"এ্যাডভেঞ্চার গল্পের আবার ভূমিকা কি? তবে হ্যাঁ, সাগরতলে এ্যাডভেঞ্চারের গল্প বাংলায় খুব-একটা লেখা হয়নি। এ ব্যাপারে আমার উৎসাহটাও অনেক দিনের। সেটা বাস্তব রূপ পেল ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সম্পাদিকা লীলা মজুমদারের তাড়নায়। ‘সন্দেশে’ই ধারাবাহিকভাবে বেরোল প্রথমে ‘সিন্ধুতলের সন্ধানী’ এবং তারপর এই ‘পাতালপুরী অভিযান’।
অতীতে নিবাত-কবচ নামের তিন কোটি অসুর বাস করতো সমুদ্রতলে দুর্গ বানিয়ে। লঙ্কার রাজা রাবণ তাঁদের সঙ্গে এক বছর যুদ্ধ করেন। তবে শেষপর্যন্ত পাণ্ডু-পুত্র অর্জুন মাতলির সাহায্য নিয়ে আকাশ থেকে অস্ত্র হেনে ধ্বংস করেন তাঁদের। ....রামায়ণ-মহাভারতে এসব কাহিনী লেখা আছে। এ-যুগের কয়েকজন দু;সাহসী ভারতীয় নিজেদের প্রানের মায়া তুচ্ছ করে ‘পাতালপুরী অভিযানে’ গিয়ে সমুদ্রতলের সেই রহস্যময় দুর্গ খুঁজে বার করেন। গল্পের নামকরণ অবিশ্যি সন্দেশ-সম্পাদকমশাই সত্যজিৎ রায়ের। বইয়ের প্রথম ছবিটাও মানিকদা-ই এঁকে দিয়েছেন, বাকি ছবিগুলি সুবীর রায়ের আঁকা। মলাট এঁকেছেন মানিকদার পুত্র শ্রীমান সন্দীপ। আর লে-আউট, প্রুফ দেখা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো সামলেছেন তরুন লেখক-বন্ধু সুজয় সোম। এদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বাহুল্য বলে বোধ করি।" —লেখক
"নিবাতকবচ অভিযান"-এর কথা মনে আছে? বছর দেড়েক আগেই প্রকাশিত হয়েছিল দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের লেখা এই উপন্যাসটি, যাতে বিষবৈদ্য মানুষের মহাশত্রু নিবাতকবচদের পরাভূত করেছিলেন। আলোচ্য নভেল্লাটি পড়তে গিয়ে বুঝলাম, একটি বিশুদ্ধ পার্থিব, বিজ্ঞান ও পুরাণমিশ্রিত কাহিনিতে নিবাচকবচেরা তার অনেক আগেই এসেছিল পাঠকের সামনে, সন্দেশের পাতায়। সুবীর রায়ের ঝকঝকে অলঙ্করণে সমৃদ্ধ হয়ে সেই লেখাটি জানুয়ারি ২০১৪-য় নিউ বেংগল প্রেস থেকে নতুন করে আমাদের সামনে এল। কী নিয়ে লেখা হয়েছে এই কাহিনিটি? জলের মধ্যে মানুষের নিপুণ যন্ত্রে কাটা একটা পাথুরে দেওয়াল দেখে শুরু হওয়া অনুসন্ধান শেষ হয় এক অন্ধ গুহায়, যেখানে মৃত্যুর জন্য দিন গুনছে এক একদা মহাশক্তিধর প্রজাতির শেষ ক'জন। তাদের কি উদ্ধার করা গেল? নাকি সমুদ্র আরও অনেক রহস্যের মতো একেও চিরকালের মতো রেখে দিল নিজের কাছে? পড়তে খুব একটা সময় লাগবে না। দামও মাত্র ৬০/- টাকা। আর গল্পের প্লট থেকে শুরু করে সংলাপ, সবেতেই আছে এক মানবিকতার স্পর্শ, যা ধুমধাড়াক্কা মারামারি আর অস্ত্রশস্ত্রের এই বাজারে একান্ত দুর্লভ। আমি বইটিকে পড়ার অনুরোধই করব।
কয়েকজন অভিযাত্রীদের দল। তাদের কাছে আসে এক গবেষক। সমুদ্রের তলায় এক গুহার ভিতর আছে এমন এক হারানো যুগের স্মৃতি যা আবিষ্কার করলে প্রমাণ করা যাবে রামায়ণ কোন কল্পকাহিনি নয়। অতঃপর সেই গুহায় অভিযান, সেখানে নিবাতকবচ বলে এক প্রায় বিলুপ্ত হতে বসা এক অসুর প্রজাতির কয়েকজন অবশিষ্ট অসুরের দেখা মেলে যারা বেঁচে আছে কোন এক সংকল্পের জন্য - এই নিয়েই এই ৮০ পাতার উপন্যাসিকাটির কাহিনি এগিয়েছে। আরো একটি রহস্যময় চরিত্র রয়েছে, কিন্তু তার কথা এখানে বলব না, ওটা সাসপেন্স হিসেবে থাক।
প্লটটি শুনতে বেশ মনে হলেও এক্সিকিউশন খুব একটা ভালো নয়। লেখক ভূগোল বিশারদ ছিলেন কিনা জানি না তবে ভূগোলের অনেক ইনফো ডাম্পিং আছে। রামায়ণের আমলের গুহায় ঢুকে স্থাপত্য, ভাস্কর্য এসবের বর্ণনা ছেড়ে স্ট্যালাগমাইট কীভাবে গজায় তা নিয়ে ভাষণ শুনতে হলে কার ভালো লাগে? এছাড়াও আশেপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ বোঝাতে লেখক যেমন ভাষার প্রয়োগ করেছেন তা প্রায়ই দুর্বোধ্য লাগল। গুহার শীর্ষবিন্দু, চাটান, বার সমুদ্র - এসব বোধগম্য হল না।
কিন্তু ওইটুকু বাদ দিলে শেষের ২০-৩০ পাতা বেশ ভালো। নিবাতকবচদের ব্যাপারটা ভালোভাবেই প্লটে ইমপ্লিমেন্ট করা হয়েছে।
মোটামুটি ধরনের একটা বই। মাস্ট রিড নয়। সন্দেশে বেরিয়েছিল বলে প্রচ্ছদ সন্দীপ রায় এবং ইলাস্ট্রেশনের কিছু (সব নয়) সত্যজিৎ রায় করেছেন। সেইসব ইলাস্ট্রেশন নিউ বেংগল প্রেসের এই বইতে আছে।