একজন বালক আর তার শিক্ষক বন্ধু হলে সেই বন্ধুত্বটা কেমন হবে? সুসাহিত্যিক শওকত ওসমানের ‘ছোটদের কথা রচনার কথা’ বইটি পড়লে, তার সহজ একটা ছবি আমরা দেখতে পাই। এক কিশোর বালকের সাথে শিক্ষকের বন্ধুত্বের গল্প নিয়ে এই বইটি। বইটি আসলে লেখা শেখার ওপর একটি বই। গল্পের মতন বইটি পড়তে পড়তে ‘কীভাবে লিখতে হয়’ সেটা খুব পরিষ্কার হয়ে যায়। বইটি ছোটদের জন্য খুব ভাল। সে যে কোন বিষয়ে সহজে দুকথা লিখতে শিখবে। কিন্তু আমাদের বড়দের জন্য এই বইটি পড়া শুধু ভাল নয়, এটা জরুরি। বড় মানে শিক্ষক, বাবা-মা-বড় ভাইবোন- যারা ছোটদের বড় করেন। কোন বাবা এবং মা এই বইটি পড়লে- তাদের সন্তানদের লেখার ক্ষমতা, জানার দক্ষতা একটু হলেও বাড়বে।
Shawkat Osman (Bengali: শওকত ওসমান; Sheikh Azizur Rahman; 1917 – 1998) was a Bangladeshi novelist and short story writer.Osman's first prominent novel was Janani. Janani (Mother)is a portrait of the disintegration of a family because of the rural and urban divide. In Kritadaser Hasi (Laugh of a Slave), Osman explores the darkness of contemporary politics and reality of dictatorship.
Awards Bangla Academy Award (1962) Adamjee Literary Award (1966) President Award (1967) Ekushey Padak (1983) Mahbubullah Foundation Prize (1983) Muktadhara Literary Award (1991) Independence Day Award (1997)
বিকেলে কোন কাজ না থাকায় অহেতুক পুরনো বইয়ের দোকানে বই আর পত্রিকার জঞ্জাল ঘাটছিলাম। দোকানি চাচা বলতেছিলো নিবার মতো কোন বই আসেনি, আর এমনভাবে বলতেছি যেন না-আসাটা উনারই অপরাধ। তবু কি ভেবে যেন আমি বস্তাটস্তা খুলে কোন মূল্যবান কিছু বের করবোই ভঙ্গিতে স্তূপ ঘাটছিলাম। আমার সংগ্রহের অনেক চমকপ্রদ আর মূ্ল্যবান বই আক্ষরিক অর্থে ছাই ঘেটে হীরক বের করা কায়দায় পুরনো বইয়ের দোকান থেকে সংগ্রহ করা। এভাবে শওকত ওসমানের এই চমৎকার বইটি আমার হাতে আসে।
আমার কৈশোরকালে কেনো এটা পাইনি ভেবে আফসোস হচ্ছে। বইটি বড়দের নিকট আহামরি কিছু মনে হবেনা। তবে ছোটবেলায় এরকম একটি বই একটা কিশোর-কিশোরীর জীবন পাল্টে দিতে পারে। বইটির বিষয়বস্তু- কেনো লেখা লিখতে হয় এবং কিভাবে লিখতে হয় সেইবিষয়ক ছোটদের উপযোগী করে অত্যন্ত মনোগ্রাহী ও নানা গল্পোচ্ছলে দিকনির্দেশনা দেয়া। শিশুকিশোরদের মনে রচনা সৃষ্টির আনন্দবীজ বুনে দিবে এই বইটি। শিশুকিশোরদের হ্নদয়ে সাহিত্যের প্রতি উৎসাহসঞ্চার করবে। প্রাক-স্বাধীনতা আমলে বাংলা একাডেমি থেকে এতো চমৎকার বই বের হয়েছে অথচ বর্তমানে এরকম শিশুসাহিত্য বাংলা একাডেমি বের করছেনা কেনো ভাববার বিষয়। বর্তমান উঠতি বয়সীদের হাতে মোবাইল-ট্যাবের পরিবর্তে এরকম বই হাতে তুলে দেওয়া উচিত।
আহা......আহা.....আহা..... বই, নাকি মোলায়েম সন্দেশ? ট্রেনের কু-ঝিক ঝিক, শীতের সকালে উঠানে বসে বাটিতে মুড়ি খাওয়া, শেয়ালের হুক্কা-হুয়া, ছাত্রের সাথে শিক্ষকের সম্পর্ক..... কি নেই এতে! গল্পের ছলে বলা, কিন্তু আসলে গল্পের চেয়েও বেশি। চিরায়ত বাংলার সোঁদা গন্ধ যেন পাতায় পাতায়। সাথে আছে হাশেম খানের ক্লাসিক সব ইলাস্ট্রেশন। বহুবছর পরেও যদি কেউ বুকে জড়িয়ে ধরে বইটা, একনিমিষে ছোটবেলায় চলে যাবে সে। এ ছোটবেলা সেই ছোটবেলা, যাকে আমরা কেউ দেখিনি, কিন্তু যাকে আমরা সবাই দেখতে চাই। এ বই যার কৈশোরসঙ্গী, তাকে কেউ হিংসা করলে তাতে আমার একটুও আপত্তি নেই।
হোসেন আলী নামের একটা কিশোরের শৈশবকালের কিছু অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বইটা লেখা৷ তবে, লেখকের মূল উদ্দেশ্য ছিল কিশোরদের বিভিন্ন সুন্দর অভ্যাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়াঃ
- চিঠি লেখা - "রচনা" কীভাবে আসলে লিখতে হয় তার নমুনা দেয়া। (এই অংশটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে) - কবিতা পড়া
গল্পের ভঙ্গিমায় নানান শিক্ষনীয় দিক তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। পড়ে মনে হচ্ছে, ছোটবেলা থেকে একজন মানুষকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই ধরণের বই সত্যিই খুব উপকারী।
বই থেকে পাওয়া কিছু তথ্যঃ
১. মৌমাছির চোখ আড়াই জোড়া (৫টি)। মাথার দু'পাশে দুটো বড় বড়, আর সামনে তিনটে।
২. মৌমাছি কৃষ্ণপক্ষে চাক বানায় আর জোছনা রাতে খেয়ে শেষ করে।
৩. শৃগালের আরেক নাম যামঘোষ ( = প্রহর ঘোষণাকারী)। কারণ এদের ডাক শুনে কত রাত্রি তা আন্দাজ করা যায়৷
৪. সুবোধ বালক যাহা পায় তাহা খায়। কাক ও তেমন। খাদ্যাখাদ্যের বাচবিচার নাই।
৫. অকৃতজ্ঞ মানুষ দেখা যায়। কিন্তু অকৃতজ্ঞ কুকুর দেখা যায় না।
৬. সিংহের ঘাড়ে কেশর আছে, অন্য কোন জন্তুর তাহা নাই।
৭. সাপের মুখ দেখিতে ছোট। কিন্তু চোয়ালের হাড় মানুষের মতো আটকানো নয়। ফলে ইচ্ছা মতো হা করিতে ও বড় বড় ব্যাঙ, ইঁদুর অনায়াসে গিলিতে পারে।
৮. কাগজের আরেক নাম 'আলোক' দেওয়া উচিত। ইহা মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে৷
৯. মনে রাখবে- লেখা শেখার শ্রেষ্ঠ উপায় হল লেখা-লেখা-লেখা। বার বার লেখা।
১০. ভালো গদ্য লেখার জন ভালো কবিতা পড়া উচিত।
১১. তুমি একা, হাতে বই আছে! তাহলে তুমি আর একা নও। তোমার সঙ্গী রহিয়াছে। এমনকি যখন বই থাকে না, তখন বইয়ের কথা তোমার সাথে থাকে।
শওকত ওসমানের 'ছোটদের কথা রচনার কথা': শিশুকিশোরদের জন্য এবং মা, বাবা ও শিক্ষকদের জন্য অবশ্যপাঠ্য একটি বই।
শওকত ওসমান লিখছেন, ভালো রচনার জন্য সহজ সরল মন দরকার। সহজ সরল মন দ্বারাই সহজ সহজ লেখা যায়। একটা বাংলা প্রবাদ বাক্যও শওকত ওসমান আমাদের জন্য তুলে ধরেছেন। ‘কালি, কলম, মন লেখে তিনজন।’ “রচনা শিক্ষার জন্য মনও তৈরি করতে হয়। তার কোন উপায় আছে?” এর উত্তর মাস্টার মশাইয়ের জবানিতে শওকত ওসমান লিখছেন- ‘আছে। তাহা এক কথায় বলা যায়; নিজের দেশকে ভালবাসো। দেশের মানুষ, ফলফুল, গাছপালা, পশুপাখি, নদনদী- সবকিছু যেন তোমার প্রিয় হয়। নচেৎ কোনোদিন ভাল রচনা তোমার দ্বারা সম্ভব হবে না। কারণ, দেশপ্রেম ছাড়া তুমি ভাল মানুষ হতে পারবে না। সৎ মানুষ না হলে সৎ রচনা অসম্ভব। দেশকে ভালবাসো...” আমরা কোথায় লেখার বিষয় পাবো? বইয়ের একেবারে শেষ পৃষ্ঠায় শওকত ওসমান বলছেন- লেখার সন্ধানে নিত্য ছুটে যেতে হয় পথ-ঘাট, বিল-খাল, গিরিদরীময়, ঝোপে-ঝাড়ে গ্রামে শহরে শহরে আমার দেশের লোক যেথা বাস করে; দ্রুত তাঁত বোনে, হাল ধরে, দাঁড় টানে, দরিয়ায় পাড়ি দেয় দুরন্ত উজানে সারা রাত্রিদিন চাকা কলের ঘোরায়... হাজার রচনা সেখানে পড়ে আছে ভাই। http://www.sachalayatan.com/56707