মালদার একটা ছোট গ্রাম হেড়িয়াচক। শীত পড়তেই সেখানে শুরু হয়ে যায় বেআইনি পোস্ত চাষ আর তার থেকে বিভিন্ন মাদক তৈরি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা পশ্চিমবঙ্গে। কলকাতার নামকরা একটি কলেজের ছাত্রছাত্রীরা মিলে যখন মাদকবিরোধী দিবস পালন করছে তখন তারা জানতে পারে ওদেরই এক বান্ধবী সোমঋতা ড্রাগের জগৎ সম্বন্ধে বহু কিছু জানে। হঠাৎই সোমঋতার অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। সে কি অন্ধকার জগৎ সম্বন্ধে বড্ড বেশি জেনে ফেলেছিল? পোস্তর মতো নিরীহ শস্য থেকে কীভাবে তৈরি হয় ড্রাগ আর কীভাবেই বা তা ছড়িয়ে পড়ে বাজারে? সোমঋতার মৃত্যুরহস্যের তদন্তে নামে অফিসার অরণ্য সেন। কী উঠে আসবে তদন্তে? খুনি কি ধরা পড়বে? উপন্যাসের কুশীলবদের মধ্যেই কি কেউ সেই আততায়ী, না কি সে লুকিয়ে রয়েছে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে নানারকম চেহারা নিয়ে? ‘তৃতীয় শত্রু’ উপন্যাসে লেখক এমন একটা বিষয়কে ধরেছেন বাংলা সাহিত্যে যা বিরল।
সৌমিত্র বিশ্বাস-এর জন্ম ১৯৬৫ কলকাতায়। শিক্ষা নিউ আলিপুর মাল্টিপারপাস স্কুলে। পরে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের অর্থনীতির ছাত্র। অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর পাঠ শেষে রাজ্য সরকারের আধিকারিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বাংলার অধ্যাপিকা মৈত্রেয়ী সরকারের অনুপ্রেরণায় আরও মনোযোগী হয়ে ওঠেন সাহিত্যে। দেশ পত্রিকা আয়োজিত রহস্য গল্প প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভ করে তাঁর ‘মুখোশ’ গল্পটি। দ্বিতীয় গল্প ‘নাস্তিক’ও প্রশংসিত। প্রথম উপন্যাস ‘হেরুক’। আবাল্য সত্য সাইবাবার শিক্ষায় অনুপ্রাণিত মানুষটি ভালবাসেন আড়ম্বরহীন, সৎ জীবনযাপন আর সমাজসেবা। বই ও বন্ধুদের সঙ্গে মননশীল আড্ডায় সমান উৎসাহী।
"গিলবি না? তথ্য গিলবি না? ঘাড় ধরে গেলাব!" হেরুক-খ্যাত লেখক সৌমিত্র বিশ্বাস মনে হয় এই ধ্যানজ্ঞান নিয়েই উপন্যাসটি লিখতে বসেছিলেন। এমন একটি প্লট তিনি বেছে নিয়েছিলেন যাতে এক আদর্শ রহস্য কাহিনি গড়ে তোলার সব মালমশলা মজুত ছিল, কিন্তু ওই...
কাহিনি শেষে পাঠক হিসেবে বিরক্ত হতে হয়, তথ্যের ভারে নুব্জ হয়ে যাই। মূল কাহিনির, চরিত্রদের খেই হারিয়ে ফেলি।
"পোস্ত" নামটা শুনলেই সবার প্রথম মাথায় আসে আলুপোস্ত। যা আমার খুব প্রিয় খাবার। তবে বর্তমানে পোস্তর যা দাম, তাতে আলুপোস্ত আর সেভাবে খাওয়া হয় না আর কী। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে এই পোস্তর মতো শস্য থেকেই তৈরী হয় বিভিন্ন মরণশীল ড্রাগ, যাকে নিয়ে চলে সারা দুনিয়া জুড়ে কালোবাজারি আর যার কবলে পড়ে অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েরা চলে যাচ্ছে এক অন্ধকার জগতে। সৌমিত্র বিশ্বাসের "তৃতীয় শত্রু" উপন্যাস সেই অন্ধকার জগৎ ও তার কালোবাজারি-কে কেন্দ্র করেই।
মালদার একটি ছোট্ট গ্রাম হেড়িয়াচক, যেখানে শীত পড়লেই শুরু হয় বেআইনিভাবে পোস্ত চাষ। আর এই পোস্ত থেকে তৈরী বিভিন্ন মাদকদ্রব্য যা ছড়িয়ে পড়ে মালদা থেকে কলকাতা সহ গোটা পশ্চিমবঙ্গে। এই বিভিন্ন মাদকদ্রব্য বা ড্রাগসের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ করে মালদার কয়েকটি ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর নেতারা। প্রত্যেক নেতাদের নিজস্ব দল আছে, যারা বেআইনিভাবে পোস্ত চাষ থেকে শুরু করে তার থেকে তৈরী মাদকদ্রব্যগুলির সাপ্লাই দেওয়া অবধি সমস্ত কাজ খুব নিখুঁতভাবে পরিচালনা করে। তবে এই পোস্ত চাষকে নিয়েই হেড়িয়াচকের পরিস্থিতি বেসামাল হয়। শুরু হয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক লড়াই।
অন্যদিকে কলকাতার একটি নামকরা কলেজের অঙ্কের ছাত্রী সোমঋতা সরকার। ২৬ শে জুন অ্যান্টি ড্রাগ ডে-এর দিন কলেজের একটি প্রোগ্রামে তাকে বক্তৃতা দিতে বলা হয়, কারণ ড্রাগ সম্বন্ধে তার ধারণা আছে। কিন্তু খুব অস্বাভাবিকভাবে এর কিছুদিনের মধ্যেই তার মৃত্যু ঘটে। সোমঋতার মৃত্যু রহস্যের তদন্তের দায়িত্ব পড়ে লালবাজার অ্যান্টি-নারকোটিক বিভাগের অফিসার অরুণ সেন- এর উপর। তদন্ত চলাকালীন তিনি সোমঋতার ঘর থেকে খুঁজে পান একাধিক লেখাপত্র, যেখানে পাওয়া যায় পাতায় পাতায় ভর্তি ডুডল আর বিভিন্ন ড্রাগের কোড নাম। সোমঋতার এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ কি এই অন্ধকার দুনিয়া? সে কি অন্ধকার দুনিয়া সম্বন্ধে অনেক বেশি জেনে ফেলেছিল?
কাহিনীর আরেকটি চরিত্র হলো পীযূষ। যার সাথে সোমঋতার বছর দেড়েক আগে সম্পর্ক ছিল। কিন্তু একটা ভুল বোঝাবুঝির জন্য বর্তমানে তাদের মধ্যে আর কোনো সম্পর্ক নেই। তদন্তকারী অফিসারকে সে জানিয়েছে যে সোমঋতার সঙ্গে তার আর কোনো যোগাযোগ নেই। কিন্তু সেই সোমঋতার খাতাতেই পীযূষকে নিয়ে লেখা রয়েছে যে, "কাল রাত্তিরে পীযূষকে নিলাম, নাকি ও নিল আমাকে? আসলে দু'জনেই দু'জনকে। গা-ভর্তি আরাম।" সোমঋতার সঙ্গে যদি পীযূষের যোগাযোগ না থাকে তাহলে এসবের অর্থ কী? পীযূষ কি আদেও সত্যি কথা বলছে? নাকি এর পেছনে আছে অন্য কোনো অর্থ? অফিসার অরুণ সেন কি পারবেন এই সকল রহস্যের উদঘাটন করতে?
"তৃতীয় শত্রু" উপন্যাসের মাধ্যমেই সৌমিত্র বিশ্বাসের লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটল। প্রচুর তথ্য থাকায় প্রথম দিকে একটু গুলিয়ে যাচ্ছিল ঠিকই তবে কাহিনী যত এগিয়েছে তত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। লেখক ড্রাগ ব্যবসা, প্রতিটি ড্রাগের কোড নাম এবং ওই জগতের ভাষাগুলিকে নিয়ে এতো সুন্দরভাবে আলোচনা করেছেন যা প্রশংসনীয়। বাংলা সাহিত্যে সত্যিই এই ধরণের লেখা সচরাচর চোখে পড়ে না। এক কথায় দারুন লেগেছে।
যারা থ্রিলার পড়তে ভালোবাসেন, তারা এই বইটি অবশ্যই একবার পড়ে দেখবেন। আশা করি ভালো লাগবে।