সেইসব পাঠকেরা, যাঁরা কবিতাকে বোঝেন, যাঁরা কবিতার শরীরের ভাঁজে খুঁজে পান অমৃতের সন্ধান আর সর্বনাশের স্বাদ, তাঁদের আমি ঈর্ষা করি। কেন জানেন? কারণ আমি ওসব কিচ্ছু পারি না। বরং, সারারাত কবিতার পাশে শুয়ে, তার বন্ধ চোখের আড়ালে অপার শান্তির কথা ভেবে, শেষরাতে বা ভোরে তার গায়ে একটা পাতলা চাদর টেনে দিই আমি, যাতে ঠাণ্ডায় সে কষ্ট না পায়। আর উঠে পড়ি! আমাদের মতো নিষ্ফলের, হতাশের দলে থেকে যাওয়া লোকেদের তাহলে কী পড়া উচিৎ? আমাদের না-হওয়া, অবুঝ আর অব্যক্ত প্রেম নিয়ে তাহলে কি কোনোদিন লেখা হবে না কোনো মন্দাক্রান্তা বা চতুর্দশপদী? বছরখানেক আগে ফেসবুকের পাতায় এক আশ্চর্য লেখকের সন্ধান পেয়েছিলাম। চিতা আর কবরখানার মধ্যে ছুটোছুটি করার সেই দিনগুলোয় আমার মতো অজস্র বেঁকে যাওয়া, ঝুঁকে যাওয়া, হেরে যাওয়া পাঠক দিন শুরু করতেন সেই মানুষটির লেখা কয়েকটি অনুচ্ছেদ পড়ে, যাতে আমাদের কালো আর চুপসে যাওয়া ফুসফুসে ভরে নেওয়া যায় কিছুটা সুবাতাস। সেই মানুষটি, যাঁর অপাপবিদ্ধ সরলতা আর মানুষের ওপর আজও টিঁকে থাকা দুর্জয় বিশ্বাস আমাকে তখন অবাক করত, আবার পরিত্রাণায় সাধু(?)নাম হয়ে এলেন কবিতার এই যুদ্ধবিধ্বস্ত ময়দানেও। তারপর তিনি কী লিখলেন? এই শীর্ণকায়, তৌসিফ হক-কৃত হৈমন্তী কুয়াশার মতো অলৌকিক অলংকরণে সমৃদ্ধ বইটি শুরু হয়েছে যে কথামুখ দিয়ে, সেটাই তুলে দিই বরং: "অবৈধতার 'ভূমিকা' থাকে না কোনো, 'উপসংহার' নিশ্চিতভাবে থাকে। নদী চলে যায় নিজের ছন্দে, শুধু মরা গাছখানা দাঁড়িয়ে রয়েছে বাঁকে....." বিশ্বাস করুন, হে পাঠক, আমার সর্বাঙ্গ শিউরে উঠল এই লাইনগুলো পড়ে। এ কী??? এইভাবে, নিতান্ত সহজ ক'টা লাইনের মাধ্যমে আমাদের না বলা, অনুপলব্ধ পূর্বজন্মের মতো করে স্বপ্নের মধ্যে হাতছানি দেওয়া এত কথা কীভাবে বলে দিলেন লেখক? তারপর একে-একে পড়ে ফেললাম 'দ্বিচারী', 'বোধন', 'প্রত্যাখ্যান', 'দ্বিধা'..... আর আমার সব কথা ফুরিয়ে গেল। এই ভীত, আত্মসর্বস্ব, দিনরাত্রি একাকার হয়ে যাওয়া জীবনে অনেক কিছুর মতো প্রেমটাও করে উঠতে পারিনি, যা পেরেছি তা শুধুই অভ্যাস। কিন্তু এই প্রথম, এই প্রথম আমার মনে হল, আমার জীবনেও বলার মতো, অনুভব করার মতো, প্রেমের কবিতা হয়। পড়বেন সেই কবিতাটা?
"যাওয়ার সময় হলে অনায়াসে চলে যেতে হয়। পিছনে তাকাতে নেই, অকল্যাণ হতে পারে তাতে... পদক্ষেপ দৃঢ় থাকবে, মাথা থাকবে সটান, উন্নত - দৃষ্টি ঋজু; মৃদু হাতে খুলে ফেলতে হবে পিছুটান, চোখে জল এলে কিন্তু যাত্রাপথে বাধা হতে পারে! যাওয়ার সময় হলে এইভাবে চলে যেতে হয়।
এভাবেই অনায়াসে যেতে হয়, কেননা নাহলে যে যায়, সে থেকে যায়; যে থাকে, সে ততটা থাকে না... এ সব জটিল তত্ত্ব হা হা ক'রে কেঁদে উঠতে পারে! যাওয়ার সময় হলে, তাই... শুধু চলে যেতে হয়...."
আমার আর কিছু বলার নেই। আমি জানি না আপনি সেই সৌভাগ্যবান সফল মানুষদের মধ্যে পড়েন কি না, যাঁরা কবিতাকে বোঝেন, চিনে নিতে পারেন তার ধার ও ভার, আলাদা করে নিতে পারেন তাকে ছদ্মবেশের আড়াল থেকেও। যদি হন, তাহলে আমি জানি না এই সহজ, সরল কথাগুলো আপনাকে ছুঁতে পারবে কি না। কিন্তু, যদি আপনি আমারই মতো এক নিতান্ত সাধারণ মানুষ হন, যে কবিতাকে আড়চোখে দেখে, যে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চায় কবিতার গাল, কিন্তু তার জন্য বাসের সিটটা ছেড়ে দেওয়াতেই যার দৌড় শেষ হয়..., তাহলে এই বইটা পড়ুন। হয়তো, হয়তো যে কথাগুলো আজ অবধি বলে উঠতে পারেননি, বা বলা তো দূরের কথা, ভেবেও উঠতে পারেননি, সেই কথাগুলো পড়তে পেয়ে আপনিও ভাববেন, "একলা কোনো গাছের মতো পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকবো; কেননা তুই বলে গেছিস - 'একটু দাঁড়াস। ফিরে আসবো।'"
'তুই' পড়ুন। আমার ধারণা আপনার ভালো লাগবে। তাছাড়া, অনেক-অনেক দিন আগে সেই মানুষটি তো বলেই গেছেন, "সহজ জিনিসের গুণ এই যে, তাহার স্বাদ কখনোই পুরাতন হয় না, তাহার সরলতা তাহাকে চিরদিন নবীন করিয়া রাখে।" এই ভীষণ সহজ কথাগুলোও তাই পুরোনো হবে না। ভালো থাকবেন।
অবৈধতার 'ভূমিকা' থাকে না কোনো, 'উপসংহার' নিশ্চিতভাবে থাকে,,,,,,
এই পৃথিবীতে যদি সত্যি বলে কিছু থাকে, বৈধ বলে কিছু থাকে তাহলে তা হলো প্রেম। অপ্রেমের জীবনগাথায় প্রেম হলো সেই অমৃত, যা আমরা প্রতিনিয়ত আশ্লেষে পান করি । সাংসারিক জীবনে রোজনামচার পাতা জুড়ে চলে শুধুই নিয়মের দিনযাপন। আলমারির ওপরের তাকে পরিপাটি করে রাখা যে ভালোবাসা,তা ব্যবহারহীন অযত্নের ধুলোয় মাখামাখি। সংসারের চাকা পিষে টনটনে ব্যথা, কিন্তু ঘানি থেকে না তেল না প্রেম,কিছুই বেরোয় না। অপ্রেমের স্বাদে তখন মুখ বুক ভরা। তাতেই সুখী সুখী ভাবে সকাল সন্ধ্যে কেটে যায়।
"ছেঁড়াখোঁড়া এই জোড়াতালি সংসারে দু-একটা কথা অবিচল যন্ত্রণা! দু একটা কথা এখনও অনশ্বর, তোকে বলব না..কিছুতেই বলব না,,,,"
জগতে সব মানুষের একটা নিজের পৃথিবী থাকে । সেই পৃথিবীতে মানুষ চারা গাছ পোঁতে। গাছে ভালোবাসার পাতা হয়, আদরের ফুল ফোটে, স্বপ্নের ফল ফলে। পৃথিবী জুড়ে শুধু আনন্দ আর আনন্দ । সূর্যের আতপ গায়ে লাগে না, রাতের তারাভরা আকাশে চাঁদের আলো মোহময় হয়ে ছড়িয়ে থাকে। ভালোবাসার উঠোনে তখন চাঁদের গায়ের গন্ধ। বেল, জুঁই, কামিনীর সুবাসে ফুসফুস ভরে থাকে। এই পৃথিবী জুড়ে শুধু প্রশান্তি, তৃপ্তি আর আকন্ঠ অমৃতসুধা। একঝলক দেখা আর এক পয়োধি হাসি , অনাবিল ভালোবাসার পৃথিবীকে আলাদা করে দৈনন্দিন কেজো জগৎ থেকে। আর সমাজ তার নাম দেয় পরকীয়া।
"ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনেক বলেছি -"যাই"। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনেক বলেছি - "আসি"। অনেক বলেছি-"আসলে জানিস..." ।আজ সরাসরি বলি-"ভালবাসি... ভালবাসি,,"-
হাতে এখন সেই পরকীয়ার পদ্যগুচ্ছ, সেই অবৈধতার কাব্যকথা। লেখক ও কবি রাজা ভট্টাচার্যের "তুই" কবিতার বই নিয়ে মুগ্ধ আবেশে বিহ্বল আমি। প্রেম , তাও আবার পরকীয়া!! আর তা নিয়ে পাতার পর পাতা শুধু কালো অক্ষরে শব্দ বোনা। করেছেন কী রাজামশাই!!
"তুই হইহই হাসাহাসি আমি দ্বিধায় দ্বিধায় দিন,,, আমি সাড়া দেব কিনা ভাবি তুই আহ্বানে দ্বিধাহীন।
আমি সামলে রেখেছি ছাতা তুই বৃষ্টি হলেই ছাতে তোর ভুরুতে জলের ফোঁটা আমি ছুঁয়েছি অলীক হাতে।"
এই বই পড়ে যে প্রেমে পড়বে না, তার নিশ্চিত হৃদয় নেই, গোপন ভালোলাগা নেই, প্রেমে ডুবে যাওয়ার বাসনা নেই।
"আমাকে তুই ছাড়িস না রে, আঁকড়ে রাখিস। যাবার কথা বললে বেদম ঝগড়া করবি, ভুরুর খাঁজে সাত সমুদ্র ঢেউ তুলে দিক, চোখের কোলে ঝিকিয়ে উঠুক স্রোতস্বিনী!"
পরকীয়া প্রেমের কত পর্যায় যে এই বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে, খুনসুটি থেকে কাতর আকুতি। কখনো প্রেমের প্রতিশ্রুতিতে অটুট বিশ্বাস, কখনো অস্থিরতা আর শেষে বিরহ। পরকীয়ার অমোঘ পরিণতি শুরুতে ফিরে আসা। সংসার ভেঙে বেরিয়েছে কজন,ফিরেছে তার থেকেও বেশি, কেউ বোলে তো কেউ কান্না চেপে, 'এমন কাঙাল ক'রে কেউ কাউকে ফেলে যায় নাকি?"
"সব কিছু ব্যাগে ভরে কী নিশ্চিন্তে চলে গেলি তুই! শুভঙ্কর-নন্দিনীর ছেঁড়াখোঁড়া কথোপকথন, সব সুমনের গান,লন-ভরা হলুদ বিকেল, নীলাভ ওড়নার রাত,,,সব নিয়ে দিব্যি চলে গেলি!"
এই বই হয়ত পরকীয়া প্রেমের কবিতা, কিন্তু আমার মনে হলো এই কবিতাগুলো শুধুই প্রেমের কবিতা, প্রেম যেখানে বানভাসি, প্রেম যেখানে ভরসা বিশ্বাস,প্রেম যেখানে নিজেকে ভুলে যাওয়া, যেখানে বসে জিরিয়ে নেওয়া যায়, সেখানে অনায়াসে এইসব কবিতার স্বছন্দ বিচরণ। "আমাকে তুই যতটা ভালো ভাবিস আসলে আমি ততটা ভালো না রে; যেই না তুই পিছন ফিরেছিস অমনি মন চুমু খেয়েছে ঘাড়ে।"
বিরহের কবিতা দিয়ে বইয়ের সমাপ্তি, আসলে তো ছেড়ে যাওয়ার মধ্যে অদ্ভুত ধরে রাখা থেকে যায়। সবটা ছেড়ে যাওয়া কী যায়। তলানিতে লেগেই থাকে। সিজন চেঞ্জের জ্বরের মত ঘুরে ফিরে আসে বারবার।
" এভাবেই অনায়াসে যেতে হয়, কেননা নাহলে যে যায়, সে থেকে যায়; যে থাকে , সে ততটা থাকে না,,,"
বইয়ের মুদ্রণ, বাঁধাই অনবদ্য। ক্যাফে টেবিলকে ধন্যবাদ এমন অপূর্ব উপস্থাপনার জন্য। আর কবিকে কুর্নিশ।,😊
"তুই" - রাজা ভট্টাচার্য দ্য ক্যাফে টেবল মুদ্রিত মূল্য ₹১৭৫ (২০২২)
প্রেম অবিনশ্বর, চিরকালীন। এই কাব্য সংকলনের প্রতিটি কবিতাই কবিতাপ্রেমী, সংবেদনশীল মানুষের মনের কাছাকাছি।
✓ইচ্ছাপত্র কানীন কামনা নিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে সাদা পাতা- 'কতটুকু লেখা যায়?' ভেবে যাচ্ছে হাতের কলম। কতটুকু লিখে ফেললে শেষ হয় একটি কবিতা? কত শব্দ পার হলে? কতখানি কাটাকুটি খেলে? কতটা আদর করলে? কতবার নতজানু হলে? কতবার একরাশ কালো চুল ঢেকে ফেললে মুখ- অকস্মাৎ সন্ধ্যা নামলে কতবার... অশ্রু মুছে ফেলে... আবার কলম ধরলে লেখা যায় একটি শব্দ - 'প্রেম'। হে প্রেম! হে বহ্নিমান! তবে এসো মৃত্যুর মতন! প্রেম! চিতা কাষ্ঠ হও। আমি তবে শান্ত হয়ে পুড়ি।
✓প্রত্যাশা কেঁদেছি খুব রাতে বৃষ্টি হলে ভাসিয়ে চোখ নয়ানজুলি জলে গিয়েছি দূরে কাছে আসবো ভেবে- ফিরে আসবো ভালোবাসবো ব'লে। ফিরে আসবো, কথা দিলাম তোকে সেবার হোস একটু দ্বিধাহীনা সেবার ঠিক চোখ রাখবো চোখে আমাকে তুই আদর করবি না?
✓রাত পবিত্র নক্ষত্রপুঞ্জ! তোমরা ওই মেয়েটিকে চেন। জানলার পাশে ব'সে বহু রাত কাটালো যে মেয়ে তাকে তোমরা চিনে নিয়ে চিহ্নিত করেছ ভালোবেসে ওকে আমি এই রূপে কোনোদিন দেখিনি কখনো। পবিত্র নক্ষত্রপুঞ্জ! তোমরা ওকে সারারাত দ্যাখো! জানলার ফ্রেমে আঁকা অনেকে তপস্বিনী মুখ... সেও তোমাদের দ্যাখে! লক্ষ চোখ মেলে মহাকাশ বিনিদ্র তাকে দ্যাখে - সে অবশ্যই কথা বোঝে না।। পবিত্র নক্ষত্রপুঞ্জ! তোমাদের নীল চোখ থেকে দুখানি শিশিরবিন্দু ঝরে যাক ওর দুই চোখে ওর চোখে শান্তি লেখো... প্রেম লেখো... ঘুম লেখো... ঘুম... আমিও যে জেগে আছি জানালায়, সে কথা লিখো না!!