ইতিহাসে সন্ধ্যাকর নন্দী চাটুকবি হিসেবে পরিচিত। কৈবর্ত বিদ্রোহ দমনকারী রামপালের চাটুকার ছিলেন। লিখেছিলেন রামপালের জীবনী রামচরিত। বাঙালি বুদ্ধিজীবী মাত্রই কি সন্ধ্যাকর? শাসকের ধামাধরা চাটুকার?
দেবতোষ দাশ-এর জন্ম ১১ জানুয়ারি ১৯৭২। মা-বাবা-স্ত্রী-কন্যাসহ থাকেন দক্ষিণ শহরতলি সুভাষগ্রামে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। রাজ্য সরকারের ভূমি ও ভূমি-সংস্কার দফতরে কর্মরত। প্রথম গল্প প্রকাশ ১৯৯৫ সালে ‘অপর’ পত্রিকায়। গল্প প্রকাশিত হয়েছে দেশ, রবিবাসরীয় আনন্দবাজার পত্রিকা, শারদীয়া প্রতিদিন, শিলাদিত্য, কিশোরভারতী পত্রিকায়। লেখেন নাটকও। নান্দীকার তাঁর নাটক ‘বিপন্নতা’ মঞ্চস্থ করে ২০১৪ সালে। নাটক ‘ওচাঁদ’ লিখে পেয়েছেন সুন্দরম পুরস্কার। প্রকাশিত উপন্যাস: ‘বিষকন্যা’, ‘বিন্দুবিসর্গ’ এবং ‘সন্ধ্যাকর নন্দী ও সমকালীন বঙ্গসমাজ’। সিনেমা, সংগীত আর খেলাধুলোয় আগ্রহী।
এত খারাপ উপন্যাস পড়তে পারা খুব একটা সহজ কাজ নয়। স্যাটায়ারের নামে সার্টিফায়েড তারকাটা আর বাঁকুড়া মিম টাইপের জিনিসপত্র ঠেলে, পলিটিক্যাল হিউমারের নামে একতরফা বজ্জাতি আর দালালি, সর্বোপরি লেখকের নিজেকে সন্ধ্যাকর নন্দী ভাবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা একেবারে গেঁটেবাতের মতো করে ঠেলে-ঠেলে বেরোনো... এইসব সামলে এমন যাচ্ছেতাই উপন্যাসের শেষ অবধি গেছিলাম ভেবেই গর্ব হচ্ছে।
লেখকের ভাষা ধার করেই বলতে হয় যে এটি একটি 'বালের' উপন্যাস। নবারুণ ভটচায্ কে অনুকরণ করা সোজা, কেননা দু-দশ দুশোটি খিস্তি আলটপকে দিতে পারলেই নিজেকে ফ্যাতাড়ু মনে হতে পারে। কিন্তু উপন্যাসের বিষয় বস্তু কিছু থাকতে হলে নবারুণের মতো ভাবনা চিন্তাও করতে হয়। উপন্যাসের শুরু আর শেষের মধ্যে কোনো তালমিল নেই, যেন চাড্ডি খিস্তি দিলে আর পাচডি শব্দ নিয়ে খিল্লি করলে, সেটা নিজেই উপন্যাস হয়ে যাবে!
প্রহসন বা স্যাটায়ার।'হুতোম প্যাঁচার নকশা','বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ' থেকে 'শনিবারের চিঠি' হয়ে 'নবারুণ ভট্টাচার্য'।সমসাময়িক রাজনৈতিক সামাজিক ঘটনাবলী বিদ্রুপের মোড়কে বারবার পরিবেশিত হয়েছে সাহিত্যের আঙিনায় যা হয়ে উঠেছে লেখকের প্রতিবাদ,প্রতিরোধের হাতিয়ার।মূলত শাসক-শোষিতের টানাপোড়েন এইধরনের রচনাগুলির মূল উপজীব্য হলেও নানান বিতর্কিত সামাজিক রীতিনীতিও ছাড় পায়নি কলমের খোঁচা থেকে,যার থেকে আখেরে লাভই হয়েছে সুধী সমাজের।আবার নিতান্তই ব্যক্তিগত আক্রমণ শানিয়ে লেখা সজনীকান্ত দাসের শনিবারের চিঠিগুলি নজরুলের ভাবমূর্তি একটুও ক্ষুন্ন করতে পারেনি,উল্টে জবাবি কবিতাগুলি একেকটি সম্পদ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। এতগুলি মাথাধরানো কথার যে জন্যে অবতারণা,বাংলাসাহিত্যের এইধারায় সংযোজিত সাম্প্রতিকতম বই দেবতোষ দাশের 'সন্ধ্যাকর নন্দী ও সমকালীন বঙ্গসমাজ' নিয়ে দু-চারটি কথা বলার ধৃষ্টতা।আশা রাখি,লেখক নিজগুণে ক্ষমা করে উদারতার পরিচয় দেবেন। সন্ধ্যাকর নন্দী কে?দেখুন বই থেকে সরাসরি:- "-এক্সকিউজ মি স্যার, না,মানে আপনি তো রামচরিত,মানে রামচরিত মানসের- -আমারটায় মানস নেই,ওটা তুলসীর। -তুলসী চক্রবর্তী? -না,দাস। -মানে আপনি- -আমি রামচরিতের সন্ধ্যাকর।সন্ধ্যাকর নন্দী।"
এতক্ষণে নিশ্চয়ই বোঝা গেছে,কবিবর এসে উপস্থিত এখনকার সময়ে।পালরাজা রামপালের সভায় চাটুকবি ছিলেন তিনি।শাসকের চাটুকারিতায় তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিলেন না।রামপালের সময় কৈবর্ত বিদ্রোহ দমনে তাঁর রামচরিতের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।একালের বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদলের টালমাটাল অবস্থায়,বিদ্রোহীদের উপর নেমে এল বন্দুকের গুলি।পরিণামে শাসকের পোষা বুদ্ধিজীবীরাও আর পাশে থাকল না।দীর্ঘ চৌত্রিশ বছরের শাসকদলের চেয়ারম্যান পালযুগ থেকে সন্ধ্যাকরকে উড়িয়ে আনলেন,বঙ্গীয় বুদ্ধিজীবীদের চাটুকারিতার ব্যাকরণ শেখাবার জন্য।তারপর,পালাবদলের হাওয়ায় কোনদিকে ঝুঁকলেন চাটুকার শিরোমণি?চেয়ারম্যানের চেয়ার অটুট রইল না মাতঙ্গিনী মায়ের আনা বাংলার মাটিতে ঘাসফুল ফুটে উঠল,তা যে এতদিনে সকলের জানা বলাই বাহুল্য।তবুও সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বের উত্তালদিনে লেখা এই উপন্যাস আজও প্রাসঙ্গিক।কারণ,যুগে যুগে চাটুকারবৃত্তি কারও ধার ধারে না।ডিগবাজি খাওয়ায় তাঁরা অলিম্পিক পদকের দাবিদার।আজ যে 'বুদ্ধিজীবী-বিদ্বজ্জন' এই শিবিরের মিছিলে হাঁটছেন,বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পেলে পরদিন প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের পতাকা বইতে তাঁদের বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ থাকবে না।তবে বুদ্ধিজীবী মাত্রেই কি শাসকের ধামাধরা পদলেহনকারী?উত্তর মিলবে বইয়ের শেষে। আগাগোড়া অপক্ক গালাগালসমৃদ্ধ উপন্যাসের কারণে সো কলড 'কলচরড' পাঠকসমাজের বিরাগভাজন হবেন কিনা সে বিষয়ে লেখক সন্দেহপ্রকাশ করেছেন।এর উত্তরে বলতে হয়,তথাকথিত 'ছোটলোকের ভাষা'র মাধ্যমে একটি গোটা উপন্যাস নামানোর সাহস আপনার মধ্যে দেখে বিস্মিত হলাম।জানলাম 'টেস্টিস সেরিবেলাম'এর সংজ্ঞা ও ক্যাডার-হার্মাদের পার্থক্য!দুরানিদা সহ টিম জনার্দনের ধুঁয়াধার পারফরম্যান্স লেখার গতিকে একবারের জন্যও স্তব্ধ হতে দেয়নি।একেকটা চকলেট বোম মাঝেমধ্যে বেশ চমকে দিয়েছে,যেমন- "-সত্যজিত রায়ের নাম শুনেছেন? -শুনেছি।দেশের দারিদ্র্য বিদেশে বেচে নাম কিনেছেন। -আঃ কমরেড!গেরিলা অঞ্চলে থেকে থেকে আপনার মধ্যে একটা এক্সট্রিমিজম গ্রো করেছে।বি কেয়ারফুল।অতিবাম ঝোঁক ভাল নয়।ব্যালান্স করুন,ব্যালান্স!"
'কেন্দ্রের চক্রান্ত','মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ'..শাসক দলের বাঁধা বুলি থেকে ছাপোষা গেরস্ত,ব্যাঙ্গের তীব্র কশাঘাত থেকে ছাড় পায়নি কেউই।তবে মাতঙ্গিনীর প্রতি সামান্য পক্ষপাতিত্ব চোখ এড়ায়নি।কেজানে,আজকে বসে লেখা হলে চরিত্রেরা জায়গাবদল করত কিনা!কারণ,সময়ই সবচেয়ে বড় প্রতারক,একথা মেনে নিতেই হবে।কিছু জায়গায় অ্যানার্কি সামান্য বেশি লাগলেও রসাস্বাদনে সেরকম ঘাটতি পড়েনি বললেই চলে।বরং,ব্যঙ্গের মোড়ক ছাড়া এ লেখা প্রকাশ আর হাঁড়িকাঠে গলা দেওয়া একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।তবে যে সুধী পাঠকসমাজের গালিগালাজ বিষয়ে অভিজ্ঞতা কম,তাঁদের জন্য এ বই সম্বন্ধে আগের থেকে বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ টাঙিয়ে দেওয়াই সমুচিত কাজ হবে বলে মনে হয়।প্রচ্ছদ বেশ অন্যধারার এবং বিষয়োপযোগী।নবারুণ অস্তাচলে যাবার পরে এরকম একটি রাজনৈতিক প্রহসন পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্য দ্য কাফে টেবিল এবং দেবতোষবাবুকে সাধুবাদ জানাই।
I like the narration style of the author. If I ignore the political biases of the novel, it was quite an enjoyable read. Though, the climax could have been made more dramatic.