্তা চিত্র ও স্থাপত্য দুই শাখাতেই উৎকর্ষের চরমে পৌঁছেছিল। নিবেদিতা আমদের সেই সময় আবিষ্কৃত ২৯টি গুহা পরিদর্শন করিয়েছেন। তিনি ভারতে বৌদ্ধধর্মের তিনটি কাল চিহ্নিত করেছেন— বিম্বিসার, অশোক ও কনিষ্ক। এই কনিষ্কের সময় মহাযান পন্থা তার দিশা পায়, যা পরবর্তিকালে দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়া ও চিনে ছড়িয়ে পরে। আজও যা শ্রদ্ধার সাথে পূজিত। অথচ বৌদ্ধধর্ম তার জন্মস্থান ভারতের থেকে অপসারিত কালের কবলে। বর্তমানে যেটুকু চোখে পড়ে তা তিব্বতিদের দ্বারা পরিচালিত। কুশান আমলেই বৌদ্ধধর্ম মধ্য-এশিয়ায় ছড়িয়ে পরে। সুদুর আফগানিস্থান অব্দি যার বিস্তার ছিল। নতুন ধরনের স্থাপত্যের দেখা মেলে সেই সময়। যেগুলি গান্ধার শিল্প নামে পরিচিত। কিছু ঐতিহাসিক এতে গ্রিক স্থাপত্যের মিল খুঁজে দেখানোর চেষ্টা করেন। তাঁরা বলেন ভারতীয় স্থাপত্য আসলে ইউরোপীয় ধারার অনুসরণকারী। এমনকি অশোকের পিলারগুলিকেও অনুকরণ বলে দাবি করেন। নিবেদিতা ক্ষুব্ধ চিত্তে এইসব বালখিল্য তত্ত্বের সমালোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন আসলে এই শিল্পধারা মগধের শিল্পধারার কাছে ঋণী। বইটির শেষে কিছু চিঠিপত্র রয়েছে যার অনুবাদ করেছে স্বয়ং সংকলক শংকরীপ্রসাদ। অত্যন্ত সুখপাঠ্য এই চিঠির অনুবাদ্গুলি। তুলনায় মূল বইটির অনুবাদ বেশ খারাপ। কিছু যায়গায় মনে হয়েছে অভিধান থেকে শব্দ বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু বাক্য পড়ে আমার সন্দেহ হয়েছে, আমি বাংলাই পড়ছি তো! আসলে অনুবাদও যে শৈলীর দাবি রাখে তা আমরা মাঝে মাঝেই ভুলে যাই। যার তার হাতে অনুবাদ ঠিক জমে না।