Jump to ratings and reviews
Rate this book

শ্রীসদনের শ্রীমতীরা

Rate this book
Memoir

প্রচ্ছদ – ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

মেয়েদের স্কুল হোস্টেল তৈরি করে রবীন্দ্রনাথ তখনকার বঙ্গসমাজে যে আলোড়ন তুলেছিলেন, যত নিন্দেমন্দ শুনেছিলেন, এখন তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। তা সত্ত্বেও নিজের লক্ষ্যে স্থির অবিচল ছিলেন তিনি। শ্রীসদন সেই নীরব আন্দোলনেরই ফসল। এই হস্টেলের একদা আবাসিক লেখিকা এঁকেছেন শ্রীসদনকে কেন্দ্র করে তাঁদের মেয়েবেলা যাপনের এক মনোরম স্মৃতিচিত্র। কৈশোর থেকে যৌবন – জীবনের পর্ব থেকে পর্বান্তরে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে চলেছে হস্টেলকে ঘিরে সেখানকার সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হই-হুল্লোড়ের এক রমণীয় ধারাবিবরণী।

150 pages, Hardcover

First published December 1, 2016

17 people want to read

About the author

Rita Basu

20 books3 followers
ঋতা বসুর জন্ম কলকাতায়। শিক্ষা শান্তিনিকেতন পাঠভবন ও প্রেসিডেন্সি কলেজে। প্রথমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করে শিশুশিক্ষায় বিশেষ ডিগ্রি অর্জন করেন মারিয়া মন্টেসরির নিজস্ব প্রতিষ্ঠান থেকে। দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে নিজের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষাদান করেছেন।

একটু দেরি করেই সাহিত্যক্ষেত্রে প্রবেশ। বড়দের এবং ছোটদের, দু’ধরনের রচনাতেই সমান স্বচ্ছন্দ। তাঁর সৃষ্ট পিন্টুমামা ও বাঘা, কিশোর সাহিত্যের প্রিয় চরিত্র। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লেখা শতদল ও মন্দাক্রান্তা বোসের রহস্যকাহিনিগুলো পাঠকমহলে সমাদর লাভ করেছে। শান্তিনিকেতনের মেয়ে-হস্টেল নিয়ে তাঁর রম্যরচনা রবীন্দ্র সাহিত্যের ধারায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এ ছাড়া ভ্রমণকাহিনি, হাস্যরসাত্মক রচনাও তিনি লিখে চলেছেন সমানভাবে।

ছোট-বড় যে-কোনও ভ্রমণে সমান আগ্রহী। প্রিয় বিষয় ইতিহাস। ছোটদের জন্য ইংরেজি ও বাংলা পাঠ্যপুস্তকও রচনা করেছেন বেশ কয়েকটি। ২০১৪ ও ২০২৪ সালে শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য পেয়েছেন বিশেষ পুরস্কার।

আজও তিনি শিশুমনের স্বাস্থ্য ও বিকাশের জন্য নিরন্তর কাজ করে চলেছেন।

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
4 (66%)
4 stars
2 (33%)
3 stars
0 (0%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 2 of 2 reviews
Profile Image for Riju Ganguly.
Author 38 books1,867 followers
March 2, 2017
স্মৃতিকথা কি সরস হয়?
অবশ্যই হয়। তপন রায়চৌধুরীর অদ্বিতীয় সাহিত্যকীর্তি “রোমন্থন অথবা ভীমরতিপ্রাপ্তর পরচরিতচর্চা”, বা নবনীতা দেবসেনের বয়ানে তাঁর নিজের নানা অ্যাডভেঞ্চার বা ব্যাড-ভেঞ্চারের বিবরণ পড়ে যৎপরোনাস্তি পুলকিত হননি, এমন পাঠক অতিবিরল।
তবু, কেন যেন, বাংলায় অধিকাংশ স্মৃতিকথা গবেষকদের জন্যই লেখা হয়। হয়তো সাহিত্য বা রচনা নিয়ে ডকুমেন্টেশনের দৈন্যদশা দেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের জীবনকথায় রসের বদলে তথ্যকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
আমিও সচরাচর ‘জীবনী’ টাইপের বইগুলো থেকে কিঞ্চিৎ সশ্রদ্ধ দূরত্ব বজায় রাখতেই পছন্দ করি।
কিন্তু, গতবছর আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকীতে যে সাহিত্যিকের কলমে হারানো ছোটোবেলার আশ্চর্য সরস আখ্যান “বাঘার আশ্চর্য ডায়েরি” পড়ে শুধু মুগ্ধই হইনি, বরং অনেক-অনেক আগে পড়া “টং লিং” বা “গুপির গুপ্তখাতা” পড়ার অনুভূতিগুলো ফিরে পেয়েছিলাম, সেই ঋতা বসু-র স্মৃতিচিত্রণ হাতের কাছে পেয়ে পড়ার লোভ সামলাতে পারলাম না।
পড়ে ফেললাম, “শ্রীসদনের শ্রীমতীরা”।
কেমন লাগল?

“প্রাককথন”, “প্রথম আলোর পরশখানি”, “চিঠি”, “লেখাপড়া”, এমনই সব শিরোনামে সাজানো, সরস সপ্রাণ গদ্যে লেখা, অন্তত দশ-বিশ রকমের স্বাদ ও গন্ধ দিয়ে ঠাসা মিঠা মসালা মঘাই পানের মতো সুস্বাদু এই নাতিদীর্ঘ বইটি হাতে নিলেই বিপদ, কারণ মাঝপথে এ লেখা ছাড়লে বুকের মাঝে হাহাকার ওঠে।
আর কেমন সেই লেখা? একটু নমুনা দিই তাহলে।
“ধর্মের কল দেরিতে হলেও একদিন নড়বেই। আমার বাবা তাঁর নয় বছরের দুঃসাহসী কন্যারত্নটির সুরক্ষার জন্য প্রথমেই শান্তিনিকেতনের কথা চিন্তা করলেন। চৌষট্টি সালে পুজোর পর এক মনোরম বিকেলে আমি এক ভাই ও এক বোনের সঙ্গে শান্তিনিকেতনের মাটিতে পা দিয়েই স্থানমাহাত্ম্যে আবিষ্ট হলাম। রাস্তার গাছেই এত ফুল, বাড়ির সীমানায় ইটের পাঁচিলের বদলে বাহারি গাছের বেড়া, লাল মাটির রাস্তা, অনেকখানি জায়গা নিয়ে ছবির মতো সব বাড়ি। ... এর কিছুদিন পর ২৩ জানুয়ারি সন্ধেবেলা বাক্সবিছানা সহ শ্রীসদনের সামনে এসে নামলাম"।
স্মৃতির অন্ধকার গুহার ভেতর থেকে ভেসে আসা ঘন্টাধ্বনির মতো কয়েকটা লাইন মনে পড়ল কি? সেই যে...
“১৯১৩ সালের জুন মাসের একেবারে শেষের দিকে, দুপুরের একটা প্যাসেঞ্জার ধরে, রওনা হলাম। ... খানা স্টেশন পেরিয়ে যেই-না লুপ লাইন ধরা, অমনি সমস্ত জগৎটা গেল বদলিয়ে। চেয়ে দেখলাম লাল মাটি থেকে তখনও খরা যায়নি, বর্ষা সবে শুরু হয়েছে। গাছপালার সব অন্য চেহারা, শাল, শিমুল, পলাশ, মহুয়া; ... বিকেলে বোলপুর স্টেশনে পৌঁছলাম। ... আমার জন্য অনঙ্গবাবুর ট্যাক্সি ঠিক করা ছিল। তাতে চেপে আমি ঝড়ঝড় করতে করতে রাজার হালে মেয়েদের নতুন বোর্ডিং শ্রীভবনে পৌঁছলাম"।
আজ্ঞে হ্যাঁ, শতবর্ষে পা দেওয়া লীলা মজুমদারের লেখা, বাংলা সাহিত্যের অক্ষয় সম্পদ “আর কোনোখানে”-কে পদে-পদে মনে করিয়ে দিয়েছে এই বই তার সরসতা আর প্রাণপ্রাচুর্য দিয়ে। আরেকটু উদাহরণ তুলে দেওয়াই যাক।
“শ্রীসদনের মূল গেটের সামনে দুটো সিমেন্টের বাঁধানো বেঞ্চ। পরবর্তী জীবনে অন্যকে দেখা এবং নিজেকে দেখানোর কাজেই তা ব্যবহার করেছি। ... বারান্দার দু’দিকে দুই সুপারের ঘর। দু’জনেই সুধাদি। একজন বাচ্চাদের। অন্যজন বড়োদের। একজন শ্যামবর্ণ অন্যজন ফরসা। তাই একজনকে বলা হত পূর্ণিমা সুধাদি অন্যজন অমাবস্যা সুধাদি"।
কিছু মনে পড়ছে কি? আমার তো পড়ছে, তবে এবার “পাকদণ্ডী” থেকে...
“সামনের দরজা খুলে দুজন থান-পরা আধা-বয়সি মহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন, একজন রোগা, দুঃখী চেহারা, নাম সরোজিনীদি, অন্যজন মোটামোটা হাসি-খুশি, তিনি বালবিধবা হিরণদি। এঁরা রান্নাঘরের মেট্রন"।

এইভাবে লিখতে গেলে এটা পাঠ-প্রতিক্রিয়া না হয়ে কপিরাইট আইন-ভঙ্গকারী দলিল হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু তবু লোভ সামলানো যাচ্ছেনা, তাই আরো কিছুটা তুলে দিলাম।
“ফুলের লম্বা বোঁটা দিয়ে বিনুনি বুনে আমরা সবাই চুলে লাগিয়ে নিজেদের বিশ্বসুন্দরী মনে করতাম। মনে করবার অবশ্য যথেষ্ট কারণও ছিল। চতুর্দশী পঞ্চদশীরা অলস খেয়ালে ফুল তুলছে মালা গাঁথছে নিজে সাজছে সখীকে সাজাচ্ছে। চোখে মুখে খুব যত্নে গড়ে তোলা উদাস আনমনা ভাব। দেখলে মনে হবে একপাল শকুন্তলাসহ একেবারে কণ্বমুনির আশ্রম। এদিকে সামনের রাস্তাটাই হল প্রধান সড়ক। কলেজের ছেলেরা ছাড়াও দলে দলে ট্যুরিস্ট। এহেন স্বর্গীয় দৃশ্যে খুব শক্ত ধাত না হলে কাত হবে এ আর বেশি কথা কী"।
এবং, আবার-আবার সেই কামান গর্জনের মতো আমার আবারো মনে পড়ল “আর কোনোখানে”-র সেই লাইনগুলো ...
“একবার প্রবীণ পূর্ণচন্দ্র উদ্ভটসাগর এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই তো ফ্যাসাদে ফেললেন! কী সব বই পড়তে দিয়েছেন! এদিকে “কৃষ্ণকান্তের উইল” পড়াতে হবে; ওদিকে পয়ে র-ফলা একার ম উচ্চারণ করলে ছাত্রীরা হয়তো গার্জেনের চিঠি আনবে। কী করা যায় বলুন!’
বললাম, ‘খালি উচ্চারণ করবেন তো? আর কিছু করবেন না তো?” উদ্ভটসাগর নাসা কুঞ্চিত করলেন। আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম, ‘তাহলে কোনো ভয় নেই’"।

শুধু “আর কোনোখানে” বা “পাকদণ্ডী” নয়, আমার তো “খেরোর খাতা” পড়ার স্মৃতিও জেগে উঠল লেখাগুলো পড়ে। কেন? রইল আরেক পিস নমুনা।
“হস্টেলে যে-কোনো রোগই মহামারী হয়ে দেখা দিত। চিকেনপক্স হয়ে দলে দলে মেয়েরা রোদন ভরা এ বসন্ত গাইতে গাইতে সিকরুম ভরিয়ে ফেলছে। একুশ দিন টানা ছুটি। শরীর ভরা বসন্তের গুটি না থাকলে কে বলবে এরা অসুস্থ? হা হা হি হি গুলতানি সারাদিন। আর জানা কথাই, বিস্তরের সঙ্গেই আসে বিস্তর মিছা"।
অথবা, পড়াশোনা প্রসঙ্গে, “ভয়ের বিষয়গুলো সীতার গয়নার মতো খসিয়ে দিতে দিতে ক্লাস নাইনে এলাম কিন্তু ফেউয়ের মতো পেছনে লেগে রইল ইংরেজি"।

নাঃ, এভাবে তুলে দিতে গেলে আস্ত-আস্ত অধ্যায় তুলে দিতে হবে, যার মধ্যে প্রধানতম হল “ন্যাকামো”। এতে ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতো জিনিস এত আছে যে উদ্যোগী পাঠক বইটা কিনে সোজা ল্যামিনেশন করাতে তৎপর হতে পারেন।

তবে সবই কি আর অলস মায়া বা মেঘের খেলা? সরস ভঙ্গিতে বলা হলেও শান্তিনিকেতনের কিছু টালমাটাল মুহূর্ত, কিছু উথাল-পাতাল অনুভূতির সঙ্গেও আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন লেখক। তাঁর কলম থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি, কীভাবে যুগান্তর ছায়াপাত ঘটিয়েছিল লাল মাটি আর সবুজ গাছে ভরা ওই প্রান্তরে আর শ্রীসদনের বাসিন্দাদের অন্তরে।

এসবের মধ্য দিয়ে বুঝতেও পারিনা, কখন বইটা শেষ হয়ে গেছে। শেষ পাতাটা ওলটানোর পর মনে হয়, শ্রীসদনের তেঁতুলতলার ঝিরিঝিরি বাতাস শ্রীমতীদের মতো আমাদের গায়েও আর লাগবেনা। বুঝি, উন্মুক্ত প্রকৃতির মতোই যেসব কাহিনি আর অনুভূতি আমাদের চোখে সম্মোহক অঞ্জন বুলিয়ে রেখেছিল এতক্ষণ, সেটা হঠাৎই সরে গেছে।
শুধু রেখে গেছে ভোরের শিউলি বা পথের পলাশের মতো মুঠো-মুঠো ভালোলাগা।

ভাদ্র ১৩১৩-র “আবরণ” নামক লেখায় মানুষটি লিখে গেছেন, “সহজ জিনিসের গুণ এই যে, তাহার স্বাদ কখনোই পুরাতন হয় না, তাহার সরলতা তাহাকে চিরদিন নবীন করিয়া রাখে। যাহা যথার্থ স্বভাবের কথা তাহা মানুষ যতবার বলিয়াছে ততবারই নূতন লাগিয়াছে"। কথাটা যে কত সত্যি তা এই বইটা পড়তে গিয়ে আরেকবার বুঝলাম, যখন বইটা একবার পড়া হয়ে যাবার পরেও আবার পড়তে ইচ্ছে করল।
তাই, অতিনিবিড় পুঁথির অরণ্যে ধরা বুলির বোলের মাদকতায় নিজেকে মাতাল না করে ঝটপট তুলে নিন এই বইখানা, আর রওনা দিন শ্রীসদনের পথে।
ভয় নেই। কেউ আপনাকে গম্ভীর ভাবে বলবেননা, “আপনি কি জানেন না যে এ সময়ে মেয়ে বোর্ডিংয়ে পুরুষ ভিজিটরদের আসবার কথা নয়? যান শিগগির!”
লেখক সঙ্গে আছেন তো।
Profile Image for Ranendu  Das.
156 reviews63 followers
April 16, 2017
শান্তিনিকেতনের শ্রীমান-শ্রীমতীরা
॥শ্রীসদনের শ্রীমতীরা, ঋতা বসু (আনন্দ, ₹১৫০) এবং ছাতিমতলার গান, সুব্রত সেন মজুমদার (সিগনেট প্রেস, ₹২৫০)॥

বসন্তোৎসব শেষ হওয়ার বেশ কিছু দিন পর শান্তিনিকেতনের ডাক এল হাওয়ায় হাওয়ায়, এক সেমিনারের অজুহাতে। সে ডাক ফিরিয়ে না দিতে পেরে, যৎকিঞ্চিত যা আছে, তাকে পোটলাবন্দী করে চড়ে বসলাম রাতের ট্রেনে। বোলপুরে নেমে টোটোর সাওয়ারী হয়ে এমোড় ওমোড় ঘুরে, আলোয় মেখে, আঁধারে নেয়ে যখন পৌছলাম গুরুপল্লীর নিবাসে, রাত তখন তারুন্যের চপলতা ছেড়ে মধ্য-যৌবনের ভাব-আবেশে সামান্য গম্ভীর হয়েছে, হাওয়া তখন মন্দ্র-মন্থর বেগে ঘুমন্তপ্রায় প্রাণের কাছে ফিসফিস করে বলে যাচ্ছে জগৎ পারাবারের নিত্য-অনিত্য, শান্তি, শীতলতার বাণী।

পরদিন সকালে উঠে দ্রুত নেয়ে-টেয়ে রওয়ানা দিলুম লিপিকা অডিটোরিয়ামের দিকে। অনুষ্ঠান শুরু হল। উপাচার্য মহাশয় ও অন্যান্য মাননীয় আমন্ত্রিতদের উত্তরীয়, ফুল ও মঙ্গলমন্ত্রে বরন করার পর, উপাচার্য উঠলেন তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য রাখতে। বক্তব্য শেষ হলে আমরা বহিরাগতরা করতালি দিতে যাব, আমাদের তালি ফিকে হয়ে গেল অন্যদের ‘সাধু সাধু’ রবে! সেটা প্রথম চমক! ডিপার্টমেন্টের ছাত্ররা এসেছে সাদা পাঞ্জাবীতে কমনীয় সাজে, ছাত্রীরা এসেছে প্রায় সাদা শাড়িতে, রমনীয় সাজে। দেখলাম আমাদের কাংস্যবাদ্যের মত করতালির চেয়ে তাদের শুভমুখের ‘সাধুবচন’ টাই এখানে ভাল মানিয়েছে! আমরাও অচিরেই তাই তাদের অনুসরণ করে ওই সাধনমন্ত্রে দীক্ষিত হলেম। আমরাও সমস্বরে বললাম, “সাধু, সাধু”!

এরপর সারাদিন ধরে চলল বৈজ্ঞানিক সারগর্ভ আলোচনা, যা আর যাই হোক, শুনতে খুব একটা সমধুর নয়। বিকালে ওই একঘেয়ে লেকচার শেষ হলে, রাতের ডিনারের আগে ছোটো একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল। সেদিন আবার সমস্তদিনটা কেমন ভেঁপে ছিল, কেৎলীর ফুটন্ত জলের বাষ্প যেমন রান্নাঘরের চতুর্দিক ভাঁপিয়ে তোলে, তেমনি স্তব্দ গরমে হাসফাস করেছে মানুষজন। কিন্তু, অনুষ্ঠানের আগে হঠাৎই ছুটল দমকা হাওয়া! চতুর্দিকের গাছপালা মাথা নেড়ে হাওয়ার এই পাগলামী কে খুব বাহবা দিলে। আর ওই পাগলা হাওয়ার পেছু পেছু একপশলা বাদল-বৃষ্টিও এল নৃত্যরত তরুনীদলের মত! তারা বসন উড়িয়ে, কবরী খসিয়ে, যে যুগল নৃত্যনাট্য উপস্থাপন করলে, তাতে শান্তিনিকেতনের লালকাকঁরের মাটি যেমন ভিজে উঠল একনিমেষে, তেমনি সমস্তদিনের মন মধ্যকার বৈজ্ঞানিক ক্লেদও ধুয়েমুছে গেল একমুহুর্তে!

তারপর, শুরু হল অনুষ্ঠান। রসায়ন বিভাগের ছেলেমেয়েরাই করছে ঋতুরঙ্গ, গানে পাঠে নাচে! তারা যেন বসন্তোৎসব শেষে, শেষ চৈত্রের বিকেলে অলক্ষ্য দেবতার উদ্দেশ্যে আরেকবার তাদের মনবসন্তের নৈবেদ্যের ডালি দিল সাজিয়ে। এ আসলে তাদেরই প্রকাশ, আমরা সেখানে কেবলই উপলক্ষ্য। আমি স্বভাবতই নরম হৃদয়ের মানুষ, ছাত্রছাত্রীদের সমবেত এই অনুষ্ঠান, তার উপরে কবিগুরুর রচনার আবেশে আমার চোখে ঘনঘন জল চলে আসছিল। হলের আলো যদিও িনেভান ছিল, তবু বারবার চোখমোছা বড় বিব্রতকর। পাশে বসে, সঙ্গী অধ্যাপক মশাই ছবি তুলছিলেন, লজ্জ্বা ঢাকতে আগ বাড়িয়েই তাকে বললাম, চশমা ছাড়া দেখছি তো, মঞ্চের লাল-নীল আলোয় চোখ বড় করকর করছে। তিনি বিশ্বাস করলেন কি না কে জানে! অমন সুন্দর অনুষ্ঠানের মাঝে তাল ব্যাহত হল একবারই কারন স্বল্পসংখ্যক নৃত্যরত ছাত্রীদল ঋতুবদলের সাথে দ্রুতলয়ে পোষাক বদল করে উঠতে পারছিল না। তা সেই অনাকাঙ্খিত বিরতিতে অবশ্য সুবিধাই হল, নিজের চোখদুটিকে শুকিয়েও নেওয়া গেল, গলার কাঁপুনিকেও কিছু সম্বৃত করা গেল সেই ফাকে!

কিন্তু, কি জন্য এত আবেগ বিহ্বল হলাম? কি ভেবে এত অশ্রুসজল হলাম? সে কি কেবলই মনের দুর্বলতার কারনে? তা, সে তো বটেই। তবে, তার সাথে আমি শান্তিনিকেতনের নিজেস্ব ঐতিয্যের কথা ভেবেও ক্ষনে ক্ষনে আবেগমথিত হয়ে উঠছিলাম। কি সুন্দর, কি সহজ, কি অনায়াস এই শিক্ষার সাথে সংস্কৃতির মিলন। এই উদাত্ত গলায় গান, নাচ, বাদন এখানকার, বিশেষত পাঠভবনের ছাত্র-ছাত্রীদের সহজাত প্রতিভা। তারা হয়ত সবসময় খেয়ালও করে না যে কত অবহেলায় তারা এক আশ্চর্য, মহান ধারার উত্তরাধিকারী হয়ে উঠেছে!

শান্তিনিকেতন এর এই ধারাটা কি? শান্তিনিকেতন মানেই বা কি? শান্তিনিকেতন মানে কি সপ্তাহান্তে তারাপীঠে বাবার থানে পুজো দিয়ে ফেরার পথে মস্তি করতে থামা? তারাপীঠে যতটুকু পুণ্যি অর্জন হল, তাকে বোলপুরের লজে সুরাস্রোতে বইয়ে দেওয়া? শান্তিনিকেতন মানে কি দুপুরে মাংসভাত সাঁটিয়ে দলবেঁধে ঢেকুঁর তুলতে তুলতে কোনো এক রবিঠাকুরের পুরানো বাড়ি দেখতে যাওয়া? আনতাবড়ি যেখানে সেখানে দাড়িয়ে ফোটো-সেলফি তোলা? শান্তিনিকেতন মানে কি শুধুই আমার কুটিরে গিয়ে বাটিক বা কাঁথাস্টিচ কেনা? শনিবারের হাটে ঘর সাজানোর জিনিষ কেনা? শান্তিনিকেতন মানে কি বসন্তোৎসবে সুরা আর পৌষোৎসবে গাঁজা? শান্তিনিকেতন মানে কি বাউল গান শোনবার হিড়িক আর কালচারাল ও আতেঁল সাজার ১০১ সহজ উপায়? শান্তিনিকেতন মানেটা কি?

শান্তিনিকেতন মানে, দেখা শোনার বাইরেও আসলে কোনো একটা উপলব্ধির ব্যাপার। ওই যে রাঙা মাটির পথ চলে গেছে, যে পথের পাশে নিরন্তর ঝরে যাওয়া শুকনো পাতার স্তুপ আছে পড়ে, সে পথ কোথায় গেছে? কোন গন্তব্যে? ওই যে শাল শিমূল পলাশ, ওই যে অমলতাস, ওই যে মাধবীকুন্জ, তার দিকে নিস্তব্ধ হয়ে চেয়ে দেখেছেন দু-দন্ড! ওই যে বিশাল বটগাছ, যা তিন থাকে বাধানো, ভেবে দেখেছেন সে কেন চুপ করে দাড়িয়ে আছে ওখানে! কার অপেক্ষায়? ওই যে এখানে ওখানে ইতি উতি কত ভাস্কর্য, রমনীর, পুরুষের, শিশুর, মলিন হয়ে উঠেছে তারা রাঙা মাটির ধুলায়, ওরা কি কোন ভোর রাতে পরী হয়ে উড়ে যেতে চায়? ওই যে উপাসনাগৃহ, ওই যে ছাতিমতলা, ওই যে উত্তরায়ন, ওই যে গৌরপ্রাঙ্গন, ওইখানে একদিন কবিগুরু পা ফেলেছিলেন, তার ধুলা কি আজও ছড়িয়ে নেই চতুর্দিকে! আশ্রমের শিশুর দল, বালক-বালিকার দল, আর যত কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, তাদের সমবেত গানের সুর কি দোলের আবিরের মত রাঙিয়ে তোলেনা মনের গহীন প্রদেশকে? তাদের যুথবদ্ধ নৃত্যভঙ্গি কি নাচিয়ে তোলেনা আপনার হৃদয়কে? যৌবনের এই কলকাকলি, প্রাণের যত রস, মনের যত হাসি, হৃদয়ের যত গান, যত হৃদয় আনচান, সে সব কি শান্তিনিকেতনের হাওয়ার হাওয়ায় গুঞ্জরিত হয় না? হয়, নিশ্চই হয়। চুপ করে শুনেছেন কখনো হাওয়ার সেই ভাষা? হয়ত আজ মলিন হয়ে এসেছে সব প্রথা, ভেঙে পড়েছে পুরাতন নিয়মের আগল, ফিকে হয়ে এসেছে আশ্রম দ্বারের আলপনার রঙ, তবুও কোথাও যেন অলক্ষ্যে কোপাই খোয়াই এর চোরাস্রোতের মতই শান্তিনিকেতনী ধারা এখনও বহমান। তাকে খুজলে এখনও পাওয়া যায়, চোখ চাইলে এখনও দেখা যায়, দু-দন্ড নিবিড় করে ভাবলে এখনও তার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করা যায়।

শান্তিনিকেতনের এই অমলিন, অত্যাশ্চর্য পরম্পরা ও সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করাতেই যেন কলম ধরেছেন ঋতা বসু ও সুব্রত সেন মজুমদার। দুজনেই রবীন্দ্রতিরোধানের পরবর্তী কালে ছিলেন শান্তিনিকেতনের পড়ুয়া। ঋতা বসু অকপটে লিখেছেন শ্রীসদনের শ্রীমতিদের কথা, সুব্রত মজুমদার বিস্তারে লিখেছেন শ্রীমানদের কথা। ঋতাদেবীর লেখা প্রাণের উচ্ছাসে ভরপুর, শ্রীমতীদের গোপন জগতের বহু রহস্য পেটারার চাবিকাঠি আছে তায়। আর মজুমদার মশাই এর বই তথ্যবহুল, অনেক মজার ঘটনা, অনেক মানুষের কথায় সমৃদ্ধ। তবে দুটি বইই পরস্পরের পরিপূরক, আর দুটি বইই বারবার মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের মাঝেই ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি ঘর আর বাহিরকে তুলে এনেছিলেন একই আঙিনায়, সমবেত প্রাণের মহামিলনের আশায়। তিনি রঙে রেখায় যেমন সাজিয়ে তুলেছিলেন সকল মনের ঘরটিকে, ছন্দে সুরে তিনি তেমনি কাঁপন তুলেছিলেন সবার মনের ভাবটিতে! তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, এ তার নিজ নিকেতন, শান্তিনিকেতন। এ আমাদেরও শান্তির নিকেতন, মনের ও প্রাণের দুইয়েরই অবধারিত শান্তি এখানে। আমরা কেউ প্রত্যক্ষ, কেউ পরোক্ষ ভাবে এই শান্তিনিকেতনী ধারা-স্রোতে গা এলিয়েছি, এই জেনে যে এই রবীন্দ্র-ধারায় বয়ে চলাতেই আমাদের প্রাণের আনন্দ, এ ধারায় ভেসে চলাতেই মনের মুক্তি। যতদিন এই স্রোত, ক্ষীন হলেও, বহমান থাকবে, ততদিন আমাদের বিশ্বাস, আমাদের ঐকান্তিক প্রার্থনাটুকুও জীবনদেবতা খেয়ালে রাখবেন।

“প্রার্থনা
চিত্ত যেথা ভয় শূন্য , উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত , যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবস শর্ব্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,
যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে , যেথা নির্বারিত স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়
অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়,
যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালু রাশি
বিচারের স্রোতঃ পথ ফেলে নাই গ্রাসি ,
পৌরুষেরে করেনি শতধা ; নিত্য যেথা
তুমি সর্ব্ব কর্ম্ম চিন্তা আনন্দের নেতা, —
নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি , পিতঃ
আমাদের সেই স্বর্গে করো জাগরিত ।“

[কবিগুরুকে নিয়ে আমাদের আবেগ সর্বদাই বড় বেগে ছোটে। তাই, আশা করি, আমার আবেগের বাহুল্যটাকেও হাসিমুখেই স্বীকার করবেন। আলোচনা টি পড়ে আমাকে কেউ কেউ বিষেদের সাথে বলেছিলেন যে সে শান্তিনিকেতন আর নেই! সে সত্যি কথা। সে রবিঠাকুর আর নেই যখন, সে শান্তির আলয় আর থাকে কেমনে! কিন্তু আমি তো অত ঘুরে দেখিনি কি ছিল আর কেমনে তা বদলে গেছে, আমার মুগ্ধতার স্বপক্ষে আমার জবাবটি ছিল যে:

"আমি সেমিনারের চক্করে একদম ঘুরে দেখতে পারিনি। একবার ঘন্টাখানেকের জন্য রসায়ন বিভাগে গিয়েছিলাম আর ওই আসা যাওয়ার পথে যেটুকু দেখা। আপনি বলবেন, আমি তো কিছু দেখিই নি! সত্যিই তাই। তেমন কিচ্ছু দেখিনি।

কিন্তু আমি কি দেখতে চাইতাম? কি দেখতে চাই? কি দেখেছি? আমি ঠিক শান্তিনিকেতনের মলিন হয়ে আসা বাড়ি, কিংবা মেলার পসরা, ডিয়ার পার্কে ডিয়ার, বা রবিঠাকুরের বাড়ি আর তার আরামচেয়ার দেখার কথা ভাবিনি।

আমি বরং না চাইতেই দেখলাম লাল কাঁকড়ের রাস্তার পাশে ঝরা অজস্র পাতার স্তুপ; দেখলাম একটা নিস্তব্ধ বটগাছ, তার গোড়ায় তিনটে থাক; দেখলাম এখানে সেখান ছড়ানো ধূসর কাঁটার বন; দেখলাম বনের মাঝে দীর্ঘ গাছ, তাদের শেকড়ের আলপনা; দেখলাম গাছের ছাওয়ায় থাকা মলিন বাড়ির গায়ে কাঁলচে হয়ে আসা ফ্রেস্কো আর থাম আর চৌখুপি জানালা; দেখলাম বাড়ির আঙিনায় ইতিউতি ছড়ানো নিরুত্তর ভাস্কর্য; দেখলাম দুটো হনুমানের নীরব খুনসুটি, একসাথে ফল ভেঙে খাওয়া; দেখলাম অমর্ত্য সেন আর প্রণব বর্ধনের বাড়ি; দেখলাম বাড়ির সামনে রঙিন ফুলের ঢের, বাড়ির পেছনে কুয়ো; দেখলাম সাওতালি মহিলারা কাজে চলেছে সাইকেলে, শাড়ি তাদের গাছকোমর করে গোঁজা; দেখলাম তাদের সাইকেল চলে গেল দীর্ঘ নির্জন শায়িত রাস্তা ধরে; দেখলাম সেই রাস্তার পাশে আনমনা একটা ফাকা মাঠ; দেখলাম মাঠ, রাস্তা, বাড়ি সব ডুবে আছে দুপুরের নিস্তব্ধতায়, সন্ধ্যের নির্জনতায়!

এই তো! এ যাত্রায় আমার জন্য এইটুকুই দেখাই অনেক ছিল। যদিওবা মনেমনে পুরানো-নুতনের হিসেব-নিকেশ কিছু মেলানোর ছিল, পুরানোর উপর কোনো দাবি তো ছিল না! তাই, সেভাবে আশাভঙ্গ হয়নি। হয়ত পরের বার, কখনো সুযোগ এলে আরও ভাল করে দেখব। তখন আশাভঙ্গ হতেও পারে, তখনও চেষ্টা করব মনের চোখে দেখার। "]
Displaying 1 - 2 of 2 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.