ফেলুদা এবং ব্যোমকেশকে নিয়ে লেখা দু'দুটি ফ্যান ফিকশন। ফেলুদার প্রথম গল্পের পঞ্চাশ বছর এবং ব্যোমকেশের প্রথম চলচ্চিত্রের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে লেখা হয়েছে এই pastiche দু'টি। জয়পুরের মহারাজার জন্য ফরাসী এক মণিকার বানিয়েছিলেন 'রুবি আইড প্যারট', এক অমূল্য শিল্পকর্ম। দিল্লীর এক শিল্প সংগ্রাহক হঠাৎ-ই খুঁজে পান আরেকটি রুবি আইড প্যারট, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে এর আগে কোনো ধারণাই ছিল না। সোনার তৈরি এই দ্বিতীয় টিয়াপাখিটি, যার চোখে আবার বসানো রয়েছে দুর্মূল্য রুবি পাথর, জাল কিনা সেটি যাচাই করার জন্য নিয়ে আসা হয় কলকাতার সিদ্ধেশ্বর বোস অর্থাৎ আমাদের সিধুজ্যাঠার কাছে। শিল্পকর্মটির অথেনটিসিটি প্রমাণিত হলেও রহস্যজনক ভাবে সে টিয়া চুরি হয়ে যায়, তার পর পরেই খুন হন গুজরাটের সেই আর্ট কালেকটর-ও। সিধু জ্যাঠার অনুরোধেই এ রহস্যের সমাধানে ফেলুদা এবার সদলবলে দিল্লীতে। রাজধানীতে এবার সত্যিই তুলকালাম, অপরাধী যে কে তা বুঝতে ফেলুদারও ঘাম ছুটে গেছে। দিল্লীতে ফেলুদার এই প্রথম অ্যাডভেঞ্চার, সে অ্যাডভেঞ্চারে সামিল হওয়ার জন্য পড়তেই হবে 'রাজধানীতে তুলকালাম'।
অপরাধীকে চিনতে না পারলে সমস্যা প্রবল, কিন্তু অপরাধ চিনতে না পারলে সে সমস্যা প্রবলতর। উনিশ'শ বিয়াল্লিশের ডিসেম্বর মাস, কলকাতার রাস্তায় কান পাতলে শুধু একটা গুজবই শোনা যাচ্ছে - জাপানীরা যে কোনো দিন বোমা ফেলতে পারে। এরকমই এক আবহে, ব্ল্যাক-আউটের অন্ধকারের সুযোগ নিতে নেমে পড়েছে কোনো এক সিরিয়ল কিলার। একের পর এক নৃশংস খুনের কিনারা করতে খোদ কমিশনার সাহেব ডেকে পাঠিয়েছেন ব্যোমকেশকে। এরকম অপরাধ কলকাতার মানুষ সত্যিই আগে দেখেননি - কিন্তু এ অপরাধ গোড়ার কথা নয়, উপসংহার মাত্র। সব অপরাধ যে রাতের অন্ধকারেই ঘটে তা তো নয়। 'গরল তমসা' কিন্তু কোনো জ্যাক দ্য রিপারের গল্প নয়, তার থেকেও ভয়াবহ এক চরিত্রচিত্রণ। ব্যোমকেশ ছাড়া কেই বা পারত এ অপরাধের সুরাহা ঘটাতে?
নতুন লেখকদের মধ্যে প্রবীরেন্দ্র অবশ্যই আমার পছন্দের প্রথম সারির একজন| অন্য দিকে ব্যোমকেশ আর ফেলুদা দুজনেই আমার প্রিয় সত্যান্বেষী| তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই বইটার জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে ছিলাম। অবশেষে সেই অপেক্ষা শেষ হয়েছে। যেহেতু বইটি ফ্যান ফিকশন তাই মূল চরিত্রের স্রষ্টা দের সঙ্গে লেখক-এর তুলনা করা খুব স্বাভাবিক হলেও কতটা উচিত কাজ সে বিষয়ে আমার দ্বিধা ছিল। তাই আমি প্রবীর-এর অন্য লেখার সঙ্গেই ওর এই বই-এর তুলনা করেছি। এখানে আগে আরেকজনের কথা উল্লেখ করেনি| অভীক-এর আঁকা বইটির প্রচ্ছদ দুটি ও ছবি গুলো কে আমি 4/৫ দিচ্ছি (ভেতরের একটি ছবি গল্পের বর্ণনা-র সঙ্গে মেলালে ভুল দেখতে পাওয়া যাবে।)। গল্প দুটো গোগ্রাসে শেষ করার পরে প্রচ্ছদের প্রাসঙ্গিকতা তা আরও বেশি করে বুঝতে পারছি। এবারে আসি 'রাজধানীতে তুলকালাম'-এ। গল্পের প্লট টা বই-এর বিবরণ-এই লেখা আছে তাই আর সে নিয়ে কথা বাড়াচ্ছি না। যাদের কথা বলা হয়নি তাদের উল্লেখ করি। সন্দেহজনক সোলাঙ্কি, ব্যবসায়ী জয়সওয়াল নাকি আর্ট কালেক্টর জোশি, কে যে আসল অপরাধী তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত ও বেশ ধ্বন্দে ছিলাম। বেশ unpredictable একটা টার্ন নিলো গল্প টা। একটি খুন ও হলো। এমনকি সিধু জ্যাঠা পর্যন্ত ধরতে পারেননি চালাকি টা! জটায়ু-র জন্য ফেলুদা প্রাণে বেঁচে গেছে এ যাত্রা। যদিও বেশ কিছু প্রশ্ন থেকে গেলো মনে। কিন্তু সেগুলো আর এখানে উল্লেখ করে spoiler দিতে চাইনা। গল্পের প্লট পছন্দ হলেও ছোটগল্প বলে রহস্য দানা বাঁধার আগেই যেন শেষ হয়ে গেলো তাই ঠিক মন ভরলো না। জটায়ু কে যথাযথ ভাবে চেনা গেলেও এই ফেলুদা যেন ততটা ক্ষুরধার নয়। সেটাও বোধ হয় গল্পের দৈর্ঘ্যের জন্য। প্রবীর-এর অন্য দুর্দান্ত লেখাগুলোর সঙ্গে তুলনা করে এটিকে আমি ৩.৫/5 দিচ্ছি। 'গরল তমসা' সত্যি-ই চমকে দিয়েছে। ব্ল্যাক আউট-এর অন্ধকারে নৃশংস ভাবে খুন হয়ে যাওয়া তিন বারবধূর মৃত্যু ঘিরে রহস্য দানা বেঁধে শেষমেশ যে অপরাধের সামনাসামনি হলাম তা আমার কল্পনার অতীত ছিল। শুধু অপরাধী নয়, অপরাধের ধরণ টাও গল্পের চমক। কিন্তু এইখানে একটা সমস্যা হয়েছে। এডিটিং-এর দোষে গল্পে গুরুচন্ডালি দোষ এতো বেশি চোখে পড়েছে যে মাঝে মাঝেই তাল কেটে যাচ্ছিলো। আশা করবো প্রকাশক এই দিকটায় চোখ দেবেন এবং পরবর্তী এডিশন-এ ভুল গুলো শুধরে নেবেন। তাই গল্প পছন্দ হলেও অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে এটিকে ৩.৫/৫ দিলাম।
শব্দটার নাম প্যাস্টিশ। অবশ্য আমার মত পাঠকেরা এত প্রপার নাউনের কচকচিতে যায় না, পাতি ফ্যান ফিকশন বলেই কাজ চালায়। বইটির মুখবন্ধে এই ব্যাপারটা প্রথম চোখে পড়লো। জানলাম, প্যাস্টিশের ক্ষেত্রে লেখকের পায়ে জুতো গলিয়েই চলতে হবে, মানে এক্কেরে সেই বনেদী ব্যাপার স্যাপার। স্বভাবতই পছন্দের লেখকের লেখা আবার পড়ছি ভেবেই উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, শরদিন্দুর ব্যোমকেশ সমগ্র আমর পড়া নেই। ওনার একটা লেখাই পড়েছি, আর প্রিয় বইয়ের তালিকায় জ্বলজ্বলে হয়ে গেছে সেই সময় থেকে একটা নাম- "ঐতিহাসিক রচনা সমগ্র"। যাই হোক যেটা বলছিলাম, বইটা হাতে পেয়ে পড়া শুরু করতে কালবিলম্ব হলো না। কিন্তু মন ভরলো কি? না এবং হ্যাঁ।
ফেলুদার গল্পটা আমার অন্ততঃ ভালো লাগলো না। প্লটটা ভালো (intersting বলতে পারছি না, একটু simple ই), অপরাধী কে হতে পারে, তা প্রায় শেষ অবধি বোঝাও যায়নি; তবু কিছু একটা গলদ রয়েই গেল। মানিকবাবুর স্টাইলে ফেলুদাকে কোনদিন এত ছটফটে লাগেনি। এই ফেলু যেন একটু বেশীই কথা বলে। কমপার্টমেন্টের বাইরে টাঙানো নামের লিস্টের পাশে বয়সটাও তো লেখা থাকে দেখেছি। তা ভদ্রলোক সেখানে ঢুকে মিস্টার মিত্র কে (জটায়ু না ফেলু?) তা কি বোঝার কথা নয়? তিনমূর্তির বয়সে তো যথেষ্টই পার্থক্য ছিল!
সেই তুলনায় ব্যোমকেশের গল্পটা বরং বেশী ভালো লাগলো। একটা কারন হতে পারে, আমার এই সিরিজটা আগে দু-চারটে গল্প ছাড়া পড়া হয়ে ওঠেনি। এই বইটার জন্যই আজ পুরো সমগ্রটা নিয়ে বসলাম। (এতদিনেও না পড়ে ওঠাটা একটা crime, I know, sorry floks!) যদিও এখানেও একটা গিঁট থেকেই গেল, ব্যোমকেশ এত detail এ সব কিছু জানলো কি করে! অবশ্য এর উত্তর হতে পারে "পথের কাঁটা"র সেই অমোঘ সত্য..."...অনুমান..."। (জানতাম না, আজই জানলাম)
সুতরাং overall এর চেয়ে বেশী রেটিং দেওয়া আমার দ্বারা সম্ভব হলো না।