খাদ্যরসিক বাঙালি- বলে একটা কথা আছে। খাবার ব্যাপারে বাঙালিদের একটা দূর্বলতা আছে। তারা খেতে ভালোবাসে, খাওয়াতেও ভালোবাসে। সুপ্রাচীন কাল থেকে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর খাবারের নিজস্ব কিছু পদ ও খাবার তৈরির ধরন থাকে। সেগুলো একই ভাবে বয়ে চলে না। আমাদেরও এমন কিছু নিজস্ব খাবার দাবার ছিল বা আছে। তবে নানা সময় নানা জাতির আগমনে তাদের বয়ে নিয়ে আসা খাবারের সাথে আমাদের খাবার ও খাবার তৈরির উপকরণ মিলে বাহারি কিছু সুস্বাদু খাবার আমরা এখন দেখতে পাই।
প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব কিছু খাবার থাকে, তেমনি আমাদের ঢাকা কেন্দ্রীক কিছু খাবার ও সে খাবারের উৎস বা উৎপত্তি ও রন্ধন প্রনালী নিয়েই সাদ উর রহমানের " ঢাকাই খাবার ও সংস্কৃতি " বইটা।
সুস্বাদু উপাদেয় সব খাবার, রান্নার প্রক্রিয়া, ভিন্ন ভিন্ন উৎসবে নিদিষ্ট কিছু খাবার, তা পরিবেশনা এবং এসব খাবারের পেছনের গল্প নিয়েই চমৎকার এই বই। যারা খেতে ভালোবাসেন তাদের জন্য বইয়ের শেষ পর্যন্ত যাওয়াটা কষ্টকর বলে মনে হয়েছে।
কোথায় যেন পড়েছিলাম যে, জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন কোনো জাতিকে জানতে হলে জানতে হবে তারা কী খায় এবং কী পড়ে। উক্তিটা সত্যই স্যারের কিনা জানি না তবে কথাটা অস্বীকার করা যায় না। খাবারের সাথে মিশে থাকে একটি জাতির আবেগ-অনুভূতি ও ইতিহাস। খাবার হলো মানুষের বেচে থাকার মৌলিক চাহিদাগুলোর অন্যতম একটি চাহিদা। কিন্তু এখানেই শেষ হয়ে যায় না। খাবার একটা বিনোদনও বটে। হাল আমলে ফেসবুকে খাবার ভিত্তিক অনেক গ্রুপ ও সেই গ্রুপ গুলোতে খাবারের রিভিউয়ের পরিমান দেখলে খাবার যে বিনোদন সেটা ভালোই বোঝা যায়। সারাদেশে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় যেভাবে প্রতিদিন নতুন নতুন খাবারের দোকান চালু হচ্ছে তাতে বোঝা যায় খাবার নিয়ে আমরা কতটা প্যানিক। তবে এই ট্রেন্ড নতুন না। মোঘল আমলেরও আগে থেকে আমরা একটু স্পেশাল খেতেই বেশি পছন্দ করি। বিশ্বের মধ্যে আমরা ভারতবর্ষের মানুষরা একটু বেশিই ভোজনরসিক হিসেবে পরিচিত। এবং বিভিন্ন স্বাদের খাবার তৈরিতেও এই অঞ্চলের মানুষের তুলনা নাই। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে ঢাকার মানুষ বোধহয় একটু বেশিই খাদ্যরসিক। এই ঢাকার খাবারের আছে এক বিরাট ইতিহাস। কত খাবার যে ঢাকাই সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছে তার হদিস পাওয়া কঠিন। সেই কঠিন কাজটি করার চেষ্টা করেছেন লেখক সাদ উর রহমান তার "ঢাকাই খাবার ও খাদ্য সাংস্কৃতি" বইতে। কেউ যদি এটাকে শুধু খাবারের বই মনে করেন তাহলে বিরাট ভুল করবেন। এই বইটা বহন করছে ঢাকার শত শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। খাবারের মাধ্যমে জানা যায় বিভিন্ন সময়ে সমাজের মানুষের বিভিন্ন জীবনযাত্রা, হাসি-কান্না, হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস আর সেই ইতিহাসের পাতা থেকে ধুলার সাথে উড়ে যাওয়া মানুষ। অদ্ভুত একটা টাইমলাইনে হারিয়ে যাচ্ছিলাম পড়ার সময়ে। কখনো তুর্কি-মোঘল বাদশাহদের বাবুর্চিখানায়, কখনো ইংরেজ সাহেবদের কিচেনে। কখনো পূজা-পার্বণে মণ্ডপে আর বাড়িতে, আবার কখনো রমজানের সেহরিতে। লেখকের সাথে ঘুরে বেড়ালাম বিভিন্ন বিয়ে বাড়ি, দোয়া মাহফিল, হরেক রকম ধর্মীয় উৎসবে। সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু হারিয়ে যায় আবার নতুন এসে তার স্থান দখল করে। ঠিক তেমনি সময়ের সাথে হারিয়ে গেছে ঢাকার অনেক ঐতিহ্যবাহী খাবার। হারিয়ে গেছে অনেক দক্ষ কারিগর। রয়ে গেছে শুধু ইতিহাস।
ঢাকার অলিতে গলিতে বাহারি পদের খাবারের সমারোহ দেখতে পাওয়া যায়। এসব বাহারি খাবারের ঘ্রাণ নাকের স্নায়ুতন্ত্র হয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছে মনপ্রাণ জুড়িয়ে দিয়ে যায় আমাদের। কি খাইবেন কন? নেহারি দিয়ে তেলে ভাজা লাল পরোটা নাকি কাবাব দিয়ে নান? সবজিডাল আর ডিম পোচ কিংবা অমলেটের সাথেও কিন্তু পরোটা অথবা নানের কেমিস্ট্রি মন্দ না। বাসমতি চালের সাথে নরম নরম খাসির মাংসের কাচ্চি নাকি সরিষা দিয়ে মাটনের স্প্যাশাল তেহারি। মাটন কিংবা গরু না খেলেও কোনো অসুবিধা নেই, মোরগ পোলাও আছেতো। বিরিয়ানীতে পোষাচ্ছে না? নো প্রবলেম! ভাত, ভর্তা-বাজি, শাক, মাছের তরকারি, ঢাল দিয়ে পেটকে তৃপ্ত করে নিতে পারবেন। এসবের পর ডেজার্ট হিসেবে আপনার জন্য বাহারি মসলা দিয়ে পান থেকে শুরু করে ফিন্নি, জর্দা, জিলাপি, ফালুদা, দইয়ের ব্যবস্থা আছে। বিকেলের হালকা নাস্তাটা সিংগাড়া, সমুসা, দুধ চা দিয়ে বাকরখানি, হালিম, চটপটি, ফুসকা দিয়ে সেরে নিতে পারবেন। খুব জোর তেষ্টা নিবারণ কিংবা এমনি গলা ভেজানোর জন্য পেয়ে যাবেন লাচ্ছি, শরবত, বোরহানির মত পানীয়। আইসক্রিম হিসেবে আছে কুলফি মালাই। জাদুর শহর রাজধানী ঢাকায় কোন খাবারটা পাওয়া যায় না তাই বলুন তো আমাকে! একেবারে বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে বিবর্ণ কিংবা ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত পরিচিত, অপরিচিত অদ্ভুত সব খাবারের দেখা মেলে। এগুলোর কিছু কিছু ভিনদেশী কুইজিনে তৈরি করা হয়। তবে পরিচিত সব খাবারই ঢাকার বিবর্তনের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছে।
বৈচিত্র্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক এই শহরের খাবার ও খাদ্য সংস্কৃতির প্রাচুর্য দিয়েই এই বইটি শোভান্বিত করেছেন লেখক সাদ উর রহমান। ভোজন রসিক বাঙালি বলে একটা কথা আছে জানেন বোধহয়। অন্য কোথাও ঘাটতি হলেও অসুবিধা নেই তবে জমিয়ে খাওয়া দাওয়া করে তৃপ্তির ঢেঁকুর না তুলে বাঙালির শান্তির ঘুম হয় না যেন। (অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা ব্যাতিক্রম) এক দেশ থেকে অন্য দেশের কিংবা এক শহর থেকে অন্য শহরের খাবারদাবার আর ফুড হ্যাভিটে স্বাতন্ত্র্য (Distinctive) বৈশিষ্ট্য থাকে। কালের বিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে ঢাকার ফুড কালচারে কিছু ইউনিক আসপেক্ট চলে এসেছে। আমাদের দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে এই ইউনিক আসপেক্টগুলো ঢাকাই খাবারদাবারকে আলাদা করে তুলেছে। প্রাচীন এই শহরের খাদ্যাভ্যাসের বিবর্তনে সুলতানি আমল এবং মোঘল আমল মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। এই আমল থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত ঢাকাই প্রতিটা খাবারের বিবরণসহ এর পেছনের গল্প উঠে এসেছে বইয়ের আলাদা আলাদা অধ্যায়ে। ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে ঢাকায় খাবার হোটেল ও মিষ্টান্ন দোকানের সূচনা হলে কিছু কিছু প্ল্যাসের খাবার জনপ্রিয় হয়ে উঠে। সেসবের গোড়ার কথা জানতে পারলাম বইটি পড়ে। এরপর একে একে বোর্ডিং ও বিলাসবহুল হোটেলের বিকাশ শুরু হয়। এসবের গোড়ার ইতিহাস ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ উল্লেখ করা আছে আলাদা আলাদা করে। এ বই পড়ার পর উপলব্ধি করতে পারছি কতটা রিচ ফুড কালচারে সমৃদ্ধ আমাদের এ নগরী। এই বাহারি খাবারগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড হিস্ট্রি জেনে নিজের মস্তিষ্কের খুদা কিছুটা হলেও মিটেছে বৈকি! ঢাকাই খাবার নিয়ে আপনার জ্ঞানের পরিধি সমৃদ্ধ করতে চাইলে নির্দ্বিধায় এই বইটি তুলে নিন। বইটা পড়ে শেষ করার পর অতৃপ্ত থাকবেন না আশা করি। তবে পড়ার সময় জিভে জল চলে আসাটা গ্যারান্টি!
If you are interested in the history of Dhaka city this book is for you. Although I am a big fan of this type of book but I can't give it anything above 3 star because of the poor writing quality and in some cases things kinda feel repetitive. Despite all credit has to be given where it is due and that is the enormous work of getting all the information together and put it in one place. So if you are in for the history of Dhaka, after reading the better ones, if you think you want to learn more, specially about the food, this book should be in your short list.
আমি খুব একটা খাদ্য রসিক মানুষ না তবে খাবার বিষয়ক বই পড়তে ভালো লাগে। সে হিসেবে এই নন-ফিকশন বইটা হাতে নেয়া।
দারুণ দারুণ এক্সক্লুসিভ খাবারের তথ্য দিয়ে বইটা ঠাসা তবে একদমই স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড ভঙ্গিতে লেখার কারণে বইটা পড়তে কারো কারো একটু বিরক্ত লাগলেও লাগতে পারে। তাই কেউ যদি স্রেফ উপমহাদেশের খাবারের ইতিহাস জানতে চান শুধু তারাই এ বইটা পড়তে পারেন।
বেশ কিছু খাবারের নামি শুনি নাই। বইটা পড়ে জানতে পারলাম। আরো জানলাম খাবারের ইতিহাস, উৎসব, রেসিপি সম্পর্কেও ধারণা দেয়া আছে। নোটবুকে টুকে রেখেছি যেগুলা এখনো খাওয়া হয়নাই সেগুলো দ্রুত খেয়ে ফেলতে হবে।
নিজেকে খুব একটা ভোজন রসিক বলতে পারি না। তবে সত্য কথা এই যে, বইটা পড়ার পর, কিছু খাবার খেতে খুব ইচ্ছে করতেছে। ঢাকই খাবার ও খাদ্য সংস্কৃতি নিয়ে দারুণ একটা বই।