নাহ, বায়োটেকনোলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং.. এসব শাস্ত্র নিয়ে নাড়াচাড়া জরুরি। নইলে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে ঠাকুর পরিবারে একের পর এক এতো গুণী কেমন করে জন্ম নিলেন সে রহস্য বোঝা যাবে বলে তো মনে হয় না!
অনেকগুলো ঘর, অনেকগুলো মহল, অনেকখানি বাগান জুড়ে মিলিয়ে ছিল জোড়াসাঁকোর প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের বাড়ি। চকমেলানো ছয় নাম্বার বাড়িতে ছিলো অন্দরমহল আর পাঁচে ছিলো বৈঠকখানা। ছেলেবুড়ো, চাকরবাকর সবাই মনে মনে জানত দু'খানা বাড়িই এক।
গলির ধারে ছিল তালাভাঙা লোহার খালি ফটক, মস্ত বাগান, তার একধারে বুড়ো নিমগাছ আর কোটরে টুনটুনি পাখিদের বাসা।
মেজোছেলে গিরীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর পুত্র গুণেন্দ্রনাথ এবং তারপর গগনেন্দ্র-সমরেন্দ্র-অবনীন্দ্র, বৈঠকখানা মানে পাঁচ নম্বর বাড়িতেই মানুষ। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতি মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন স্মৃতিমেদুর জোড়াসাঁকোর সেই ৫ নাম্বার বাড়ি নিয়ে।
শুধু কি বাড়ি-ই? শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যের স্মৃতিবিজড়িত সেই দক্ষিণের বারান্দা আর বাড়ি জুড়ে থাকা, বাড়িকে জড়িয়ে রাখা মানুষগুলোকে নিয়েও...
অবনীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় কন্যা করূণা তিনটি শিশুপুত্র রেখে অকালে মারা গিয়েছিলেন বলে মাতৃহীন নাতিরা ছিলো অবন ঠাকুরের চোখের মণি। তার মধ্যে জেষ্ঠ মোহনলালের ভাগে আদরের অংশটা ছিলো বাড়াবাড়ি রকমের বেশি! মোহনেরও জানা ছিলো সকল কাজের সঙ্গী দাদামশায়ের কাছে কোনো আবদার করলেই নাখোশ হয়ে ফিরতে হবে না।
বন্ধুতা ছিলো এমনি নিখাদ!
জোড়াসাঁকোর সেই টানা বারান্দায়, লাইব্রেরি ঘরে, গোল বাগানের ফোয়ারার ধারে, চালাঘরের লতায় ঢাকা সামার হাউজে, দপ্তরঘরের কলতলার কোনে... দুটি অসমবয়সী বন্ধুর রূপে-রসে-সুরে, গল্প-ছবি আর গানের আনন্দ-নিকেতনের গল্প এ বই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে ঠাকুরবাড়ির অক্ষয় বিলাসের ওপর যে অর্থনৈতিক ধাক্কা পড়ে তারই জের ধরে একদিন দেনার দায়ে নিলামে ওঠে এবং শেষে বেহাত হয়ে যায় ৫ নম্বর বাড়ি। সেই সঙ্গেই শেষ হয় দক্ষিণের বারান্দার এই গল্প।
থেকে যায় হাহাকার।
কোন ভাবেই কি সংরক্ষন করা যেতো না সেই আশ্চর্য জাদুপুরী?
ভাঙবার আগে কেউ একবারো সামলে রাখার চেষ্টা করেনি অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য বই কিংবা হরেদরে বিকিয়ে দেওয়া অবনীন্দ্রনাথের অমূল্য ছবিগুলো?
এইসব, অক্ষম আক্ষেপ-ই, থাকে বাকি,
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার...
এমন মায়াময় আত্মকথন মিস করাটা অন্যায়! :)