কোশলরাজের পুরোহিত ভার্গব-পুত্র অঙ্গুলিমাল । তাঁর জন্মের পর দৈবজ্ঞরা ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন - কালে তিনি ভয়ঙ্কর দস্যু হবেন। তাই ভার্গবের ইচ্ছা ছিল তিনি পুত্রের প্রাণ নাশ করবেন। কিন্তু কোশল -রাজ্যের আদেশে তিনি এই সংকল্প ত্যাগ করেন।
অঙ্গুলিমালের প্রকৃত নাম অহিংসক । তক্ষশিলায় বিদ্যাশিক্ষার সময় তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। সহপাঠীদের কেউ তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না। তাই তাঁর সতীর্থরা ঈর্ষাবশত গুরুর কাছে এই বলে মিথ্যা অভিযোগ করেন যে, তিনি গুরুপত্নীর প্রতি প্রণয়াসক্ত। ক্রুদ্ধ গুরু পুর্পাবর বিবেচনা না করে তখন তাঁকে নির্দেশ দিলেন-- বৎস অহিংসক, যদি তুমি এক সহস্র মানুষের প্রাণ নাশ করে প্রত্যেকের একটি করে আঙ্গুল এনে আমাকে দেখতে পার, তবেই তোমাকে বিদ্যা দান করবো, অন্যথায় এই বিদ্যালয় ত্যাগ করতে হবে।
জন্ম ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৫০। প্রথম জীবনে কবিতা লিখতেন। উভয় বাংলার শ্রেষ্ঠ পত্রপত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তারপর সিনেমার বিষয়ে উৎসাহী হয়ে উঠলেন এবং এপর্যন্ত বেশ কিছু তথ্যচিত্রসহ ‘তথাগত’ নামে গৌতম বুদ্ধের জীবনের উপর ভিত্তি করে একটি হিন্দি কাহিনিচিত্র তৈরি করেছেন। তাঁর রচনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষকরা তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং করছেন। ‘ব্যাস’ উপন্যাসের মাধ্যমে নতুন করে সাহিত্যযাত্রা শুরু হয়। তাঁর উপন্যাস নিয়ে প্রখ্যাত সমালোচক পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় ‘শাহ্যাদ ফিরদাউসঃ উপন্যাসের সন্দর্ভ’ নামে একটি গ্রন্থ লিখেছেন। স্বপ্না পালিত ও স্বপন ভট্টাচার্য ‘মুখোমুখি শাহ্যাদ ফিরদাউস’ নামে একটি সাক্ষাৎকার ভিত্তিক গ্রন্থ তৈরি করেছেন। ‘অ-য়ে অজগর’ পত্রিকা তাঁর প্রথম নয়টি উপন্যাস নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। সাহিত্য এবং চলচ্চিত্র ছাড়াও তিনি সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। কলকাতার রুশ দূতাবাসের সংস্কৃতি দপ্তরের সহযোগিতায় পরিচালিত সাহিত্য সংস্থা ‘প্রগতি সাহিত্য সংবাস’-এর সম্পাদক। শান্তি সংগঠন ‘কলকাতা পিস মুভমেন্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের শিক্ষা দেওয়া ও নেওয়ার প্রতিষ্ঠান ‘পিস স্কুল’-এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক।
গল্পের ধাপে ধাপেই বেশ নাটকীয়তা, আর পড়তে শুরু করার একটু পর পর যখন মনে হচ্ছিল গল্প বোরিং হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই কাহিনী আরও ইন্টারেস্টিং হতে থাকল।
অনুপম রায়ের লেখার গানের একটা লাইন আছে- "হিংসা যাকে বাসল ভালো মানবে কেন সে বারন"
তক্ষশিলার এক প্রতিভাবান তরুণ অহিংসকের ভাগ্য এই হিংসার প্রভাবেই বদলে গেল হঠাৎ। গুরুর সবচেয়ে প্রিয় শিষ্য থেকে সবচেয়ে ঘৃণার পাত্র হয়ে উঠল সে। একটা সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদ্যাশ্রমের ইর্ষাকাতর সহপাঠীরা এমনভাবে গুরুদেবের কনভারি করল যে গুরুদেব ক্রোধের বসে বিনা পাপে অহিংসককে গুরু দন্ড দিলেন। বললেন, "তোমাকে আর পড়াইতে পারবো না বৎস। তয় তুমি যদি এক হাজার মানুষ হত্যা করে তাদের একটি করে আঙ্গুল এনে আমাকে দেখাইতে পারো তাইলে তুমি continue করতে পারবা। Otherwise get lost!"
বোঝেন অবস্থা! কোনো শিক্ষক তার শিষ্যকে এমন শাস্তি দিতে পারেন? কিন্তু কথা হচ্ছে, অহিংসক জ্ঞানের অন্বেষক। জ্ঞানার্জন তার সাধণা এবং বেঁচে থাকার অর্থ। তাই তক্ষশিলার ভুবনবিখ্যাত বিদ্যাশ্রম থেকে যখন তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হয় তখন থেকেই শুরু হয় তার মধ্যে মানসিক দন্দ। জ্ঞানার্জনই যে ছিল তার একমাত্র প্রেম।
সে কি তার গুরুর আদেশ পালন করে আবার বিদ্যাশ্রমে ফিরে যেতে চাইবে? সে ক্ষেত্রে সহস্র মানুষ তাকে হত্যা করতে হবে। সে কি সহস্র মানুষের কাটা আঙ্গুল দিয়ে মালা গেথে হয়ে উঠবে অঙ্গুলিমাল? তাকে যদি এমন সহিংসই হতে হয় তাহলে বিদ্যালাভের উদ্দেশ্য কী?
---[SPOILER ALERT]---
আসলে এটা বুদ্ধধর্মের একটা প্রাচীনগল্প, মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত, ঐতিহাসিক পটমুভিও আছে।
খুব সরলীকরণভাবে দেখলে অহিংসক বিভ্রান্ত এক তরুণ। সে তক্ষশিলায় সেরা শিক্ষার্থী ছিল বটে কিন্তু তার অর্জিত শিক্ষা বিভ্রান্তিপূর্ণ। তাই কিনা দেখা যায় পরবর্তীতে সে অহিংসক থেকে অঙ্গুলিমাল হয়ে হঠে। আরও সোজাসুজি বললে, এক সন্ত্রাসী হয়ে হঠে। সন্ত্রাসী কারা? যারা মানুষের মন সন্ত্রস্ত করতে পারে। অহিংসক সেটা পেরেছিল। নাহলে কিভাবে একা একা এত মানুষকে হত্যা করতে পারল?
আমার মনে গল্পটা কিছু ভিন্ন চিন্তা দিয়েছে। অহিংসকের মত তরুণদের কি আমারা আমাদের সমাজেও দেখছি না? আদর, স্নেহ ও যত্নে বেড়ে ওঠার পরও দেখা যায় কত তরুণ বিভ্রান্ত হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে লিপ্ত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো কি এমন অনেক তরুণদের recruit করে নি? শিক্ষালাভের পরও তো তারা অহিংসক না হয়ে অঙ্গুলিমাল হয়ে উঠল। হলি আর্টিজেন হামলায় তরুণদের কথাই ভাবুন। তাদের সাথে তো দারিদ্রতার সম্পর্ক ছিল না। শিক্ষিত সমাজ থেকে এসেও কেন তারা এমন ভয়ানক কাজ করল? মানুষ হত্যা বাদ দেই, শিক্ষিত সমাজ কেউ না কেউ প্রতিদিনই মানুষ হত্যা ছাড়াও কত হিংসাত্মক কাজ করছে না?
গল্পের প্রথম পরিচ্ছেদ শুরু এই বাক্যটি দিয়েঃ বিদ্যালাভের উদ্দেশ্য কী?
আসলেই বিদ্যালাভের উদ্দেশ্য অনুভব করা জরুরী(শুধু জানলেই হবে না)।
এই লেখকের প্রতিটি বই পড়ে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। একেবারেই যেমন আশা করিনি, ভাবিনি, তেমন কিছু হচ্ছে। যা হচ্ছে তা অদ্ভুত হলেও আবার খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে।
এই বইয়ের শুরু থেকে বুঝতে পারছিলাম এখানে বুদ্ধের একটা বড় ভূমিকা থাকবে, কিন্তু সে ভূমিকা এমন মোড় নিবে তা ভাবিনি।
অহিংসকের মানসিক দ্বন্দ্ব, আকস্মিকভাবে কিছু করে নিজেরই তা অবিশ্বাস্য মনে হওয়া, এসব যেন প্রতি মুহূর্তে অনুভব করতে পারছিলাম।
আমাদের সবার অবস্থাই অহিংসকের মতই। ভালো কিছু লাভের আশায় অনিচ্ছায় কঠিন পথ অতিক্রম করছি, কিন্তু সেই ভালো জিনিসটা আসলেই কতটা ভালো সেটাই গভীরভাবে ভাবি না আসলে।
এখনকার পরিস্থিতিতে বুদ্ধের কথাগুলো যেন আরও বেশি উপযুক্ত মনে হচ্ছে। "সব্বে সত্তা সুখিতা হন্তু - সকল প্রাণী সুখী হোক।"
শাহযাদ ফিরদাউস রচিত 'অঙ্গুলিমাল' উপন্যাসটি মূলত বর্ণনানির্ভর; সংলাপ সামান্যই। তবে বর্ণনার সাথে সাথেই লেখক কাহিনী এগিয়ে নিয়েছেন, চরিত্রের মানসিক টানাপোড়েন ফুটিয়ে তুলেছেন — তাই একঘেয়েমি সেভাবে জেঁকে বসার সুযোগ পায়নি। তবে পড়তে সময় লাগে বেশি। কিন্তু পড়া শেষে একটা আত্মতুষ্টি কাজ করে। এই আত্মতুষ্টি অহিংসকের জয়ী হবার, হিংসার বিরুদ্ধে অহিংসার জয়ের।
স্নেহ ভালবাসার জন্য কারণ দরকার করে না। ভালবাসা নিজেই নিজের কারণ। মানুষের মানবিকতার কোনও কারণ নেই। মানবিকতা নিজেই নিজের উৎস। মনুষ্যত্বের কোনও কারণ থাকে না, মনুষ্যত্বই মানুষের স্বভাবধর্ম।
A scholar. A doubter. A helper. A beloved student. A murderer. A serial Killer. A truth-searcher. A devotee of the Buddha. A monk. A bhikkhu. A mass-victim.
The protagonist of this simple yet harrowing tale transforms over time, from a simple man who have set out to search for the path of knowledge and truth, transforms to a monster, due to his willingness to be one. Due to delusion, and circumstances. Because, in the end, it is only choices, and paths that we tread upon, we decide who we want to be.
The prose is heavy with words. It took time for me to grasp each and every meaning. There are deep metaphors and conversations and philosophy embedded in the writing, that makes you think and question almost everything you know. Nowhere, you find an unrelated tug of extra words pushed out of the scope of the story.
A serious read! Recommended, if you want some change from light reading!
মানুষ তার সাফল্য লাভের প্রতিটি সিঁড়িতে কিভাবে। আত্ম এবং আত্মীয়-হুতি দেয় তার নিদর্শন। অহিংসকের যাপন কিভাবে হিংসাত্মক অঙ্গুলিমাল রূপান্তরিত হয় তার নিদারুন আখ্যান।