' শেখ হাসিনার বড় শত্রু তার রসনা' এভাবেই '৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের কারণ চিহ্নিত করেন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী।
কলকাতায় বেড়ে উঠেছেন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। পড়েছেন সেখানকার স্কুলে। প্রেসিডেন্সি কলেজে সুশোভন সরকারসহ স্বনামধন্য শিক্ষকদের শিক্ষার্থী ছিলেন। সেই সময়ের প্রেসিডেন্সি কলেজের স্মৃতিচারণ করেছেন খুব সুন্দরভাবে। পড়তে ভালো লাগছিল। তখনকার শিক্ষকদের পাণ্ডিত্য ও শিক্ষার্থীদের জন্য দরদের নানান কথা লিখেছেন সিদ্দিকী সাহেব। দেখেছেন কলকাতার দাঙ্গা, সাক্ষী হয়েছেন দেশভাগের।
কখনোই ঢাবিতে পড়ার ইচ্ছে ছিল না জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর। নিজেই স্বীকার করেছেন দেশভাগ না হলে ঢাবিতে ভর্তি হতেন না। অনন্যোপায় হয়ে ঢাবির ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার কথা লিখেছেন। ঢাবির ইংরেজি বিভাগের বর্ণনা দিয়েছেন বিশদভাবে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কত নিবিড় ও অমলিন ছিল তা ভাবতে গিয়ে বিস্মিত হতে হয়। মিস এজি স্টক না থাকলে হয়তো জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী শিক্ষক হতে পারতেন না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমদিকের শিক্ষক সিদ্দিকী সাহেব। আই এইচ জুবেরির ভীষণ পছন্দের ছাত্র ছিলেন তিনি। জুবেরি সাহেবই রাবিতে নিয়ে আসেন তাকে। প্রতিষ্ঠাকালীন রাবি কেমন ছিল তা বোঝা যায় এই আত্মকথা থেকে। রাবির যে কোনো শিক্ষার্থী হয়তো অনেক আগ্রহ পাবেন পড়তে।
সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর শিক্ষক। সাজ্জাদ সাহেবের সাথে তার সম্পর্ক অনেকবেশি হৃদ্যতার ছিল। ড. হোসায়েন রাবিতে উপাচার্য হয়ে এলে সেই সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়। সিদ্দিকীর তাই সাজ্জাদ হোসায়নের মতাদর্শ ও একাত্তরের দালালির মতো কর্মকাণ্ডকে হালকা চোখে দেখার প্রয়াস পুরো বই জুড়ে ছিল। আরও মজার ব্যাপার হলো একাত্তরের পুরো সময় তিনি রাবিতে ছিলেন। কিন্তু তার লেখার বয়ান থেকে বোঝা মুশকিল দেশে একটি মুক্তিযুদ্ধ চলছে। তিনি পুত্র-কন্যার পরীক্ষায় অংশগ্রহণের স্মৃতি নিয়ে বিভোর!
'৭৩ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। তখন উপাচার্য সৈয়দ আলী আহসান। যিনি পাকিস্তান ও আইয়ুবের খানের একনিষ্ঠ খাদেমের ভূমিকা থেকে অবসর নিয়েছেন। এখন তিনি সাচ্চা মুজিবনগরপন্থি এবং রবীন্দ্রনুরাগী।
স্বাধীনপরবর্তী সময়ে মুজিবনগর থেকে আগত বনাম অ-মুজিবনগরী সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বৈরথ দেখেছেন তিনি। তখন জাবি থেকে আলী আহসান বিতাড়িত। ড. এনামুল হক উপাচার্য হয়ে এসেছেন। তার নেতৃত্বে বাকশালে যোগ দেওয়ার তোড়জোড়। এনামুল সাহেব শিক্ষকদের মতামত না নিয়েই সকল শিক্ষক বাকশালে যোগ দেবে এমন তথ্য গণভবনে জানিয়ে দেন। এদিকে শিক্ষকদের কেউ বাকশালে যোগ দেওয়ার পক্ষে নন। তখন ড. এনামুলকে কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়ে গণভবনে গিয়ে বাকশালে যোগ দিতে হয়েছিল।
জাবিকে প্রতিষ্ঠা করা হয় আলিগড় মডেলে। পাকিস্তান সরকার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি ও আবাসনের নিশ্চিয়তার পরিকল্পনা রেখে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশাল এলাকা জুড়ে প্রতিষ্ঠা করেছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারের হাতে টাকা নেই। এত বড় এলাকাজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বিরোধী অনেকেই। তখন বঙ্গবন্ধু এই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ড. এনামুল বঙ্গবন্ধুর সাথে নিজের সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তাকে বুঝিয়ে সিদ্ধান্ত রদ করান।
জাবি নিয়ে অনেক তথ্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইবারের উপাচার্য ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর বইতে পাবেন। জাবির যে কেউ বইটি পড়ে আনন্দিত হবেন।
৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। সেই স্মৃতি অন্য একটি বইতে লিখেছেন। তবু আওয়ামী লীগের কেন পরাজয় হলো তা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। পড়তে ভালো লাগবে।
অসাধারণ কোনো আত্মকথা নয়। সামাজিক ইতিহাসের কিছু উপাদান পাওয়া যাবে। গদ্যে চলনসই। না পড়লেও ক্ষতি নেই।