শান্তিনিকেতনের শ্রীমান-শ্রীমতীরা
॥শ্রীসদনের শ্রীমতীরা, ঋতা বসু (আনন্দ, ₹১৫০) এবং ছাতিমতলার গান, সুব্রত সেন মজুমদার (সিগনেট প্রেস, ₹২৫০)॥
বসন্তোৎসব শেষ হওয়ার বেশ কিছু দিন পর শান্তিনিকেতনের ডাক এল হাওয়ায় হাওয়ায়, এক সেমিনারের অজুহাতে। সে ডাক ফিরিয়ে না দিতে পেরে, যৎকিঞ্চিত যা আছে, তাকে পোটলাবন্দী করে চড়ে বসলাম রাতের ট্রেনে। বোলপুরে নেমে টোটোর সাওয়ারী হয়ে এমোড় ওমোড় ঘুরে, আলোয় মেখে, আঁধারে নেয়ে যখন পৌছলাম গুরুপল্লীর নিবাসে, রাত তখন তারুন্যের চপলতা ছেড়ে মধ্য-যৌবনের ভাব-আবেশে সামান্য গম্ভীর হয়েছে, হাওয়া তখন মন্দ্র-মন্থর বেগে ঘুমন্তপ্রায় প্রাণের কাছে ফিসফিস করে বলে যাচ্ছে জগৎ পারাবারের নিত্য-অনিত্য, শান্তি, শীতলতার বাণী।
পরদিন সকালে উঠে দ্রুত নেয়ে-টেয়ে রওয়ানা দিলুম লিপিকা অডিটোরিয়ামের দিকে। অনুষ্ঠান শুরু হল। উপাচার্য মহাশয় ও অন্যান্য মাননীয় আমন্ত্রিতদের উত্তরীয়, ফুল ও মঙ্গলমন্ত্রে বরন করার পর, উপাচার্য উঠলেন তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য রাখতে। বক্তব্য শেষ হলে আমরা বহিরাগতরা করতালি দিতে যাব, আমাদের তালি ফিকে হয়ে গেল অন্যদের ‘সাধু সাধু’ রবে! সেটা প্রথম চমক! ডিপার্টমেন্টের ছাত্ররা এসেছে সাদা পাঞ্জাবীতে কমনীয় সাজে, ছাত্রীরা এসেছে প্রায় সাদা শাড়িতে, রমনীয় সাজে। দেখলাম আমাদের কাংস্যবাদ্যের মত করতালির চেয়ে তাদের শুভমুখের ‘সাধুবচন’ টাই এখানে ভাল মানিয়েছে! আমরাও অচিরেই তাই তাদের অনুসরণ করে ওই সাধনমন্ত্রে দীক্ষিত হলেম। আমরাও সমস্বরে বললাম, “সাধু, সাধু”!
এরপর সারাদিন ধরে চলল বৈজ্ঞানিক সারগর্ভ আলোচনা, যা আর যাই হোক, শুনতে খুব একটা সমধুর নয়। বিকালে ওই একঘেয়ে লেকচার শেষ হলে, রাতের ডিনারের আগে ছোটো একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল। সেদিন আবার সমস্তদিনটা কেমন ভেঁপে ছিল, কেৎলীর ফুটন্ত জলের বাষ্প যেমন রান্নাঘরের চতুর্দিক ভাঁপিয়ে তোলে, তেমনি স্তব্দ গরমে হাসফাস করেছে মানুষজন। কিন্তু, অনুষ্ঠানের আগে হঠাৎই ছুটল দমকা হাওয়া! চতুর্দিকের গাছপালা মাথা নেড়ে হাওয়ার এই পাগলামী কে খুব বাহবা দিলে। আর ওই পাগলা হাওয়ার পেছু পেছু একপশলা বাদল-বৃষ্টিও এল নৃত্যরত তরুনীদলের মত! তারা বসন উড়িয়ে, কবরী খসিয়ে, যে যুগল নৃত্যনাট্য উপস্থাপন করলে, তাতে শান্তিনিকেতনের লালকাকঁরের মাটি যেমন ভিজে উঠল একনিমেষে, তেমনি সমস্তদিনের মন মধ্যকার বৈজ্ঞানিক ক্লেদও ধুয়েমুছে গেল একমুহুর্তে!
তারপর, শুরু হল অনুষ্ঠান। রসায়ন বিভাগের ছেলেমেয়েরাই করছে ঋতুরঙ্গ, গানে পাঠে নাচে! তারা যেন বসন্তোৎসব শেষে, শেষ চৈত্রের বিকেলে অলক্ষ্য দেবতার উদ্দেশ্যে আরেকবার তাদের মনবসন্তের নৈবেদ্যের ডালি দিল সাজিয়ে। এ আসলে তাদেরই প্রকাশ, আমরা সেখানে কেবলই উপলক্ষ্য। আমি স্বভাবতই নরম হৃদয়ের মানুষ, ছাত্রছাত্রীদের সমবেত এই অনুষ্ঠান, তার উপরে কবিগুরুর রচনার আবেশে আমার চোখে ঘনঘন জল চলে আসছিল। হলের আলো যদিও িনেভান ছিল, তবু বারবার চোখমোছা বড় বিব্রতকর। পাশে বসে, সঙ্গী অধ্যাপক মশাই ছবি তুলছিলেন, লজ্জ্বা ঢাকতে আগ বাড়িয়েই তাকে বললাম, চশমা ছাড়া দেখছি তো, মঞ্চের লাল-নীল আলোয় চোখ বড় করকর করছে। তিনি বিশ্বাস করলেন কি না কে জানে! অমন সুন্দর অনুষ্ঠানের মাঝে তাল ব্যাহত হল একবারই কারন স্বল্পসংখ্যক নৃত্যরত ছাত্রীদল ঋতুবদলের সাথে দ্রুতলয়ে পোষাক বদল করে উঠতে পারছিল না। তা সেই অনাকাঙ্খিত বিরতিতে অবশ্য সুবিধাই হল, নিজের চোখদুটিকে শুকিয়েও নেওয়া গেল, গলার কাঁপুনিকেও কিছু সম্বৃত করা গেল সেই ফাকে!
কিন্তু, কি জন্য এত আবেগ বিহ্বল হলাম? কি ভেবে এত অশ্রুসজল হলাম? সে কি কেবলই মনের দুর্বলতার কারনে? তা, সে তো বটেই। তবে, তার সাথে আমি শান্তিনিকেতনের নিজেস্ব ঐতিয্যের কথা ভেবেও ক্ষনে ক্ষনে আবেগমথিত হয়ে উঠছিলাম। কি সুন্দর, কি সহজ, কি অনায়াস এই শিক্ষার সাথে সংস্কৃতির মিলন। এই উদাত্ত গলায় গান, নাচ, বাদন এখানকার, বিশেষত পাঠভবনের ছাত্র-ছাত্রীদের সহজাত প্রতিভা। তারা হয়ত সবসময় খেয়ালও করে না যে কত অবহেলায় তারা এক আশ্চর্য, মহান ধারার উত্তরাধিকারী হয়ে উঠেছে!
শান্তিনিকেতন এর এই ধারাটা কি? শান্তিনিকেতন মানেই বা কি? শান্তিনিকেতন মানে কি সপ্তাহান্তে তারাপীঠে বাবার থানে পুজো দিয়ে ফেরার পথে মস্তি করতে থামা? তারাপীঠে যতটুকু পুণ্যি অর্জন হল, তাকে বোলপুরের লজে সুরাস্রোতে বইয়ে দেওয়া? শান্তিনিকেতন মানে কি দুপুরে মাংসভাত সাঁটিয়ে দলবেঁধে ঢেকুঁর তুলতে তুলতে কোনো এক রবিঠাকুরের পুরানো বাড়ি দেখতে যাওয়া? আনতাবড়ি যেখানে সেখানে দাড়িয়ে ফোটো-সেলফি তোলা? শান্তিনিকেতন মানে কি শুধুই আমার কুটিরে গিয়ে বাটিক বা কাঁথাস্টিচ কেনা? শনিবারের হাটে ঘর সাজানোর জিনিষ কেনা? শান্তিনিকেতন মানে কি বসন্তোৎসবে সুরা আর পৌষোৎসবে গাঁজা? শান্তিনিকেতন মানে কি বাউল গান শোনবার হিড়িক আর কালচারাল ও আতেঁল সাজার ১০১ সহজ উপায়? শান্তিনিকেতন মানেটা কি?
শান্তিনিকেতন মানে, দেখা শোনার বাইরেও আসলে কোনো একটা উপলব্ধির ব্যাপার। ওই যে রাঙা মাটির পথ চলে গেছে, যে পথের পাশে নিরন্তর ঝরে যাওয়া শুকনো পাতার স্তুপ আছে পড়ে, সে পথ কোথায় গেছে? কোন গন্তব্যে? ওই যে শাল শিমূল পলাশ, ওই যে অমলতাস, ওই যে মাধবীকুন্জ, তার দিকে নিস্তব্ধ হয়ে চেয়ে দেখেছেন দু-দন্ড! ওই যে বিশাল বটগাছ, যা তিন থাকে বাধানো, ভেবে দেখেছেন সে কেন চুপ করে দাড়িয়ে আছে ওখানে! কার অপেক্ষায়? ওই যে এখানে ওখানে ইতি উতি কত ভাস্কর্য, রমনীর, পুরুষের, শিশুর, মলিন হয়ে উঠেছে তারা রাঙা মাটির ধুলায়, ওরা কি কোন ভোর রাতে পরী হয়ে উড়ে যেতে চায়? ওই যে উপাসনাগৃহ, ওই যে ছাতিমতলা, ওই যে উত্তরায়ন, ওই যে গৌরপ্রাঙ্গন, ওইখানে একদিন কবিগুরু পা ফেলেছিলেন, তার ধুলা কি আজও ছড়িয়ে নেই চতুর্দিকে! আশ্রমের শিশুর দল, বালক-বালিকার দল, আর যত কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, তাদের সমবেত গানের সুর কি দোলের আবিরের মত রাঙিয়ে তোলেনা মনের গহীন প্রদেশকে? তাদের যুথবদ্ধ নৃত্যভঙ্গি কি নাচিয়ে তোলেনা আপনার হৃদয়কে? যৌবনের এই কলকাকলি, প্রাণের যত রস, মনের যত হাসি, হৃদয়ের যত গান, যত হৃদয় আনচান, সে সব কি শান্তিনিকেতনের হাওয়ার হাওয়ায় গুঞ্জরিত হয় না? হয়, নিশ্চই হয়। চুপ করে শুনেছেন কখনো হাওয়ার সেই ভাষা? হয়ত আজ মলিন হয়ে এসেছে সব প্রথা, ভেঙে পড়েছে পুরাতন নিয়মের আগল, ফিকে হয়ে এসেছে আশ্রম দ্বারের আলপনার রঙ, তবুও কোথাও যেন অলক্ষ্যে কোপাই খোয়াই এর চোরাস্রোতের মতই শান্তিনিকেতনী ধারা এখনও বহমান। তাকে খুজলে এখনও পাওয়া যায়, চোখ চাইলে এখনও দেখা যায়, দু-দন্ড নিবিড় করে ভাবলে এখনও তার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করা যায়।
শান্তিনিকেতনের এই অমলিন, অত্যাশ্চর্য পরম্পরা ও সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করাতেই যেন কলম ধরেছেন ঋতা বসু ও সুব্রত সেন মজুমদার। দুজনেই রবীন্দ্রতিরোধানের পরবর্তী কালে ছিলেন শান্তিনিকেতনের পড়ুয়া। ঋতা বসু অকপটে লিখেছেন শ্রীসদনের শ্রীমতিদের কথা, সুব্রত মজুমদার বিস্তারে লিখেছেন শ্রীমানদের কথা। ঋতাদেবীর লেখা প্রাণের উচ্ছাসে ভরপুর, শ্রীমতীদের গোপন জগতের বহু রহস্য পেটারার চাবিকাঠি আছে তায়। আর মজুমদার মশাই এর বই তথ্যবহুল, অনেক মজার ঘটনা, অনেক মানুষের কথায় সমৃদ্ধ। তবে দুটি বইই পরস্পরের পরিপূরক, আর দুটি বইই বারবার মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের মাঝেই ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি ঘর আর বাহিরকে তুলে এনেছিলেন একই আঙিনায়, সমবেত প্রাণের মহামিলনের আশায়। তিনি রঙে রেখায় যেমন সাজিয়ে তুলেছিলেন সকল মনের ঘরটিকে, ছন্দে সুরে তিনি তেমনি কাঁপন তুলেছিলেন সবার মনের ভাবটিতে! তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, এ তার নিজ নিকেতন, শান্তিনিকেতন। এ আমাদেরও শান্তির নিকেতন, মনের ও প্রাণের দুইয়েরই অবধারিত শান্তি এখানে। আমরা কেউ প্রত্যক্ষ, কেউ পরোক্ষ ভাবে এই শান্তিনিকেতনী ধারা-স্রোতে গা এলিয়েছি, এই জেনে যে এই রবীন্দ্র-ধারায় বয়ে চলাতেই আমাদের প্রাণের আনন্দ, এ ধারায় ভেসে চলাতেই মনের মুক্তি। যতদিন এই স্রোত, ক্ষীন হলেও, বহমান থাকবে, ততদিন আমাদের বিশ্বাস, আমাদের ঐকান্তিক প্রার্থনাটুকুও জীবনদেবতা খেয়ালে রাখবেন।
“প্রার্থনা
চিত্ত যেথা ভয় শূন্য , উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত , যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবস শর্ব্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,
যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে , যেথা নির্বারিত স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়
অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়,
যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালু রাশি
বিচারের স্রোতঃ পথ ফেলে নাই গ্রাসি ,
পৌরুষেরে করেনি শতধা ; নিত্য যেথা
তুমি সর্ব্ব কর্ম্ম চিন্তা আনন্দের নেতা, —
নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি , পিতঃ
আমাদের সেই স্বর্গে করো জাগরিত ।“
[কবিগুরুকে নিয়ে আমাদের আবেগ সর্বদাই বড় বেগে ছোটে। তাই, আশা করি, আমার আবেগের বাহুল্যটাকেও হাসিমুখেই স্বীকার করবেন। আলোচনা টি পড়ে আমাকে কেউ কেউ বিষেদের সাথে বলেছিলেন যে সে শান্তিনিকেতন আর নেই! সে সত্যি কথা। সে রবিঠাকুর আর নেই যখন, সে শান্তির আলয় আর থাকে কেমনে! কিন্তু আমি তো অত ঘুরে দেখিনি কি ছিল আর কেমনে তা বদলে গেছে, আমার মুগ্ধতার স্বপক্ষে আমার জবাবটি ছিল যে:
"আমি সেমিনারের চক্করে একদম ঘুরে দেখতে পারিনি। একবার ঘন্টাখানেকের জন্য রসায়ন বিভাগে গিয়েছিলাম আর ওই আসা যাওয়ার পথে যেটুকু দেখা। আপনি বলবেন, আমি তো কিছু দেখিই নি! সত্যিই তাই। তেমন কিচ্ছু দেখিনি।
কিন্তু আমি কি দেখতে চাইতাম? কি দেখতে চাই? কি দেখেছি? আমি ঠিক শান্তিনিকেতনের মলিন হয়ে আসা বাড়ি, কিংবা মেলার পসরা, ডিয়ার পার্কে ডিয়ার, বা রবিঠাকুরের বাড়ি আর তার আরামচেয়ার দেখার কথা ভাবিনি।
আমি বরং না চাইতেই দেখলাম লাল কাঁকড়ের রাস্তার পাশে ঝরা অজস্র পাতার স্তুপ; দেখলাম একটা নিস্তব্ধ বটগাছ, তার গোড়ায় তিনটে থাক; দেখলাম এখানে সেখান ছড়ানো ধূসর কাঁটার বন; দেখলাম বনের মাঝে দীর্ঘ গাছ, তাদের শেকড়ের আলপনা; দেখলাম গাছের ছাওয়ায় থাকা মলিন বাড়ির গায়ে কাঁলচে হয়ে আসা ফ্রেস্কো আর থাম আর চৌখুপি জানালা; দেখলাম বাড়ির আঙিনায় ইতিউতি ছড়ানো নিরুত্তর ভাস্কর্য; দেখলাম দুটো হনুমানের নীরব খুনসুটি, একসাথে ফল ভেঙে খাওয়া; দেখলাম অমর্ত্য সেন আর প্রণব বর্ধনের বাড়ি; দেখলাম বাড়ির সামনে রঙিন ফুলের ঢের, বাড়ির পেছনে কুয়ো; দেখলাম সাওতালি মহিলারা কাজে চলেছে সাইকেলে, শাড়ি তাদের গাছকোমর করে গোঁজা; দেখলাম তাদের সাইকেল চলে গেল দীর্ঘ নির্জন শায়িত রাস্তা ধরে; দেখলাম সেই রাস্তার পাশে আনমনা একটা ফাকা মাঠ; দেখলাম মাঠ, রাস্তা, বাড়ি সব ডুবে আছে দুপুরের নিস্তব্ধতায়, সন্ধ্যের নির্জনতায়!
এই তো! এ যাত্রায় আমার জন্য এইটুকুই দেখাই অনেক ছিল। যদিওবা মনেমনে পুরানো-নুতনের হিসেব-নিকেশ কিছু মেলানোর ছিল, পুরানোর উপর কোনো দাবি তো ছিল না! তাই, সেভাবে আশাভঙ্গ হয়নি। হয়ত পরের বার, কখনো সুযোগ এলে আরও ভাল করে দেখব। তখন আশাভঙ্গ হতেও পারে, তখনও চেষ্টা করব মনের চোখে দেখার। "]