“ভারতবর্ষ এক মহান দেশ, কারণ তার বিভিন্ন কোণে ছড়িয়ে থাকা একেকজন অসাধারণ সাধারণ মানুষের জন্য” – এক সাধারণ ভ্রমণপিপাসু বাঙালি, বন্ধুবান্ধব ও পাঠকের আড্ডায় তাঁর বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সঙ্গে গুজব ও কল্পনা মিশিয়ে পরিবেশন করছেন গল্প। একান্তে তাঁর কলমে ভীড় করে আসছে সেইসব সাধারণ মানুষের চরিত্র, গল্পের আকারে লিপিবদ্ধ ও প্রকাশিত হচ্ছে বিভিন্ন সাময়িক পত্রিকায়। আবার তিনিই বসেছেন ক্যামেরার মেমোরি কার্ড ও আন্তর্জালের আধার থেকে স্থিরচিত্র আহরণ করে সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরতের পর পরত বসিয়ে সেই সব ছবির মাধ্যমে নিজের কল্পনা ও অভিজ্ঞতার রূপদান করতে। একের পর এক সেই সব খণ্ডচিত্র ও গল্প-কল্পনা-অভিজ্ঞতার পত্রপুষ্প জুড়েই এক দীর্ঘ আখ্যানমালা। কী বলব একে? গল্প-সংকলন? স্মৃতিকথা? ট্রাভেলগ? নাকি সম্পূর্ণতই একটিমাত্র উপন্যাস? এক মহান দেশের অসাধারণ এক সাধারণ মানুষের আত্মকথন। মজলিশী মেজাজে ভুমিকা থেকে বিভিন্ন অধ্যায়ের শিরোনামে এই বই ক্রমশ বিস্তৃত হয়ে যায় একেবারে আক্ষরিক অর্থেই আসমুদ্রহিমাচলে। ফুলের মালার মধ্যে তুলনামূলক অনুজ্জ্বল ফুলটিও যেমন নিজস্বতা দাবী করে, অন্য ফুলগুলির বর্ণে-দ্যুতিতে হয়ে ওঠে সমুজ্জ্বল, তেমনি দুর্বলতম গল্পটিও কী অনায়াস দক্ষতায় লেখক বুনে দেন গল্পগুজবের আড্ডায়। গল্পে যাকে অতিকথন অপবাদের ভয়ে স্থান দিতে অপারগ হন গল্পগুজবের আসরেই বলা যায় সেই অসম্ভব সত্যি ঘটনার আখ্যান। আবার দেশ পত্রিকায় যে ডিসিপি ব্রহ্মকমলের রহস্য সমাধান করে প্রথম পুরষ্কার অর্জন করেছিলেন, সেই ধৃতিমান বোসেরই আরেক রোমাঞ্চকর রহস্য অনুসন্ধান যে রয়ে গিয়েছে এক উপন্যাসে তা পাঠকের অজানাই থেকে যেত গল্পগুজবের আড্ডা না জমলে। এই আড্ডাতেই আরও জানা যায় লেখক হিসেবে প্রথম বড়মাপের আত্মপ্রকাশের সেই ব্রহ্মকমল গল্পটি রচনার পটভূমিকার কথা। চকিতে একবার গল্পগুজবের শ্রোতা-পাঠকরা ঘুরে আসতে বাধ্য হবেনই সেই ছোটগল্পে, তবেই তো জানবেন পায়ের ক্র্যাম্পটা আসলে কার লেগেছিল, নীলাদ্রির? নাকি অন্য কারো? একটি বাদে বাকি সব গল্প উত্তম পুরুষে লেখা হওয়ায় আরেকটি সুবিধে হয়েছে - সত্যি ঘটনা আর গল্পের মধ্যে কোন সীমারেখা থাকছে না। অনেক যায়গায় কথকের অকপট স্বীকারোক্তির কাছে স্তম্ভিত হতে হয়, এমন সাহস তো আত্মজীবনীকারও অনেক সময় দেখাতে পারেন না। গল্পগুজবের আড্ডা শুরু হয়েছিল মহান দেশ ভারতবর্ষের একটি অন্ধকার সময়কালে নবদম্পতির ভ্রমণকাহিনী দিয়ে, আড্ডার নিয়মে প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে ঘুরে ১৬ টি গল্প, ১ টি উপন্যাস, ১৮টি অভিজ্ঞতা যাপন করে ফিরে আসে আবার সেই অভিশপ্ত ডিসেম্বরে, একটি বৃত্ত পরিপূর্ণ হয়।
কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৬৪, ব্যারাকপুরে। প্রথম জীবন কেটেছে শ্যামনগরে। ইছাপুর নর্থল্যান্ড বয়েজ হাইস্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা। স্কুলজীবন থেকেই লেখালেখির সূত্রপাত। প্রথমে অনিয়মিতভাবে কিছু লিটল ম্যাগাজিনে লিখতেন। ২০০৫ থেকে নিয়মিতভাবে আনন্দবাজার পত্রিকার বিভিন্ন প্রকাশনায় ছোটগল্প লিখছেন। ‘খেজুর কাঁটা’ গল্পটি নিয়ে হয়েছে শ্রুতিনাটক। ছোটগল্প ‘ছবির মুখ’ আকাশবাণীতে বেতারনাটক হয়ে সম্প্রচারিত হয়েছে। লেখকের ‘ব্রহ্মকমল’ গল্পটি ২০০৬-এ ‘দেশ রহস্যগল্প প্রতিযোগিতা’য় প্রথম পুরস্কার লাভ করেছে। ২০০৭-এ ‘পূর্বা’ শীর্ষক একটি কল্পবিজ্ঞান গল্পের জন্য ‘দেশ গল্প প্রতিযোগিতা’য় দ্বিতীয় স্থান পেয়েছেন। রাধিকা লেখকের প্রথম উপন্যাস।পেশাদারি জীবনে ইঞ্জিনিয়ার, বেসরকারি বিদ্যুৎ সংস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে কর্মরত। সাহিত্য ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে প্রবন্ধ লেখেন। ভারতীয় মার্গ সংগীতের প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত।
বাস্তব অভিজ্ঞতা ,স্মৃতিকথা ,জনশ্রুতি, ছোট বড় গল্প, এবং একটি উপন্যাস নিয়ে প্রকাশিত বইটি পড়তে ভালোই লাগলো। জঙ্গলে বাঘ হাতি দেখার রোমাঙ্চকর বৃত্তান্ত, দেশের বিভিন্ন প্রদেশের সাধারণ মানুষের কথা ও সংষ্কৃতি ,স্কুল জীবনের টুকরো স্মৃতি, পারিবারিক ভ্রমণ ইত্যাদি অভিজ্ঞতা ও কল্পনায় মেশানো রচনাগুলির "গল্পগুজব"নামকরণ সার্থকতা পেয়েছে।ঠিক যেমন বন্ধুদের সাথে বা পরিবারের সাথে গল্পে ও আড্ডায় বিভিন্ন রকমের বিষয় ঘটনা ঘুরে ফিরে চলতে থাকে ঠিক সেভাবেই সমস্ত রচনা গুলি বই এর মধ্যে ছড়িয়ে আছে। অথচ কখনোই এলোমেলো মনে হয়নি। বেশ যত্নের সঙ্গেই লেখা সমস্ত বিষয়।রাজস্থান, পন্ডিচেরী, ডুয়ার্স, রণথম্বোর , মহাবলীপুরম, চেন্নাই ,অজন্তা ইত্যাদি স্থান ভ্রমণপ্রেমী লেখকের নিপুণ বর্ননায় বইটি পড়তে পড়তেই যেন দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনায়াসে ঘুরে বেড়ানো যায়। হিমালয়ের কোলে valley of flowers এর উপর সংক্ষীপ্ত লেখাটি আমায় মুগ্ধ করেছে। কল্প বিজ্ঞানের গল্প চার্জার ৫ ও মাহেন্দ্রক্ষণ পড়েও বেশ ভালো লাগল। এইভাবেই কল্পনা ও বাস্তব মিশিয়ে রচিত এই সঙ্কলনে রহস্য ,রোমাঞ্চ, লোককথা, ভয়, ভৌতিক মূহুর্ত, ভালোবাসা,বিষণ্ণতা,মানবিকতা এবং আত্মকথা ঘটনাক্রমে সকলেই উপস্থিত। প্রচ্ছদ ও বই এর পাতায় মুদ্রিত ছবিগুলিও বেশ চমৎকার। "ভারতবর্ষের একেকটা অসাধারণ সাধারণ মানুষের জন্যেই ভারত এক মহান দেশ " এতো সহজ, সরল ও তাৎপর্যপূর্ণ কথা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের ও নিজের অভিজ্ঞতার সাথে কল্পনা মেশানো নানা রঙের গল্পগুজবের মাধ্যমে উপলব্ধি করানোর জন্যে শ্রদ্ধেয় লেখককে আমার "স্যালুট"।