অতুলচন্দ্র গুপ্ত (১৮৮৪-১৯৬১) প্রখ্যাত আইনজীবী ও আইনের অধ্যাপক ছিলেন। গদ্যলেখক হিসেবেও খ্যাতি ছিল তাঁর। গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে বাংলা ও আসামের নদীতে স্টিমারে বেড়াবার সময় তিনি যেসব চিঠি লিখেছিলেন—পরবর্তীতে সে চিঠিগুলিই 'নদীপথে’ নামে ভ্রমণকাহিনী হিসেবে প্রকাশিত হয়। তবে প্রাপক বা প্রেরকের নাম না থাকায় তা ভ্রমণের দিনলিপি বলে মনে হয়।
প্রথমবার কলকাতা থেকে বরিশালগামি স্টিমারে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে, খুলনা হয়ে, হুলারহাট ও কাউখালিতে থেমে ঝালকাটি পর্যন্ত ছিল তাঁর ভ্রমণ। পরের বার একই পথে গোয়ালন্দ পর্যন্ত। তার পরের বার গোয়ালন্দ পার হয়ে যমুনা নদী ধরে সিরাজগঞ্জ, জগন্নাথগঞ্জ ও চিলমারি হয়ে—তারপর আসামের গৌহাটি ছুঁয়ে তেজপুরে গিয়ে তাঁর ভ্রমণ শেষ হয়েছিল।
বইতে নদীপথের দু'পাশের প্রকৃতি ও লোকালয়ের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। সরষে খেত, নারকেল-খেজুর-সুপারির বাগান, হাটবাজার, নদীর ঘাটে স্নান, সূর্যাস্ত—এমনকি নদীর পাড়ে ছাগলছানার লাফানোর দৃশ্যও বাদ যায়নি। আবার ভ্রমণের আসাম অংশে ব্রহ্মপুত্রের দু'পাড়ের বনজঙলে ঘেরা সবুজ পাহাড়ের কথাও বয়ান করেছেন।
লেখক নদীর বুকে চলা নানা রকম স্টিমার ও নৌকার বর্ণনা দিয়েছেন। জানিয়েছেন, স্টিমারগুলোর কেতাবি নাম থাকলেও ডাকা হত ট্রেনের মত করে—ঢাকা মেল, বরিশাল এক্সপ্রেস, ইত্যাদি। আছে জাহাজের খালাসিদের রোজা রেখে ইফতার করার বিবরণও। ভ্রমণের সময় লেখক হরবোলা থেকে শুরু করে নানা পেশার, নানা রকম মানুষের দেখা পেয়েছেন—বলেছেন তাদের কথাও।
Gupta, Atul Chandra (1884-1961) pleader and litterateur, was born on 12 March 1884 in the village of Billaik of tangail district, son of Umesh Chandra Gupta, a lawyer who had settled at rangpur.
Atul Chandra had his early education at Rangpur, passing the Entrance examination from Rangpur Zilla School in 1901. He then moved to Kolkata, completing his BA (Hons) in English and Philosophy in 1904 from presidency college. After completing MA in Philosophy (1906) and BL (1907) from the university of calcutta, he taught briefly at Rangpur National School before taking up the practice of law. In 1914, he started practising at Calcutta High Court. From 1918 to 1928 he was a professor of Roman Law and Jurisprudence at Calcutta University. He then left teaching and returned to his legal practice, soon becoming one of the best-known lawyers of India.
Atul Chandra was a versatile genius. He won the 'Anathanath Dev Prize' of Calcutta University for his thesis on 'Trading with the Enemy' written in 1918. Calcutta University conferred the DL degree on him in 1957.
ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা হল শুধু নদীপথে ভ্রমণ নিয়ে ডেডিকেটেড একটা বই, এই ধারণাটা আমাদের এখানে খুব প্রচলিত নয়। অতুলবাবু ডায়রির মতো লিখে গেছেন ভ্রমণবর্ণনা।আজকাল এই রুটে যাতায়াত প্রচলিত না, আজ থেকে ৮০ বছর আগের, বাংলাদেশে টু আসাম বা কোলকাতার যাত্রার জন্য এই 'জার্নি বাই বোট' গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বভারতী থেকে বইটা বেরিয়েছে, তখনকার দিনে বইটি কতোটুকু গুরুত্বপূর্ণ ঠেকেছে জানিনা, হয়তো আজকে আমার কাছে যতোটা ঠেকেছে অত না।কারণ ওই অভিজ্ঞতা তৎকালীন মানুষের জন্যে দুর্লভ নয়। আমার ভুগোলজ্ঞান বিশ্রী রকমের খারাপ, নৌরুটটা মনে মনে ঠিকমতো আঁকতে পারিনি, তবুও বর্ণনশৈলীতে মুগ্ধ। একটা বিষয় সম্পর্কে আমাকে কেউ ধারণা দিন, বইতে লেখকের চড়া নৌযান হচ্ছে 'স্টিমার", তাঁর ভাষায়। এটা কি লঞ্চ? উনি কেবিনে ছিলেন।তখনকার নৌযানগুলো কীরকম ছিল?
অতুলচন্দ্র গুপ্ত রচিত 'নদীপথে' একখানা ভ্রমণকাহিনি। যা আজ থেকে প্রায় শতবর্ষ আগে একটানা তিন বছরের বড়দিনে স্টিমার ভ্রমণের ইতিবৃত্ত।
অতুলচন্দ্র গুপ্ত, বার-আ্যট-ল ১৯৩৪, ১৯৩৫ ও ১৯৩৬ সালের বড়দিনের ছুটিতে স্টিমারে করে বাংলাদেশের সুন্দরবন থেকে আসামের তেজপুরে ঘুরে বেরিয়েছেন। নদীপথে যেতে যেতে প্রধানত পূর্ববঙ্গের যা যা দেখেছেন তা মনোহর গদ্যে এঁকেছেন 'নদীপথে' বইতে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো আজ মরে গেছে। জীবিতগুলোর অবস্থা মরমর৷ খুলনা-বরিশাল অঞ্চলের এই নৌপথের অসামান্য বিবরণ পাঠক হিসেবে আমাকে ভীষণভাবে তাড়িত করছিল। অতুলচন্দ্র গুপ্ত বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন স্টিমারের ডেকে বসে। স্টিমার কোম্পানির কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে মোটামুটি রাজকীয় সুখ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছিল। যদিও নোয়াখালী অঞ্চলের একজন মুসলমান খালাসি তাতে সহমত হতে পারেনি। সে লেখককে ব্যাখা করে বুঝিয়ে বলেছিল, কালো চামড়ার সাহেব বলে অতুলচন্দ্র গুপ্ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সাদা সাহেব হলে আরও বেশি আরাম-আয়েশ এখানে মেলে।
স্টিমার থেকে তত বেশি নামেননি। আদতে এটি খাঁটি স্টিমারভ্রমণ। তাই নামার দু'একবার ছাড়া বিশেষ সুযোগ হয়তো লেখকের হয়নি। তবু তিনি দু'চোখ ভরে দেখেছেন। পূর্ববঙ্গের নদীতীরবর্তী জনপদের বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সুন্দর ও সহজ ভাষায়। খুলনার পর বরিশালের কাউখালি, হুলারহাট, ঝালকাঠি ইত্যাদি বড় বড় বন্দরের নাম ও বিবরণ তার লেখায় এসেছে। এছাড়াও গোয়ালন্দসহ পূর্ববঙ্গেী আরও কিছু নৌবন্দরের উল্লেখ বইটিতে পাব।
স্টিমারের খালাসি ও মাল্লাসহ নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের প্রায় সকলেই পূর্ববঙ্গের নোয়াখালী ও চাটগাঁর বাসিন্দা। প্রায় তিন বছরের ডিসেম্বর মাসে তিনি স্টিমারে দেখেছেন রমজান মাস চলছে। মাল্লা ও খালাসিরা সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে কিন্তু কেউ রোজা ভাঙে না। সন্ধ্যায় আজানের পর ছোলা ও কখনো কখনো ভাত খেয়ে ইফতার করার কথা অতুলচন্দ্র গুপ্ত লিখেছেন।
মাত্র ষাট পাতার বইয়ের বড় সৌন্দর্য লেখকের সহজ অথচ মধুমাখা গদ্য। একইসাথে এদেশের নৌপথের প্রকৃত ছবির একটি দলিল অতুলচন্দ্র গুপ্তের 'নদীপথে'।
জলের কাছাকাছি দীর্ঘক্ষণ থাকলে যে শীতল ও শান্তিভাবটুকু অনুভব করা যায়, এই বইটি পড়লেও ঠিক তেমনি অনুভূতি হয়। 'স্রোতস্বচ্ছন্দ ভাষায় লেখা এই সুরম্য ভ্রমণকাহিনী আজও সমান সজীব।' ফ্ল্যাপের এই কথার সাথে সম্পূর্ণ একমত।
লেখক একবার নদী ভ্রমণে গিয়েছিলেন বাংলায়। ভ্রমনের সময় তার চোখে দেখা বাংলার নদ নদীর সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন। সেসব বর্ণনা ছিল চিঠিতে,পরে সেটাকে বই আকারে প্রকাশ করা হয়। অপূর্ব। লেখকের অসাধারণ ভ্রমণ বর্ণনার সাথে সাথে বইয়ের ইলাস্ট্রেশন গুলো ছিল অসম্ভব সুন্দর। ছোট্ট একটা বই,কিন্তু এর রেশ থেকে যাবে দীর্ঘ দিন।
জ্ঞান কম থাকার একটা সুবিধে আছে, অভিভূত হওয়াটা তাতে অনায়াস হয়। অবিভক্ত বাংলার নদীপথে যাতায়ত আর তার গতানুগতিকতা আগের শতাব্দীতে কত স্বাভাবিক ছিল ভাবতে বিস্ময় হয়। মেল স্টিমার, ফ্ল্যাট, কুয়াশার পদ্মা, 'নামকানা', নৌকোর স্টিমার চাপা পড়া...এসব এমন এক দুনিয়ার জলরং আঁকে, যা না দেখেও নস্টালজিক হতে বাধা থাকে না। বইটা আনন্দ থেকে বেরিয়েছে আর SETএর সিলেবাসেও আছে যখন, তখন নিশ্চিত পাঠকমহলে সুপরিচিত। কিন্তু আমার গ্রাম্যমফস্বলী মন কিকরে জানবে চখাচখি বসে পুরো চর ধুকপুকে জ্যান্ত হয়, বা কালোপাথুরে জিভ কিভাবে নদীতে পড়ে থাকে। এই পথের আয়ু ফুরিয়েছে, দেশভাগের দাগ বা ট্রেনপ্লেনবাসের দৌলতে। এক আইনবিশারদের (লোকে আইনি পরামর্শ নিতে আসছিলো) চোখে প্রাকদ্বিতীয়বিশ্বযুদ্ধের বাংলা আর আসামের এক জলছবি, আর জলরং যেমন হয়, অস্পষ্টতা আর মিনিমালিস্টিকতা এই ভ্রমণকাহিনীর মেজাজ এক্কেবারে।
বইটার আকার আর প্রচ্ছদ খুব খুব ভাল লেগেছে, আয়তন আমার মত হাফপড়ুয়ার জন্য আদর্শ। পরিতোষ সেনের অলঙ্করণগুলো অসামান্য লেগেছে।