দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জড়িয়ে পড়ে ১৯৪১ সালে এবং অক্ষশক্তির দ্বারা আক্রান্ত হয়। সেসময় বার্মা মুলুকে স্থায়ীভাবে বাস করতেন বেশকিছু বাঙালি পরিবার। পেশাগত কাজেও অনেকে পাড়ি জমিয়েছিলেন সেখানে। বড় শহর নিরাপদ নয়, বোমা হামলা হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে, দেশে ফেরত যেতে হবে, সেখানেও বিপত্তি। কলেরায় মৃত্যু, মগদের নির্মম আক্রমণ, খাদ্য ও আশ্রয়হীনতা, পথে বাঘ ও হাতির অতর্কিত হামলা, সঙ্গে বোমা পড়ার ভয় তো আছেই - পুরোপুরি নারকীয় পরিবেশ যাকে বলে। মায়ানমারের পরিস্থিতি ও যুদ্ধের বর্ণনা বেশ প্রাণবন্ত। উপন্যাস হিসেবে "প্রাচী"র সমস্যা হচ্ছে, যে তা মননে অতিরিক্ত রোমান্টিক। মলয় আর মাথিন পালাচ্ছে; কিন্তু এরা মনে হয় যুদ্ধক্ষেত্রে থেকেও নেই। যখনই দুজন গল্পে এসেছে, মনে হয়েছে যুদ্ধ এই কপোত কপোতীকে স্পর্শ করছে না অথচ এরা শরণার্থী; সবকিছু হারিয়ে জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে পালাচ্ছে। উপন্যাস হিসেবে "প্রাচী"কে পুরোপুরি সার্থক বলা যেতো, যদি বুলবুল চৌধুরী প্রধান চরিত্রদের এতোটা রোমান্টিক না করে তুলতেন। শেষটা ইঙ্গিতময় ও অর্থবহ, এই যা রক্ষা। তবে ইতিহাসের এ অংশ আমাদের সাহিত্যে প্রায় অনুপস্থিত। শুধু এ কারণেই বইটা পাঠ্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়,তৎকালীন বার্মার রাজধানী ছিল রেঙ্গুন। যুদ্ধের অনেক আগ থেকেই হাজার হাজার বাঙালি সেখানে রাজত্ব করতো ব্যবসা,কৃষি কিংবা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রেই। অনেক বাঙালি পরিবার তো সেখানে নিজেদের স্থায়ী বসতিই স্থাপন করে ফেলেছিল। ভালোই চলছিল সব। কিন্তু তখন শুরু হয়ে যায় ২য় বিশ্বযুদ্ধ। জাপানী প্লেন থেকে রেঙ্গুনের বুকে নেমে আসে মৃত্যু। মুহূর্তে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সব। কর্মচঞ্চল, ছবির মতো সুন্দর একটা নগরী,ঘন্টা ব্যবধানে হয়ে উঠে মৃত্যু উপত্যকা। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে শুরু হয়, হাজার হাজার বাঙালির বাংলা অভিমুখে পলায়ন।
দলে দলে বর্মা থেকে যাত্রা শুরু হয় বাংলার দিকে। সে যাত্রা বিপদসংকুল, সে যাত্রার পদে পদে ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো হাঁ করে আছে মৃত্যু আর সে যাত্রায় আছে ক্ষুধার অপরিসীম যন্ত্রণা। আছে প্রেম,আছে বিদ্বেষ, আছে স্বপ্ন,আছে স্বপ্ন ভাঙার হাহাকার। পড়তে পড়তে কখন যে হাজার হাজার বাঙালির সাথে আপনিও তাদের দলে ভিড়ে যাবেন,ঠের ও পাবেন না। কখনও তাদের সুখে হাসবেন আবার কখনও....! এই যাত্রাকে কেন্দ্র করেই মূলত মূল গল্পটা এগিয়ে চলে।
আমার মতে,যত দ্রুত সম্ভব এই বইটি সবার পড়ে ফেলা উচিৎ। ২য় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত বাংলা সাহিত্যে রচিত যে ক'টা মাস্টারপিস আছে, এই বইটি সেই তালিকায় উপরের দিকেই থাকবে। বর্ণণা আর দুর্দান্ত লেখনীর ফলে তৎকালীন প্রেক্ষাপটটা যেন সিনেমার মতো চোখে ভাসছিল। ৭৮ বছর আগে লেখা বই,৭৮ বছর পরেও কী ভীষণ বাস্তব! কী ভীষণ নির্মম!! আন্ডাররেটেড এই রত্মতুল্য বইটি আরও বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছানো উচিৎ। হওয়া উচিৎ আরও বেশি আলোচনা।
একের পর এক দিন গেছে, বছর ঘুরেছে। পৃথিবীতে এসেছে কতো পরিবর্তন। একটা ব্যাপারে আজও কোন পরিবর্তন আসেনি... বন্ধ হয়নি মানুষ হয়ে মানুষের উপর বোমা, বন্দুক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া। বন্ধ হয়নি শান্তিপ্রিয় মানুষদের সর্বহারা হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এদিক ওদিক দিশেহারা হয়ে ঘুরতে থাকা। বন্ধ হয়ে যায়নি ক্রন্দন, হাহাকার...
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগের মুহূর্তের ঘটনা। জাপানীরা বোমা ফেলে ফেলে করছে-এমন ধারা গুজব চারপাশে। মায়ানমার, তৎকালীন বর্মায় তখন অনেক বাংলা ভাষাভাষীর বাস। অনেকে গুজবে কান দিয়ে রওনা হয়েছে আগেভাগেই দেশের উদ্দেশ্যে। আবার অনেকের মাঝে দেখাই যাক কি হয়-এমন একটা ভাব। তবে এবারে গুজব সত্য হলো। ধ্বংস হয়ে গেলো ছবির মতো সুন্দর একটা শহর। আর সে শহরেরই কয়েকজন প্রবাসী বাঙ্গালী, মরতে হলে দেশের কোলেই মরব এমন চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রওনা দিল নিশ্চিত গন্তব্য কিন্তু এক অনিশ্চিত, বিপদসঙ্কুল রাস্তা ধরে।
টুকরো টুকরোভাবে বার্মার ইতিহাস আর সেই শহরের তৎকালীন জীবনযাত্রার পাশাপাশি গোটা বই জুড়ে রয়েছে সে�� বিপদসঙ্কুল অনিশ্চিত যাত্রাপথের সত্য গল্প।
খুব করে মনে করি প্রত্যেক বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের উচিত বুলবুল চৌধুরীর অনবদ্য সৃষ্টি "প্রাচী" নামের এই উপন্যাসটী অন্তত একবার হলেও পড়ে দেখা। উপন্যাসের কাহিনি, বর্ণনাশৈলি সবটা মিলিয়ে অসাধারণ লেগেছে।
উপন্যাসের প্রেক্ষাপট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যখন জাপান নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভুত হলো এবং আমেরিকা, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের শক্ত অবস্থান নিয়েছে। ৬ আগস্টের আগ পর্যন্ত জাপান দক্ষিণ ও দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ার ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীন বড়ো বড়ো সব শহরে বোমা ফেলেচ্ছে। এই শহরগুলোর মধ্যে যে ক'টা শহর মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তারমধ্যে অন্যতম একটি হলো বার্মার রেঙ্গুন। উত্তাল ঐ সময়ে যেসব বাঙালি রেঙ্গুনে বাস করতো, তাদের অনেকেই স্ত্রী বা পরিবারের অন্যদের দেশেই রেখে আসতেন। এরকম একটি বাঙালি পরিবার নিয়েই "প্রাচী" উপন্যাসটির কাহিনি গড়ে উঠেছে।
এই উপন্যাসটীতে একটা ব্যাপার খেয়াল করলে দেখতে পাওয়া যায় যে, উপন্যাসিক গল্প বলার সময় মাঝে মাঝে ইতিহাস বা সংস্কৃতির ব্যাখ্যা টেনে এনে বেশ বৈচিত্র্য আনয়ন করেছেন। মীর জাফরের সহায়তা এক বর্মি কি করে ইংরেজ শাসনের কাছে মাথানত করিয়েছে বার্মাকে, সেই সাথে বার্মায় অবস্থানরত ভারতীয় ও বাঙালিদের ভেতরকার দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষেরও উল্লেখ রয়েছে। শেষটায় এসে দেখা যাচ্ছে বার্মার স্থানীয় মুসলমানদের ওপর বর্মি মগদের আক্রোশের চিত্র।