'ভালুক-বালক'-এর প্রথম দুটি অক্ষর নিয়ে 'ভাবা' । নামেই পরিচয় মেলে ছেলেটির, যাকে পাওয়া গেছিল তরাইয়ের জঙ্গলে । মানুষ হয় সে নিঃসন্তান ডাক্তার-দম্পতির কাছে । কিন্তু মানুষের সমাজ সহজে মেনে নেয় না তাকে । ...বারেবারেই সামনে এসে দাঁড়ায় লোভ-হিংসা এবং সংঘাত । ভাবা জানে পশুপাখির ভাষা, কথা বলতে পারে সে তাদের ভাষায় । তিন সর্বক্ষণের সঙ্গী ভালুক বালু, আদ্যন্ত মজার শিম্পাঞ্জি কেলো এবং আলসেশিয়ান রাজা ।
এই আশ্চর্য 'ভাবা' কাহিনি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে আলোড়ন জাগে কিশোরমহলে । বিদেশী 'টারজান' আর 'ভাবা' যে সম্পূর্ণ আলাদা । সে তো এই সমাজেরই এক ছেলে, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, বলিষ্ঠ শরীর, সমাজ-সচেতন অথচ রক্তে বন্যতা ।
ভাবা সমগ্র ১-এ স্থান পেয়েছে মোট পাঁচটি ভাবা-কাহিনি -
নাম তার ভাবা বিপদে ভাবা পথের খোঁজে ভাবা নিজের খোঁজে ভাবা ফিরে এল ভাবা
শিক্ষা, এম.এ. (ইংরাজি সাহিত্য) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। সংগ্রামী জীবন। তারই প্রতিফলন দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সমগ্র সৃষ্টিতেও। কৈশোরে সশস্ত্র স্বাধীনতা-সংগ্রামের পথ ধরে যৌবনে গ্রহণ করেন বৈজ্ঞানিক মতাদর্শ। পেশাগত ভাবে গ্রহণ করেন প্রকাশন ব্যবসা। প্রথম সাহিত্য স্বীকৃতি ১৯৬২ সালে, ভয়ঙ্করের জীবন-কথা ভূষিত হয় রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে। বহুদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় ১৯৬৮ সালে। দীনেশচন্দ্রের সম্পাদনায় প্রকাশিত হল কিশোর ভারতী। উৎসারিত হল এক জাদুকরী লেখনীর ঝরনা। সাড়া পড়ে যায় পাঠকমহলে। ১৯৮৭ সালে দীনেশচন্দ্র সম্মানিত হলেন বিদ্যাসাগর পুরস্কারে। দীর্ঘজীবনে তিনি পেয়েছেন আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মান।
প্রকাশিত গ্রন্থ : দীনেশচন্দ্র রচনাসমগ্র, বিজ্ঞানের দুঃস্বপ্ন, ওদের বাঁচতে দাও, দুরন্ত ঈগল, নীল ঘূর্ণি, কালের জয়ডঙ্কা বাজে, ভাবা সমগ্র ১ ও ২, প্রথম পুরুষ, চিরকালের গল্প, ভয়ঙ্করের জীবন-কথা, মানুষ অমানুষ, ভারত গল্পকথা, ইত্যাদি।
'ভালুক-বালক'-এর প্রথম দুটি অক্ষর নিয়ে 'ভাবা' । ভাবা'র এই বিচিত্র উপাখ্যান এককালে কিশোরভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে পাঠকমহলে সাড়া ফেলেছিল। পরবর্তীতে সংকলন হিসেবে প্রকাশ করতে গিয়ে বর্ধিত, পরিমার্জিত সংস্করণে রূপ দেয়া হয়েছে।
আদতে পশ্চিমা সাহিত্যের বিখ্যাত টারজান এর সাথে মিল থাকলেও, ভাবা চরিত্রটা কিন্তু নতুন রূপেই আত্মপ্রকাশ করেছে। তরাইয়ের জঙ্গলে খুঁজে পাওয়া 'ভাবা'র কাহিনীগুলো জঙ্গলের নয়, বরং আধুনিক সমাজের প্রেক্ষাপটে। নিঃসন্তান ডাক্তার-দম্পতির কাছে অপত্য স্নেহে বেড়ে ওঠা ভাবা সমাজের মানুষরূপী জন্তুদের লোভ, হিংসা আর ষড়যন্ত্রের শিকার হয় বারবার।
ভাবা যেমন পশুপাখির ভাষা বুঝতে পারে, তেমনি কথাও বলতে পারে তাদের ভাষায় । সর্বক্ষণের সঙ্গী ভালুক বালু, আদ্যন্ত মজার শিম্পাঞ্জি কেলো এবং আলসেশিয়ান রাজাকে সাথে নিয়ে সে লিপ্ত হয় অন্যায়ের প্রতিবাদে। রুখে দাঁড়ায় সমাজের নানা অনাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে।
অনেকাংশে মেলোড্রামাটিক মনে হলেও, ভাবার গল্পগুলো সুখপাঠ্য। আশির দশকে এমন অভিনব কিশোর সাহিত্য নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবীদার।