একটা যুদ্ধ। তাঁর প্রথম এপিসোড সুদূর অতীতে মহাকাশে। দ্বিতীয় এপিসোড দ্বাপরযুগে, সমুদ্রের তলায়। বিশ শতকে এসে পৃথিবী যখন বিশ্বযুদ্ধে ব্যস্ত, অখন সে যুদ্ধের অন্তিম হামলা থেকে পৃথিবীকে রুখতে মাঠে নামলেন বিষবৈদ্য, পুম্পুহার থেকে ইংরেজি স্ক্রিপ্টে সিন্ধুভাষায় চিঠি পেয়ে। আহ নি বালুগুয়াক্কা মেলুহান – জলের তলায় পুঁথি। চলুন, ঝাঁপ দেয়া যাক----
মহাভারতের বনপর্বে অর্জুনকে দিব্য অস্ত্র শিক্ষা দেওয়ার পর ইন্দ্র, বীর অর্জুনের কাছে গুরুদক্ষিণা হিসেবে চেয়েছিলেন, নিবাত কবচ দানবদের ধ্বংস। নিবাতরা নাকি জল, বায়ু, অগ্নির সমস্ত রহস্য করেছে করায়ত্ত।তারা ইচ্ছে মতই প্রকৃতির এই তিন উপাদানকে বিরুদ্ধ পক্ষের পেছনে লেলিয়ে দেয়, নিজেদের কাজেও লাগায়।তবুও অর্জুন ধ্বংস করেছিলেন সেই জাতিকে।যুদ্ধ শেষে ছাড় দিয়েছিলেন নিবাত কবচ দানবদের স্ত্রী-সন্তানদের।কিন্তু সত্যি কি ধ্বংস হয়েছিলো সেই দানব জাতি??
আক্কা ও তার সহায়ক কোলাভান স্কুবা ডাইভিং করতে গিয়ে খোঁজ পেলো, সোনার পাতে লেখা প্রাচীন পুমপুহার নগরীর মুহূর্তের মধ্যে সামুদ্রিক প্লাবনে ভেসে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ইতিহাস।খবর পেয়ে বিষবৈদ্য নামলেন জলের গভীরে।সঙ্গী আক্কা, কোলাভান আর প্রফেসর পাণ্ডুরঙ। সত্যি কি জলের তলায় সভ্যতা গড়ে তুলেছে কোনো শক্তিশালী জাতি? সত্যি কি জল-বায়ু-আগুনকে ইচ্ছা মতো চালনা করার ক্ষমতা তাদের করায়ত্ত?পৃথিবী কি তবে ধ্বংসের মুখে? পারবে কি বিষবৈদ্য কবচধারী দানবদের বংশ ধ্বংস করতে???
Chiranjit Das দাদার নতুন প্রকাশনী অরণ্যমন এর প্রকাশিত প্রথম বই এটি।ফলে বইমেলাতে গিয়েই বইটা আগে হস্তগত করেছি।প্রথম দিকে বইটা পড়তে বেশ মজা লাগছিল, অনেক তা নাট বল্টুর মতন মজাদার সায়েন্স-ফিক্শন চলছিল।দেব-দানবের ঘাত-সংঘাত কথাও বেশ মজাদার। কিন্তু যেই গল্পের প্রধান চরিত্র বিষবৈদ্য তিন সঙ্গীসহ জলের গভীরে ঝাপালেন, গল্পের আমেজ জমে গেলো।কি হয়, কি হয় ভাব নিয়ে এগিয়েছে গল্পের চরিত্ররা,সাথে আমিও।জলের তলার জগৎ দেখে চারমুর্তির মতন ভেবলে গেছি আমিও। "আহ নি বালুগুয়াক্কা মেলুহান"-- শুনে বিষবৈদ্য ছুটেছিলেন রহস্যের পিছু... "আহ নি বালুগুয়াক্কা মেলুহান"-- মানে...... আর তো বলার উপায় নেই। এর মানে জানতে গেলে ভাগ নিতে হবে, নিবাত কবচ অভিযানে।
শেষপর্যন্ত বিষবৈদ্য সিরিজ পড়া কমপ্লিট করলাম।এর আগে ২ টো সিরিজ পড়া ছিল, এবার সময় বের করে লাস্ট সিরিজটাও শেষ করে ফেললাম।প্রথমটায় সত্যি বলতে কি এ বইএর প্রতি একটুও আকর্ষন বোধ করিনি।লাস্ট একটাই সিরিজ ছিল, বাকি রাখবো কেনো তাই শুরু করেছিলাম।প্রথম ৬৫ পৃষ্ঠা পর্যন্ত কোনো আগ্রহই জাগেনি, তারপর থেকে তবু একটু পড়ার জোশ পেয়েছি।মূল চরিত্রে আছে - সনাতন, কোভালান,আক্কা ও পান্ডুরঙ। পাতালপুরীর উন্নত টেকনোলজির ব্যবহার দেখে মুগ্ধ হয়েছি। গল্পের বিষয়টা ইন্টারেস্টিং হলেও লেখনীতে অ্যাডভেঞ্চারের ফিলিং কম লেগেছে।অ্যাডভেঞ্চার গল্প পড়ার সময় যে একটা উত্তেজনার ভাব তৈরি হয়, আমার ক্ষেত্রে এখানে তা অনুভব হয়নি।
মহাভারতের বন পর্বে আছে, ইন্দ্র গুরুদক্ষিণা হিসাবে চেয়েছিলেন সমুদ্রের নিচে নিবাত কবচ দানবদের ধ্বংসলীলা। অর্জুন তাই করলেন, তাঁর শক্তির কাছে পাতালপুরীর তিন কোটি দানব ধ্বংস হয়।কিন্তু অর্জুন একটা ভুল করলেন, দানব জাতকে পুরোপুরি নির্মূল না করে দানবদের স্ত্রী সন্তানদের প্রাণভিক্ষা দিলেন। আর কথা তেই আছে শত্রুর শেষ রাখতে নাই।তাঁর ওই ভুলের মাসুল গুনতে হয় পৃথিবীর মানুষদের। ভিতরে ভিতরে আবারও দানব রাজ্য গড়ে ওঠে ও পৃথিবীর মানুষদের ধ্বংসের চক্রান্ত করতে থাকে। এর পরিণতি স্বরূপ '৪১ এর সুনামি আর ভূমিকম্প।
ধারা দেখে ব্যোমকে গেলেন তো? আমিও গেছিলাম দেবজ্যোতি বাবুর "বিষবৈদ্য সিরিজ" টার নাম শুনেছিলাম বেশ কিছুদিন আগেই তবে সংগ্রহ করা হয়নি। দুদিন হলো শেষ করলাম এই সিরিজের তৃতীয় বইটা। এবার একটু ভালো খারাপে আসি, প্রথমে ফেনোটাইপ,মানে দেখতে শুনতে কেমন এক, প্রচ্ছদ বেশ সুন্দর, কাগজের মান অসাধারন। মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়েছে মাত্র চারটে। তবে একটা বিষয় গল্পের কাল অনুযায়ী ডাইভিং স্যুটটা একটু আধুনিক লেগেছে। ব্যাস ফেনোটাইপ শেষ দুই, জেনোটাইপ, গল্পের ধরন কেমন? এডভেঞ্চার গল্পের মতো টানটান উত্তেজনা, পৌরাণিক গল্পের বিবরণ আর তার সাথে ঘনাদা গোছের গুল্প মানে "টল টেলস" অর্থাৎ যে গল্পের মধ্যে সারবত্তা কিছু থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু অতিরঞ্জিত হওয়ায় অনেকে বিশ্বাস করে অনেকে গাঁজা বলে উড়িয়ে দেন। বিষবৈদ্য সিরিজের এই বইও অনেকটা সেই গোত্রের। সেখানে এসে মেশে মহাভারতের দানব, আধুনিক সমরকৌশল, বৈজ্ঞানিক ভিত্তিওয়ালা সমুদ্রবিজ্ঞান, আধুনিক কল্পবিজ্ঞান ও আর এক গুল্পবাজ বদ্দি। তবে লেখার চলন আর বলন এমনই যে একবার শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যায়না, একভাবে বসে পড়লে ঘন্টা দেড়েক লাগতে পারে তবে এর রেশ থেকে যায় অনেকক্ষন। এই হতাশাগ্রস্থ করোনাকালে একটা ভাতঘুম মিস করে এটা শেষ করে ফেলাই যায়।
ভারতীয় পুরাণ, রহস্য, কল্পবিজ্ঞান, এবং সমকালীন ঘটনাক্রম মিশিয়ে লেখা এ এক রোমহর্ষক অ্যাডভেঞ্চার। বিষবৈদ্য চরিত্রটির মাধ্যমে লেখক বাংলা সাহিত্যে ইন্ডিয়ানা জোন্সের মতোই উপাদেয়, অথচ বাস্তবের শক্ত জমিতে দাঁড়ানো এক নায়ককে দিয়েছেন। তার এই আখ্যানটিও শুরু করার পর শেষ না করে ছাড়া যায় না। অরণ্যমন-এর এই ছিমছাম বইটি হস্তগত হলেই পড়ে ফেলুন।