শিকার কাহিনীগুলি এখন ইতিহাসের মতোই অতীতের নীরব সাক্ষী। এ বইয়ের কাহিনীর নায়ক যারা তাঁরা সকলেই বঙ্গসন্তান, এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ভূ-সামন্ত ও জমিদার। কাহিনীগুলি তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্বৃদ্ধ এবং বেশিরভাগ শিকারের পটভূমিকা অবিভক্ত বাংলার। অধিকাংশ কাহিনীই বর্তমানে দুর্লভ। এ বইয়ের পাতায় পাতায় পাঠকেররা পুনরাবিস্কার করবেন শিল্পী ময়ূখ চৌধুরী (প্রসাদ রায়) কে।
বেশ চমৎকার একটি বই। যাদের শিকারকাহিনী পছন্দ, করবেট আর এন্ডারসনে ভালোবাসা আছে, নিজেকে আরণ্যক হিসেবে ভাবতে ভালো লাগে, তাদের জন্য এ বইটি বেদ স্বরূপ। পাতায় পাতায় শ্রীযুক্ত ময়ূখ চৌধুরীর অজস্র গা চমকানো চিত্রকর্ম, সাথে প্রচুর দুষ্প্রাপ্য ফটোগ্রাফ - সব মিলিয়ে বইটি এক জীবন্ত দলিল।
লেখাগুলোও দারুণ। অরণ্যে হারিয়ে যাবেন। বাঘ, চিতা, মহিষ, কুমির, ভাল্লুক, হায়না ইত্যাদি সবধরণের জীবজন্তুই এসেছে। সব কটা রচনা সরেস না হলেও বীভৎস, জঙ্গলের ভ্রুকুটি, শিকারের কথা - এ অভিজ্ঞতা গুলো বেশ। শিকারী রা যে সবসময়ই সাহিত্যিক হবেন তার গ্যারান্টি নেই। তাই কিছু লেখার সরলতাকে স্বীকার করে নিতে হবে।
পরিশিষ্টে ভারতের জঙ্গল, জীবজন্তু, তাদের শিকারের উপায়, বন্দুকের প্রকারভেদ, ভারতের স্যানচুয়ারি ও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের পশুসম্ভারের বিবরণ - ইত্যাদি এসেছে।
শুধুমাত্র চমৎকার সব চিত্রের জন্যই বইটিকে ১০০/১০০ দেয়া উচিত। আমি ৪/৫ দিলাম কেবল কিছু অভিযানের গল্প তেমন জম্পেশ হলোনা বলে। একান্তই নিজের রেটিং।
ময়ুখ চৌধুরীর ইলাস্ট্রেশনের জন্য ফুল মার্কস। কিছু গল্প গাঁজাখুরি। কিছু বেশ দুর্ধর্ষ। প্রমথ চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কুমুদনাথ চৌধুরী যে একজন দুরন্ত শিকারি ছিলেন এই তথ্যটুকু জানা ছিল শুধু কিন্তু তাঁর শিকার অভিজানের কাহিনী পড়া ছিল না। ওনার কয়েকটা কাহিনী আছে এই বইয়ে। কুমুদনাথ চৌধুরী ছাড়া আর কোন শিকারিকে ঠিকঠাক চিনতে পারলাম না।
পুরোনো গল্প হলেই নিতে হবে কেন? কয়েকটা গল্প পড়ে জাস্ট বিরক্ত হয়েছি। গল্প রসকষহীন বলেই মনে হয়েছে। তবে বেশ কয়েকটা দারুণ ছিল। বইয়ের শেষদিকে হাবিজাবি না দিলেও হয়তো ভালো হতো। আদতে মানুষ এই বইটা গল্প পড়ার জন্যই কিনবে, সেটাকে শেষ দিকে শিকারিদের গাইডবুক বানাতে যাওয়াটা বেখাপ্পা লাগলো
জঙ্গলের প্রসঙ্গ উঠলে কি মনে পড়ে আপনার? আপনি- “ আফ্রিকা” জঙ্গলের রাজা? আপনি- “ সিংহ” শিকারি? আপনি-“ জিম করবেট, কেনেথ অ্যান্ডারসন” শিকারের মতো ‘খতরনাক খেল’ এর প্রসঙ্গ উঠলে লালমুখো সাহেবদের নাম মনে আসা অস্বাভাবিক নয় মোটেই। কোলবালিশ আঁকড়ে ভাতঘুম দেওয়া বাঙালীর সাথে শিকারির সাহস, ধৈর্য্য, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, ইস্পাতকঠিন মানসিক কাঠিন্যকে ঠিক মেলানো যায়না। আমাদের এমন মনোবৃত্তিকে ‘কলোনিয়াল হ্যাংওভার’ বলা চলে কিনা সেই তর্ক নিস্প্রয়োজন। তবে সেকালের কয়েকজন বাঙালীও হিংস্র শ্বাপদকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল। শ্বাপদের নরমাংস লোলুপ চাহনির প্রত্যুত্তরে দিয়েছিল গরম কার্তুজ। ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়, কুমুদনাথ চৌধুরী, দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীদের মতো সাহসী বাঙালিদের প্রতক্ষ্য শিকার অভিজ্ঞতার সংকলন এ বই। শ্রী বিশু মুখোপাধ্যায় প্রায় পাঁচ দশক আগে ‘বিখ্যাত শিকার কাহিনী’ নামে একটি বই সম্পাদনা করেছিলেন। সে বই এখন বিলুপ্ত। সেই বইয়ে সঙ্কলিত কাহিনী এবং আরও কয়েকটি দূর্লভ শিকার কাহিনী নিয়ে বিশ্বদেব গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদনা করেছেন- ‘বাঙালির দুষ্প্রাপ্য শিকার অভিযান’। সেই সাথে রয়েছে ময়ূখ চৌধুরী অঙ্কিত একশোটিরও বেশী অলঙ্করণ। ‘আরণ্যক’ ছদ্মনামে ময়ূখ চৌধুরী লিখেছিলেন শিকার নিয়ে সত্যঘটনা-‘ জঙ্গলের ভ্রূকুটি’। স্থান পেয়েছে সেটিও। সেকালের শিকার হত তিন রকমের। মাচায় বসে শিকার। হাতির পিঠে হাওদায় চেপে শিকার। জলায় পাখি শিকার। শিকারের শেষের ধরনটি মজলিশি। শীতের শুরুতে কাছেপিঠের কোনো জলায় বন্দুক ছুঁড়ে শিকার হত পাখি। মূলত গ্রে গুজ, ফিজেন্টের মতো সুস্বাদু খাদ্যযোগ্য পাখি। সন্ধ্যেয় ক্যাম্পে ফিরে মৌজ করে পাখির রোস্ট খাওয়া। যে সমস্ত অঞ্চলে জঙ্গল খুব ঘন, বড় বড় ঘাসের সারিতে পথ চলা দায় সে সমস্ত অঞ্চলে শিকারের দ্বিতীয় ধরনটির প্রচলন ছিল। হাতির পিঠে হাওদায় চেপে প্রচুর লোকলস্কর নিয়ে শিকার অভিযান। তাতে খরচও হত প্রচুর। এই ধরণের শিকারের মূলত আয়োজক ছিলেন রাজা রাজড়ারা। এ বাংলার রাজারা তখন সাহেবদের বেতনভোগী তোষামোদকারী। রাজত্ব গিয়েছে বহুকাল। কিন্তু রাজকীয় ঠাট তো ফুরোবার নয়। রাজকীয় মেজাজ প্রদর্শনের মাধ্যম হল শিকার। শরতের শুরুতে হাতির পিঠে হাওদায় চেপে লোক লস্কর নিয়ে রাজা করেছেন শিকার যাত্রা। নামজাদা শিকারিরা রাজার অতিথি। রায়বাহাদুর বাগাতে সাহেব মেমদেরও করা হয়েছে নেমন্তন্ন। শিকারের পিছনে বন্দুক নিয়ে ধাওয়া করার দস্তুর রাজার জন্যে নয়। তাঁর জন্যে অন্য ব্যবস্থা। একদল মুটে মজুর গরীব গুর্বোকে রাখা হয়েছে জঙ্গল ‘বিট’ করার জন্যে। তারা জঙ্গলে ঢুকে বিচিত্র আওয়াজ করে ঢাক-ঢোল ক্যনেস্তারা পিটিয়ে বন্য জন্তুদের পিলে চমকিয়ে খেদিয়ে নিয়ে যাবেন জঙ্গলের অন্যদিকে, যেদিকে রাজা তাঁর অতিথি সমভ্যিবহারে হাতির পিঠ থেকে বন্দুক তাক করে আছেন। তারপর একের পর এক গুড়ুম গুড়ুম। জন্তুর লাশ পড়বে টপাটপ। শিকার শেষে লাশ গুলোকে বাঁশে বেঁধে বয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। এক হাতে বন্দুক, এক পা লাশের উপর রেখে বুক ফুলিয়ে শুরু হবে রাজা রাজড়ার ফটোসেশন। তবে ব্যতিক্রমীও তো কেউ কেউ ছিলেন। যেমন ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়। লালগোলার মহারাজ। হাতির পিঠে চেপে করতেন বাঘ শিকার। কোথাও মানুষখেকোর উপদ্রব হলেই তাঁর কাছে পৌছত তার- “ Tiger waiting come sharp”। বন্দুকে টোটা ভরে চললেন শিকারে। সেসমস্ত শিকার অভিজ্ঞতাই বেশ রসিয়ে লিখতেন দেব সাহিত্য কুটিরের পূজাসংখ্যায়। স্থান পেয়েছে সেগুলিও। যারা দক্ষ অভিজ্ঞ শিকারি, বুকের পাটা আছে যাদের, সেসমস্ত পেশাদার শিকারিরা করতেন মাচায় বসে শিকার। যেমনটা করতেন সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর বড়দা কুমুদনাথ চৌধুরী। শক্তপোক্ত কোনো গাছে বেশ উঁচুতে মজবুত করে বাঁধা হত মাচা। সন্ধের একটু আগে শিকারি সাজ সরঞ্জাম নিয়ে উঠতেন মাচায়। তার থেকে বেশ কিছুটা দূরে থাকে ‘মড়ি’( আধ খাওয়া মৃতদেহ)। বাঘ সে মড়ি খেতে আসে। তখনই অব্যর্থ নিশানায় গুলি ছোড়ে শিকারি। শুনতে বেশ সহজ লাগলেও সহজ নয় মোটেই। ধৈর্য ধরে স্থির হয়ে বসে থাকতে হয় মড়ি লক্ষ্য করে। কোন রাতে বাঘ আর আসে না। একটুও ভুল চুক হলে শিকারির প্রাণ সংশয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কুমুদনাথের মতো অভিজ্ঞ শিকারিও মধ্য প্রদেশের জঙ্গলে বাঘের থাবায় প্রাণ খুইয়েছিলেন। এই বইতে তিন ধরনের শিকার অভিযানই রয়েছে। আছে মজলিশি মেজাজ। রোমাঞ্চের হৃদকম্প। এই বইতে সংকলিত হয়েছে যে ব্যক্তিবর্গের শিকা��� সমস্ত শিকার অভিজ্ঞতা, তাঁদের কেউ কেউ নিজের হাতে বন্দুক ধরে শিকার করেছেন, কেউ প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন কোনো শিকার অভিযানের। প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতা অনন্য। এদের অনেকেই পেশাদার সাহিত্যিক ছিলেন না, তাই এসমস্ত কাহিনী সাহিত্যমূল্যের নিরিখে বিচার্য নয়। তবে সাহিত্যিক প্রবোধ কুমার সান্যাল, শিকারী ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়, কুমুদনাথ রায়ের শিকার কাহিনী গুলি লেখনীর গুণে রোমহর্ষক ও সুখপাঠ্য। এই বইয়ের পরিশিষ্ট অংশটি জবরদস্ত। আছে শিকারের সাজ সরঞ্জামের বিস্তারিত ব্যাখ্যা। শিকার নিয়ে বিখ্যাত বাঙালি শিকারিদের মূল্যবান মতামত। শিকার সম্বন্ধীয় শব্দবন্ধের বিস্তারিত ব্যাখ্যা। দুস্প্রাপ্য শিকার গ্রন্থের সুলুক সন্ধান। সেই সাথে বিখ্যাত বাঙালি শিকারীদের প্রচুর দূর্লভ আলোকচিত্র। Wild life Protection Act, 1972 অনুযায়ী যে কোনো বন্যপ্রাণ হত্যাই এখন দন্ডনীয় অপরাধ। মানুষের বিলাসিতার কাছে জীববৈচিত্র যখন বিপন্ন, আইন প্রণয়নের প্রয়োযনীয়তা সেখানে অনস্বীকার্য। শিকার কাহিনী পড়ে রোমাঞ্চিত হতে বাধা কোথায়! সেকালের এই সব শিকার কাহিনী পরিচয় করিয়ে দেয় কিছু সাহসী বাঙালির সাথে। তাঁরা ছিলেন না ‘ অন্নপায়ী বঙ্গবাসী’, ‘স্তন্যপায়ী জীব’। তাঁরা শ্বাপদের চোখে চোখ রেখে বন্দুক উঁচিয়ে ধরেছিলেন।
পুরানো দিনের সত্য অভিজ্ঞাতালব্ধ শিকার কথা.... OR A Brief History Of Mindless and Unnecessary Slaughter Of Animals By Zamindaars, Rajas and Men with immense Pride.