স্বপ্ন নিয়ে ভাষা শহীদ গ্রন্থমালা সিরিজের বইটি পড়লাম। স্বপ্নকে বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যখ্যা করা হয়েছে। বইটি থেকে অল্প একটু আলোচনা করলাম। প্রথমেই আমেরিকান ফোকলোরের একটি গল্প দিয়ে শুরু করও। মহক নামের এক উপজাতির মাঝে এক রকম লৌকিক বিশ্বাস ছিল। এই বিশ্বাস অনুযায়ী কেউ কোন কিছু নিয়ে স্বপ্ন দেখলে তাকে তা দিতে হবে। ধরুন আমার একটা বেড়াল আছে আপনি স্বপ্নে দেখলেন ওই বেড়ালটা আমি আপনাকে দিয়েছি এখন মহকদের লৌকিক বিশ্বাস অনুযায়ী ওই বেড়াল আমি আপনাকে দিয়ে দিতে বাধ্য। মহক উপজাতির এক লোক স্বপ্নে দেখলেন তাদের এলাকায় কর্মরত আমেরিকান ঔপনিবেশিক কর্মকর্তার গায়ের কোট নিয়ে। ওই মহক এসে তাকে জানাতেই তাদের আচারের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন করে কর্মকর্তা তাকে কোটটা দিয়ে দেন। কিন্তু কর্মকর্তা এর প্রতিশোধ তুলতে চাইলেন। তিনিও একদিন ওই মহক মানুষটিকে একটি স্বপ্নের বিবরণ শোনালেন এবং সে বিবরণ অনুযায়ী মহক মানুষটি তাকে ৫০০০ একর জমি তার নামে দলিল করে দিলেন।
এ ছিলো আগেকার মানুষের স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস এবং তার অপব্যবহারের নমুনা। স্বপ্ন নিয়ে আমাদের মাঝে এই সময়েও চর্চা যে কম নয় তা রাস্তাঘাটে "খোয়াবনামা" বই গুলো দেখলেই বোঝা যায়। স্বপ্ন নিয়ে কথার শেষ নেই। স্বপ্নের আগেও যার কথা বলতে হয় তা হলো ঘুম। মানুষ তার জীবনের ৩৩% ভাগ কাটায় ঘুমিয়ে এবং তার ঘুমের ২৫% অংশ জুড়ে থাকে স্বপ্ন। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে কমতে থাকে এর পরিমাণ।
সব যুগের মানুষ স্বপ্নকে একরকম ভাবে দেখেনি। আদিম মানুষের কাছে ঘুম ও স্বপ্ন ছিল এক বিস্ময়কর ব্যাপার। ঘুম ছিল রহস্যময় একটি ঘটনা। ঘুমকে অনেকে তুলনা করেছেন সাময়িক মৃত্যুর সাথে। আত্মার ধারণাও এ থেকে জন্ম নেয়। জে জি ফ্রেজার তার বিখ্যাত বই দ্যা গোল্ডেন বাউ বউতে বলেছেন ব্রাজিল ও গায়নার লোকেরা মনে করতো তাদের আত্মা স্বপ্নে দেখা কোন কাজ করতে গিয়েছে শুধু তার শরীরটাই বিছানায় পড়ে ছিল। এমনকি ঘুম ভাঙার আগে আত্মা শরীরে প্রবেশ করতে না পারলে সে আর ঘুম থেকে উঠবে না।
আদিম মানুষেরা তাদের স্বপ্ন ও বাস্তব দুটোকেই সত্য মনে করত। স্বপ্নের সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বয়ানে স্বপ্নের মাধ্যমে আদেশপ্রাপ্ত হয়ে বহু কার্জ সাধন করতে দেখা যায়। সনাতন ধর্ম, আব্রাহামিক রিলিজিয়ন, গ্রিক মিথলোজিতেও এর উপস্থিতি রয়েছে। বইতে এরকম অসংখ্য উদাহরণ উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে স্বপ্নের ধারণা ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়। স্বপ্নের ভাববাদী ব্যখ্যার বদলে বস্তুবাদী ধারণার সূচনা হয়। ফ্রয়েডের অবদানে আমূল পরিবর্তন এলেও আদতে দেখা যায় ফ্রয়েডও বস্তুবাদী ধারণার অন্তরালে ভাববাদী ব্যখ্যায় গিয়েছেন কারণ তিনি সবকিছুর মাঝে একটি প্রতীক খুঁজেছেন। তার লিবিডো সম্পূর্ণ যৌনতা নির্ভর। অবদমিত ইচ্ছাকেই মানুষ স্বপ্নে দেখে, সবখানে লিঙ্গের অস্তিত্বের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এদিকে ইগুয়েন এক ধাপ সামনের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তার মতে লিবিডোতে যৌনতা একটা দিক মাত্র আরও অন্য বিষয় রয়েছে। পাভলভ এদিকে রিফ্লেক্সের মাধ্যমে মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের মাঝে রাখার চেষ্টা করেছেন।
স্বপ্ন এরপর ঘুম থেকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হতে থাকে। মানুষ শুধু ঘুমিয়েই স্বপ্ন দেখেনা জেগেও দেখে। লেনিন, কিয়ের্গেগার্দ স্বপ্নের এই বস্তুবাদের কথা বলেছেন। লুথার কিং এর I had a dream বাস্তবে অর্জনের স্বপ্ন।
সাহিত্যেও রয়েছে স্বপ্নের ব্যাপক প্রভাব। বিভিন্ন ঘটনার বয়ানে স্বপ্নের আশ্রয়। ম্যাজিকাল রিয়ালিজমে এর ব্যবহার বেশ লক্ষ্যণীয়। বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্য তো পুরোটাই স্বপ্ন নির্ভর৷
এরপর আসে স্বপ্নের পরীক্ষা নির্ভর ব্যখ্যা। মানুষের স্নায়ুগলোর সক্রিয়তার উপর নির্ভর করে মানুষের আর ই এম স্লিপে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষ স্বপ্ন দেখে।
স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রাথমিকভাবে জানতে বইটি পড়তে পারেন। তবে ফ্রয়েড, ইগুইন, পাভলভের আলোচনা আরও সহজ হতে পারত।