সে সংগীত কল্পনা করেছিল, কিন্তু গাইবার সামথ্য পায়নি। তেমনই তার সামর্থ্যের ওপারে দাঁড়িয়েছিল প্রেম। তবু গানের কোন ঝরনাতলায় এসে একদিন মিলিত হল গান আর প্রেম! কীভাবে জ্বলে উঠল অন্ধকার ফুলগাছে আলোর ফুল! তারই নিবিড় আলেখ্য এই উপন্যাস। তার নাম সোমনাথ। কলেজের অধ্যাপক। সারাক্ষণ সে যেন গানের বলয়ে বাস করে। গান তার সঙ্গে সঙ্গে থাকে। তবু সে মনে করে, গান গাইবার কোনও অধিকার তার নেই। নেই কোনও সামর্থ্য। কেননা প্রথাগত শিক্ষা সে পায়নি। ওর গান-পাগল বাবা আর সংগীতপ্রেমী হেডমাস্টার মশাইও মনে করতেন এই কথা। অথচ গান দিয়েই তৈরি এই মানুষগুলির অন্তর-অনুভব-পৃথিবী। একসময় সোমনাথের জীবনে ওই গানের সূত্রেই আসে রক্তমাংসের নারী। কিন্তু প্রেম আসে না। গান হারিয়ে যায়। কত দিগন্তছোঁয়া বেদনা সোমনাথকে ছুঁয়ে থাকে নিয়ত। যন্ত্রণার অন্ধকারে তাকে গাছের মতো দাঁড় করিয়ে রাখে তারা। তবু গানেরা একদিন তার কাছে ফিরে আসে। আসে স্নেহ, প্রেম। এই উপন্যাসে জয় গোস্বামী রচনা করেছেন এক অন্যতর স্বপ্নসুরলোক।
ভারতীয় কবি জয় গোস্বামী (ইংরেজি: Joy Goswami নভেম্বর ১০, ১৯৫৪) বাংলা ভাষার আধুনিক কবি এবং উত্তর-জীবনানন্দ পর্বের অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি কবি হিসাবে পরিগণিত।
জয় গোস্বামীর জন্ম কলকাতা শহরে। ছোটবেলায় তাঁর পরিবার রানাঘাটে চলে আসে, তখন থেকেই স্থায়ী নিবাস সেখানে। পিতা রাজনীতি করতেন, তাঁর হাতেই জয় গোস্বামীর কবিতা লেখার হাতে খড়ি। ছয় বছর বয়সে তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। মা শিক্ষকতা করে তাঁকে লালন পালন করেন।
জয় গোস্বামীর প্রথাগত লেখা পড়ার পরিসমাপ্তি ঘটে একাদশ শ্রেণীতে থাকার সময়। সাময়িকী ও সাহিত্য পত্রিকায় তিনি কবিতা লিখতেন। এভাবে অনেক দিন কাটার পর দেশ পত্রিকায় তাঁর কবিতা ছাপা হয়। এর পরপরই তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কিছুদিন পরে তাঁর প্রথম কাব্য সংকলন ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ প্রকাশিত হয়। ১৯৮৯ সালে তিনি ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা কাব্যগ্রন্থের জন্য আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। ২০০০ সালের আগস্ট মাসে তিনি পাগলী তোমার সঙ্গে কাব্য সংকলনের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
"তোমার কাছে যেতে আমার ইচ্ছে হয় না, তোমার গায়ে কটু কেরাসিনের গন্ধ।" নিজেকে খুব অসহায় লাগে যখন নিজের ইচ্ছে মত কিছু করা যায় না। আমি যা চাই তা পাওয়া যেন খুব দুষ্কর। গান কে ভালবাসে না। রবী ঠাকুর তো বলে দিয়েছেন, গান ছাড়া যে পুরুষ বাঁচে সে আর যাইহোক প্রেমিক না। সেই গান জয় গোস্বামীর ভালবাসার মানুষ ছিল। তার বেঁচে থাকার কারণ ছিল। আমাকে সব থেকে কি টানে জানো এই গান, তুমি তো জানো না আমার মাঝে ভালবাসার সাথে একটি গানের সাগর রয়েছে। এমনি নানা কথা তিনি বলেছেন গানকে ভালবেসে। এই বইটি মূলত একজন যুবকের গান নিয়ে যত কথা। আমাদের মানবজীবন যে গান ছাড়া চলে না তা এই বইয়ে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। জীবন সংঘাত, ভালবাসা, নিজের হৃদয়কে না বলা কথা যেন বুক ফেটে বের হয়েছে এই বইয়ে। যে যুবকের বাবা ছিল এক গান পাগল, যার তৃষ্ণা চৌধুরীর, আমি নয় আমি নয় তোমার মায়া, গানকে করেছে আপন। সেই এক যুবককে তুলে এনেছেন তিনি। আমার মনে হয় জয় গোস্বামী নিজের যে চিত্র তাই এই বইয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। কেননা গান ছাড়া তার ক্ষুদ্রা নিবরাস হয় না। শোন, জয় গোস্বামীকে আমি বুঝতে পারি না। তিনি কী মানবজীবন তুলে এনেছেন কল্পনার সাথে মিশিয়ে। তাকে কি বলব, এই যে আপনি বললেন, যেও না ঐ পর্বতের দক্ষিণে তৃণাচ্ছন্ন হয়ে তুমি ছড়িয়ে আছো, এটা কি আমার চোখে দেখার ভুল না তুমি সত্যি আছো পাহাড় সমান হৃদয় নিয়ে। যাই হোক, এই বইটি অসাধারণ। কবিরা যে কোন চোখে পৃথিবী দেখে সাধারণ মানুষ যদি জানতো তারা তাহলে বুঝতো এই রহস্যময় প্রকৃতিকে।
বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে আন্ডাররেটেড ঔপন্যাসিকের লেখা থেকে:
"- আছেন। সেই গানের দেবী তোমার ভেতরে অবস্থান করে আমাকে রক্ষা করেছেন। রক্ষা করেছেন সত্যভঙ্গ থেকে। সেইসব মৃত পরিজনরা, যাঁদের কাছে আমি সত্য করেছিলাম, যাঁরা পরলোক থেকে আমাকে দেখছেন, যাঁরা মৃত্যুর ওপারে গিয়েও আমাকে ভুলে যাননি, যাঁরা ভালবেসেছেন আমাকে, যাঁরা ভালবেসেছিলেন সন্তানদের, এমন কি দূরতর আত্মীয়ের সন্তানদের, আত্মীয়ের আত্মীয়ের সন্তানদের ভালবেসেছিলেন যাঁরা, যাঁরা আমাকে দিয়ে সত্য করিয়েছিলেন, নিরুপায় হয়েও, আমাকে দিয়ে, যারা আমাকে সত্য করাবার যোগ্য মনে করেছিলেন, তাঁরা সব, ওই বৃষ্টির ওপারে, বৃষ্টির ওপরকার আকাশে দাঁড়িয়ে আছেন আজ। এমন কি বৃষ্টির সঙ্গে সামনের ওই মাঠেও কেউ কেউ হয়তো নেমে এসেছেন আজ! আমার মতো পরিজন তাঁরা, তাঁদের সত্য আমার কাছে। আর আমি নপুংসক কি না, কাপুরুষ কি না, সে-প্রমাণ হয়তো এ জীবনে দেওয়া হল না। কিন্তু আমার মৃত পরিজনদের সত্য আমার কাছে রাখা রইল। আর আমার জীবিত পরিজন, একমাত্র জীবিত, আত্মীয়া আমার, আমার স্ত্রী, সেও এক দুর্ভাগা। কেননা সে গানকে ভালবাসতে পারেনি, কারও কাছে কোনও সত্য করতে পারেনি। আর যাকে ভালবেসেছিল, সর্বস্ব দিয়েই ভালবেসেছিল, সেও কেবল লুণ্ঠন করেছিল তাকে। ছিন্নভিন্ন করেছিল তাকে। আর আমি, তার দ্বিতীয় স্বামী, আজ এ কথা স্বীকার করব, যে আমিও তাকে ভালবাসতে পারিনি। প্রতিশ্রুতি পালন করেছিলাম মাত্র। কিন্তু, সে তবু, অন্যের শিশুকে কোলে তুলেছে। সে আমার ঘুমের ভঙ্গি নিয়ে উদ্বেগ জানায়। আমাকে ঘুমন্ত দেখে তার নিজের বাবাকে মনে পড়ে...
এরা সব কী। এরা সব অন্ধকার ফুল গাছ। আমরা সবাই। যারা ভালবাসবার অধিকার পাইনি। যারা সঙ্গীত কল্পনা করেছি, কিন্তু গাইবার সামর্থ্য পাইনি। আমাদের সামর্থ্যের ওপারে দাঁড়িয়ে থেকেছে প্রেম। সামর্থ্যের ওপারে দাঁড়িয়ে থেকেছে গান। এই বৃষ্টির মাঠের ওপারে দাঁড়িয়ে থেকেছে। আর জলভর্তি মাঠের মধ্যে ঠায় থেকে গেছি আমরা। এক একটা অন্ধকার ফুল গাছ হয়ে হয়ে। এর মধ্যে আমরা সবাই আছি। আমি, আমার বাবা, আমার মা, মাস্টারমশাই। আর আমার স্ত্রী, ওই মালাও। সবাই অন্ধকার ফুলগাছ। খুঁজে খুঁজে দেখতে হয় আমাদের। তবু গান, সুগন্ধ রৌদ্রকিরণ আমাদের মধ্যেই এসে লুকিয়ে আছে। ঘুমিয়ে আছে। তাই দেখা যায় না। আমরা, কেউ কেউ, দু-একটা সত্যের বেশি হয়তো কিছুই রক্ষা করতে পারি না জীবনে। কিন্তু দু-একটা সত্যের কমও কিছু রক্ষা করতে পারি না। দু-একটা অন্ধকার ফুলগাছের সত্য..."