সাড়ে বাইশশো বছর আগে মহামতি অশোক ন’জন অজ্ঞাত পণ্ডিতকে নিয়ে ন’টি বিভিন্ন বিষয়ে সর্বোত্তম জ্ঞ্রানের চর্চার জন্য একটি গুপ্তসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অনেকে বিশ্বাস করেন এই গুপ্ত সংঘটি আছে আজও। এই সূত্রকে ভিত্তি করে সাহিল তৈরি করে একটি হিন্দি সিনেমার চিত্রনাট্য। প্রোডিউসার রোশন মেহেতার সেটি পছন্দ না হওয়ায় আরও তথ্যের সন্ধানে সাহিল উত্তর কলকাতায় ঐতিহাসিক অমরেন্দ্র সিকদারের কাছে আসে। ‘প্রজ্ঞাসূত্র’ উপন্যাসে সমান্তরাল দু’টি গল্প। প্রথম গল্পটি সাহিলের থ্রিলারধর্মী চিত্রনাট্য। যেখানে সাড়ে বাইশশো বছর আগের গুপ্ত সংঘের একের পর এক রহস্য উন্মোচনে সম্বুদ্ধ, রুচির প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন তিন প্রৌঢ় পৃথ্বীশ মিত্র, বিশ্বনাথ কর্মকার ও অচিন্ত্য বৈদ্য। অন্য গল্পে সাহিল যখন এই থ্রিলারটি একটু একটু করে অমরেন্দ্রনাথ সিকদারকে শোনায় বর্ণালী, কিঙ্কি পাল্টাতে থাকে চিত্রনাট্যর গতিপথ। টানটান এই উপন্যাসে শেষপর্যন্ত আরেক রহস্যের উন্মোচন।
কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৬৪, ব্যারাকপুরে। প্রথম জীবন কেটেছে শ্যামনগরে। ইছাপুর নর্থল্যান্ড বয়েজ হাইস্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা। স্কুলজীবন থেকেই লেখালেখির সূত্রপাত। প্রথমে অনিয়মিতভাবে কিছু লিটল ম্যাগাজিনে লিখতেন। ২০০৫ থেকে নিয়মিতভাবে আনন্দবাজার পত্রিকার বিভিন্ন প্রকাশনায় ছোটগল্প লিখছেন। ‘খেজুর কাঁটা’ গল্পটি নিয়ে হয়েছে শ্রুতিনাটক। ছোটগল্প ‘ছবির মুখ’ আকাশবাণীতে বেতারনাটক হয়ে সম্প্রচারিত হয়েছে। লেখকের ‘ব্রহ্মকমল’ গল্পটি ২০০৬-এ ‘দেশ রহস্যগল্প প্রতিযোগিতা’য় প্রথম পুরস্কার লাভ করেছে। ২০০৭-এ ‘পূর্বা’ শীর্ষক একটি কল্পবিজ্ঞান গল্পের জন্য ‘দেশ গল্প প্রতিযোগিতা’য় দ্বিতীয় স্থান পেয়েছেন। রাধিকা লেখকের প্রথম উপন্যাস।পেশাদারি জীবনে ইঞ্জিনিয়ার, বেসরকারি বিদ্যুৎ সংস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে কর্মরত। সাহিত্য ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে প্রবন্ধ লেখেন। ভারতীয় মার্গ সংগীতের প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত।
আই সি ইউ -এর ভেতরে সমর ভট্টাচার্য নামের এক রোগী অচেতন অবস্থায় অসংলগ্ন কথা বলে যাচ্ছেন। তাঁর সামনে রয়েছেন ডাক্তার সম্বুদ্ধ। যুদ্ধ- সাংকেতিক ভাষা- সর্বোত্তম জ্ঞানের সন্ধান- এইগুলো শুনে সম্বুদ্ধের মনে হয় যে সমরবাবু হয়ত কোন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে যেতে চাইছেন। তাই সে এই কথাগুলো ফোনে রেকর্ড করে নেয়।
সাড়ে বাইশশো বছর আগে সম্রাট অশোক নয়জন পন্ডিতকে নিয়ে একটি গুপ্ত সংঘ গড়ে তোলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য নয়টি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জ্ঞানচর্চা করা ও তা সাংকেতিক ভাষায় লিখে যাওয়া। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে এই গুপ্ত সংঘ এখনও আছে। সেই সুত্রকে ভিত্তি করে চিত্রনাট্যকার সাহিল রায় চলচ্চিত্রের জন্য একটি থ্রিলার লিখছেন। সাহিলের স্ত্রীর মাধ্যমে প্রজ্ঞাসূত্র' নামে একটি পুরনো বই হাতে পাওয়ার পর সাহিলের মাথায় এই প্লটটা আসে। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার সত্যতা যাচাই করা ও আরো কিছু তথ্য সংগ্রহ করার উদ্দশ্যে সাহিল কলকাতায় অধ্যাপক অমরেন্দ্র সিকদারের বাড়িতে পৌঁছয়। গল্প শোনার আনন্দে অধ্যাপকের পরিবার সাহিলকে আপন করে নেয়।
সেইখানেই সাহিল এই সমর ও সম্বুদ্ধের গল্পটা পড়তে শুরু করে। এই গল্পপাঠের মাধ্যমেই সাহিলের থ্রিলার এগোয়। সম্বুদ্ধর মোবাইলটা পকেটমার হয়ে যায় সেটা কি নিতান্ত কাকতালীয়? সম্বুদ্ধর কেন মনে হয় যে কেউ তাকে অনুসরণ করছে? হাসপাতালে কেন সমরবাবুকে নিয়ে এত রহস্যজনক ঘটনা ঘটলো? ----
এটা কিন্তু ইতিহাস নির্ভর থ্রিলার নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে ভিত্তি করে সমসাময়িক কালের একটি গল্প তৈরির গল্প। পাঠক এই বই কেনার সময় যেন এটা খেয়াল করেন।
একদিকে সাহিলের মুখে আমরা শুনছি এক সহৃদয়, দায়িত্ববান ডাক্তারের তাঁর রোগীর ইচ্ছেপুরণ করতে চাওয়ার গল্প আরেকদিকে রয়েছে উপন্যাসের লেখকের সৃষ্টি চরিত্র সাহিলের থ্রিলার তৈরি হওয়ার গল্প। গল্পের ভেতর আরেকটা গল্প। লেখকের সৃষ্টি চরিত্র সাহিল ও সাহিলের সৃষ্টি চরিত্র সম্বুদ্ধ, রুচি, সমরবাবুরা। কে যে আসল চরিত্র আর কে যে গল্পের, সেটা অনেকসময় পাঠকের মাথায় গুলিয়ে যায়। আর এইখানেই এই উপন্যাসের মজা।
আর শুধু একটা কথাই বলব। কাহিনীর প্রথমদিকটা একটু বেশি ধীরে আর শেষটা একটু তাড়াতাড়ি হয়ে গেল মনে হচ্ছে। যার জন্য প্রথমদিকে উৎসাহ পাইনি। পরে সাহিল যখন তাঁর থ্রিলার পড়তে শুরু করে তখন গল্প জমে ক্ষীর। ভালো লাগলো। একটু অন্যরকম অভিজ্ঞতা হল।
যা ভেবে বইটি সংগ্রহ করা, একেবারেই কাহিনী বিন্যাস সে পথে হাঁটেনি। এটা কোন ইতিহাস আশ্রিত থ্রিলার নয়। এটা একটা গল্প তৈরী হবার গল্প যা কিনা পাঠক ক্রমশঃ কাহিনীর সাথে এগোতে এগোতে বুঝতে পারবেন।