কালচে রক্ত আর জঞ্জালের স্তূপে চিহ্নিত এই শহরের গলিতেও বৃষ্টি নামে। দক্ষিণের জানলা দিয়ে একমুঠো হাওয়া হঠাৎ ঢুকে দুলিয়ে দেয় ধুলোজমা টুংটাং খেলনা। শেষ বিকেলের আলোয় ঝলসে ওঠে ওষুধের শিশির পাশে পড়ে থাকা হার।
আজও শমীক ঘোষ-এর মতো কেউ গল্প লেখেন।
কী, বা কোন্ ঘরানার গল্প লেখেন শমীক?
রহস্য? রোমাঞ্চ? রোমান্স? অলৌকিক? ফ্যান্টাসি?
সামাজিক???? (কথাটা বলার সময় মুখে হরতুকি নেওয়ার এফেক্ট আনতে হবে।)
ক্ষমা করবেন, কিন্তু শমীকের লেখা চোদ্দোটি গল্প পড়ার পরেও আমি বুঝতে পারলাম না তিনি ঠিক কোন্ গোত্রের গল্প লেখেন। তবে এটুকু বলতে পারি যে এমন গল্প যদি আরও পড়তে পেতাম তাহলে, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় বললে, ‘জীবন আরও বেশি, আরও সতেজ’ হয়ে উঠত।
শমীকের গদ্যের কোনো তুলনা নেই, কারণ এমন অদৃশ্য গদ্য আমি কোথাও পাইনি। গদ্য কীভাবে অদৃশ্য হয়, তাই ভাবছেন? আসলে এই বইয়ের কোথাও লেখক নেই। আছে শুধু আশ্চর্য নির্মোহ ভঙ্গিতে, ছেঁড়া গৈরিক বসনাবৃত বাউলের ভাঙা গলায় সম্রাটের ঐশ্বর্যকে ম্লান করে দেওয়া দৌলতের মতো কিছু অনাবিল গল্প।
কেমন গল্প তারা?
এই সংকলনের কোন্ গল্পটি কী নিয়ে তা যদি লিখতে চেষ্টা করি, ছড়িয়ে লাট হবে। এরা আক্ষরিক অর্থেই বিন্দুতে সিন্ধু ধারণ করে আছে। তাদের মধ্যে কোনোটিতে মিশে গেছে ইতিহাসের যন্ত্রণা আর শোপিনের সুর, কোথাও বাস্তবের অসহ্য গ্লানি হারিয়ে গেছে ফ্যান্টাস্টিক মৃত্যুকামনায়, কোথাও পরাবাস্তবের মুখোশ খুলে আত্মপ্রকাশ করেছে এক ভয়ংকর চেহারা, কোনো গল্পে পাওয়া আর না-পাওয়ার অজস্র রঙ একাকার হয়ে ঘোলা করে দিয়েছে সবকিছু, আবার কোথাও বর্তমান প্রেমের সুর প্রতিধ্বনি খুঁজে পেয়েছে ঝরা বকুলের গন্ধমাখা অতীত ভালোবাসায়...! এদের নিয়ে আমি কীই বা লিখতে পারি?
বরং লিখি, কী-কী গল্প আছে এই বইয়ে।
একটি অতি সংক্ষিপ্ত ‘আমার কথা’-র পর এই সংকলনে এসেছে নীচের গল্পগুলো: -
১] দূরবিন
২] নীল পিঁপড়ে
৩] একটি অতিলৌকিক কথন অথবা নিছক কইমাছ
৪] ভিউফাইন্ডার
৫] এলভিস ও অমলাসুন্দরী
৬] ঈশ্বরের কান্না
৭] টিউলিপ
৮] লোকটা
৯] তুলসীতলা
১০] হাফ টাইমের পর
১১] ইয়ে দাগ দাগ উজালা
১২] ঘোলা
১৩] এনকাউন্টার
১৪] ক্যানভাস
এই গল্পগুলো ছাড়া এই সংকলনে আর কী আছে? আছে গলার কাছে একটা দলা পাকিয়ে যাওয়ার অনুভূতি, আছে অসহনীয় ফাঁপা দিনযাপনের কষ্ট, আছে গাছতলার অন্ধকারে প্রথম জোনাকি দেখার থিরথিরানি...
আছে ভালোবাসা। আছে জীবন।
সম্ভব হলে বইটা পড়ুন। হয়তো আপনি আরও ভালোভাবে এই বইয়ের গল্পগুলো বিশ্লেষণ করবেন। হয়তো আপনি নির্মোহ বিশ্লেষণ করে এদের মধ্যে অজস্র ফাঁকফোকর আর প্রেডিক্টেবিলিটি খুঁজে পাবেন। আমি দুর্বল পাঠক বলে এতে শুধুই জীবন খুঁজে পেলাম।
অর্পিতাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই। সে না বললে আমি এই বই পড়তাম না। তাতে আমি কী হারাতাম, তা এখন জানি। বইটা পড়লে হয়তো আপনিও জানবেন।