পুরুষোত্তম ভগবান বিষ্ণুর অন্যতম একটি নাম। এই নামে উপন্যাসের নামকরণের হেতু কি??
শুরুতেই একটা সংক্ষিপ্ত গল্প বলা যাক।প্রভু ভঙ্কটেশ্বর বা তিরুপতি বালাজির কপাল থেকে নাক- মুখ পর্যন্ত কর্পূরের প্রলেপ ঢাকা থাকে।এই প্রসঙ্গে একটি গল্প প্রচলিত আছে। রামানুজের শিষ্য অনন্ত আচার্যের ওপর প্রভু তিরুপতির ফুলের বাগান সংরক্ষণের ভার ছিল। তিনি একদিন কোদাল দিয়ে বাগানে মাটি কেটে সমান করছিলেন আর ঝুড়িতে সেই মাটি মাথায় বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তার স্ত্রী। এই কাজ করতে গিয়ে তার স্ত্রী ভারী ক্লান্ত-শ্রান্ত আর অবসন্ন হয়ে পড়লেন আর মাটি বইতে পারে না এমন অবস্থা। এই দেখে স্বয়ং তিরুপতি এক তরুণ ব্রহ্মচারীর দেশ হয়ে এসে মাটি সরানোর কাজে তার স্ত্রীকে সাহায্য করতে লাগলেন। দূর থেকে তাই দেখে সন্দেহে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন অনন্ত আচার্য। সোজা এসে কোদাল দিয়ে সে ব্রহ্মচারীর মুখে বিষম আঘাত করে বসলেন। ব্রহ্মচারীকে আর দেখা গেল না। তারপরই অনন্ত আচার্য মন্দির এসে দেখে বিগ্রহের মুখ আর চিবুক দিয়ে অঝোরে টাটকা রক্ত ঝরছে। অনন্ত আচার্য বুঝলেন কাকে আঘাত করেছেন। হায় হায় করে ত্বরিতে প্রভুর সে ক্ষতের ওপর কর্পূরের প্রলেপ লাগিয়ে দিলেন তিনি। প্রভু তিরুপতি তাকে যে শুধু ক্ষমাই করলেন তাই নয় অনদাচার্যের প্রতি প্রেমে নিদর্শন সড়ক সেই কর্পূর প্রলেপ অলংকারের মত চিরদিন ধারণ করে থাকলেন।
এবার উপন্যাসের চরিত্রদের পরিচয়ে আসা যাক। প্রখ্যাত এক লেখক দক্ষিণ ভারত ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে এক পর্যটন সংস্থার সঙ্গে ট্রেনে যাত্রা শুরু করেন।সেখানে তার পরিচয় হয় মঙ্গল ঘোষের সাথে।পরিচয় পর্বের এক পর্যায়ে তিনি বলে বসেন যে তিনি বারো বছর যাবৎ কারাদণ্ড ভোগ করেছেন, কাউকে খুন কররা প্রচেষ্টার অপরাধে।এখন তিরুপতি বালার উদ্দেশ্যে চলেছেন একজনের অনুতাপ সচক্ষে দেখার জন্য।লেখক এই কথা শুনে তাজ্জব বনে গেলেন।লেখক তাকে প্রথম থেকেই দেখছিলেন যে তিনি একটি প্রকান্ড আকারের বই "দি সেলফ" এর মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেন।এবং, তার বেশভূষায় এবং কথা বার্তায় কিছুতেই এই কথা বিশ্বাস হতে চায় না যে তিনি এত বছর জেলে ছিলেন। একজন খুনি মানুষের মুখ,চোখ,হাসি এত সুন্দর হয় কি করে? আর যদি তাই হয় তাহলে নিজের অপরাধবোধের পরিবর্তে কার অনুশোচনা দেখার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন! মনে প্রশ্ন জমতে শুরু করলেও তা ব্যক্ত করেননি স্বল্পভাষী মঙ্গল ঘোষের কাছে। যাত্রাপথে ট্রেনে পরিচয় হয় স্মৃতিকনার সাথে। এখানে তার জীবনের বর্নিত কাহিনীটিও বিচিত্র। ভালবাসার মর্যাদা দিতে পারেনি এমন এক পুরুষকে তার অন্তিম শয্যা থেকে তুলে ধরার জন্য মিনাক্ষী মন্দিরে তার আকুতি হৃদয়কে ব্যাকুল করেছে। লেখকসহ মঙ্গল ঘোষ অবশেষে যখন তার গন্তব্যে পৌঁছোলেন, তিনি সম্মুখীন হলেন তার স্ত্রী সুমিত্রা দেবীর। এটাই ছিল তার আসল গন্তব্য। লেখক জানতে পারলেন শিকারী মঙ্গল ঘোষের অতীত দিনগুলোর সম্পর্কে। নিজের দেবতুল্য পিতাকে চরম ঘৃনা করার কারন, সুমিত্রা দেবীর থেকে বারো বছরের দূরত্বের কারন, তাদের পরিচয় -পরিনয় সব। সুমিত্রা দেবী সংস্কৃতের ছাত্রী। বিভিন্ন পুথি নিয়ে গবেষণা করাই তার কাজ।সেই পুথির সন্ধানেই মঙ্গল ঘোষের বাড়িতে গিয়ে তাদের পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে আস্তে আস্তে পরিনতি পায় তাদের সম্পর্ক। সব ঠিকঠাক চললেও পরবর্তীতে ��ক কালো অধ্যায়ের সূচনা করে কৃষ্ণকুমার নামের এক ব্যক্তির আগমন। সুমিত্রার এক গবেষনায় সেও ছিল তার সাহায্যকারী হিসেবে।তার এই উপস্থিতি মঙ্গল ঘোষ মেনে নিতে না পেরে ঘটিয়ে ফেলেন এক অভাবনীয় দুর্ঘটনা। শিকারী মঙ্গল ঘোষের আঘাতে আহত হলেও শেষ পর্যন্ত নিহত হননি তিনি।বারো বছর পর তার জবানবন্দিতে মঙ্গল ঘোষ একটি বিষয় বুঝতে পারেন যে সুমিত্রা তাকে ঘৃনা করলেও তিনি ছাড়া তার জীবনে আর কেউ ছিলো না। তিনি তারপরই সেই স্থান ত্যাগ করলেও প্রস্থান করেননি সেই লেখক মহোদয়। তিনি সুমিত্রা দেবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাকে একটি প্রশ্ন করেন, "তিরুপতি বালাজির কপাল থেকে মুখ পর্যন্ত চন্দন ও কর্পুরের প্রলেপে ঢাকা থাকে কেনো?"
এই সম্পর্কে বিভিন্ন গল্প প্রচলিত থাকলেও লেখকের জানা একটি গল্প লেখক নিজেই ব্যক্ত করেন সুমিত্রা দেবীর সামনে যা শুরুতেই বলা হয়ে গেছে।
লেখকের তার কাছে এই জিজ্ঞাসা ছিল, ভগবানের পরম ভক্ত যদি তার স্ত্রীর প্রেমে অন্ধ হয়ে এই ভুলটি করার পরেও ক্ষমা পেয়ে থাকেন তবে মানুষ মঙ্গল ঘোষ, যিনি এক ব্যক্তিকে অভুক্ত অবস্থায় আত্নহননের ইচ্ছা থেকে উদ্ধার করে তাকে তার গন্তব্যে পাঠিয়েছেন, স্মৃতিকনা নামের এক রমনীকে অর্থ সাহায্য প্রদান করে তার স্বপ্ন পুরনের পথ করে দিতে চেয়েছেন,নিজের ভুল গুলো ফুলে পরিনত করার জন্য নিজেকে সঠিকভাবে জানতে আত্মবিশ্লেষন করে চলেছেন, তিনি কি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য একেবারেই হয়?
মতামত : এ বেশ ভিন্নধর্মী একটি বই ছিল আমার জন্য। উপসংহারে যেভাবে ভগবানের ক্ষমা প্রদান ও তার নিকট ভক্তের ক্ষমা প্রাপ্তি এবং মর্ত্যের মানুষের ভুল ও ক্ষমা প্রাপ্তির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এখানেই আমার কাছে উপন্যাসটা সার্থক হয়ে গেছে।