পরিমল ভট্টাচার্য বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। স্মৃতিকথা, ভ্রমণ আখ্যান, ইতিহাস ও অন্যান্য রচনাশৈলী থেকে উপাদান নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক নতুন বিশিষ্ট গদ্যধারা, নিয়মগিরির সংগ্রামী জনজাতি থেকে তারকোভস্কির স্বপ্ন পর্যন্ত যার বিষয়-বিস্তার। ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। কলকাতায় থাকেন।
অধ্যায়ের নামগুলোর দিকে একবার খেয়াল করুন - ঘরহারাদের ঠিকানা, জানলা, সিঁড়ি, আয়না, কক্ষ, দরজা, চিলেঘর, বাগান। মনে হয় কোনো বাসার প্রত্যেকটা অংশের বর্ণনা। সবটা মিলিয়ে গড়ে ওঠা আমাদের থাকার জায়গা, আমাদের বসতি, আমাদের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ, আমাদের স্মৃতি ও বিস্মৃতি। এই বইয়ের সকল অংশ পড়ে আমরা জানতে পারি তারকোভস্কির আন্তর ও বাহ্য জগতের ইতিবৃত্ত। চলচ্চিত্র নিয়ে তার ভাবনা স্বভাবতই তার নিজের চলচ্চিত্রের মতোই আমাদের সমীহ জাগায়। তারকোভস্কি বলেন, "আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র তারাই, যারা বাইরে থেকে স্থানু কিন্তু ভেতরে ভেতরে এক তীব্র আবেগে দপদপ করছে।" চলচ্চিত্রের সাথে তার দেশ, সময়, রাজনীতিও একাকার হয়ে যায় ("আমাদের নস্টালজিয়া আর তোমাদের নস্টালজিয়া এক জিনিস নয়। এটা নিছক একটা ব্যক্তিগত আবেগ নয়, আরও গভীর ও জটিল কিছু যা রাশিয়ানরা বিদেশে গেলে অনুভব করে। এটা একটা অসুখের মতো যা ভেতর থেকে নিংড়ে দেয় সত্তাকে, কর্মক্ষমতা, এমনকি বাঁচার আনন্দও।") প্রিয় স্বদেশভূমি ছেড়ে নির্বাসিত মানুষের অন্তর্দাহ তো এমনই তীব্র হবে! চলচ্চিত্র, জীবনদর্শন, ছেলেবেলা নিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত কথার ফাঁকে তাই অতর্কিতে ঢুকে পড়ে বিষণ্ণতা; যা থেকে আমাদের মুক্তি নেই।
রাশিয়াতে টানা মনখারাপ করা বৃষ্টি হয়৷ যে বৃষ্টির দেখা পাওয়া যায় তারকোভস্কির ছবিতে। আরো দেখা পাওয়া যায় হাওয়াতে দুলতে থাকা সবুজ ঘাস, সাদা বাঙলো বাড়ি, সমুদ্রসৈকতে ঘোড়ার আপেল খাওয়া-এমন সব সাধারণ কিন্তু অসাধারণ দৃশ্য। এইসব দৃশ্যের মাধ্যমে তারকোভস্কি লুক্কায়িত কিছু বলতে চান না৷ সুনিপুণ তুলির আঁচড়ে দেখাতে চান আমাদের চারপাশের বাস্তবতাকে৷ বৃষ্টির আরেকটু গূঢ় অর্থ হয়তো খারাপ আবহাওয়া, এর বেশি কিছুই না। কিন্তু মানুষ তাঁর ছবির পেছনের অর্থ খুঁজে খুঁজে হয়রান। কারণ পর্দায় মানুষ অতি বাস্তবতাকে দেখে বুঝতেও পারে না তারকোভস্কি তাই দেখাচ্ছেন যা তারা নিজেরাই৷ তাদের ভাবনা, তাদের ছেলেবেলা, তাদের স্মৃতি। কারণ তাদের তারকোভস্কির মতো নেই সেই গভীর পর্যবেক্ষণ এর চোখটি। মিরর দেখে অনেকেই জিজ্ঞেস করেছেন তারকোভস্কিকে কীভাবে তাদের ছেলেবেলাটা জেনে ফেললেন তিনি? মাত্র ১১টি ছবির পরিচালক তারকোভস্কি কেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালকদের একজন? কোথায় বিশেষত্ব তাঁর? তারকোভস্কির সৃষ্টি আর তাঁর কলমে লেখা কথামালা থেকে বেছে বেছে সেসব প্রশ্নোত্তর অনুসন্ধান করেছেন পরিমল ভট্টাচার্য। তাঁর আশ্চর্যরকম স্বাদু গদ্যে, অসম্ভব সাবলীল অনুবাদে। অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে আর্সেনিয় তারকোভস্কির কিছু কবিতার অনুবাদ আর জাপানি হাইকু। ব্যঞ্জনাময় এই গ্রন্থটি তাই দাবি রাখে বহুল আলোচনার-একজন সত্যিকার সাহিত্যপ্রেমী আর চলচ্চিত্রপ্রেমী এখানে এসে একাকার হয়ে যান।
" আমার ছবিতে গল্প খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।" -- তারকোভস্কি কোন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন এটা। তাহলে তাঁর ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ কী? এটাও তিনি বলেছিলেন। অথচ আমরা বেশীর ভাগ ছবিতে দেখি সব গল্প নির্ভর। যারা ছবি ভালো বোঝেন বা ভালো ভালো অনেক ছবি যদের দেখার ঝুড়িতে জমা আছে তারা ভালো বুঝবেন এবং এটাও জানেন তারকোভস্কি কে!
রাশিয়ায় জন্ম গ্রহণ করেন, বাবা ছিলেন একজন কবি, এবং নিজে সফল একজন পরিচালক। "মিরর" তাঁর আত্মজৈবনিক ছবি, এখানে তিনি তিনটা সময়কে ( প্রাকযুদ্ধ ৩০ দশক: যুদ্ধকালীন : যুদ্ধপরবর্তী ৬০ দশক), এক সাথে বেঁধে ফেলেছেন।
আন্দ্রেই তারকোভস্কির কিছু দিনলিপি, নির্বাচিত কিছু চিত্রনাট্য, শিল্পভাবনা ও সাক্ষাৎকার অনুবাদ করেই গ্রন্থায়ন করেছেন " তারকোভস্কির ঘরবাড়ি "। লেখক পরিমল ভট্টাচার্য নিজের লেখায় অসাধারণ তবে তিনি অনুবাদে ও সমান দক্ষতা রেখেছেন। পড়তে গিয়ে একবারও মনে হয়নি অনুবাদ পড়ছি।
টুকরো টুকরো সব শৈশব স্মৃতি, ছবি বানানোর গল্প এবং তা পর্দার পিছনের গল্প, সময়, আত্মা, স্বাধীনতা এবং এর সাথে সম্পর্ক যুক্ত নানা বিষয় নিয়ে নিজের ভাবনা, পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজের ও সহকর্মীদের দিক গুলো উঠে এসেছে।
ছবি দেখার আগ্রহ আমার খুবই কম, নাই বললেই চলে, তাই দেখা ও হয় না আর এ ব্যাপারে জানাশোনা ও প্রায় শূণ্যের কোটায়। কিন্তু বইটা পড়ে আমি বেশ কিছু ছবি যেনো দেখতে পেলাম, যদিও তা খুবই সামান্য কিছু মুহূর্ত মাত্র। কি দারুণ উপলব্ধি এবং বিশ্লেষণ।
অতি সুন্দর কোন জিনিসকে সামনে থেকে দেখেও উপলব্ধি না করার যে ব্যর্থতা বইটা পড়ার পরের অনুভূতি টা আমার এমনই। তারকোভস্কিরকে যদি এক বিন্দু বোঝা যেত তাহলে অনেক কিছু উপলব্ধি করা সহজ হতো।
আমি তারকোভস্কির সিনেমা অথবা লেখা অথবা কথাবার্তা বিচার করার মত একচুল ক্ষমতাও রাখি না, খালি যেটা পারি সেটা হচ্ছে আমার অনুভূতি বোঝানোর অক্ষমতা প্রকাশ করতে। প্রথম যখন ওনার সিনেমা দেখা শুরু করসিলাম, সেটা বেশিদিন আগের কথা না। ১৮ ছিলাম বোধহয়, তো একবছর আগেকার কথাই আরকি। আমি বলবো না যে, প্রত্যেক দৃশ্য দেখেই বিজ্ঞের মত সব টপাটপ বিশ্লেষণ করে ফেলসি, কারণ সেটা আদতে সত্যি অথবা সম্ভব না। নিজে নিজে কিছু ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করসি, বিশেষত স্টকার সিনেমার শেষ দৃশ্যটার বিবিধার্থকতা নিয়ে বেশ ভাবনাচিন্তা করসিলাম, মনে পড়ে। মাথায় কি আসলো গেলো জানিনা, কিন্তু ভালো ও স্বতন্ত্রগোছের সিনেমাটোগ্রাফির বিশাল ভক্ত আমি, অন্তত এই একটা মোহের কারণেই ওনাকে ছাড়তে পারলাম না। এরপর আরো ৪-৫টা সিনেমা দেখলাম, ওনার তোলা পোলারয়েড ছবিগুলা দেখলাম একে একে, এছাড়া স্কাল্পটিং ইন টাইম নামে তার লেখা বইয়ের কিছু বিচ্ছিন্ন অংশ পড়লাম। গত কয়েক মাস আগে হুট করে গুডরিডসের কল্যাণে এই বইটার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েই মনে হইলো, এটা দরকার আমার। বইটা পড়ার সাথে সাথে আমি কিছু ব্যাপার তাৎক্ষণিকভাবে লিখসিলাম, কথাগুলা তেমন একটা গুছানো না হইলেও, আমার মনে হয় একদম কাঁচাটাই দিয়ে দেয়া সবচেয়ে ভালো হবে। একদম মনের ভিতরের খবরাখবর আরকি-
*বইয়ের সাথে সাথে যখন মাথার ভেতর সিনেমার দৃশ্যগুলো ভেসে উঠছে, অদ্ভুত একরকম ভালোলাগা কাজ করছে।
*আর্সেনিয় তারকোভস্কির কবিতাগুলো সিনেমার সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে বারবার পড়ছি।
*কবিতা আবৃত্তি হচ্ছে রুশ ভাষায়, সাবটাইটেল পড়ছি ইংরেজিতে, হাতে বাংলা অনুবাদ। বেশ না?
*Paterson সিনেমায় এই লাইনটির সাথে পরিচয় ঘটেছিলো, "Poetry in translations is like taking a shower with a raincoat on." অর্থাৎ, কবিতা ভাষান্তরিত হলে কি যেন একটা হারিয়ে যায়। যদিও বাংলায় পড়তে খারাপ লাগছে না, কিন্তু কিছু না বুঝেও রুশ ভাষায়ই বেশি ভালো লাগছে।
শেষ করার পরের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে আমার ভাষাগত সীমাবদ্ধতা বেশিদূর আগাইতে দিবে না। খালি বলবো, আন্দ্রেয় তারকোভস্কির আশ্চর্য উপলব্ধি আর সূক্ষ্ম জীবনদর্শনের সিকিভাগও যদি কখনো ধারণ করতে পারি, তাইলে বর্তে যাবো। আর পরিমল ভট্টাচার্যের অনুবাদ এককথায়, অনবদ্য! আমি অনেকদি��� এত অকৃত্রিম, সাবলীল অনুবাদ পড়ি নাই। পরিশেষে একটা অনুরোধ, ওনার Mirror, Nostalghia, Stalker এবং The Sacrifice, অন্তত এই কয়টা সিনেমা আগে একবার দেখে নেয়ার চেষ্টা করবেন, বইটার মাহাত্ম্য তাহলে অনেকাংশে বেড়ে যাবে, বিফলে মূল্যফেরত। আর কিছু বলতে চাচ্ছি না।
তারকোভস্কিকে প্রথম যখন আবিষ্কার করি তখন তাঁর সিনেমা দেখে কতটা বুঝতে পেরেছিলাম বলতে পারি না। কিন্তু কেমন এক ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়েছিলাম। দৃশ্যের সঙ্গে বাঁধা পড়েছিলাম, নৈঃশব্দের ভেতর আটকে পড়েছিলাম। প্রথম দেখার সেই অনুভূতিগুলো কোথায় যেন এখনো মিলিয়ে আছে। চার বছর আগে এই বইটা একজনের কাছে দেখেছিলাম। বইয়ের নামটাই টেনে নিয়েছিল। একটু নেড়েচেড়ে দেখে গেঁথে গেলাম বইয়ের ভেতর। তারপর দীর্ঘ দিন বইটা খুঁজে বেরিয়েছি মনে মনে। পাইনি। হঠাৎ পেয়ে গেলাম বাতিঘরে। তারকোভস্কিকে আলো ফেলে ফেলে দেখার কাজটি করে দিল এ বইটি। আবিষ্কারের আনন্দ যেমন হলো, তেমনি পাঠেরও আনন্দ হলো। কোথায় এক অনুরণন লেগে রইল, 'আমরা আমাদের একক, কপি-অযোগ্য স্মৃতিগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখি, যাতে সব দরজাগুলোয় দেয়াল উঠে গেলেও একদিন আমরা অনায়াসে চলে যেতে পারি আমাদের সেই একান্ত নিজস্ব জমিতে।'