"প্রত্যেক সেহরীতে হুজুর প্রথমেই খোঁজ লইতেন কোন মুসাফির আছেন কিনা। মুসাফিরকে সেহরী খাওয়ানো হইয়াছে জানাইলে শান্ত হইতেন; তাহা না হইলে কতক্ষণ পরপরই ছটফট করিতেন। ভুলবশতঃ কোন মুসাফির বাদ পড়িয়া যায় কিনা- এই ভাবনা তাঁহাকে এমনভাবে পাইয়া বসিত, মনে হইত তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়ের চাইতেও তাঁহার জন্য ইহা একটি বড় কাজ।
আরও একটি ভাবনা তাঁহার থাকিত। কুকুর-বিড়ালগুলি সেহরীর সময়কালে খাইল কিনা ইহা নিজে তদারক করিতেন। হঠাৎ করিয়া তারস্বরে আমাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিতেন, কানপচা কুত্তাটি খাইছে? কানপচা কুত্তাটিই দরবারের সবচেয়ে দুর্বল ও মজলুম ছিল। হুজুরের দাফনের পরদিন হইতে সে যেভাবেই হউক সকলের দৃষ্টি এড়াইয়া একেবারে মাজারের উপর গিয়া শুইয়া থাকিত। এইজন্য বহুত তাড়া ও মার খাইয়াছে। কিন্তু নিরস্ত হয় নাই। সাত দিন এইরূপ উৎপাত করিয়া কুকুরটি মাজারের উপরে শুইয়া থাকা অবস্থায় অষ্টম দিবসে মারা যায়। "
সৈয়দ ইরফানুল বারী মওলানা ভাসানীর শেষ দিনগুলোতে তাঁর সাহচর্য পেয়েছিলেন। ব্যক্তি মওলানা, রাজনীতিবিদ মওলানা, গৃহী মওলানা, রসিক মওলানা ও সূফি মওলানা - বহুমাত্রিক মওলানাকে তিনি দেখেছেন। তার এই দেখা নিয়েই লেখা 'আমার ভালোবাসা মওলানা ভাসানী'।
সৈয়দ ইরফানুল বারী মওলানার পত্রিকা 'হক-কথা' সম্পাদনা করতেন। শেখ মুজিবের সরকার এই পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। সেখানে শেখের আমলে কত দ্রোহী লেখা ছাপানো হতো পাঠক তা কিছুটা হলেও বুঝতে পারবেন। মওলানা ভাসানী স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগকে বলতেন 'লুটপাট সমিতি'। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা দেখে অক্টোবর মাসে ঢাকার একটি জনসভায় মওলানার প্রোফেটিক মন্তব্য,
“লুটপাট সমিতির অধিকাংশই ১৯৭৫ সালের মধ্যেই অপঘাতে যাইবে। তাহাদের ধন-সম্পত্তি বাড়ি-গাড়ি কারূনের মালের মত ধ্বংস হইয়া যাইবে। সরকারী ও বিরোধীদলের যাহারা জনসাধারণকে ধোঁকা দিবার জন্য মিথ্যা প্রতিশ্রুতি মিথ্যা প্রচার চালাইয়া এখনো জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করিবার জন্য মোনাফেকি করিতেছে তাহাদের জালিয়াতি জুয়াচ্চুরী সমস্তই ১৯৭৫ সালের মধ্যেই চিরকালের জন্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইবে। "
উপমহাদেশের রাজনীতির অন্যতম কৃতী সন্তান মওলানা ভাসানীকে বুঝতে হলে তাঁর মুর্শিদ সূফি সাধক হজরত নাসিরুদ্দিন বাগদাদিকে বোঝা দরকার। চিনতে হবে রবুবিয়াত তথা পালনবাদের প্রবক্তা মওলানা আজাদ সুবহানিকে। জানতে হবে মওলানা হসরত মোহানি, মওলানা মাহমুদুল হাসান সম্পর্কে। তরুণ মওলানা ভাসানীর অন্যতম মুর্শিদ ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। এঁদের কর্ম ও জীবন সম্পর্কে বুঝলে মওলানা ভাসানীর চিন্তাজগৎ, জীবনধারা ও সাধনার কিয়দাংশ পাঠক উপলব্ধি করতে পারবেন। এঁরাই মওলানা ভাসানীর মানস গঠন করেছেন।