গল্পটি অবসরের। নাহ! অবসর সময়ের কোন গল্প নয়। মুল চরিত্রের নাম অবসর। অবসরের জীবনে ঘটতে থাকা ঘটনার প্রবাহ তার চিন্তা জগতে নিয়ে আসে এক ব্যাপক পরিবর্তন। মফঃস্বলে বেড়ে ওঠা অবসর হঠাৎ করেই জীবনচক্রের আবহে চলে আসে ঢাকায়। বাবা-মা’র মৃত্যু, বড় বোনের বাসায় থাকা এবং বিষ-চরিত্রের দুলাভাই এর অসহিষ্ণু বেড়াজালের মধ্যে আটকে পড়া অবসরের একমাত্র বন্ধু হয়ে ওঠে একটি চড়ুই পাখি।
অবসরের মনন জগতে অদ্ভুত কিছু পরিবর্তন আসলেও তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যাবে বইয়ে। তবুও পুরোপুরি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের জনরায় ফেলতে পারবেন না বইটিকে।
গল্পের চরিত্রায়নে বাসার কোনায় কোনায় ভূত খুজতে থাকা ময়না মা, মফস্বল শহরের সবচাইতে কাছের বন্ধু ইদরিস এবং নিমাদি, ফিরোজ দাদা সহ আরো অনেককেই দেখা যাবে। অবসর কি তার জীবন থেকে বিষবৃক্ষের প্রভাব মুছে ফেলতে পারে? ফিরোজ দাদা’র হাতে তুলে দেয়া এন্টি কাটার ও চড়ুই পাখির অদ্ভুত যোগাযোগ শেষ পর্যন্ত কি পরিণতি পেল। জানুন বইটির স্পর্শে এসে।
ইকবাল মাহমুদ ইকু’র দ্বিতীয় একক উপন্যাস 'বিষবৃক্ষ' বইয়ের বরাবরের মত চমৎকার প্রচ্ছদটি করেছেন তিহিমনি। এক রঙ্গা এক ঘুড়ি থেকে প্রকাশিত বইটি পাওয়া যাবে বাংলা একাডেমি মূল ভবনের সাথেই “লিটল ম্যাগাজিন চত্বর” এর “মেঘফুল” স্টলে। পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৮০ পৃষ্ঠা। মুদ্রিত মুল্যঃ ১৮৫ টাকা।
একটি বই, তার পরিচয় দিতে গেলে প্রথম যে কথাটি আসে সেটি হল শিরোনাম। দ্বিতীয়ত শিরোনামদাতা, অর্থাৎ লেখকের নাম। এবং তৃতীয়ত বইটির জনরা, ঘরানা, ধরণ ইত্যাদি যা-ই বলা হোক তাকে। এখানে এসেই আটকে গেছে বইটির পরিচয়পর্ব। কোন ঘরানার বলা যাবে একে? জীবনধর্মী? মনস্তাত্ত্বিক? অথবা স্রেফ কিশোর উপন্যাস? মূল চরিত্রের নাম বেশ অদ্ভুত। অবসর! নামে তার পরিচয় আছে যেমন, সেই স্বকীয়তার সাথে সে নিজেও সমান অদ্ভুত। তাহলে কি বইটি ‘অদ্ভুত’ জনরার? অদ্ভুত অবসর-এর কিশোর বয়স, একটি চড়ুই পাখির সাথে তার বন্ধুত্ব এবং পুরো বইয়ের কিশোরসুলভ বর্ণনার সাদৃশ্যে এই প্রশ্ন বাতিল করে দেয়া যায়। তাহলে হয়ত কিশোর উপন্যাস! তবে ‘কিশোর’ অবসর-এর জটিল মনস্তাত্ত্বিক দিকটির পরিচিতি এই সম্ভাবনাকে বেশিক্ষণ টিকতে দিচ্ছে না আবার। সেক্ষেত্রে সোজাসুজি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস বললেই হয়! ইকো সিস্টেম ঠিক রাখার জন্য জীবনে কিছু বিষবৃক্ষের দরকার হয়। তবে সেই বৃক্ষের বিষ সহনীয় পর্যায় পার হয়ে গেলে তার উৎপাটন জরুরী। কিশোর অবসর-এর পারিপার্শ্বিক ঘটনাপ্রবাহ, অল্প বয়সের এই ‘বিষ-অনুধাবন’ আর তদনুযায়ী নেয়া পদক্ষেপ... সবমিলিয়ে বইটিকে আসলে একটি ঘরানায় বাঁধতে পারেনি। তাই সে চেষ্টাকে অবসর দিয়ে আমাদের অবসর-কে নিয়ে কথা বলা যাক বরং। দুর্ঘটনায় মা-বাবা হারানো, নাড়ি-ছেঁড়া প্রিয় মফঃস্বল ফেলে আসা, একমাত্র বোনের সংসারে একা চিলেকোঠায় বসবাস এবং বোনের অসহিষ্ণু স্বামীর ছায়ায় থাকা সহিষ্ণু অবসর। আপাত একলা জীবনে ছটফটে, সমবয়সী ইভা’র আবির্ভাবের পূর্বে চড়ুই পাখিটিই ছিল তার একমাত্র বন্ধু। চরিত্রায়নে আরও আছে ভুত গবেষক ময়নার মা, নিচতলার ফিরোজ দাদা, মফঃস্বলের বন্ধু ইদরিস, স্নেহময়ী নিমাদি, সাহায্যের হাত বাড়ানো ডাঃ এনামুল। সবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংস্পর্শে, চড়ুই পাখি এবং তার এন্টি কাটার-এর সাহায্যে কিভাবে শেষমেশ বিষবৃক্ষের প্রভাব থেকে মুক্তি পেলো জীবন, ফিরোজ দাদা পেলেন স্বাধীনতা, অবসর পেলো তার মনস্তাত্ত্বিক জগতের ব্যাখ্যা... সেটি চমকপ্রদ বই কিছু নয়। উপন্যাসটি পড়ে মিশ্র অনুভূতির শিকার হতে হবে। অতঃপর আঁতিপাঁতি ‘জনরা’ খুঁজতে থাকা বইটির জন্য ‘অন্যরকম’ ব্যতীত আর কোনও সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়া যাবে না। বইয়ের পরিচয়পর্ব নিজে যতটুকু দাবি করে, ততটুকু সম্পূর্ণ করতে গেলে স্পয়লার চলে আসার সম্ভাবনা বিষম। এটুকুই বলা যায় যে, শেষ করে মনে হয়েছে সবার জীবনে একটি চড়ুই পাখি থাকলে মন্দ হত না।
জীবন জটিল। দুর্বোধ্য। তার চেয়েও বেশি রহস্যময়। রহস্য সদ্য মেট্রিক পাশ করা অবসরের জীবনকে ঘিরে। রহস্য তার একমাত্র সঙ্গী চড়ুইপাখি। রহস্য তার দুলাভাই। যার আশ্রয়ে মাথাগোঁজার ঠাই মিলেছে বাবা মা হারানো অবসরের। এত রহস্য এত জটিলতারর মাঝেও ছোট ছোট আনন্দের খোঁজে অবসর ছুটে যায় তার শৈশব পার করা মফস্বল শহরে। আনন্দের অফুরান উৎস বাল্যবন্ধু ইদরিস, ভন্ড পীরের ভন্ড মুখোশ খুলে দিতে তাদের অ্যাডভেঞ্চার, নিমাদি, আর ইভা। ইভার পরিচয়টা না হয় নাই দিলাম। আনন্দ জুড়ে থাকে ম্যাজিক দেখানো ফিরোজ দাদা, আলুশাক, রাবেয়া আপা এবং তার ছোট্ট মেয়ে পরী। এত আনন্দ রহস্যময় অবসরের জীবনে বিষবৃক্ষ তবে কে? যে বৃক্ষময় কেবল বিষ আর বিষ। ছায়াও যার বিষাক্ত। অবসর কি পারবে? তার ছোট হাতে বিষবৃক্ষ উপ্রে ফেলতে? কে তাকে সাহায্য করবে? ইভা, ফিরোজ দাদু, ইদরিস নাকি চড়ুই পাখি? জানতে হলে পড়ে ফেলুন ঝটপট ইকবাল মাহমুদ ইকুর উপন্যাস 'বিষবৃক্ষ'। দারুন একটা উপন্যাস।