সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র যে, বিজ্ঞান গবেষণা, চর্চা ও বৃহৎ পরিসরে জনগণের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহারের সরকারি নীতিমালা প্রস্তুত করেছিল। ১৯১৭ সালের অক্টোবর মহাবিপ্লবের পর সোভিয়েতের সমাজতান্ত্রিক সরকার কৃষি অর্থনীতির বিকাশ ও আধুনিকায়নে বিভিন্ন তড়িৎ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। স্তালিন সরকারের প্রথম পঞ্চবাষির্কী পরিকল্পনায় রাষ্ট্রের কৃষিচাহিদা পূরণে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করা হয় গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে। পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলিতে যে-সময় বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির চর্চা শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক উপাদান হিসেবে ধরে নিয়ে এক ধরনের ইউটোপিয়ান ধারণায় ভুগছিল, সে-সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সামাজিক ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় চাহিদা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শুরু থেকে বিজ্ঞান-গবেষণায় সরকারি অনুদান, সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদানের ক্ষেত্রে সোভিয়েত সরকার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে বংশগতিবিদ্যা, কোষ-বংশগতিবিদ্যা গবেষণা এক সময় সারা বিশ্বে অগ্রগামী ছিল।
...কিন্তু যে-সোভিয়েত ইউনিয়ন বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে কৃষিগবেষণা, খাদ্য-উৎপাদনসহ জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা কার্যক্রম ও আবিষ্কারের দিক দিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছিল, সেই দেশের কয়েক দশক পরে যেন ‘নক্ষত্রপতন’ ঘটে! সাম্যবাদী ভাবাদর্শ নিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে ‘আইকন’ রাষ্ট্র হওয়ার বিপরীতে তাকে নিয়মিত তীব্র খাদ্যঘাটতি, দুর্ভিক্ষ, গণঅসন্তোষ প্রভৃতি মোকাবেলা করতে হয়েছে, যার কোনটি সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে না।
বিজ্ঞানভিত্তিক সোভিয়েত রাষ্ট্র কিনা এক সময় বিজ্ঞানের অগ্রগামিতার পথ রুদ্ধ করে দেয় নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ চাপিয়ে। রাশিয়ায় জীববিজ্ঞানের পতন ঘটে, সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায় জিনেটিক্সের মতো আধুনিক বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এখন পর্যন্ত একবিংশ শতাব্দীতেও রাশিয়া জীববিজ্ঞান-গবেষণায় তার পূর্বের অবস্থান ফিরে পায় নি। স্তালিনের রাশিয়ায় বিজ্ঞানের বিপর্যয় বিশ্ববাসীর কাছে উজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। ১৯২৭ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন দশক সোভিয়েতের জীববিজ্ঞান-জগতে রাজনৈতিক জবরদস্তিমূলক ঘটনাবলীতে লিসেঙ্কো অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। লিসেঙ্কো কীর্তিকে বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান জগতে সবচেয়ে বড় ‘স্ক্যান্ডাল’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কেন ও কিভাবে টান টান উত্তেজনায় ভরপুর নাটকীয় এ ঘটনাবলী সংঘটিত হয়েছিল, প্রশ্নগুলো বিজ্ঞানের ইতিহাসে আগ্রহী অনেকেরই মনে বিশেষ ঔৎসুক্যের সৃষ্টি করে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। বিভিন্ন বিশ্লেষণী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এ গ্রন্থে একের পর এক।