অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক জ্ঞানতৃষ্ণা ও পাণ্ডিত্য নিয় একাই হয়ে উঠেছিলেন পরিপূর্ণ একটা প্রতিষ্ঠান। তাঁর মৌলিক চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি অনেককে যেমন জ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করেছে, তেমনই গণতান্ত্রিক চিন্তা ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণেও উদ্বুদ্ধ করেছে। বেঙ্গল পাবলিকেশনস থেকে ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় ‘জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক স্মারকগ্রন্থ’। বইটির সম্পাদক এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। ২০১৫ সালে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় সংস্করণে যুক্ত হয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের তিনটি অভিভাষণ এবং পাকিস্তানের উন্নয়ন-পরিকল্পনাসম্পর্কিত একটি ইংরেজি লেখা। লেখাটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়বৃদ্ধির সঙ্গে আমাদের মতো দেশে সামরিক শাসন প্রবর্তনের যৌক্তিক সম্পর্কের কথা এতে তিনি বলেছেন। বাংলা অভিভাষণ তিনটিতেও তাঁর চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে। এ ছাড়া অধ্যাপক রাজ্জাক সম্পর্কে খালিদ শামসের একটি রচনা এই সংস্করণে যুক্ত হয়েছে। আর প্রকাশিত কয়েকটি আলোকচিত্রও এ সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
Anisuzzaman was a Bangladeshi academic of Bengali literature. He was an activist who took part in the Language Movement (1952), participated in Mass Uprising (1969), and took part in the Bangladesh Liberation War (1971).
He was a member of the Planning Commission to the Government of Bangladesh during the Bangladesh liberation war and a member of the National Education Commission set up by the government after liberation. He was inducted as a National Professor by the Government of Bangladesh in 2018.
স্মারকগ্রন্থ কথাটির সোজাতম মানে - স্মরণ করিয়া যে গ্রন্থ লিখিত হয়।
আব্দুর রাজ্জাকের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টির ইন্দন যুগিয়েছে মোটামুটি তিনটি গ্রন্থ যথা -
১.যদ্যপি আমার গুরু - আহমদ ছফা ২.ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ - সরদার ফজলুল করিম এবং ৩.সাক্ষাৎকার - হুমায়ুন আজাদ
প্রথম দু'জন আব্দুর রাজ্জাকের বিশেষ গুণমুগ্ধও বটে। তাঁদের লেখাতেই প্রফেসর রাজ্জাককে জ্ঞানের এক বিরাট মহীরুহ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আর এটিই আমার মত নিরীহ পাঠকের প্রফেসর রাজ্জাকের প্রতি অফুরন্ত আগ্রহের কারণ।
আব্দুর রাজ্জাক নামের মানুষটিকে ঘিরে কতশত মিথ, গল্প চালু আছে জ্ঞানী-গুণীদের বাজারে তার ইয়াত্রা নেই। কিছু মিথ জানবার, সত্য জানবার জন্যই দারস্থ হয়েছিলুম "আব্দুর রাজ্জাক স্মারকগ্রন্থ" র।
"যদ্যপি আমার গুরু " এবং " ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ " বই দু'টোতে যেসব কথা কথা সেসব বাদ দিয়ে আব্দুর রাজ্জাক সম্পর্কে কী জানা গেল তা লিখছি-
মনসুর মুসা লিখেছেন তাঁর বইপড়ার পদ্ধতি নিয়ে লিখেছেন,
"বিচিত্র বিষয়ের বিচিত্র বই তিনি পাঠ করতেন। বইপড়া বলতে যে নিদ্রাকর্ষী কর্ম কেউ কেউ বুঝে থাকেন, আব্দুর রাজ্জাক সে রকম কর্মে কখনই নিযুক্ত ছিলেন না। তাঁর বইপড়া ছিল তথ্য যাচাইয়ের এক অনন্ত প্রক্রিয়া। একটি বই পড়তে বসে, সে বইয়ে উল্লেখিত সূত্র পরীক্ষা করার জন্য আরো পাঁচটি বই দেখতেন, সে পাঁচটি বইয়ের মনোভঙ্গি উপলব্ধি করার জন্য আরো পনেরোটি সংগ্রহ করে আনতেন, আবার সেই পনেরোটি বইয়ের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধির জন্য বিভিন্ন গোপনসূত্রে সংরক্ষিত দলিলপত্র পরীক্ষা করতেন। "
মৌলবাদ ও আলেমদের হাদিস উচ্চারণ নিয়ে সরদারকে বলেছিলেন, " এরা লিঙ্গুইসটিক তথা 'শব্দশাস্ত্রের' একটি কথা ভুলে যায়। এরা ভুলে যায় যে, শতশত বছরে একটি লিখিত বাক্যকে অপরিবর্তিত রাখা গেলেও, সেই বাক্যের শব্দের উচ্চারণকে অপরিবর্তিত রাখা যায় না।..... এক উচ্চারণ যে অর্থ, অনেক যুগ পরে সেই শব্দের অন্য উচ্চারণ এক অর্থ বহন নাও বহন করতে পারে। "
সাবেক প্রধানবিচারপতি ও তত্ত্বাবধারক সরকারপ্রধান হাবিবুর রহমান আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে মজার একটি ঘটনা লিখেছেন,
" তাঁর ক্লাসটা ছিল তিন-চার সারি ডেস্কবেঞ্চের ছোট্ট একটি কামরায়। সেই ঘরের সুইচবোর্ডের একটা সুইচ ভাঙা ছিল। তার খোলা দুটো তার জোড়া দিলে যে আগুনের ফুলকি ছুটত তাতে আমরা দেশলাই না থাকলে সিগারেট ধরাতাম।তখন আমি একেবারে নতুন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যারদের চিনি না। সেই ছোট্ট ক্লাসে আট- দশটি ছাত্র নিয়ে রাজ্জাক সাহেব ক্লাস নিচ্ছিলেন তখন আমি তাঁকে শিক্ষক হিসেবে চিনতে পারিনি। আমার মনে হয়েছিল বয়োজ্যেষ্ঠ একজন ছাত্র শিক্ষকের চেয়ারে বসে তার সহকর্মীদের সাথে কথাবার্তা বলছে। আমি সেই ক্লাসে ঢুকে দুটো বিজলি তারের সংযোগ সাধন করে আগুনের ফুলকিতে একটা সিগারেট ধরাই। রাজ্জাক সাহেব বললেন, 'এদিকে শোনেন '। তাঁর কন্ঠস্বর এবং ডাকার ভঙিতে আমার সন্দেহ হলো তিনি শিক্ষক। মুখ থেকে ফস করে বেরিয়ে এলো তিনটি অসহায় শব্দঃ আপনি স্যার নাকি! । এই বলেই আমি দেদ্দৌড়। "
বদরুদ্দীন উমর তাঁর পোশাকআশাক নিয়ে লিখেছেন,
"পাজামা ও খদ্দরের পাঞ্জাবি ছিল তাঁর সাধারণ পোশাক। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে স্যুট ও প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় কখোনো দেখিনি। "
আবুল মাল আব্দুল মুহিত তাঁর একটি বিশেষ দিক সম্পর্কে ইঙ্গিত করেছেন,
" রাজ্জাক স্যার বিস্তৃত ও ব্যাপক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতে পারতেন বলেই সমসাময়িক দুর্যোগ বা অধঃপতন সম্বন্ধে তিনি উদাসীন বা নিস্পৃহ থাকতে পারতেন। "
আব্দুর রাজ্জাক কী শুধুই পান্ডিত্যপূর্ণ বই পড়তেন? এ জেড এম আবদুল আলীর উত্তর,
"একদিন আমার হাতে একটা পিজি উডহাউসের বই দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'কি পড়েন ওইটা? ' আমি অপরাধীর সুরে বইয়ের এবং লেখকের নাৃ বলতে বললেন, ' দেখি বইটা '। হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে বললেন, ' আমি বোধকরি পড়ি নাই '। আপনার পড়া হইলে দিয়েন আমারে আমারে পড়তে। "
তাঁর বইপ্রেম নিয়ে আনিসুজ্জামান লিখেছেন, " জাহাজে তাঁর বইপত্রের একটা বড়ো সংগ্রহ- এসেছে - তা ছাড়াতে হবে। বই বিনা শুল্কে কিভাবে ছাড়বেন শুল্ক সংগ্রাহকেরা তার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। তাঁদের প্রশ্ন - সা্র আর কী এনেছেন বিলেত থেকে? ফ্রিজ? টেলিভিশন? মাইক্রোওয়েভ? ইলেকট্রিক বা ইলেকট্রিনিকের অন্য সামগ্রী? কিছুই নই? কেবলই বই? "
কামাল লোহানী বললেন,
" আমরা তাঁকে বলতাম Running Dictionary "
আহমদ ছফার বয়ানে,
"বিলেতে প্রায় প্রতিদিনই পুরোনো বইয়ের দোকানে যাওয়া তাঁর একটা মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। বিলেতে যাঁরা পুরোনো বই বেচতেন তাঁরা হালকা- পাতলা একহারা চেহারার মানুষটিকে চিনে নিয়েছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ লক্ষ করেছিলেন, এ লোকটি সকালবেলা আসেন এবং সারাদিন বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে সন্ধ্যাবেলা ফেরত যান। বইবিক্রেতাদের একসময় খেয়াল হলো ভদ্রলোক কিছু না খেয়ে- দেয়ে সারাদিন শুধু বইপত্রের স্তূপের মধ্যেই ডুবে থাকেন। প্রতিদিন একই ঘটনা ঘটতে দেখে এক বিক্রেতার মনে করুণা হলো। তিনি রাজ্জাক স্যারকে একদিন সসংকোচে লাঞ্চ খেতে ডাকলেন। তারপর থেকে সেটাই নিয়মে দাঁড়িয়ে গেল। পুরনো বইয়ের দোকানে গেলেই তিনি লাঞ্চ করে আসতেন। "
আব্দুর রাজ্জাকের দু'একটি বক্তৃতা ছাড়া তো কিছুই লিখেন নি মানুষটি। তবুও তাঁর এক বক্তৃতায় বলা কথাটি বলেই শেষ করছি,
" বিশ্ববিদ্যালয় সম্ভবত সৃষ্টিশীল প্রতিভাবানদের খুব একটা পছন্দ করে না। "
আব্দুর রাজ্জাককে প্রায় সবাই শিক্ষকদের শিক্ষক হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তাঁর বিশাল রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কেও প্রচুর ঘটনা আছে বইতে। বর্ণিত ঘটনার 'ক্রসচেক' আমার দায়িত্ব না।
"পান্ডিত্যের শীর্ষে পৌঁছেও সেটাকে ধর্তব্যে না এনে জ্ঞানপিপাসা আর জ্ঞানার্জনের ইচ্ছা পোষণ আর প্রকাশ করার অপর নাম জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক।"
আমাদের দেশটি ছোট, আর এর মানুষেরাও বেশ ক্ষুদ্র। প্রথাগত ভূয়োদর্শন আমাদের উপদেশ দেয় বেশি না-বাড়ার, বেশি উঁচু না-হওয়ার। বেশি বৃদ্ধি পেলে ক্রুদ্ধ ঝড়ে ভেঙে পড়ার ভয় আছে। আমাদের প্রকৃতি ও মানুষগুলো এ-ভয়ে আতঙ্কিত; তাই অভাব এখানে আকাশছোঁয়া বৃক্ষের, দুর্লভ এখানে মহৎ ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব। মাঝারি, নিম্ন-মাঝারি ও নিম্ন-আকারের ব্যক্তি ও বৃক্ষে পূর্ণ আমাদের লোকালয় ও অরণ্য। কাউকে পাওয়া কঠিন এই পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলে, যিনি আয় করেছেন মহত্ত্ব- অর্জনে বা ত্যাগে হয়ে উঠেছেন অসাধারণ- একরকম বিস্ময় ও কিংবদন্তি।
স্মারকগ্রন্থ কথাটিকে সহজ ভাষায় বললে- যে গ্রন্থ কাউকে স্মরন করে লেখা হয়। 'জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক স্মারকগ্রন্থ' ঠিক তেমনি একটি গ্রন্থ। তার সকল স্নেহভাজন ছাত্র-ছাত্রীরা তার স্মরনে এই গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। শুধুমাত্র আমাদের প্রজন্মকে জানানোর চেষ্টা করেছেন যে আব্দুর রাজ্জাক স্যার কত মহান ব্যক্তি এবং জ্ঞানী দার্শনিক ছিলেন। এত জ্ঞানের ভার বহন করা সত্ত্বেও স্যার তেমন কিছুই লিখে যান নি। একটা শেষ না করা বই, দু দশটা চিঠি, কয়েকটা ছুটির দরখাস্ত, সোপারেশনামা, কিছু আর্জি, একটা বক্তৃতা আর অনুমান আধা ডজন ইন্টারভিউ ছাড়া পি.এইচ.ডি ডিগ্রীর জন্যে লেখা থিসিস 'পলিটিকাল পার্টিস ইন ইন্ডিয়া', প্রবন্ধ 'দ্য মিলিটা��ি ইন পাকিস্তান' এবং 'বাংলাদেশঃ স্টেট অফ এ নেশন' বলতে গেলে এই ছিলো তার লেখালেখির জীবন। অথচ পুরো জীবন তিনি অতিবাহিত করেছেন জ্ঞানের সন্ধানে আর অন্যকে জ্ঞান অর্জনে উস্কে দিতে। যারা মোটামুটি বই পড়েন কমবেশি সবাই প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক স্যার নামটির সাথে পূর্ব পরিচিত। এছাড়াও, তিনি পরপর দুবার 'জাতীয় অধ্যাপক' ছিলেন যার জন্যে অনেকেই তাকে চিনে থাকবেন। 'জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক স্মারকগ্রন্থ' বইটি প্রকাশ করেছে বেঙ্গল পাবলিকেশন্স। সম্পাদনা করেছেন আনিসুজ্জামান। সম্পাদনা পরিষদে ছিলেন- সরদার ফজলুল করিম, রেহমান সোবহান, হামিদা হোসেন, আবুল মাল আবদুল মুহিত, রওনক জাহান, মফিদুল হক। সহযোগী সম্পাদক হিসেবে ছিলেন- লুভা নাহিদ চৌধুরী, আবুল হাসনাত এবং মোহাম্মদ আবদুর রশীদ। বইটি প্রথম প্রকাশ হয় অক্টোবর ২০১২ সালে। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী আর প্রচ্ছদ প্রতিকৃতি শেখ আফজাল এর। বইটির পেইজ, বাইন্ডিং, চিত্রমালা সবদিক মিলিয়ে সংগ্রহে রাখার মত দারুণ একটা বই।
"প্রতিভা যাহাকে স্পর্শ করে তাহাকেই সজীব করিয়া তুলে।"
আব্দুর রাজ্জাক স্যার ১৯৩৬ সালে মাস্টার্স এ প্রথম শ্রেণীতে পাস করে ঢাবিতে রাজনৈতিক অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকস এ বিশ্বখ্যাত প্রফেসর হ্যারল্ড লাস্কির অধীনে পিএইচডি করতে যান। 'পলিটিকাল পার্টি ইন ইন্ডিয়া' এই শিরোনামের থিসিসটি সে পরিপূর্ণ করতে পারেন নি তার কারন তার প্রফেসর হ্যারল্ড লাস্কির মৃত্যু। প্রফেসর হ্যারল্ড লাস্কি ছাড়া তার থিসিস মূল্যায়ন করার মতো কেউ নেই এই ভাবনাই তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনেছিলো যদিও তার থিসিস শুধুমাত্র জমা দেয়াই বাকি ছিলো। তবে অনেকের মতে পিএইচডি এর প্রতি তার বিতৃষ্ণা হওয়ায় থিসিস পূর্ণ করতে পারেন নি তিনি। সে যাই হোক, ১৯৫০ সালে তিনি দেশে ফিরেন। ১৯৭৩ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডি লিট উপাধি দেয়। এর ঠিক দুবছর পরই ১৯৭৫ সালে তিনি ঢাবির সিনিয়র প্রভাষক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। একই বছর সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক মনোনীত করে। সর্বদা ঢাকাইয়্যা বুলি বলা দেখতে ছোটখাটো এই মানুষটার জ্ঞান ছিলো হিমালয়সম। তিনি ছিলেন শিক্ষকদের শিক্ষক। এমনকি তাকে অনেকে গ্রীক দার্শনিক ডায়োজেনিসের সাথে তুলনা করেন। শুধু ডায়োজেনিস বললে ভুল হবে অনেকেই বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের সাথেও তাকে তুলনা করে থাকেন।
এই স্মারকগ্রন্থ দেশ-বিদেশ বরেণ্য তার সকল ছাত্র-ছাত্রী তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরন করেছেন। হৃদয়ের গহীন কোনে লুকিয়ে থাকা স্যারের প্রতি ভালোবাসাটা প্রকাশ করেছেন। এমন অনেকের লেখাই আছে এখানে যাদেরকে আমরা এখনকার প্রজন্ম বুদ্ধিজীবী বলে থাকি তারা সকলেই স্যারের ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন। প্রত্যক্ষভাবে হয়তো অনেকেই স্যারের ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন না কিন্তু পরোক্ষভাবে সবাইই জ্ঞানের আলোকিত পথের এই ছোটখাট মানুষটার কাছে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা পরে থাকতেন। আর চিরকুমার এই মানুষটা নিজের সময়কে বিলিয়ে দেন এদের জ্ঞানদানে। স্যারের নিজস্ব একটা কথা বলার ভাষা ছিল। যেটা পুরোপুরি ঢাকাইয়্যাও না আবার গ্রাম্যও না। স্যার ইংরেজিতে বেশ ভালো বলতে পারতেন কিন্তু মাতৃভাষাকে বেশী প্রাধান্য দিতেন। আড্ডায় আড্ডায় খাবারের সময় হয়ে এলে নিজে রান্না করে খাওয়াতেন। বাজার করা এবং রান্না করা ছিল স্যারের আরেক প্রকাশ নেশা। অনেক ছাত্রী এমনকি ছাত্রের বউকেও তিনি রান্না করা শিখিয়েছেন। হুমায়ুন আজাদ তার সাক্ষাৎকারে স্যারকে তার নেশার কথা জিজ্ঞেস করলে উনি তামাক, রান্নাবান্না আর দাবা খেলার কথা বলেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স লাউঞ্জ রুমে তাকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে দাবা খেলতে দেখা যেত। নিয়াজ মোর্শেদ ছিলেন তার দাবাখেলার সঙ্গী। অন্যান্যরাও অবশ্য খেলতেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তার প্রাণ। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন আরেকটা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষকদের শিক্ষক।
তারই ছাত্র পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছিলেন স্যারকে নিয়ে বলেছেন, "Abdur Razzaq is the most eminently learned man in the whole of Bangladesh in Social Science. He is also highly respected in the learned circles in India and elsewhere. The country has very few selfless man of his nature. He is universally respected in all circles in Bangladesh for his unrivalled knowledge, learning erudition and scholarship and integrity and character." -মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী।
বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী স্যারের সম্পর্কে বলেছেন, "সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর প্রকৃত পরিচয় হলো জ্ঞানের অন্বেষণ ও জ্ঞানের বিকাশে, জ্ঞানাহরণ ও গবেষণায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে তিনি সারাটা জীবন কাটান। বস্তুতই তিনি ছিলেন জ্ঞানের পূজারী ও শিক্ষক। তাঁর পড়াশোনার পরিধি ছিল ব্যাপক ও বিস্তৃত। শিক্ষকের সরলতা ও আড়ম্বরহীন জীবন ছিল তার ট্রেডমার্ক। পরোপকার যেন ছিল তার ধর্ম। শুধু তাঁর পছন্দের লোকের ভালোর জন্য তিনি সচেষ্ট ছিলেন না, অন্যরাও সে-রকম সাহায্য, সহায়তা বা পৃষ্ঠপোষকতা তাঁর কাছ থেকে পেত।" -আবুল মাল আব্দুল মুহিত।
এছাড়াও, স্যারকে নিয়ে অন্যান্যদের উক্তিসমূহ নিচে তুলে ধরা হলোঃ
"স্যার শুধুমাত্রই স্যার ছিলেন না তিনি ছিলেন আমার দ্বিতীয় পিতা।" -সরদার ফজলুল করিম।
"তিনি ছিলেন জ্ঞানসমৃদ্ধ চিন্তাশীলতার জীবন্ত রূপায়ণ।" -মীজানুর রহমান শেলী।
"আমরা তাঁকে বলতাম - Running Dictionary." -কামাল লোহানী।
"আব্দুর রাজ্জাক জ্ঞানচর্চার জগতে যেমন ব্যতিক্রমী মানুষ ছিলেন ব্যক্তিজীবনেও ছিলেন ব্যতিক্রমী। তিনি গৃহী ছিলেন কিন্তু গৃহনির্মাণ করেননি। সংসারে বসবাস করেছেন কিন্তু নিজে সংসারী হননি।" -মনসুর মুসা।
"স্যার বোধহয় মনে করতেন যে, তামাম দুনিয়ার সমস্যা সমাধানের দায় আমার স্কন্ধে ন্যস্ত নয়, কিন্তু পৃথিবীর গোলকধাঁধা সমাধানের একটি সূত্র আমি।" -আবুল মাল আব্দুল মুহিত।
"Why do so many of us, spanning several generations, genuinely feel a deep sense of affection and respect for Professor Abdur Razzaq. He became a member of so many of our families." -কামাল হোসেন।
"Razzaq Sir is huge mansion, with many rooms, closed but unlocked doors, and many treasures in each of them." -আহমদ ছফা।
"Abdur Razzak was an intellectual in the European tradition of the men of ideas; a scholar with a true passion for knowledge. He loved knowledge for the beauty of knowledge." -হাবিবুল হক খন্দকার।
"এ সাধারণত্বকেই তো অসাধারণ করে তুলেছেন নিজের জীবনে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক; একালের জ্ঞানতাপস শুধু জ্ঞানের জন্যে জীবনকে অবহেলা করে। জ্ঞানের কাছে জীবন পরাভূত হলে জন্ম নেন একজন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক।" -হুমায়ুন আজাদ।
"জ্ঞানোভাবে তিনি অহংকারী হন নি, হয়েছেন বিনম্র। চাল-চলনে পোশাকে ও পরিচ্ছদে ছিলেন সাধারণ। ব্যতিক্রমী পাণ্ডিত্য ও ব্যক্তিত্ব; সে সঙ্গে বয়স, মতাদর্শ, নির্বিশেষে জ্ঞানপিপাসু সকলকে একত্র করার অসাধারণ শক্তি তিনি অর্জন করেছিলেন। এখানেই ছিল তার মহত্ত্ব!" -মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ/সুনীল কান্তি দে।
এই তো গেল তার জ্ঞানের আলোয় আলোকিত তার ছাত্র-ছাত্রীদের কথা। এবার স্যারের নিজস্ব কিছু উক্তি দেয়া হলোঃ
মৌলবাদ আর আলেমদের হাদিস উচ্চারণ নিয়ে সরদারকে তিনি বলেছিলেন, "এরা ভুলে যায় যে, শত শত বছরে একটা লিখিত বাক্যকে অপরিবর্তিত রাখা গেলেও, সেই বাক্যের শব্দের উচ্চারণকে অপরিবর্তিত রাখা যায় না। এক উচ্চারণে যে অর্থ, অনেক যুগ পরে সেই শব্দের অন্য উচ্চারণ এক অর্থ বহন নাও করতে পারে। 'শব্দশাস্ত্রের' এই নিয়মটাকে আমরা কেউ মনে রাখি নে। তাই পরিবর্তিত অর্থের অপরিবর্তিত শব্দের আকার-ইকার নিয়ে আমরা হাঙ্গামা-হুজ্জুত করি।" -জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক।
"একজন শিক্ষক প্রতি বছর বুড়িয়ে যায়, কিন্তু ছাত্ররা চিরকাল নবীন থাকে।" -জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক।
"এ পাঠশালা নয়, বিদ্যালয় নয়, এমনকি মহাবিদ্যালয়ও নয়- এ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়- বিশ্বকে সর্ব অর্থে চেতনায় ধারণ করবার ও বিশ্ববোধে জাগ্রত হবার জন্যেই তোমরা এখানে এসেছো।" -জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক।
"শিক্ষা একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। শুধু তত্ত্ব-উপাত্ত দিয়ে শিক্ষার্থীর মনের ভার বাড়ানোকে শিক্ষা বলা যায় না। শিক্ষার কাজ হচ্ছে এমন এক প্রক্রিয়ার সূচনা করা যার মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষের মনে যে-চোখ আছে তাকে জ্ঞানের অনির্বাণ আলোর দিকে ফেরানো যায়।" -প্লেটোর আদর্শে আব্দুর রাজ্জাক।
মুনতাসীর মামুনকে বলেছিলেন, "পরিশ্রম হচ্ছে ৯৫ ভাগ, মেধা ৫ ভাগ।" -জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক।
"মাতৃভাষা ছাড়া কোন জাতি বা কারো উন্নতি করা সম্ভব নয়।" -জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক।
আশির দশকের দিকে তার পুরাতন সকল ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় স্যার অনেকটা একা হয়ে যান। পুরাতন এক ছাত্রের সাথে দেখা হলে তিনি বলেন, "এতক্ষণ বইসা থাইক্যা আমারে নিয়া অনেক ভালো ভালো কথা হুনলাম। মানুষ মইরা গেলে তার সম্পর্কে সাধারণত এমন কথা কওয়া হয়। কী জানি, হয়তো মইরাই গেছি। কিন্তু টের পাইতাছি না।" -জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক।
তার প্রয়াণের আগে সর্বশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন হুমায়ুন আজাদ। মৃত্যু প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে স্যার বলেছিলেন, "আমি যে-কোন মুহুর্তে বিদায়ের জন্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কোন দুঃখ নাই। কত বছর বাঁচবো, তা ভাবি না। জীবন-মৃত্যু সম্পর্কে আমি বেশি ভাবি না। আমি অনেক বেঁচেছি, সত্তর বছর। নিজের হাতে জীবন নেব, এই কথা কখনো ভাবি নাই, যে-কোন মুহুর্তে মারা গেলে দুঃখ নাই। অনেক তো বেঁচেছি।" -জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক।
বইটার শেষে স্যারের বেশ কিছু চিত্র আছে। স্যারের পরিবারের ছবি। বিদেশে থাকাকালীন স্যারের ছবি। স্যারের পি.এইচ.ডি বা ভিজিটিং ফেলোশিপের নথিপথ। স্যারের পরিবারের ছবি। স্যারের পড়ার ছবি সহ এখনকার বিশিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ তবে তার ছাত্রদের সাথে তোলা ছবি।
আব্দুর রাজ্জাক স্যার আমাদের অনেকের কাছেই দুর্ভেদ্য এবং রহস্য আর তার কারন একটাই আমরা কেউই তার চিন্তাচেতনা এবং তার পান্ডিত্যের রেশ আমরা পাই নি। তার নিজের লিখিত কোন বই নেই যদিও তবে তারই ছাত্র ঢাবির সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী স্মরণে তিনি এক বক্তৃতা দেন যা পরবর্তীতে 'Bangladesh : State of the Nation' শীর্ষক বক্তৃতাকে একটি বইতে রুপান্তর করা হয়েছে। লেখালেখির প্রতি তার প্রচুর অনাগ্রহ ছিলো সে নিজেই স্বীকার করতো। তার অনেক ছাত্র-ছাত্রী তাঁকে উৎসর্গ করেছেন তাদের নিজেদের বই। এমনকি ডিক উইলসন তার 'এশিয়া অ্যাওয়েকস' বইটা আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে উৎসর্গ করেছেন। উৎসর্গপত্রে লেখা হয়েছে, 'টু আব্দুর রাজ্জাক অফ ঢাকা, হু ফার্স্ট মেড এশিয়া কাম এলাইভ ইন মাই মাইন্ড।' তবে উনার সম্পর্কে সবচাইতে বেশী জানা যায় তার ছাত্র বাংলাদেশের সাহিত্যের আরেক উজ্জ্বল তারা আহমদ ছফা রচিত 'যদ্যপি আমার গুরু' এই বইটি থেকে। এছাড়াও, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ ব্যবস্থাঃ অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা' এই নামে সরদার ফজলুল করিম এর একটা বই আছে। আর 'জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক' নামে একটা ফাউন্ডেশন আছে যেখান থেকে যা সম্ভব গবেষণার জন্য অর্থসাহায্য দেয়া হয়ে থাকে। আর স্যারের সকল দুর্লভ আর দুষ্প্রাপ্য বইসমূহ নিয়ে ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরের উল্টোদিকে 'জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ' নামে এক লাইব্রেরী চালু আছে। যেখানে আপনি গবেষণা ছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে জ্ঞানী হওয়ার জন্য আমন্ত্রিত।
সবশেষে বলছি বইটাতে অনেক একঘেয়েমি আছে কেননা এটা শুধুমাত্র স্মৃতিচারণ মূলক এক গ্রন্থ। এতে নেই কোন সাহিত্যরস, নেই কোন গল্প, নেই কোন কল্পনারস; আছে শুধু একগাদা জ্ঞানের কথা, একজন মনীষীর সাধারণ জীবনযাপন এর কথা, স্যারের জ্ঞানের মাধুর্যতা আর মহিমার কথা। আমার এমন সব মানুষ ভালো লাগে। ভালো লাগে সাদা মনের মানুষের ব্যাপারে জানতে। মুদ্ধ হয়েই পড়ি আমি এরকম প্রবন্ধ গ্রন্থ। কিন্তু আমার ভাবনা যে বাকি সবার ভালো লাগবে এমনটা নয়। তাই ভেবেচিন্তে পড়ুন। বই কিনুন। বই পড়ুন। বইয়ের সাথেই বন্ধুত্ব গড়ুক।
নিজপ্রসঙ্গ : জ্ঞানতাপস প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক স্যারের নাম জেনেছি প্রথম সাধারণ জ্ঞান এর বই পড়ে। বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক হিসেবেই চিনতাম উনাকে। তার অনেক পরে যা সম্ভব ২০১০/১১ সালের দিকে বেঙ্গল গ্যালারী অফ ফাইন আর্টস এ এক শিল্পীর প্রদর্শনী দেখতে যেয়ে উনার ছবি দেখি সেখানে প্রথম। এর আগে হুমায়ুন আহমেদ এর কিছু লেখাতেও উনার কথা জেনেছিলাম এবং এর পরপরই একজনের উপদেশে আহমদ ছফা রচিত 'যদ্যপি আমার গুরু' বইটা পড়ি। এরপর সরদার ফজলুল করিমের রচিত 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ ব্যবস্থাঃ অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা' এই বইটাও পড়ি। আর তাছাড়া বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য পেইজে অনেকের সাক্ষাতকারে উনার জ্ঞানের মহিমা আর বর্ণনা শুনেছি। তার পর থেকেই উনার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ অনুভব করি। একটা কথাই ঘুড়ে ফিরে মনের গহীন কোনে, "স্যার এভাবে আমাদের বঞ্চিত করতে পারলেন"....?