লেখককে চিনি মুখবইয়ের সুবাদে। ঠিক চেনাও বলে না। ওনার প্রাক্তন ছাত্র বইটা পড়বার জন্য দিয়েছে সেই ফেব্রুয়ারিতে। লেখা সুপাঠ্য। কিন্তু এ বইটা যে আসলে কি তাতে ধন্দ লাগে কিছুটা। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কলাম কিছু না, ঠিক যেভাবে আমি আবোলতাবোল প্রলাপ লিখতাম (লিখি এখনো মাঝে মাঝে) ব্লগে, সোশাল সাইটে সেইরকম কিছু এক মলাটের ভিতরে কিন্তু আরও গুছানো ভাবে। তবে নতুন অনেককিছু শিখলাম, জানলাম। ভাল লাগলো!
এক জীবনে মানুষ প্রচুর বলে, প্রচুর শোনে। বলা যদি মুক্তো হয় আর শোনার যদি হয় সুতো, তাহলে সময়ের হাতে গাঁথা এই কথার মালার নাম জীবন। আর সেই পুরো মালা গাঁথতে যে সময় লাগে। তার মাঝে মিশে থাকে কত গল্প। প্রতিটা মুক্তায় একটা গল্প, সুতোর সাথে জড়াজড়ি করে তার বসবাস।
কিন্তু সব কথা মনে থাকে না, মনে থাকে না সব গল্পও। সেই ভুলে যাওয়ার কথা নিয়ে লেখা 'ভুলে যাওয়া মনে পড়া'। আমরা প্রতি মুহূর্তে ভুলি, ভুলে গিয়ে আবার মনে করি। স্মৃতি নিয়েই সবাই বাচে, কিন্তু সকলের স্মৃতিশক্তি সমান না। কিছু জিনিস, ভুলতে চাই না কখনও। কিছু জিনিস ভুলে যাওয়াই ভালো। সেই ভুলে যাওয়া নিয়েও আছে কত গল্প।
বাঙালীর জীবনে খাওয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। খাওয়া নিয়ে তার অনেক খুঁতখুঁতানি, অনেক পরিকল্পনা। এমনকি ভাষায়টাও খাওয়া নিয়ে বেশ পজেসিভ। কেননা, আমরা 'মার খাই', 'ভিরমি খাই', প্রেমে পড়ে ছ্যাকাও 'খাই'। সেই খাওয়া এবং খাদ্য খাওয়ার মাঝে গলিঘুঁজি দিয়ে লেখক আমাদের নিয়ে যান গল্পের রাজ্যে।
খাবারের কিন্তু নাম থাকে। নাম থাকে মানুষের, বস্তুর, প্রাণীর। একটা কথা প্রচলিত আছে, "মানুষের জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার নাম, যা সে ছাড়া সবার মুখেই ফোটে''। নাম নিয়ে লেখকের সাতকাহনের নাম রাখা হয়েছে 'নামমাত্র'।
যদিও কেতাবি নাম 'ধূমপান'; তবু কিন্তু সিগারেট আমরা 'খাই'। এই সিগারেট খাওয়া নিয়ে আছে অনেক তর্ক-বিতর্ক। 'নিঃসঙ্গতার সাথী' বলে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় বেশীরভাগ ধূমপায়ী। অনেক কৃতি পুরুষেরা ধূমপায়ী ছিলেন। আমরা এর ক্ষতিকারক দিক জেনেও সিগারেট খেতেই থাকি। লেখকও সিগারেট খেতেন। সেই সিগারেট খাওয়ার শুরু থেকে ছাড়া, এবং ছাড়ার পরের কথা নিয়ে একটা অসামান্য লেখা আছে বইয়ে। এখানে শুধু গল্প নেই, কিংবা সিগারেট ছাড়ার উপদেশ নেই। আছে খুব বিষণ্ণতার দুয়ারে টোকা দিয়ে ধোঁয়া বিহীন একাকীত্বের কথা।
ইংরেজি house আর home এর বিভ্রান্তি দিয়ে শুরু হয় 'বাড়ি বিষয়ক' গল্প। আমাদের ভাড়া বাড়ি, কিংবা সারা জীবনের পরিশ্রমে গড়া নিজের বাড়ি। ছেড়ে আসা, ফেলে আসা শৈশবের চিহ্ন। ভালোবাসা আর মন্দবাসার সাথী, আমাদের বাড়ি। কিন্তু, পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় যে বাড়িটি, তার মালিক বলে সত্যিকার অর্থে কেউ কখনও ছিলেন না। বাড়িটির ঠিকানা জানেন?
'সময় নিয়ে' আলাপ শুনে আসছি সেই ছোটবেলা থেকে। নীতিকথা আর উপদেশের মধ্য দিয়ে। অবশ্য তখনও ঘড়ি চিনতাম না। অদৃশ্য সময়ের সাথে ছুটছি সবাই। কিন্তু সেই সময় নিয়েও কথা আছে, আছে গল্প। সে গল্প আর কথাও আছে এই বইয়ে। এরই মাঝে 'যেসব কথা গল্পের মত', তা নিয়ে লিখেছেন লেখক। কিছু গল্প ইন্টারনেট থেকে পাওয়া। ভালোলাগা সে গল্পগুলোর সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। কথার মাঝে মাঝে বলেছেন গল্প।
বিজ্ঞাপন আমাদের বর্তমান সময়ের প্রচারের, বানিজ্যের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কিন্তু সেই বিজ্ঞাপন সব সময় নির্দোষ, নিষ্কলুষ নয়। বিজ্ঞাপন কখনও নিয়ে আসে ফ্যাশান, কখনও ফ্যাসান থেকে আসে বিজ্ঞাপন। আর এসেই আমাদের মাথায় চেপে বসে। আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে খুব গোপনে। সেই বিজ্ঞাপন নিয়ে লেখার নাম 'বিজ্ঞাপনে ফ্যাশনে'।
রিদওয়ান ভাই বলেছিলেন, ভাষা নিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলীর কিছু লেখা আছে, সেগুলো আমার পড়া উচিত। এখনও পড়া হয়নি। কিন্তু পড়লাম ভাষা নিয়ে লেখা ইফতেখার ভাইয়ের লেখাটা। না, এটা কোন ভাষাবিদের ভাষা বিশ্লেষণ-মূলক লেখা না। একজন গল্পকারের মুখের কথায়, ভাষার কিছু চমৎকার দিক নিয়ে কথা বলা।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সকলেই কিছু ক্ষোভ আছে। কিন্তু শিক্ষার সর্বোচ্চ যে পীঠস্থান, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কিছু কাজ আমাদের অবাক করে। এর কারন হিসেবে লেখক দেখিয়েছেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসলে 'বিদ্যালয়' থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। তাই বের হতে পারেননি শিক্ষকরাও। আর তাদের প্রভাবে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরাও পারে না। কিন্তু এ থেকে বের হওয়ারও উপায় আছে। ভাবতে হবে। কাজ করতে হবে সে জন্য।
'কথা আর গল্পের জীবন'-এর প্রতিটি লেখা আমাদের জীবন-ঘনিষ্ঠ। ভুলে যাওয়া আমরা ভুলে যাই আমাদের নামমাত্র কথাগুলো। কিন্তু সেই কথাগুলোই হয়ত আসলে আমাদের জীবনের খুব বড় কোন গল্প। আমরা বুঝতে পারি না। বুঝেছেন বইয়ের লেখক। এতো গভীর করে না দেখলে বোঝা যায় না। কিন্তু গভীর করে দেখেও লিখেছেন তিনি খুব সহজ করে। যেন সামনে বসে গল্প করছেন আমার সাথে।
লেখার সাথে সাথে আছে ছোট ছোট গল্প। লেখকের নিজের জীবনের গল্প। অভিজ্ঞতার কথা। পারিপার্শ্বিকের গল্প। সাথে আছে কিছু কৃতি মানুষের কথা। আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদের কথা বলেছেন বারবার। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বলা তার কথাগুলো লেখার মাঝে মাঝে এসেছে। আছে কিছু গল্প। বিষয়ের সাথে মিলিয়ে, কন্টেন্টকে বুঝতে সহজ করে দিয়েছে গল্পগুলো।
পড়তে পড়তে কখনও কখনও মনে হয়েছে, 'ইশ্ এভাবে আগে কেন ভাবিনি?' আবার কখনও মনে হয়েছে, 'এমন করে কথা বলার মাঝে গল্প বলে ফেলতে পারলে মন্দ হতো না'। সবচেয়ে বেশি যা মনে হয়েছে, তা হলো, 'এই হলো জীবন, কথা আর গল্পে মিশে থাকে যে জীবন'।