মধ্য কলকাতার বহুবাজার বা বৌবাজার অঞ্চলে জন্ম উজ্জ্বল ধরের। ছোটবেলা থেকেই কমিকসের প্রতি একটা অদম্য আকর্ষণ অনুভব করতেন। নারায়ণ দেবনাথের কমিক্স, ময়ূখ চৌধুরীর কমিক্স হাতে পেলেই গোগ্রাসে গিলতেন। গল্প পড়া শেষ হলে পাতা উল্টে মন দিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন গল্পের ইলাস্ট্রেশনসগুলো, বিশেষ করে নারায়ণ দেবনাথের সাদা কালো ইলাস্ট্রেশনসগুলো তাকে বিশেষ ভাবে টানত।
এরপর হাতে আসে ইন্দ্রজাল কমিক্স। ব্যাস, আর কি! সেই সময়ের আম -বাঙালি কমিক্স-প্রেমী পাঠকদের মতন তিনিও হয়ে গেলেন বেতাল, ম্যানড্রেকের ভক্ত। অংকের খাতায় অংকের থেকে বেশি ঠাঁই পেতে থাকল বাঁটুল, হাঁদা-ভোঁদা, বেতাল, ম্যানড্রেকের স্কেচ। বাড়ির একমাত্র ছেলে শিল্পী হোক তা বাড়ির কেউ চায়নি। তাই আঁকার জন্য আলাদা না ছিল কোন খাতা, না ছিল রং তুলির যোগান। কোন আর্ট কলেজ বা স্কুলেও ভর্তি হওয়া হয়ে ওঠেনি বাড়ির অনিচ্ছায়। কিন্তু তাতেও উৎসাহে বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়েনি, হাতের পেন-কালিকে সম্বল করেই চলতে থাকল তার শিল্প সাধনা।
জীবনের প্রথম কমিক্স "আকাশে আতঙ্ক" প্রকাশ পায় ১৯৭৭ সালে পূজাবার্ষিকী কিশোরভারতীতে।এই কমিক্স তাকে প্রথম পরিচিতি দেয় এবং সেই সুবাদেই তিনি নজরে পরে যান কিশোরভারতীর প্রয়াত সম্পাদক দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। তিঁনি তাকে মৌলিক কার্টুন চরিত্র নিয়ে নতুন কমিক্স শুরুর ভাবনা-চিন্তা করতে বলেন।ফলস্বরূপ জন্ম নেয় ভজা-গজা চরিত্র।
ভজা দুর্দান্ত স্মার্ট ছেলে এবং সেই এই কমিকসের প্রধান চরিত্র। গজা ভজার এক নম্বর বন্ধু , সামান্য ভীতু এবং গোঁয়ার। বৈজ্ঞানিক ভানুবাবু - ভজার এক কাকা, যে ভজাকে প্রাণের চেয়েও ভালোবাসে। ভানুবাবুর সহকারী মন্টুবাবু। মন্টুবাবুর মাথা এবং শরীর - দুটোই মোটা। এদের মজাদার কীর্তি-কলাপ নিয়ে বের হতে লাগল 'ভজা-গজার মজাভেঞ্চার', যা পাঠকমহলে সাড়া ফেলে দেয়।
সেই সব মজাদার কীর্তি-কলাপ থেকে বাছাই করা বেশ কিছু কমিক্স স্থান পেয়েছে এই বইতে। এর মধ্যে কোন কাহিনীতে ভজা গজাকে পাড়ার সবচেয়ে হাড়কেপ্পন প্রতিবেশীর থেকে কায়দা করে চাঁদা আদায় করতে দেখা গেছে, তো কোন কাহিনীতে জীব-বিজ্ঞানী ভজ-কট খান্নার আবিষ্কৃত যন্ত্রের পাল্লায় পড়তে দেখা গেছে। ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি করা চোরেদের আটকানো থেকে মরণাপন্ন ঠাকুমাকে জীবনদানের মতন চমকপ্রদ কাজকারবার করে ভজা গজা রীতিমতন কামাল করেছে। শিল্পী উজ্জ্বল ধরের অলংকরণে সমৃদ্ধ প্রত্যেকটা কাহিনীতেই রয়েছে এক অনাবিল আনন্দ, যা সব বয়েসের পাঠকরাই চেটেপুটে উপভোগ করতে পারবেন।
তবে বইয়ের সবচেয়ে মজাদার কাহিনীটি হল 'রোবট চোর' নামক কমিক্সটি। এই কমিক্সটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ পেত 'কিশোর মন' পত্রিকায় এবং এটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে পরবর্তী কালে হিন্দিতে অনূদিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছিল হিন্দি পরিবর্তন সাপ্তাহিকীতে। এই কাহিনীতে দেখা যায় ভানুবাবুর সহকারী মন্টুবাবু - ভানুবাবুর আবিষ্কৃত ট্যাবলেট খেয়ে ৩০গুণ ছোট হয়ে প্রমান সাইজ থেকে ২ইঞ্চি সাইজে এসে উপস্থিত হন। কিভাবে তাকে আবার মূল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় সে কথা ভাবতে ভাবতেই তার কাছে খবর আসে তার সাধের রোবটকে চার জন দুষ্কৃতী ছিনতাই করে নিয়ে পালিয়েছে। তার রোবটকে কারা নিয়েছে, কি উদ্দেশ্যে নিয়েছে আর নিয়েই বা কোথায় গেছে কিছুই তার জানা নেই। অতয়েব রোবটের খোঁজে শুরু হয় অভিযান; আর সেই অভিযানে তার সঙ্গী হয় ভজা গজা, ২ইঞ্চির (ক্ষিপ্ত) মন্টুবাবু , ভানুবাবুর বন্ধু প্রাইভেট ডিটেকটিভ ধনেশ ধর এবং লালবাজারের জাঁদরেল অফিসার বাঘা সেন (যার নাম চোর-ডাকাত এমনকি সাধুরাও কাঁপে) । এরপর কমিকসের ছত্রে ছত্রে পাঠকদের জন্য রয়েছে জমজমাট এডভেঞ্চার, একরাশ মজায় ভরপুর অ্যাকশন এবং মজাদার সংলাপ।
বহুকাল এই সব মজাদার কমিক্স পত্রিকা-বন্দী হয়ে পরে থাকার পর ১৪২৪ সালের বাংলা নববর্ষে বুক ফার্ম থেকে প্রথম কমিক্স বই আকারে প্রকাশিত হল। এর জন্য বিশেষ কৃতিত্বের দাবি রাখেন বুক ফার্মের কর্ণধার শান্তনু ঘোষ এবং কৌশিক দত্ত মহাশয়গণ, কারণ ওনাদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এই বই আলোর মুখ দেখেছে। বিশেষ কৃতজ্ঞতা শ্রী রুস্তম মুখোপাধ্যায়কেও, যিনি এই সংকলনটি গড়তে বিশেষভাবে সাহায্য করেছেন। আশারাখি ওনাদের ওই সমবেত প্রচেষ্টা পাঠকদের ভালো লাগবে এবং উজ্জ্বল ধরের সৃষ্ট 'ভজা গজা' কমিক্সপ্রেমী পাঠকদের কাছে সমাদর লাভ করবে।