"অউশভিৎস-এর পর আর কবিতা নয়!"- অ্যাডর্নো বলেছিলেন।
কেন কবিতা নয়, তা বুঝতে গেলে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসতে হয়। বিশ শতক জুড়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক যেসব সমাধিক্ষেত্র গড়ে উঠেছে অথবা গড়া হয়েছে বললেই হয়তো ভালো হয়, চোখ রগড়ে তাকালে দেখা যায়, শুধুমাত্র মানবদেহ গোর দেবার জন্যে নয়, বস্তুত এ গড়ে ওঠা ছিল মনুষ্যত্ব গোর দেবার প্রবৃত্তি থেকেই। ঠিক কোন মুহূর্তে একটা নিছক প্রতিশোধপরায়ণতা মনের ভুলে বুনে ফেলে গণহত্যার বীজ, তা খুঁজে পেতে গেলে ইতিহাসের সাহায্য নেয়া বোকামী। কেননা প্রচন্ড নির্মম সত্য হলো, ইতিহাস সর্বদাই লেখা হয় বিজয়ীর কলমের কালিতে, তার বিবৃতি থেকে, তার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে। নিরপেক্ষ সত্য জানার উপায় কি তাহলে? হয়তো নেই, হয়তো কিছুটা আছে। এই অন্তত কিছুটা ধারণ করার প্রচেষ্টা থেকেই সৃষ্টি হয় 'যন্ত্রণার উত্তরাধিকার'-এর মত একেকটি বইয়ের। 'Essential Read' কথাটার বাংলা অর্থ কি, আমার জানা নেই। তবে এই বইকে সেই অর্থের সমার্থক হিসেবে ধরে নেয়া ভুল হবে না।
বইয়ের শুরু 'কংক্রিটে নখের আঁচড়' দিয়ে। অনুবাদক পরিমল ভট্টাচার্য আমাদের দেখান, কি করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হাতবদল হয় গণহত্যা আর হিংসার বীজ। কিভাবে যুদ্ধ রাতারাতি মানুষের মনে আনে আমূল পরিবর্তন, কি করে অতীত হয়ে যাবার পরেও এ যুদ্ধ তাদের জীবনে থেকে যায় ঘটমান বর্তমান হিসেবে। বই তারপর আরো এগোয়; প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ে বেরানো ক্ষতের বিবৃতি থেকে শুরু করে খোলা চিঠির মধ্য দিয়ে। কখনো আমরা পড়ি মিলান কুন্দেরার বিবেককে হত্যা করতে চাইবার দুর্বল মুহূর্তের স্বীকারোক্তি, আবার কখনো সলঝেনিৎসিনের মর্মভেদী ভাষণ, কখনো আবার স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় লোরকার হত্যা নিয়ে নেরুদার আক্ষেপপূর্ণ স্মৃতিচারণ। মকমলবাফ তুলে আনেন বিস্মরিত আফগানিস্তানের কথা, পল ব্র্যাডলি শোনান রোয়ান্ডার গৃহযুদ্ধের সময়কার ভয়াবহ গণহত্যার বিবরণ যার খবর এই উপমহাদেশে আদৌ পৌঁছেছে কিনা সন্দেহ আছে। কাশ্মির, গুজরাট, পাঞ্জাবসহ দেশভাগের বিবরণে বারবার পড়ি ভারতের প্রচন্ড হৃদয়বিদারক একেকটি গণহত্যার ইতিহাস, শিউরে উঠি দেশটির নির্মমতা ও উদাসীনতার মিশেল প্রত্যক্ষ করে। 'আমার স্বদেশ খুন হয়ে যায়'-এ মুজামিল জলিল লিখেছেন,
"যে খেলার মাঠগুলোয় আমরা ফুটবল ক্রিকেট খেলেছি, যে সুন্দর সবুজ বাগানে আমরা ইস্কুল থেকে চড়ুইভাতি করতে গিয়েছি, সেখানে গজিয়ে উঠতে লাগলো শহিদদের কবর। একসময় ওখানে যারা খেলা করেছে, তাদের গোর দেয়া হতে লাগলো একে একে।"
অ্যাডর্নো কেন কবিতা লিখতে মানা করেছিলেন তা উপলব্ধি করা ঠিক কঠিন কিছু না। তবে এই নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা নিষ্প্রয়োজন মনে হয় যখন যন্ত্রনার উত্তরাধিকারীরা যুগে যুগে তীক্ষ্ণ অতীতকে চেঁছে শিল্পে রূপান্তর করে যেতে থাকেন অবিরাম; যখন এসথার মুজাউইয়ো শেখান কি করে 'বেঁচে বাঁচতে' হয়, যখন রাজা মাট্টার তাঁর কবিতায় চুরি যাওয়া শৈশবের জন্য কাঁদতে আহ্বান করেন, যখন তারকোভস্কি তাঁর সিনেমার মধ্য দিয়ে অশুভ প্রগতির বাস্তব তুলে ধরেন, যখন আমির আযিয জমিনের জুলুমের বিরুদ্ধে আকাশে ইনকিলাব লিখে দেন,
"সাব ইয়াদ রাখা জায়েগা
সাব কুছ ইয়াদ রাখা জায়েগা।"
পরিমল ভট্টাচার্যকে ধন্যবাদ, এই সংকলন আর অসম্ভব সুন্দর অনুবাদের জন্য।