১৮৭৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে সেদিন ছোট্ট গ্রাম মেনলো পার্কে নববর্ষের সান্ধ্য উৎসবটা দেখা গেল অন্যরকম। বিশ্বের আর কোথাও এমন জমকালো উৎসব দেখা যায় নি কখনো। নতুন এক বিস্ময়কর জিনিস জন্ম নিয়েছে আবিষ্কারক টমাস আলভা এডিসনের ল্যাবরেটরিতে। তাই দেখতে ট্রেন বোঝাই সব লোক এসে জড়ো হতে লাগল মেনলো পার্কে।
এডিসন তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ও অনুপম আবিষ্কারের গুণে জীবদ্দশায় একজন গণনায়কে পরিণত হয়েছিলেন। সেই গণনায়ক রয়ে গেছেন আজো।
বিজ্ঞানের জগতে একজন আবিষ্কারক হিসেবে এডিসনের অবদান অপরিসীম। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রচুর জিনিস আবিষ্কার করেছেন তিনি, যা আজকের ব্যবহারিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোয়াড্ররুপ্লেক্স টেলিগ্রাফ, ফোনোগ্রাফ ও বিজলি বাতি আবিষ্কার এবং বৈদ্যুতিক বিতরণ ব্যবস্থা, টেলিফোন ও বৈদ্যুতিক জেনারেটরের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন, চলচ্চিত্র ক্যামেরা উদ্ভাবন- এসব আবিস্মরণীয় অবদান এডিসনকে জীবন্ত কিংবদন্তীতে পরিণত করে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই সুখ্যাতি উপভোগ করে গেছেন তিনি।
এডিসনের ব্যাপারে সমালোচনা করলে এডিসনের কিছু আসবে যাবে না, বরং বাড়িয়ে প্রশংসা করলে সাধারণ মানুষ হতাশ বোধ করতে পারে। আমি একটি সন্তোষজনক দৃষ্টিভঙ্গি বেছে নিচ্ছি। কেউ যদি বলে সিটভর্তি বাসে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী ও তার বসার সুযোগ পাওয়ার হিসেব করে একটা যন্ত্র তার ভাড়া কেটে নিবে এমন যন্ত্র বানিয়ে তার পেটেন্ট নিবে তো কারো কি আপত্তি আছে? থাকার কথা নয়। ২৩৩২টি পেটেন্ট ছিল এডিসনের যার মধ্যে ১০৯৩টি যুক্তরাষ্ট্রে। যারা পদার্থবিজ্ঞান পড়ো তাদের বলি, এডিসন আসলে সত্যিকার অর্থে পদার্থবিজ্ঞানী নন, বিজ্ঞানের ভেতর বাস করা একজন ইঞ্জিনিয়ার। তাই ব্যবসা ভাল বোঝা তার দোষ নয়, ইঞ্জিনিয়ার এর সংজ্ঞার চাহিদা থেকেই ব্যবসায়ী কার্যক্রম নৈতিকভাবেও বৈধ। এডিসন আমাদের কোনো নতুন তত্ব বা জ্ঞান দিয়ে যান নি। তিনি বরং জ্ঞানকে কৌশল বানিয়েছেন— তাও আবার হাজার হাজার কৌশল। তত্ত্ব যাতে কাজে লাগানো যায়, সেজন্যই আমাদের দরকার হয় ইঞ্জিনিয়ারদের। কারণ, তাত্ত্বিকেরা কাজ করেন রহস্য অবমুক্ত করার জন্য, আর প্রকৌশলীরা কাজ করেন রহস্যকে কাজে লাগিয়ে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য। আমি চাই কেউ যেন হাজার পেটেন্ট দেখেই আকাশ থেকে পড়ে এডিসনের জন্য আহাজারিতে মরে না যায়। আবার তার অধ্যাবসায়ের ইতিহাসকেও কেউ যেন মূহুর্তের জন্য অসম্মান না করে। আহাজারির অর্থ সে পেরেছে আমি পারব না, আর সম্মানের কারণে তার পথে যে কেউ এগিয়ে যেতে পারবে। পুরো বইটাতে তার জীবনের এত পর্যায় এল, কিন্তু টেসলার নাম এল না। এ দিক থেকে এডিসন যেমন টেসলার সাথে অবিচার করেছেন, লেখকও এডিসনের প্রতি একটু বাছবিচার করেছেন বলে মনে করি। তবে বইয়ের ক্ষেত্রে এটা হতেই পারে, বই তো আর উইকিপিডিয়া নয় যে ভাল খারাপ সবই থাকতে হবে। বইয়ের উদ্দেশ্য আলোর গল্প করা, কিন্তু সত্যকে ছেড়ে না দেওয়াও নয়। এক খাতিরে মিথ্যা কিছু প্রকাশ না করায় এ দোষ ঘাড় থেকে নেমে যায়।
বিজ্ঞানের সাথে প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বন্ধুত্বটা হল এরা একে অন্যের পরিপূরক। তা কেমন? প্রযুক্তি নিজ থেকে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, কিন্তু নিজ থেকে জন্ম নিতে পারে না। বিজ্ঞান নিজেই জন্ম লাভ করে সত্য, কিন্তু আবার একা একা পৌঁছাতে পারে না বড় জনগোষ্ঠীর কাছে। এই পৌঁছে দেয়ার কাজটা করে প্রযুক্তি। বিজ্ঞানের নায়কদের বলি বিজ্ঞানী, প্রযুক্তির কারিগরদের বলি উদ্ভাবক। দুই-ই আমাদের বুদ্ধিমত্তার জয় নির্ধারক।